দানাদার শস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, শস্যের আবাদে পরিবর্তন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, যান্ত্রিকীকরণের প্রসারসহ কিছু ক্ষেত্রে দেশের কৃষি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বিদ্যমান। তবে এ খাতে এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে কৃষিপণ্যের দামে অস্থিতিশীলতা রোধ। দেখা যাচ্ছে প্রতি বছরই কোনো কোনো কৃষিপণ্যের দামে হঠাৎ উল্লম্ফন ঘটে চলছে। এক্ষেত্রে বরাবরই শীর্ষে থাকে পেঁয়াজ। চাহিদা অনুপাতে দেশে পণ্যটির উৎপাদন অপ্রতুল। ফলে চাহিদার একটি অংশ আমদানি করতে হয়। এতে প্রায়ই অস্থিতিশীলতা দেখা দেয় কৃষিপণ্যটির দামে। দাম ওঠানামা করে এমন আরেকটি পণ্য হলো মরিচ। বিশেষ করে বন্যার সময় মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যায় মরিচের দাম। এখন যেমনটি হচ্ছে। দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা বন্যার প্রভাবে বর্তমান বাজারে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে মরিচের দামে। স্বাভাবিক সময়ে পণ্যটির দাম ১০০ টাকার নিচে থাকলেও বন্যায় সরবরাহ ঘাটতি দেখা দেয়ায় এখন মরিচের দাম কেজিপ্রতি ৩০০ টাকায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু মরিচ বা পেঁয়াজ নয়, কৃষিজ পণ্যের দামের ওঠানামার তালিকায় রয়েছে আলু, কলা, আম ও ডালজাতীয় পণ্যও।
উল্লিখিত পণ্যগুলোর দামে মূলত দুই কারণে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করে। প্রথমত, আমদানিনির্ভর পণ্যগুলোর ক্ষেত্রে আমদানির উৎস দেশগুলোয় মূল্যবৃদ্ধি বা শুল্কারোপের ফলে স্থানীয় বাজারে এর বিরূপ প্রভাব পড়া। আর দ্বিতীয়ত, স্থানীয়ভাবে স্বয়ম্ভর কৃষিপণ্যগুলোর ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফলে উৎপাদনকারী অঞ্চলে সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া। বলা চলে, উভয় কারণেই কৃষিপণ্যের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এতে দুর্ভোগে পড়ে সাধারণ ভোক্তারা, বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ।
অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, পণ্যের সরবরাহ কমলে দাম বাড়ে আর সরবরাহ বাড়লে দাম কমে। এজন্য চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বাজার ব্যবস্থায় যেন কোনো অসামঞ্জস্য তৈরি না হয়, সব দেশই তাতে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়। সাধারণ ভোক্তারা যেন বাড়তি দামজনিত কোনো আর্থিক চাপে না পড়ে, তার জন্য জরুরি ভিত্তিতে সরকার থেকে হস্তক্ষেপ করা হয়, ত্বরিত পদক্ষেপ নেয়া হয়। পচনশীল হওয়ায় কৃষিপণ্যে কিছুটা ওঠানামা থাকবেই। কিন্তু সেটি মেনে নিয়েই দাম সবসময়ই স্থিতিশীল পর্যায়ে রাখার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয় সবখানে। অথচ বাংলাদেশে বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। স্বাধীনতার এত বছর পরেও কৃষিপণ্যের দামে একটি সহনশীল স্থিতিশীলতা নিশ্চিতে কোনো কার্যকর বাজার কাঠামো গড়ে তোলা যায়নি, পরিকল্পিত কোনো উপায় বের করা যায়নি। এটা হতাশাজনক।
কৃষিপণ্যের ওঠানামায় প্রায়ই আর্থিকভাবে নাকাল হচ্ছে সাধারণ ভোক্তারা। এর একটা বিহিত জরুরি। বলা বাহুল্য, কয়েক বছর ধরেই কয়েকটি পণ্যের দাম একটি নির্দিষ্ট সময়েই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এগুলো মূলত সরবরাহ সংকটেই হয়ে থাকে। সরবরাহ সংকটে যেসব পণ্যের দামের অস্থিতিশীলতা রয়েছে, সেগুলো দেশেই উৎপাদন বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। আর যেসব পণ্য আমদানি করতে হয়, সেখানেও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পরিবর্তন আনতে হবে। কৃষিপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে আমরা অতিমাত্রায় ভারতনির্ভর। মোট আমদানির প্রায় ৭৫-৮০ শতাংশ আসে ভারত থেকে। কিছু আসে চীন, অস্ট্রেলিয়া, মিয়ানমার, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর ও অন্যান্য দেশ থেকে। মূলত ভারতনির্ভরতার কারণে সেখানে দাম বাড়লে বা সরবরাহ ব্যাহত হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে আমাদের স্থানীয় বাজারেও। কাজেই দামের ওঠানামা কমাতে আমদানি বাজার বহুমুখী করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। বিষয়টি আমলে নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের সক্রিয়তা প্রয়োজন।
এদিকে আমদানিনির্ভরতা কমাতে বিশেষত ডাল ও মসলাজাতীয় পণ্য দেশে উৎপাদন বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু তাতে তেমন একটা অগ্রগতি হয়নি। এখন এসব পণ্যের আবাদ সম্প্রসারণে অর্থায়ন সুবিধাসহ প্রশিক্ষণ ও বিপণন সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। কৃষি বিভাগের এক্ষেত্রে বিশেষ মনোযোগ দেয়ার সময় এসেছে। তুলনামূলক বেশি সময় ধরে সংরক্ষণ করে রাখার সুবিধার কারণে কৃষক পর্যায়ে এসব পণ্যের মজুদ বাড়ানোর ওপরও অধিক জোর দিতে হবে। এতে নিত্যপণ্যের দামে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা অনেকখানিই সহজ হবে বৈকি। সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা আরো বাড়াতে হবে। পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে নতুন বাজার অনুসন্ধান ও একাধিক উৎস নিশ্চিত করতে হবে।
কৃষিপণ্যের দামে অস্থিতিশীলতার জন্য কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর বাজার কারসাজিও কম দায়ী নয়। অনেক সময় বাজারে ঘাটতি না থাকলেও অতিমুনাফার জন্য কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়। এ প্রবণতা উৎসবের আগে আগে বেশি লক্ষ করা যায়। বাজার অস্থিতিশীল করার জন্য অসাধু ব্যবসায়ী তথা সিন্ডিকেটকে দায়ী করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে খুব একটা দেখা যায়নি। বরাবরই এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিষ্ক্রিয়তা দুর্ভাগ্যজনক। বাজারে স্থিতিশীলতা আনার স্বার্থে এ ধরনের অযৌক্তিক আচরণের রাশ টানতে হবে। একই সঙ্গে ভোক্তারা যেন ভুলভাবে প্রবাহিত না হয়, সেজন্য বাজারে অবাধ ও সঠিক তথ্যপ্রবাহ জোগানো জরুরি। কাজটি সরকারকেই করতে হবে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আন্তরিক প্রয়াসে কৃষিপণ্যের বাজারে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে, এটিই প্রত্যাশা।










