(গতকালের পর)
দেশের আর্থিক নিয়ন্ত্রক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য একটি সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করেছে। আপনি কি মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নীতি সামষ্টিক অর্থনীতির উপাদান, যেমন মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ প্রয়োগ করবে?
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থাৎ পণ্য ও সেবার মূল্য স্থিতিশীল রাখা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম কাজ। বাংলাদেশ ব্যাংক কভিড-১৯ মহামারীসৃষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই একটি সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি প্রণয়ন করেছে। বর্তমান নীতিগত জায়গা থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনীতিতে পর্যাপ্ত তারল্য বজায় রাখার স্বার্থে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাত্ত্বিক দিক থেকে, সাম্যতা বজায় রাখার স্বার্থে MV=PT(Y), বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য বিস্তৃত অর্থ বৃদ্ধি (M) লক্ষ্যমাত্রা ১৫ দশমিক ৬ শতাংশে উন্নীত করেছে, যেখানে ২০১৯-২০ অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ শতাংশ (অর্জিত হয়েছিল ১২.৭ শতাংশ) কারণ অর্থ আয়ের গতি (V) [অর্থ একজনের কাছ থেকে অন্যজনের কাছে কতবার যায় তার পরিমাণ] কমে গিয়েছিল লকডাউন ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম কমে যাওয়ার কারণে।
এ নীতি বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বিবিধ মুদ্রানীতির উপকরণ ব্যবহার করেছে। ব্যাংক রেট (পলিসি রেট) ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং কার্যক্রমের জন্য ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে এবং অফশোর ব্যাংকিং কার্যক্রমের জন্য ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়েছে। একইভাবে ব্যাংক ব্যতীত অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য সিআরআরের বাধ্যবাধকতা ২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। রেপো (সিকিউরিটিজের সাপেক্ষে পুনরায় ক্রয় করার ক্ষমতা) হার ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ কার্যক্রম বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক অগ্রিম আমানত অনুপাত (এডিআর) প্রচলিত ব্যাংকগুলোর জন্য ৮৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৮৭ শতাংশে উন্নীত করেছে এবং ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর জন্য বিনিয়োগ-আমানত অনুপাত (আইডিআর) ৯০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৯২ শতাংশ করেছে। এসব উদ্যোগের কারণে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকতর তারল্য/তহবিল গঠিত হবে, যার দ্বারা বিনিয়োগ করা যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিম এবং সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজের সমন্বয়ে সরকার নিশ্চিতভাবেই অর্থনীতিতে অর্থ বৃদ্ধি করবে। যদি এই অর্থের প্রবাহ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা হয় তাহলে বাস্তবিক ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বাড়বে। ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও ক্রয়ক্ষমতার উন্নয়ন সাধিত হবে, যা প্রবৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে সহায়তা করবে এবং মুদ্রাস্ফীতি রোধে কাজ করবে।
আপনি কি মনে করেন, সাম্প্রতিক নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য, যেমন চাল, আলু, ডিম, ডাল, ভোজ্যতেল, সবজি ইত্যাদির মূল্যবৃদ্ধিতে অর্থনীতিতে টাকার সরবরাহ ভূমিকা পালন করেছে?
এটা সত্য যে দ্রব্যমূল্য, বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্যের মূল্যে যে ঊর্ধ্বগতি, তাতে একটা বৃহৎ জনগোষ্ঠী যারা স্বাস্থ্যঝুঁকি, বেকারত্ব এবং আয় হ্রাসের মধ্য দিয়ে সময় অতিবাহিত করছে, তারা অতিরিক্ত ভোগান্তির মধ্যে পড়েছে। যাহোক, আমি অবশ্য এই বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির ফলে অর্থপ্রবাহ এবং/অথবা সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজগুলোকে মুখ্য কারণ মনে করি না। বরং এটা বিবিধ ও অনির্দিষ্ট কোনো কারণেও হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত সম্প্রতি কোনো পূর্ববিজ্ঞপ্তি ছাড়াই পেঁয়াজ রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। যদিও সরকার এরই মধ্যে পেঁয়াজের ওপরে আরোপিত আমদানি শুল্প মওকুফ করেছে, যাতে অন্যান্য দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি কম খরচে সহজতর হয়। ধানের বাম্পার ফলনের ফলেও চালের দাম বৃদ্ধি অনেক ক্ষেত্রেই মজুদদার ও কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেটের কারণে হয়ে থাকতে পারে। সর্বোপরি, সাম্প্রতিক উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতিও সরবরাহস্বল্পতার মাধ্যমে সবজি, ডিম ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) প্রথম লক্ষ্য হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে ‘বিনা দারিদ্র্য’। বর্তমান এই কভিড-১৯ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আপনি কি মনে করেন যে বাংলাদেশ এই শূন্য দারিদ্র্য লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সমর্থ হবে?
বাংলাদেশে আয় বণ্টনে যে ক্রমবর্ধমান সাম্যের অভাব, তা দারিদ্র্য বিমোচন প্রক্রিয়াকে শ্লথ করে দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী জিনি সহগ (আয় বণ্টনে সাম্যের অভাব পরিমাপের সূচক) শূন্য দশমিক ৪৮৫-তে উন্নীত হয়েছে, যা বিশ্বের সর্বাধিকের তালিকায় অন্যতম। মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ (প্রায় ৪৭ মিলিয়ন) দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জনগোষ্ঠী (প্রায় ১৯ মিলিয়ন) চূড়ান্ত দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার ২০২৪ সালের মধ্যে দারিদ্র্যসীমার নিচের জনগোষ্ঠীর সংখ্যাকে ১২ দশমিক ৩ শতাংশে ও চূড়ান্ত দারিদ্র্যসীমার নিচের জনগোষ্ঠীর সংখ্যাকে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
যাহোক, সাম্প্রতিক কভিড মহামারী বাংলাদেশের এই দারিদ্র্য সংকটকে আরো খারাপ করে তুলেছে। বিবিএসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই কভিড-১৯ প্রেক্ষাপটে গড়ে প্রতি পরিবারের আয় কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। ব্র্যাকের একটি গবেষণায় দেখা গেছে এই কভিড-১৯ মহামারীতে দারিদ্র্যের হার ৫৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যার মধ্যে চূড়ান্ত দারিদ্র্যের হার বের হয়েছে ৬০ শতাংশ। যেহেতু এই মহামারী কখন শেষ হবে সে বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই, তাই ২০৩০ সালের মধ্যে শূন্য দারিদ্র্য অর্জন করা সম্ভব কিনা, সে বিষয়ে উপসংহারে পৌঁছানো কষ্টসাধ্য। সর্বোপরি, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সামাজিক নিরাপত্তার নেট প্রোগ্রামে বাজেটের বরাদ্দ প্রয়োজন, যাতে দারিদ্র্য বৃদ্ধির হার রোধ করা যায়।
সারা বিশ্বের এমন অনেক কর্মহীন পরিবেশে এবং অভিবাসী কর্মজীবীদের অনেকের প্রত্যাবাসনের মধ্যেও বৈদেশিক রেমিট্যান্সের অন্তর্মুখী প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এমন ধনাত্মক ধারার কী কী সম্ভাব্য কারণ হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
এটা আসলেই আশ্চর্যজনক যে সারা বিশ্বের এমন অনেক কর্মহীন পরিবেশে এবং অভিবাসী কর্মজীবীদের অনেকের প্রত্যাবাসনের মধ্যেও বৈদেশিক রেমিট্যান্সের অন্তর্মুখী প্রবাহ বৃদ্ধির হার দেখা যাচ্ছে গত তিন মাসে (জুলাই-সেপ্তেম্বর ২০২০)। বর্তমানে প্রায় এক কোটি দুই লাখ অভিবাসী শ্রমিক-কর্মজীবী বিশ্বের প্রায় ১৭৪টি দেশে কাজ করছেন। রপ্তানী উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৬৭১ কোটি মার্কিন ডলার অন্তর্মুখী রেমিট্যান্স সংগ্রহ হয়েছে ২০২০ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে, যা ২০১৯ সালের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৯ শতাংশ বেশি। এই বর্ধিত রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ভালো ভূমিকা রেখেছে, যা সরকারের বিভিন্ন মেগা প্রকল্প, যেমন পদ্মা সেতুতে বিনিয়োগে সহায়ক হবে। এমন ধনাত্মক ধারার পেছনে অনেক রকম কারণই থাকতে পারে। আমার ধারণা এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অভিবাসীরা তাদের বিপদগ্রস্ত পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়স্বজনদের জন্য বেশি করে টাকা পাঠিয়েছেন, যাতে এই মহামারীর বিপদসংকুল পরিস্থিতিতে কর্মহীন বা আয় কমে যাওয়া লোকজনও টিকে থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, শ্রমজীবীরা লেনদেনের ডিজিটালাইজেশনের কারণে আগের চেয়ে বেশি বৈধ ও প্রাতিষ্ঠানিক উপায় অবলম্বন করছেন। তারা সহজেই তাদের পরিজনের মোবাইল অ্যাকাউন্টে বা এজেন্ট ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠাতে পারছেন, বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোয়ও এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বেশি চলাফেরা না করে। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে টাকা পাঠানোতে সরকারের ২ শতাংশ প্রণোদনা তাদের অনেককেই উদ্বুদ্ধ করছে বৈধ উপায়ে টাকা পাঠানোয়।
বর্তমান অর্থনৈতিক ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিবেচনায় রেখে অর্থনীতির স্বাভাবিক ধারা বজায় রাখতে কী কী পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে?
বস্তুত, আমরা এই নভেল করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি না পেলে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক আকারে উন্নীত হবে না। তাই করোনাভাইরাস আমাদের মাঝে থাকতে পারে, এটা ধরে নিয়েই অর্থনীতিকে সচল রাখতে আমাদের স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করতে হবে। সে লক্ষ্যে আমাদের সর্বপ্রথম কাজ হবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আয় বৃদ্ধির কার্যক্রম পরিচালিত করতে হবে বিশেষ করে নগরাঞ্চলে অপ্রচলিত ক্ষেত্রগুলোয়। প্রান্তিক জনপদে অকৃষি খাতের কার্যক্রম বাড়াতে হবে, যেখানে বর্তমান বেকার জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়। যখন মানুষ আয় করতে শুরু করবে এবং খরচ করা শুরু করবে তখনই চাহিদার বৃদ্ধি ঘটবে এবং অবশেষে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে, যা জিডিপির প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে।
এছাড়া সরকারকে দারিদ্র্যসীমার নিচের জনগোষ্ঠীকে, বিশেষ করে যারা দুর্বল ও অক্ষম তাদেরকে প্রণোদনা দিয়ে যেতে হবে। একইভাবে যুব সম্প্রদায়কে যথাযথ প্রশিক্ষণ ও প্রারম্ভিক মূলধনের জন্য ঋণের জোগান দিয়ে সম্ভাব্য খাতগুলো, বিশেষ করে ফিনটেক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কৃষি খাতকে সমৃদ্ধ করতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো, ঋণপ্রবাহ চালাতে হবে উৎপাদনশীল ক্ষেত্রগুলোয়, মোটেই কোনো চাপের বশবর্তী হয়ে খেলাপি গ্রহীতাদের নয়। সরকারকে বাংলাদেশের সব সরকারি ও বেসরকারি খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকল্পে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সুদৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। সরকারকে দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ঋণাত্মক ছাত্ররাজনীতির লাগাম টেনে একটি চরিত্রবান ও বস্তুনিষ্ঠ সমাজ বিনির্মাণে কাজ করতে হবে, যেখানে যথাযথ ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা প্রাধান্য পাবে। (শেষ)
ড. মোহাম্মদ কবির হাসান: ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্সের ডিপার্টমেন্ট অব ইকোনমিকস ও ফাইন্যান্সের প্রফেসর
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এম এম মুসা










