গতানুগতিক বাণিজ্য তত্ত্ব অনুযায়ী, পণ্য প্রবাহের গতিপথ ও বিপুলতা প্রধানত নির্ণীত হয় বাণিজ্যে নিয়োজিত দেশগুলোর আপেক্ষিক সুবিধা দ্বারা। এসব আপেক্ষিক সুবিধা নির্ভর করে উৎপাদন ফ্যাক্টরের [শ্রম, পুঁজি (মানব পুঁজিসহ) এবং ভূমি (প্রাকৃতিক সম্পদ)] গুণগত বৈশিষ্ট্যের ওপর। বিভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন ফ্যাক্টরের বৈশিষ্ট্য সমন্বয়কারী শক্তিগুলো- বিশেষ করে উন্নত অর্থনীতি থেকে পুঁজি ও প্রযুক্তি এবং উন্নয়নশীল দেশ থেকে সস্তা শ্রম- বৈশ্বিক মূল্য নিগড়ের (জিভিসি) উন্নয়ন চালিত করে।
কভিড-১৯ বোধহয় একই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকা দেশগুলোর মধ্যে ‘সমরূপ মূল্য নিগড়ের ( পিয়ার ভ্যালু চেইন)’ দিকে যাত্রা ত্বরান্বিত করবে। অধিকন্তু, গতানুগতিক উৎপাদন ফ্যাক্টর, অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মান একটি দেশের আপেক্ষিক সুবিধার গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হতে পারে। ন্যাথান নান ‘কনট্র্যাক্ট-ইনটেনসিভ’ পণ্যের ধারণার অবয়ব দিয়েছে, উৎপাদন প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে বহু লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত যার জটিল সরবরাহ নিগড় রয়েছে।
বিপুল শ্রমশক্তি থাকা কোনো দেশের ঠিক যেমনটা শ্রমনিবিড় পণ্য উৎপাদনে আপেক্ষিক সুবিধা থাকে, তেমনি আইনি ব্যবস্থার মানে তুলনামূলক সুবিধা থাকা একটি দেশও ‘কনট্র্যাক্ট-ইনটেনসিভ’ পণ্যের নিজ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাসক্ষমতা লক্ষণীয় মাত্রায় উন্নীত করতে পারে। অতএব, নানা অভিজ্ঞতালব্ধভাবে দেখায় যে শ্রেষ্ঠতর আইনি প্রতিষ্ঠানের অধিকারী দেশগুলোর জটিল লেনদেন প্রয়োজন হওয়া পণ্য উৎপাদনে একটি আপেক্ষিক সুবিধা থাকে এবং সেসব দেশ বোধহয় এ ধরনের পণ্য বেশি রফতানি করতে পারে।
বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ অধিকার সুরক্ষায় যথাযথ আইনি কাঠামো থাকা একটি দেশের জ্ঞান-নিবিড় শিল্পগুলোয় একটি সুবিধা আছে। একইভাবে, ন্যায়সঙ্গত ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক কর্মকা- পৃষ্ঠপোষকতা জোগানো অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতাসক্ষমতার পরিপূরক উৎস হতে পারে। এসব উৎসের মধ্যে রয়েছে প্রতিযোগিতা নীতিমালা, নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং সুস্পষ্ট সরকারি ক্রয় মূলনীতি। অভ্যন্তরীণ-দেশীয় প্রযুক্তি উন্নয়ন ও এর ব্যবহারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল প্রযুক্তিগুলোর বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ, ডেটা স্থানীয়করণ, আন্তঃসীমান্ত তথ্য প্রবাহ এবং বাণিজ্য প্রভৃতি হলো বৈশ্বিক সরবরাহ নিগড়ের জন্য কয়েকটি উদীয়মান ইস্যু।
কিছুটা কম নতুন কিছু ফ্যাক্টরের এখনো প্রাসঙ্গিকতা থেকে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, সুনির্দিষ্ট একটি দেশের প্রযুক্তিনিবিড় জিভিসিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে যা গুরুত্ব বহন করে তা হলো বৈশ্বিক প্রযুক্তি ইকোসিস্টেমের সঙ্গে দেশটির প্রযুক্তিগত মানের পরিসর কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেটি। ভৌত অবকাঠামোর মাত্রা (বা পুঁজি ফ্যাক্টর) এবং সংশ্লিষ্ট পরিচালন দক্ষতার প্রাপ্যতা (বা মানবপুঁজি ফ্যাক্টর) ছাড়াও কোনো দেশের প্রতিযোগিতাসক্ষমতার জন্য এসব মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক দিকের তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রয়েছে।
বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও অব্যাহতভাবে পরিবেশগত সুরক্ষা ও স্বচ্ছ বাণিজ্যের মতো করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) প্রতি এখন অনেক বেশি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যথাযথ পরিবেশগত ও শ্রম-মানের উপস্থিতি একটি বৈশ্বিক সরবরাহকারী হিসেবে একটি দেশের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতাসক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
জিভিসির জন্য কেন তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব অধিক?
প্রথমত, যেকোনো দেশের আপেক্ষিক সুবিধা নির্ধারণে বর্তমানে শ্রমের গুরুত্বের অবনতি ঘটছে। তবে নতুন প্রযুক্তির প্লাবনের সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় অদক্ষ শ্রমিক (যা অব্যাহতভাবে যন্ত্র দ্বারা প্রতিস্থাপিত হচ্ছে) দ্রুত তার অর্থনৈতিক মূল্য হারাচ্ছে। এটি ঘটেছে অটোনোমাস রোবটিকস, স্মার্ট সেন্সরস ও আর্টিফিশিয়েল ইন্টেলিজেন্স দ্বারা ক্ষমতায়িত হয়ে উন্নত অর্থনীতিতে ডিজিটালি অটোমেটেড উৎপাদন প্রক্রিয়ার ব্যাপকতর প্রবর্তনের ফল হিসেবে।
দ্বিতীয়ত, বিশেষত চীন-যুক্তরাষ্ট্র চালিত বাণিজ্য যুদ্ধ ও নিরাপত্তা সংঘাতের কারণে বেড়ে চলা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে অর্থনৈতিক পরিবেশে একটি নাটকীয় পরিবর্তন ঘটছে। কোম্পানিগুলো সম্পদ জব্ধ ও বাধ্যতামূলক টেকনোলজি ট্রান্সফারের মতো বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের মুখোমুখি হচ্ছে। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলো কোম্পানিগুলোর আন্তর্জাতিক অপারেশনের সম্ভাব্যতা জোগাতে পারে এবং ব্যবসায়িক কর্মকা-ে স্থানীয় সরকারগুলোর বিবেচনামূলক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ গার্ড হিসেবে কাজ করতে পারে। সরবরাহ নিগড় সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে ঝুঁকি-সংবেদনশীল কোম্পানিগুলো উচ্চ মানের প্রতিষ্ঠান থাকা দেশগুলোর বেশি ঝুঁকবে, কিংবা নিজেদের দেশে অন্তত সমমানের প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য খুঁজবে।
অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলোর সর্বোত্তম ধরন সম্পর্কে সর্বজনীন নীতি-বিধি প্রণয়ন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি প্রধান এজেন্ডা হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। তবে প্রতিটি দেশ এসব সংস্থার সদস্য না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অভ্যন্তরীণ প্রাতিষ্ঠানিক বিধি প্রণয়নের বাস্তবতায় এসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব দ্রুত ধূসর হয়েছে।
কিন্তু বহুপাক্ষিক কাঠামোর অনুপস্থিতিতে দেশগুলো এখনো নিজস্ব প্রতিযোগিতাসক্ষমতা চাঙা করতে অভ্যন্তরীণ প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়নের ক্ষেত্রে একপাক্ষিক ভিত্তিতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সুফলপ্রদায়ী মনে করে। ডব্লিউটিও বাধিত শুল্ক হারের অনেক বাইরে গিয়ে পণ্যের ওপর একটি একপাক্ষিক শুল্ক হ্রাসের প্রবণতার মধ্যে পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশে এটি দেখা গেছে।
জিভিসিগুলো পরিবহন ধরন ও তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তিগুলোয় দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কভিড-১৯ মহামারীর পরে উৎপদান সক্ষমতার বৈচিত্র্যায়ন নিয়ে বেড়ে চলা উদ্বেগের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হবে। সম্ভবত ভবিষ্যতে ভৌগোলিকভাবে বিভাজিত জিভিসিগুলোর সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকবে। তবে মূল্য নিগড়ের পুনঃসংগঠন আর আগের মতো উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মজুরি পার্থক্যের মধ্যস্থতা শক্তি দ্বারা চালিত হবে না, কারণ রোবোটিকস ও আর্টিফিশিয়েল ইন্টেলিজেন্সের এ যুগে মজুরি খুব কমই গুরুত্ব বহন করে। বরং তার পরিবর্তে একই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য থাকা দেশগুলোর মধ্যে জিভিসিগুলো ভবিষ্যতে ‘সমরূপ মূল্য নিগড়ের’ পরিচর্যা চালিয়ে যাবে।
সাতোশি ইনোমাতা: জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনভুক্ত ইনস্টিটিউট অব ডেভলপিং ইকোনমিজের (আইডিই) ইন্টার-ডিসিপ্লিনারি স্টাডিজ সেন্টারের প্রধান জেষ্ঠ গবেষক
ইস্ট-এশিয়া ফোরাম থেকে ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির










