আমাদের সম্পদ সীমিত কিন্তু চাওয়া অসীম। এই অসীম চাওয়াকে সীমিত সম্পদ দিয়ে কীভাবে মেটানো যায়, তার মধ্যেই অর্থশাস্ত্র অধ্যয়নের মূল বিষয়বস্তু লুক্কায়িত। একটা আদর্শ অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সাধারণত অবাধ বাজার ব্যবস্থাই হচ্ছে একটি সর্বজনীন ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সীমিত সম্পদের কাঙ্ক্ষিত বণ্টন নিশ্চিত হয়। একে আমরা এডাম স্মিথের ‘ইনভিজিবল হ্যান্ড’ দ্বারা পরিচালিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে জেনে থাকি। তবে বিভিন্ন কারণে অবাধ বাজার ব্যবস্থা তার কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালাতে ব্যর্থ হয়। এক্ষেত্রে দুটি কারণ উল্লেখযোগ্য। একটি হচ্ছে যদি সম্পদের ওপর কারো একচেটিয়া বা মনোপলি অধিকার থাকে; আরেকটি হচ্ছে উৎপাদন বা ভোগের ক্ষেত্রে যদি এক্সটার্নালিটি বা বাহ্যিকতা থাকে। এই দুই ক্ষেত্রেই সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়া শুধু বাজারভিত্তিক সরবরাহ ও চাহিদার মাধ্যমে উৎপাদন ও বাজারমূল্য ঠিক করা হলে তা সমাজের জন্য কল্যাণকর হবে না। কারণ এক্ষেত্রে উৎপাদন প্রয়োজনের তুলনায় কম বা বেশি হতে পারে এবং বাজারমূল্যও হতে পারে অস্বাভাবিক। কাজেই এসব ক্ষেত্রে সমাজের কল্যাণ নিশ্চিতে উৎপাদন ও দাম নির্ধারণে সরকারের হস্তক্ষেপ আবশ্যক।

এখানে একটা জিনিস মনে রাখতে হবে যে বাজারমূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো দ্রব্যের বিক্রেতা ও ক্রেতাদের মধ্যে একটি শক্তির মহড়া হয়ে থাকে। যদি বিক্রেতার শক্তি বেশি হয়, তবে তিনি বেশি দাম নির্ধারণ করবেন এবং কম সরবরাহ করবেন। আবার যদি ক্রেতার শক্তি বেশি হয়, তবে তিনি কম দাম নির্ধারণ করবেন এবং বেশি ভোগ করতে চেষ্টা করবেন। এক্ষেত্রে মজার বিষয় হচ্ছে, ‘বিক্রেতা কিংবা ক্রেতার সংখ্যা যত কম হবে, বাজারমূল্য নির্ধারণে তার শক্তি তত বেশি হবে’ কিংবা বলা যায়, ‘যে যত বেশি দলে ভারী সে তত বেশি অসহায়’।

সাম্প্রতিক সময়ের কিছু অস্বাভাবিক বাজারদরের ঘটনার আলোকে বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার করা যাক। প্রথমত, অলিগোপলি বাজার ব্যবস্থা—এর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিক্রেতার সংখ্যা হাতেগোনা কয়েকজন কিন্তু ক্রেতার সংখ্যা অগণিত। এখানে কেবল দু-চারজন বিক্রেতার মাধ্যমে পুরো বাজারের সরবরাহ ও পণ্যের মূল্য নির্ধারণ হয়ে থাকে। তাছাড়া এই বাজার ব্যবস্থায় কোনোভাবে যদি বিক্রেতারা একজোট হয়ে যেতে পারেন, তবে সেই অলিগোপলি একটা মনোপলিতে রূপ নেয়। তখন তারা তাদের পছন্দ অনুযায়ী পণ্যের সরবরাহ ও বাজারদর নির্ধারণ করেন। এক্ষেত্রে কয়েক মাস আগে বাংলাদেশের বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ ও দামের ব্যাপারটি উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে। তবে সরকারের সময়োচিত হস্তক্ষেপের কারণে সে পরিস্থিতি ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে আসে। আমাদের দেশের সেলফোন অপারেটর বা মোবাইল মানি সার্ভিস প্রভাইডারদের বাজারকেও অলিগোপলি হিসেবে ধরে নেয়া যায়। এখানেও সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে সেবা সরবরাহ এবং তার দাম সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে।

অলিগোপলি বাজার ব্যবস্থার ঠিক বিপরীত আরেকটা বাজার ব্যবস্থা আছে, যার নাম ‘অলিগোপসোনি’। এখানে ক্রেতার সংখ্যা গুটিকয়েক কিন্তু বিক্রেতার সংখ্যা অনেক। ফলে পণ্যের পরিমাণ ও তার মূল্য নির্ধারণে বিক্রেতার তেমন ভূমিকা না থাকলেও ক্রেতার ভূমিকা খুবই শক্তিশালী। এক্ষেত্রেও যদি সব ক্রেতা কোনোভাবে একজোট হয়ে যেতে পারে, তবে তারা আরো শক্তিশালী হয়ে যে বাজার ব্যবস্থা তৈরি করবে, তাকে মনোপলির ঠিক বিপরীত ব্যবস্থা বা মনোপসোনি বলা হয়। এখানে উদাহরণ হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে কোরবানির পশুর চামড়ার মাঠ পর্যায়ে বাজারদরের বিষয়টির কথা উল্লেখ করা যায়। সরকার কর্তৃক মূল্যনির্ধারণের বিষয়টি ট্যানারির মালিক পর্যায়ে নির্ধারণ করে দেয়া হলেও মাঠ পর্যায়ে তার বাস্তবায়নে কিছু সমস্যা ছিল। ফলে মাঠ পর্যায়ে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম এবার অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়েছিল।

কাজেই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে ‘মনোপলিতে’ যেমন ক্রেতার স্বার্থ বিঘ্নিত হয় মনোপসোনিতে, ঠিক তেমনি বিক্রেতার স্বার্থ বিঘ্নিত হয়। কাজেই বাজার ব্যবস্থায় যাতে কোনোক্রমেই মনোপলি কিংবা মনোপসোনি পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়, সে ব্যাপারে সদা সতর্ক থাকতে হবে।

 

ড. মো. হাবিবুর রহমান: বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক