আপনি মাঠে একটি টেনিস বল নিক্ষেপ করলে সেটি ফের ফিরে আসে, কিন্তু একটি ওয়াইনের গ্লাস নিক্ষেপ করলে সেটি ভেঙে চৌচির হয় এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক দেশের অর্থনীতি এখন পতনশীল। তারা কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, নাকি আরো ভেঙে পড়বে? একটি শক্তিশালী পুনরুদ্ধারের জন্য আমরা কী করতে পারি? এসব প্রশ্ন এ মুহূর্তে সবার মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

কভিড-১৯ মহামারীর অর্থনৈতিক পরিণাম খুব স্পষ্ট না-ও হতে পারে, আগের সংকটগুলোর ওপর সেবাস্টিয়ান বোস্টসের সঙ্গে আমার করা চলমান গবেষণা যেমনটা বলে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটে সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত ছিল যুক্তরাষ্ট্র ও সুইজারল্যান্ডের মতো আর্থিক কেন্দ্রগুলো। অন্যদিকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো ছিল গ্রিস, বাল্টিক দেশগুলো, ইতালি, আয়ারল্যান্ড, স্পেন ও পর্তুগাল, যেখানে উৎপাদন ১০ থেকে ১০০ গুণ পর্যন্ত কমে গিয়েছিল।

একইভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সেন্ট্রাল এশিয়ান তাজিকিস্তান, ইউরোপিয়ান মলডোভা এবং ইউক্রেন তাদের জিডিপির দুই-তৃতীয়াংশ হারিয়েছিল, যেখানে তাজিকিস্তানের প্রতিবেশী দেশ উজবেকিস্তান, এস্তোনিয়া ও বেলারুশ (ইউক্রেনের কাছাকাছি) তাদের জিডিপি হারিয়েছিল কেবল এক-তৃতীয়াংশ। ১৯৮০-এর দশকের প্রথম দিকে লাতিন আমেরিকার ঋণ সংকটের সময়ে সবচেয়ে খারাপ বিপর্যয়ের শিকার দেশগুলোর মধ্যে ছিল নিম্ন আয়ের বলিভিয়া, উচ্চমধ্যম আয়ের উরুগুয়ে এবং চিলি। অন্যদিকে সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো ছিল মেক্সিকো (যেখানে সংকটটি শুরু হয়েছিল), পানামা, হন্ডুরাস ও প্যারাগুয়ে। ২০১১ সালের আরব বসন্তের সময়ে তিউনিসিয়ায় (যেখানে সবকিছু শুরু হয়েছিল) জিডিপি ২ শতাংশ খাদে পড়ে গিয়েছিল, যদিও মিসর কোনো আর্থিক মন্দাজনিত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়নি। বিপরীতক্রমে লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেন ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল।  

আপাতভাবে ভিন্ন ভিন্ন পরিণামের আগের সংকটগুলো পর্যালোচনা করতে হলে ভিন্নতার তিনটি উৎস বিবেচনায় রাখতে হবে। সেগুলো হলো অর্থনৈতিক অভিঘাতের ব্যাপকতা, সংকট উত্তরণের অর্থনৈতিক স্থায়িত্বশীলতা এবং অভিঘাতের রাজনৈতিক নেতিবাচক ফলাফল।  

২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট ও লাতিন আমেরিকার ঋণ সংকটের সময়ে সবচেয়ে পর্যুদস্ত হয়েছিল বিপুল চলতি হিসাব ঘাটতি জিইয়ে রাখা দেশগুলো। মূলধন প্রবাহে ধসের কারণে তারা আর অর্থায়ন চালিয়ে যেতে পারেনি। তখন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার বা স্থায়িত্বশীলতা ছিল আমদানির পরিবর্তে রফতানি বাড়ানোর সামর্থ্য-সংক্রান্ত, যাতে বহিঃস্থ ঘাটতি কম সংকোচনমূলক উপায়ে রোধ করা যায়।

এটি করতে অসমর্থ গ্রিস ও বলিভিয়ার মতো দেশগুলো উৎপাদন ও কর রাজস্বে একটি বিপর্যকর পরিস্থিতিতে পড়েছিল, যেটি একটি রাষ্ট্রীয় ঋণ সংকটে রূপ নিয়েছিল। চিলিতে ব্যক্তি খাতের ব্যাংকিং ব্যবস্থা দ্বারা বহিঃস্থ ঋণ সংকুচিত হয়েছিল, একটি গভীর উৎপাদন বিপর্যয় ঘটিয়ে যা দ্রুত বড় সংকটে নিমজ্জিত হয়েছিল। আরব বসন্তের সময়ে তুলনামূলকভাবে একটি সংযত-সংগতিপূর্ণ রাজনৈতিক উত্তরণে কারা সমর্থ হয়েছিল এবং কারা রাষ্ট্রীয় পতন ও যুদ্ধে নিপতিত হয়েছিল, সেই বিবেচনাতেই দেশগুলোর মধ্যে বড় পার্থক্য ছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন তাজিকিস্তানের মতো প্রজাতন্ত্রে এবং কিউবার মতো সোভিয়েত ব্লক দেশগুলোয় ফেডারেল ট্রান্সফারের অবসান ঘটিয়েছিল। তবে আলোচ্য পতন নতুন নতুন সীমান্ত ও মুদ্রারও সৃষ্টি করেছিল, যেটি বিদ্যমান মূল্য নিগড় ধ্বংস করেছিল এবং মলডোভা ও ইউক্রেনের মতো অধিক একীভূত ইউরোপিয়ান রিপাবলিকগুলোকে সাংঘাতিকভাবে ব্যাহত করেছিল।

কাজেই কভিড-১৯ কোন ধরনের অভিঘাত এবং কারা বেশি ভুগবে ও কারা কম ভুগবে কোন বিষয়গুলো তা নির্ধারণ করবে—এসব প্রশ্নের উত্তর অন্বেষণ খুব জরুরি। 

অস্বীকারের উপায় নেই যে চলমান মহামারীর অর্থনৈতিক প্রভাব বহুমুখী। লকডাউন আবশ্যিকভাবে একটি শ্রম সরবরাহ অভিঘাত (মানুষ কাজে যেতে পারেনি) এবং একই সঙ্গে চাহিদা অভিঘাত, যেটি স্কুল-বিশ্ববিদ্যালয়, পর্যটন, বিনোদন, রেস্তোরাঁ, বারসহ শারীরিক মিথস্ক্রিয়ার প্রয়োজন এমন সব কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। পরিবার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাড়া পরিশোধ, সার্ভিস লোন, বেতন-মজুরি প্রদান ও কর পরিশোধে অসামর্থ্যতা বিপুল ব্যবসা বন্ধ, চাকরি হারানো, কর্মীদের সাময়িক ছুটি প্রদান, দেউলিয়াত্ব এবং আর্থিক ঘাটতি সম্প্রসারণের মতো বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল।

নিজেদের জনস্বাস্থ্য পদক্ষেপগুলোর রোগতাত্ত্বিক কার্যকারিতার দিক থেকেও দেশগুলোর মধ্যে নাটকীয়ভাবে ভিন্নতা বিরাজমান। ইউরোপের চেয়ে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় কঠোর লকডাউন সাধারণত অনেক কম কার্যকর হয়েছে। এক্ষেত্রে কয়েকটি ফ্যাক্টর কাজ করতে পারে: কাঠামো, আকার, পরিবারগুলোর পরিসর-আয়তন, অনানুষ্ঠানিক খাতের বৈশিষ্ট্য, পরিবহন, খুচরো ব্যবসাপাতির ধরন এবং সামাজিক চর্চাগুলো। আবার ইসরায়েলের মতো কিছু দেশ প্রাথমিক প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় সফল হয়েছিল।

এদিকে অন্য দুটি ডিনামিকস ভিন্ন ভিন্নভাবে দেশগুলোয় প্রভাব ফেলেছিল। সেগুলো হলো বৈদেশিক আয়ে পতন (নিম্ন রফতানি, পর্যটন ও রেমিট্যান্সের কারণে) এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন প্রাপ্তি।  

এসব অভিঘাতের কেবল আকার নয়, সেগুলো মোকাবেলায় সামর্থ্যের দিক থেকেও দেশগুলো ব্যাপকভাবে ভিন্নতর। পরিবার, প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কিছু দেশ নজিরবিহীন আর্থিক সম্পদের সংস্থান করেছে। অন্য অনেক দেশের এ ধরনের আর্থিক পরিসরের সুযোগ ছিল না। কিছু দেশের ভাসমান বিনিময় হার এবং বিশ্বাসযোগ্য-আস্থাশীল কেন্দ্রীয় ব্যাংক রয়েছে। ফলে তারা স্বতন্ত্র মুদ্রানীতি, নিম্ন সুদহার বজায় রাখা এবং কোয়ান্টিটেটিভ ইজিংয়ে যুক্ত হতে সমর্থ হয়েছে। অন্য কিছু দেশের স্থির বিনিময় হার আছে কিংবা তাদের বেশির ভাগ সম্পদই ডলারে ধারণকৃত, যা তাদের সুযোগগুলো সীমিত করে ফেলেছে। 

এসব পার্থক্যের বাস্তবতায় সংকটের অর্থনৈতিক ক্ষতির দিক থেকে বড় ধরনের ভিন্নতা দেখতে পাওয়াটা বিস্ময়ের নয়। প্রশ্ন হলো, দ্রুত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিতে কী করা যেতে পারে?

লকডাউন ও সামাজিক দূরত্বের দ্বারা সীমাবদ্ধ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সময় হ্রাস করতে দেশগুলোকে টিকা প্রাপ্তি নিশ্চিত এবং তাদের টিকা প্রদান কৌশল উন্নয়নে এখনই কাজ শুরু করতে হবে। অধিকন্তু, হেলথ পাসপোর্টের পারস্পরিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে একটি বহুপক্ষীয় চুক্তি আরো দ্রুত আন্তর্জাতিক ভ্রমণের পথ সুগম করে তুলবে।

এছাড়া অর্থনৈতিক ক্ষতি কম রেখে কীভাবে নিজেদের সামাজিক দূরত্বের নীতিগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানো যায়, তার জন্য নিজস্ব তথ্য থেকে শিক্ষা গ্রহণ ও অভিজ্ঞতা অর্জনের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দেশগুলোকে জরুরি ভিত্তিতে বিনিয়োগ করতে হবে। সেখানকার দরিদ্র পরিবারগুলোয় ইন্টারনেটের সুবিধাও জোগাতে হবে।

আর্থিক নীতির দিক থেকে দেশগুলোকে ২০২১ সালে অর্থনীতিতে আরো বড় ধরনের সমর্থন জোগানোর পরিকল্পনা নিতে হবে। ভাইরাসের সঙ্গে জটিলতর সম্পর্কের জেরে ভবিষ্যৎ অর্থায়নের কোন প্রতিশ্রুতিগুলো ব্যাহত হতে পারে এবং ভোক্তা, প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক ও অর্থবাজারে আর্থিক নাজুকতা বাড়াতে পারে, তা মোকাবেলায় এখনই প্রস্তুতি নিতে হবে। 

সরকারগুলোর একটি টিকা-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্যাকেজ বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে সংকটে স্থিতিপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া প্রতিশ্রুতিশীল, সম্ভাবনাময় কোম্পানিগুলোয় বিনিয়োগের উদ্দেশ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাইভেট ইকুইটি ফান্ড সৃষ্টি করতে হবে। চূড়ান্তভাবে, পুঁজিবাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত এবং সংকট মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় বর্ধিত ঋণের সার্ভিসিং সম্পর্কে নিজেদের সামর্থ্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে নিশ্চয়তা প্রদানে সরকারগুলোকে এখনই তাদের মধ্যমেয়াদি কর ও ব্যয়নীতিগুলোর অঙ্গীকার করতে হবে।

এসব উদ্দেশ্য অর্জনে রাজনীতিকে অবশ্যই একটি গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে হবে। কার্যকর ও বলিষ্ঠ নেতৃত্ব যতটা পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করতে পারবে, এর বিপরীত নেতৃত্ব তা খুব কমই পারবে। এটি সবাইকে মাথায় রাখতে হবে বৈকি।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

রিকার্ডো হাউসমান: ভেনিজুয়েলার সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী, ইন্টার-আমেরিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ, হার্ভার্ডের জন এফ কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টের অধ্যাপক এবং হার্ভার্ড গ্রোথ ল্যাবের পরিচালক

ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির