নতুন বছর শুরু হতে না হতেই অস্থির হয়ে উঠেছে ভোগ্যপণ্যের বাজার। এক মাস ধরেই চড়া তেল, চাল ও চিনির দাম। স্বাভাবিকভাবেই বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারেও। আমদানি বৃদ্ধির কারণে পাইকারিতে পেঁয়াজের দাম কমে এলেও খুচরা বাজারে প্রভাব খুব একটা পড়েনি। কারসাজির কথা শোনা যাচ্ছে ডাল, আদা ও রসুনের দাম বৃদ্ধি নিয়ে। সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় ১০টি নিত্যপণ্যের দাম। চালের মূল্যবৃদ্ধিকে ঘিরে খুচরা ব্যবসায়ী ও মিলারদের মধ্যে চলছে পাল্টাপাল্টি দোষারোপ। ভোক্তার ভোগান্তি বাড়ছে। করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের আয় হ্রাস পেয়েছে। কর্মহীন হয়েছেন অনেকে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয় খাতই করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতায় মানুষের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে। তাই জনগণের স্বস্তি নিশ্চিতে নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখা এ সময়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
নিত্যপণ্যের বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার পেছনে সরবরাহ ঘাটতির পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের কারসাজিকেও দায়ী করছেন অনেকে। এর মধ্যে সরকারি গুদামে চাল ও গমের মজুদ কমে যাওয়ার কারণে প্রভাব পড়েছে এসব পণ্যের বাজার দামে। এ কথা সত্য, সরবরাহ ঠিক না থাকলে বা সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে দ্রব্যমূল্য ঠিক রাখা কঠিন। একে দেশের বাজার ব্যবস্থার ত্রুটি বা দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। ভোজ্যতেল, ডালসহ আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, বৈশ্বিক বাজারের চেয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যের বৃদ্ধি বেশি। এটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। মুক্তবাজার অর্থনীতিতেও সরকার যদি মনে করে যে বাজারে কোনো কারসাজি আছে, বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নেই, সেক্ষেত্রে বাজারে হস্তক্ষেপ করতেই পারে। তবে সেই হস্তক্ষেপ দাম নির্ধারণ করে দিয়ে নয়; যখন সরবরাহ কম থাকবে, তখন সরবরাহ বাড়িয়ে আর যখন চাহিদা বেশি থাকবে, সম্ভব হলে তা নিয়ন্ত্রণ করে। যেমনটি সরকার করে থাকে ধান-চালের ক্ষেত্রে। তবে এবার চালের বাজারেও অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। আমন ধানের উৎপাদন কমার আশঙ্কা এবং সরকারি মজুদ কমে যাওয়ায় বাজারে তার প্রভাব বিদ্যমান। চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারি মজুদ বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি সঠিক সময়ে সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক করা জরুরি।
লক্ষণীয় যে, যখনই কোনো পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে, খুচরা ব্যবসায়ী ও সাধারণ ভোক্তারা তখন সেই পণ্য মজুদে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এতে সংকট আরো ঘনীভূত হয়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যদিও কোনো পণ্যের দাম বা সেবামূল্য বাড়লে মানুষ এগুলো ক্রয় বা ব্যবহারে সাশ্রয়ী হয়ে ওঠে। যার উদাহরণ আমরা গত বছর পেঁয়াজ সংকটের সময়ও দেখেছি। ভারত সরকার যখন তাদের দেশে বন্যার কারণে পেঁয়াজ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অজুহাতে রফতানি বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন তাদের দেশেও দাম বেড়ে যায়। কিন্তু সে দাম খুব বেশিদিন স্থায়ী হতে পারেনি। বরং মাসখানেকের মধ্যেই কমে আসে। কারণ ভারতের ভোক্তারা পেঁয়াজ ক্রয়ে সাশ্রয়ী হয়ে ওঠেন। ফলে ব্যবসায়ীরাও বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রির সুযোগ পান না। তাই দাম বৃদ্ধির কারণগুলো ঘিরে ভোক্তা সচেতনতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
পেঁয়াজের বাজার অস্থিরতার পেছনে আমরা দেখেছি, বৈধ আমদানির ছাড়পত্র ও এলসি খোলার কাগজপত্র ছাড়া আমদানিকারকের কমিশন এজেন্ট, আড়তদার পরিচয়ে কিছু ব্যবসায়ীর কারসাজি। বর্তমানে ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টির যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। ক্রেতাদের আশ্বস্ত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোন পণ্যের কেমন মজুদ আছে, আমদানি ও সরবরাহ কেমন, সেসব তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে প্রচার করা যেতে পারে। এতে জনমনেও বাড়তি পণ্য ক্রয়ের প্রবণতা তৈরি হবে না। পাশাপাশি নিত্যপণ্যের বড় রকমের কোনো ঘাটতি যাতে না হয়, সেজন্য দেশীয় পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো এবং আমদানি পণ্য আসছে কিনা, তা তদারকি করতে হবে। লক্ষ করা গেছে, দেশে একবার কোনো পণ্যের দাম বাড়লে তা আর কমতে চায় না। এ অবস্থায় অভিযান পরিচালনার পাশাপাশি বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় অসাধু কারবারিদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্যের বাজার স্থির রাখা যাচ্ছে না। এক রকম অসন্তোষ নিয়ে নতুন আরেকটি বছর শুরু করেছেন উৎপাদক, আমদানিকারক, সরবরাহকারী ও ভোক্তাসাধারণ। এ অবস্থায় বাণিজ্য, খাদ্যসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং জেলা প্রশাসনকে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের সঙ্গে নিয়ে করণীয় ঠিক করতে হবে। বাজার তদারকি জোরদার, মজুদদারি ঠেকানো, আমদানিকারকের এজেন্ট পরিচয়ে অবৈধ পেপারলেস ব্যবসা বন্ধে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বাজার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তদারকির কোনো বিকল্প নেই। চাহিদামাফিক বাজারে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা থাকলে পণ্যের দাম বাড়ে। ব্যবসায়ীরা যাতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে না পারেন, সেজন্য নিয়মিত তদারকি প্রয়োজন। কভিড শুরুর পর থেকেই নিত্যপণ্যের বাজারে একধরনের অস্থিরতা বিরাজমান। বিদ্যমান পরিস্থিতি নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। তাই বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা জরুরি।










