হোসেন জিল্লুর রহমান: অর্থনীতিবিদদের আলোচনার জগৎ ও মানুষের অভিজ্ঞতার আলোচনা—এ দুটি কি আলাদা জগৎ হয়ে যাচ্ছে সাম্প্রতিক সময়ে?

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ: অর্থনীতির বিষয়গুলো কিন্তু শুধু অর্থনীতিকে নয়, সব নাগরিকের জীবনকে প্রভাবিত করে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিমাপের কেন্দ্রবিন্দুতে আছে জিডিপি বা জাতীয় আয়—এটা বিশ্বস্বীকৃত সূচক। সূচকটির প্রয়োজনীয়তাকে আমি খাটো করতে চাই না। বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক অর্থনৈতিক অবস্থানকে সাজাতে হলে একক সূচক হিসেবে এর কোনো জুতসই বিকল্প নেই। সাধারণভাবে বললে, এটি একটা দেশের এক বছরের সব চূড়ান্ত উৎপাদন ও সেবা মূল্যের সমষ্টি। আমি চূড়ান্ত বললাম একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে। চূড়ান্ত মানে আমরা যদি মধ্যবর্তী কাঁচামাল, উৎপাদনসামগ্রী ইত্যাদিকে বাদ না দিই, তাহলে ডাবল কাউন্টিং হবে। তার মানে জিডিপি হলো সব খাতের মূল্য সংযোজনের সমষ্টি। সাংবাদিকরা করের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন শব্দটা অনেক ব্যবহার করেন। অথচ জিডিপির মধ্যেও যে মূল্য সংযোজনটা অনেক বড় বিষয়, তা নিয়ে আমরা অনেক সময় চিন্তা করি না। 

জিডিপি দিয়ে উন্নয়ন মাপার ব্যাপারে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পদ্ধতিগত, তাত্ত্বিক ও পরিসংখ্যানগত সমস্যা-বিতর্ক রয়েছে। এগুলো নিয়ে গবেষণাও আছে বিশেষজ্ঞদের। মাঝে মাঝে আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন করা হয় এবং কয়েক বছর পরপর স্ট্যান্ডার্ড ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টের (এসএনএ) পক্ষ থেকে বিভিন্ন দেশে একই পদ্ধতি গ্রহণের জন্য ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তার পরও আমাদের মতো দেশে পরিসংখ্যানগত দুর্বলতার কারণে বিভিন্ন খাতের, বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতের হিসাব করতে গেলে বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়। অনেক সময় অনুমানভিত্তিক পরিসংখ্যানও ব্যবহার করতে হয়। 

জিডিপির একক সূচক মাপার পরিধি ভীষণ জটিল। এর সঙ্গে যেসব অর্থনীতিবিদ বা পরিসংখ্যানবিদ সরাসরি যুক্ত বা পরিচিত, তাদের ছাড়া অন্যদের এমনকি অর্থনীতিবিদদের পক্ষেও এ হিসাবের ভেতরের খুঁটিনাটি বিচ্যুতিগুলো যাচাই-বাছাই করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। অধিকাংশের কাছে এটা একটা ব্ল্যাক বক্স—এর ভেতরে কী আছে বোঝা কঠিন। সাধারণ নাগরিকদের কাছে এটা শুধু যে দুর্বোধ্য তা-ই নয়, এটা তাদের কাছে নিরর্থক বা যদি অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার মতো মনে হয়, তখন তা দোষের কিছু নয়। তার থেকে বরং জিডিপি মাপার পদ্ধতি, পরিসংখ্যানগত দুর্বলতাগুলো কী—এগুলো নিয়ে বিশেষজ্ঞ ও সরকারি পর্যায়ে খোলামেলা আলোচনা করা যেতে পারে। এজন্য অবশ্য সরকারের পাশাপাশি বিবিএসএর সহযোগিতা লাগবে। 

এ সূচক ছাড়াও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিমাপের আরো অনেক সূচক রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের বোধগম্য করার মতো করে সবসময় আলোচনা করা হয় না। অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিমাপের ক্ষেত্রে যেমন জিডিপি প্রবৃদ্ধির একক সূচক ব্যবহার করা হয়, তেমনি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মিলিয়ে আমাদের দারিদ্র্যের হারও একটা সূচক দিয়ে মাপা হয়। দারিদ্র্যসীমা নির্ধারণের বিষয়ে অনেক মতবাদ আছে। দারিদ্র্যের হার কত, শুধু তা বের করার জন্যও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে আলাদা বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে আমরা জিডিপি প্রবৃদ্ধি পরিমাপ করি, সব খাতের উৎপাদন কত হলো, মূল্য সংযোজন কত হলো তা দিয়ে। অনেক সময় লক্ষ করি না যে আমরা দারিদ্র্যের হার পরিমাপ করি সম্পূর্ণ অন্য আরেকটা উপাত্তের ভিত্তিতে; কয়েক বছর পরপর পারিবারিক আয়-ব্যয়ের যে জরিপ হয় তার ভিত্তিতে। 

বিবিএসের জরিপে একটা তথ্য সবসময় দেখা যায়, তা হলো জীবনযাত্রার মানের মৌলিক সূচক। এগুলো সরকারি তথ্য। যেমন গ্রাম ও শহরাঞ্চলে কাঁচা-পাকা টিনের ঘর, কুঁড়েঘর, শৌচ ব্যবস্থা, গ্রামাঞ্চলে খাবার পানির উৎস, বিদ্যুৎ সংযোগ কত পরিবারে আছে বা সেলফোন আছে কত পরিবারে। এগুলো অনেকটা নির্ভরযোগ্য তথ্য। অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রবৃদ্ধির একটা সূচক বা দারিদ্র্যের হারের একটা সূচক নিয়ে আমরা এতটা মাথা ঘামাই, তার বদলে যদি দারিদ্র্যের অন্য বিষয়গুলোর দিকে আমরা দৃষ্টি দিই, সেগুলো আরো সোজাভাবে বুঝতে পারি, তাহলে অনেক সুবিধা হয়। অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বোঝার মধ্যে যে ফারাকগুলো, তা এভাবে অনেকটা দূর করা সম্ভব হবে। 

অর্থনীতিবিদদের একক সূচকের প্রতি একটা দুর্বলতা রয়েছে। যদিও এর অনেক সুবিধা আছে। বিমানচালকের সামনে একটা ড্যাশবোর্ড থাকে। অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও ড্যাশবোর্ড অ্যাপ্রোচ রয়েছে। শুধু একটা সূচকের দিকে না তাকিয়ে সব সূচকের দিকে তাকাতে হবে। সূচকগুলোর কোথায় ঘাটতি আছে, কোথায় সব ঠিক আছে তা দেখতে হবে। এটা করতে পারলে আমরা বিষয়গুলো আরো বেশি বুঝতে পারব এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের আরো বেশি যোগসূত্র তৈরি হবে। 

হোসেন জিল্লুর রহমান: একক সূচকের প্রতি অতি দুর্বলতা কি কারিগরি ঘাটতির অভাব, নাকি সমাজতাত্ত্বিক সমস্যা? আমি অর্থনীতিবিদের সামাজিক দায়িত্বের জায়গা থেকে প্রশ্নটা রাখছি। একটি সূচক নির্ধারণ করছি, কারণ কি অন্য সূচক নির্ধারণ করতে সমস্যা? নাকি পরিসংখ্যান সংগ্রহ করতে সমস্যা, নাকি অর্থনীতিবিদরা একটি কমফোর্ট জোনের মধ্যে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন? 

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ: একটা সূচক থাকলে আন্তর্জাতিকভাবে কোন দেশ এগিয়ে বা পিছিয়ে আছে, তা বোঝার সুবিধা হয়। ব্যবহার করতে সুবিধা হয়। যেমন মানব উন্নয়ন সূচক। এটা জিডিপির চেয়েও আরো অনেক ব্যাপক, সেখানে স্বাস্থ্য, শিক্ষা সেগুলো থাকে। শুধু আয় দিয়েই তো মানুষের জীবনযাত্রার মান নির্ণয় করা যায় না, এর সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা সুযোগের বিষয়গুলোও নির্ণয় করতে হয়। এগুলোকে একত্র করে একটা সূচকই করা হয়, যাকে মানব উন্নয়ন সূচক বলা হয়। জিডিপির সঙ্গে আরো কিছু বিষয়ও রয়েছে। যেমন অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে গেলে পরিবেশগত ক্ষতি হয়। এটি মিলে আরেকটি সূচক। তবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যখন আমরা তুলনা করি, তখন অনেকগুলো সূচক থাকলে কার সঙ্গে কোনটা মেলাব, সে বিষয়গুলো জটিল হয়ে যায়। 

হোসেন জিল্লুর রহমান: আমি একটু দার্শনিক জায়গায় যেতে চাই। সূচক নিয়ে কেন আজ আমরা আলোচনা করছি? আমরা কি অন্য দেশের সঙ্গে তুলনার জন্য করছি, নাকি সরকারি দলিলে সুষ্ঠুভাবে লেখার জন্য করছি? কিংবা আমাদের অন্য একটা দিকও আছে যে সূচক নির্ণয়ের সময় যেন মানুষের প্রয়োজনগুলো সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়। একক সূচকগুলো আমাদের গড় একটা ধারণা দেয়। তবে এখানে বৈষম্যের বিষয়গুলো উঠে আসে না। আমরা জিডিপির সূচক জানতে অভ্যস্ত। কিন্তু নিচের দিকের ২০ শতাংশ মানুষের আয় কত—এ বিষয়টাও যদি জানা যেত তাহলে আলোচনার জায়গাটা সমৃদ্ধ হতো। আপনার কাছে জানতে চাইছি, সূচকের প্রয়োজনটা কোথায়? এ নিয়ে আমরা কেন আলোচনা করছি। এই ‘কেন’-এর আলোচনাটা সামনে আনা উচিত কিনা। মানুষের অভিজ্ঞতার জগতের সঙ্গে অর্থনীতিবিদদের আলোচনার দূরত্ব তৈরি হওয়া বা সাধারণ মানুষ যদি দেখে যে অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় সাধারণ মানুষের প্রয়োজনটা প্রতিফলিত হচ্ছে না—এ বিষয়গুলোকে আপনি কীভাবে দেখেন?

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ: অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়ন। আর এটা তো মানুষের নিজেরও উপলব্ধির বিষয়। দৃশ্যমান হওয়ার বিষয়। একটা দেশে যদি খুব দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়, দক্ষিণ কোরিয়া বা চীনে যখন দ্রুত উন্নয়ন হয়েছিল, চারপাশেই তা দৃশ্যমান হয়। আমরা ২০৩০ সালে উচ্চমধ্যম আয়ের দেশে, ২০৪১ সালে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছি। আমি সহজ করে একটা কথা বলি। একজন পর্যটক যখন উন্নত দেশ থেকে তুলনামূলকভাবে অনুন্নত কোনো দেশে যায়, তখন সে চারদিকে তাকিয়েই বুঝতে পারে দেশটি কোন পর্যায়ে আছে, তার বিশ্বব্যাংক বা ইউএনডিপির রিপোর্ট ঘাঁটতে হয় না। অর্থনীতিবিদরা উন্নয়নকে যেভাবে সংজ্ঞায়িত করেন ও যেভাবে গবেষণা করেন, সেগুলোকে খাটো না করে সাধারণ মানুষের নজরে পড়বে, দৃশ্যমান হবে—এ রকম সূচকগুলো কী, এ নিয়েও আলোচনা জরুরি। 

হোসেন জিল্লুর রহমান: আপনার উপস্থাপনের মধ্য থেকে আমরা বুঝতে পারছি যে এখানে একটা ধারণাগত ঘাটতি আছে। অর্থনীতিবিদরা সচরাচর সাধারণ যে সূচকগুলো নিয়ে চর্চা করেন, পাশাপাশি দৃশ্যমান সূচক নিয়ে চর্চা করার প্রয়োজন নতুন করে সম্ভবত তৈরি হয়েছে এবং এটা নিয়ে কাজ করা উচিত। অর্থনীতিবিদদের আলোচনার সঙ্গে মানুষের অভিজ্ঞতার এই যে দূরত্ব, এর একটা কারণ কি মানুষ যা চাইছে সূচকগুলো তা প্রকাশ করতে পারছে না? সূচকের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়টিও এখানে উঠে এসেছে। তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সঠিক বিষয়গুলো উঠে আসছে কিনা, এটাও গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় আমাদের কোনো সমস্যা রয়েছে কিনা? তাছাড়া দৃশ্যমান ব্যতিক্রমী সূচকগুলো কী হতে পারে? যেগুলো সাধারণ মানুষও বুঝতে পারে এবং অর্থনীতিবিদও সেগুলো নিয়ে কাজ করতে পারেন। 

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ: সবকিছুকে সার্বিকভাবে দেখার জন্য জিডিপি বা মানব উন্নয়ন সূচক রয়েছে। দৃশ্যমান ব্যতিক্রমী সূচকগুলোর উদ্দেশ্য কিন্তু ওটা নয়। এর উদ্দেশ্য উন্নয়ন কতটা দ্রুত হচ্ছে বা সত্যিকার অর্থে হচ্ছে কিনা, তা মানুষকে বোঝানো। বড় বড় শহর ও নগরে উন্নয়নটা বেশি চোখে পড়ে, গ্রামাঞ্চলে তা দৃশ্যমান হয় না। যে সূচকগুলোর কথা আমি বলছি, তা অনেক বেশি নগরভিত্তিক। যেমন নগরাঞ্চলের এবং দূরপাল্লার গণপরিবহনের মান ও শৃঙ্খলা। এ বিষয়টা থেকে জানা যাবে বাস-ট্রেন সময়সূচি অনুযায়ী চলে কিনা। ট্রাফিক আইন মানা হয় কিনা। রাস্তায় হর্ন বাজানো হয় কিনা। আমি আরো একটি বিষয় যুক্ত করছি। বিশ্বে কি এমন কোনো দেশ আছে যেখানে নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোর সুযোগ থাকে? এ প্রশ্নের উত্তর থেকেই কিন্তু জানা যাবে ট্রাফিক আইন কতটা মানা হচ্ছে। 

দ্বিতীয়ত, প্রকাশ্য স্থানে শিষ্টাচার; এর মধ্যে রয়েছে সাধারণ ভদ্রতা। রাস্তায় থুতু ফেলা বা প্রস াব করা হয় কিনা, পথে-ঘাটে-গণপরিবহনে নারীদের প্রতি কতটা শালীন আচরণ করা হয় ইত্যাদি। এটা সরকারের বিষয় নয়, নাগরিকদের বিষয়। এর যেকোনো একটা খারাপ হলে অন্যগুলোও খারাপ হওয়ার খুবই আশঙ্কা থাকে। 

তৃতীয়ত, নাগরিকদের সেবার মান। বড় শহরগুলোয় গাড়ি ও বাস চলাচলের তুলনায় পথচারীদের স্বাচ্ছন্দ্যকে কতটা অগ্রাধিকার দেয়া হয়। শহরগুলোয় গণশৌচাগারের মান এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দৃশ্যমান চিত্র দেখলেই উন্নত-অনুন্নত দেশের পার্থক্যটা বোঝা যায়। ট্যাপের পানি সরাসরি খাওয়া যায়, নাকি খাওয়া যায় না। বড় বড় রাজধানী শহরের নদীর পাড়ের চলার পথের নান্দনিক সৌন্দর্য, যেমন লন্ডনের টেমস, ব্যাংককের চাও ফ্রেয়া ও আমাদের বুড়িগঙ্গা নদীর পাড়—এগুলো থেকে উন্নত-অনুন্নত শহরের পার্থক্য বোঝা যায়। অনেক সময় চাকচিক্য বাড়ানোর জন্য কৃত্রিমভাবে সৌন্দর্য বৃদ্ধির স্থাপনা করা হয়, এগুলো যদি নাগরিক সেবার লক্ষ্যে স্বাভাবিকভাবেই গড়ে না ওঠে তাহলে কিছুদিন পরেই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা নষ্ট হয়ে যায়।  

হোসেন জিল্লুর রহমান: সূচকসংক্রান্ত পরিসংখ্যানগুলো কি নতুন কোনো উপায়ে সংগ্রহ করা যেতে পারে? আপনি গ্রামীণ সূচকের কথা বলছিলেন—

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ: যেখানে একটা সূচক দিয়ে অনেকগুলো বিষয় তুলে ধরা যায়, সেখানে অহেতুক সূচক সংখ্যা বৃদ্ধি করে কোনো লাভ নেই। যেমন অনেকে রাস্তায় সংঘটিত অপরাধের কথা বলেছেন। এটার অনেক ব্যতিক্রম রয়েছে। একটা সময় ওয়াশিংটন ডিসিতে সবচেয়ে বেশি অপরাধ সংঘটিত হতো। কাজেই এটাকে আমি গ্রহণ করতে চাই না। অনেকে বস্তিবাসীর অনুপাতের কথা বলেছেন। ঢাকা বা মুম্বাইয়ে বস্তিবাসীর অনুপাত অনেক বড়। আবার উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ, যেমন ব্রাজিলের রিওতেও বড় বস্তি রয়েছে। এটি যদি নিতেই হয় তাহলে আমি বলব বস্তির ভেতরে গিয়ে দেখতে হবে তারা কী পরিবেশে বসবাস করছে। 

গ্রামাঞ্চলের প্রসঙ্গে আসি। আমি কিন্তু আগেই বলেছি তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে অর্থনীতিবিদরা যা সংগ্রহ করেন, কোনোভাবেই আমি তার অবমূল্যায়ন করতে চাই না। কিন্তু সবার চোখে যা দৃশ্যমান, সে ধরনের সূচকের ওপর গুরুত্ব বলেছি। যেমন গ্রামে টিনের ঘর কতটি বা পাকা ঘর কতটি। তবে শৌচাগার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা কেমন—এগুলো অনুসন্ধান করলে পাওয়া যাবে, তাই জরিপ করার দরকার নেই। গ্রামাঞ্চলে বা মফস্বলে শিক্ষার্থীরা যখন স্কুলে যায়, তখন তাদের পরিবারগুলোর আর্থিক সচ্ছলতার দিকটি বোঝা যায়; ধনী দেশ ও গরিব দেশের মধ্যে খাদ্যে ভেজালের মাত্রাও। আরেকটি সূচক নিয়ে বলতে চাই, শিক্ষিত নাগরিকদের বিদেশে চলে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার মাত্রা। এটা ঠিক দৃশ্যমান নয়, কিন্তু উল্লেখ করতে চাই, কারণ এই একটা সূচকের পেছনে অনেকগুলো বিষয় জড়িত। যেমন শিক্ষার মান, দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ কেমন এবং নবীন প্রজন্মের দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আস্থা কতটুকু—এটা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম বড় বিষয়। 

হোসেন জিল্লুর রহমান: আমাদের বাস্তবতা বোঝার জন্য দৃশ্যমান সূচকের কথা আপনি বললেন, আপনি কি মনে করেন এগুলোর ওপর ভিত্তি করে আমরা এখন তথ্য সংগ্রহের দিকে যেতে পারি। সূচকগুলো নিয়ে কাজ করার বিষয়টি পরবর্তী ধাপে অগ্রসর করা সম্ভব কিনা। 

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ: অধিক পরিমাণে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে না গিয়ে সাধারণ নাগরিকদের উপলব্ধি ও জীবনযাপনের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। একটা সূচক দিয়ে যদি অনেকগুলোকে ধরা যায় তাহলে বেশি সূচক ব্যবহার করে কোনো লাভ নেই। আমি আবারো বলি, খুব টেকনিক্যাল করার দরকার নেই, অবশ্য এটা করার সুযোগও নেই। অর্থনীতি যারা বিশ্লেষণ করেন বা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, দৃশ্যমান সূচকের বিষয়টি কাজের বিকল্প হিসেবে দেখছি না। নাগরিকদের সচেতনতা বৃদ্ধির বিভিন্ন বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আর্কষণ করা এবং নীতিনির্ধারকদের পক্ষ থেকে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের চাহিদা তৈরি করা জরুরি। শুধু অর্থনীতিবিদরা নন, যেকোনো সচেতন নাগরিক যদি মনে করেন এর মধ্যে আরো কিছু সূচক যুক্ত করা যায়, তাহলে এটা দিয়ে একটা প্রতিবেদন তৈরি করা যেতে পারে।

হোসেন জিল্লুর রহমান: আমাদের আজকের আলোচনায় অর্থনীতিশাস্ত্রের শুরুত্ব নিয়ে কিন্তু কোনো দ্বিমত তৈরি হয়নি। বিষয়টা হচ্ছে সূচকগুলো কীভাবে প্রয়োগ হচ্ছে এবং তার প্রাসঙ্গিকতা। সূচকের আলোচনার পাশাপাশি মাইন্ডসেটের আলোচনাও জরুরি। আমাদের নিজের কাছেও স্বীকার করা দরকার যে জিডিপির মতো একটা মাত্র সূচকের প্রতি আচ্ছন্নতা—এটা বিশ্বের অন্য কোথাও হয় না। উন্নত দেশে হয় না। এখানে মাইন্ডসেটের বিষয়ও রয়েছে। রয়েছে সমাজতাত্ত্বিক বিষয়ও। আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি বটে, কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা শোনার কতটুকু আগ্রহ সমাজের মধ্যে রয়েছে? সুযোগ পেলে মানুষ যদি তা বলত, তা হয়তো একদিকে ঠিক হতো। আমাদের শোনার যদি প্রক্রিয়ার বিষয় থাকত তাহলে আমাদের মনস্তত্ত্বের বিষয়টা চিহ্নিত হতো। মাইন্ডসেটটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। সূচকের আগে সেটাই বড় কথা। সূচকটা এক ধরনের কারিগরি আলোচনা, তার আগে আমরা মাইন্ডসেটের আলোচনাটা করছি। তাছাড়া শোনার জায়গাটা শক্তিশালী করার বিষয় রয়েছে। মাইন্ডসেটটা ঠিক করার একটা বড় চ্যালেঞ্জ কিন্তু আমাদের আছে। এছাড়া যদি কোনো পেশাগত ঔদ্ধত্যবোধ থাকে, তা থেকেও বের হয়ে আসতে হবে। 

তবে সূচকের আলোচনাটা গুরুত্বপূর্ণ। সূচক একটা বিষয়কে দৃশ্যমান করতে পারে বা একটা বিষয়কে মনিটর করতে সহায়তা করতে পারে। এটা করতে গেলে সূচকের ধারণা ঠিক হতে হবে। তথ্যটা ঠিক আসছে কিনা, তা গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় দেখা যায় নগরে কৃত্রিমভাবে সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়, এতে অর্থ খরচ করা হয়, কিন্তু পরে তা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। এ বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয়, ব্যতিক্রমী সূচকের আলোচনাটা বাংলাদেশে জোরদার করার বিষয় রয়েছে। অফিশিয়াল পর্যায়ে না হলেও বেসরকারি পর্যায় থেকে আলোচনাটা হতে পারে। আমরা যারা বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি, আমরাই উদ্যোগ নিতে পারি। 

(গত ২৪ অক্টোবর ২০২০ তারিখে পিপিআরসি ‘আজকের এজেন্ডা’ সিরিজের সূচনা পর্বের কথোপকথনের লিখিত রূপ আজ প্রকাশ হলো)  


হোসেন জিল্লুর রহমান: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান

ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ: অর্থনীতিবিদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা

শ্রুতি লেখন: রুহিনা ফেরদৌস