সড়কে বিশৃঙ্খলার পেছনে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হয়। আর সড়কে প্রাণহানির পেছনে দায়ী চালকের বেপরোয়া গতি। চাঁদাবাজির মূলে আছে পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো। গত বছর শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামলে সরকার নতুন সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন করে। সড়ক পরিবহন নেতাদের কারণে সরকার সেটি পরিপূর্ণভাবে প্রয়োগ করতে পারেনি। যদিও সেখানে চাঁদাবাজি বন্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো কথা নেই। সড়কে চাঁদাবাজি নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হওয়ার পরও পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের সংগঠন মিলে বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার চেষ্টা করছেন বলে গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চাঁদাবাজি নাম বদলে পরিচালন ব্যয় বা সার্ভিস চার্জ আদায়ের প্রস্তাব দিয়েছেন তারা। এ প্রস্তাব এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত হিসেবে অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটিও। পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর চাঁদা আদায়ের বিষয়টিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার চেষ্টা হয়েছে এর আগেও। ২০০৮ সাল থেকেই চাঁদার হার ঠিক করে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব দিয়েছিলেন শ্রমিক নেতারা। ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত তত্কালীন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একাধিক বৈঠকে তারা বিষয়টি উত্থাপন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি নিয়ে সে সময় যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দেয়া হয়। তবে চাঁদার হার ঠিক করে প্রজ্ঞাপন জারির বিষয়টি আমলে নেয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়।

পরিবহন খাতে তিন পদ্ধতিতে চাঁদা তোলা হয়। এগুলো হচ্ছে: ১. দৈনিক মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে চাঁদা, ২. বাস-মিনিবাস নির্দিষ্ট পথে নামানোর জন্য মালিক সমিতির চাঁদা এবং ৩. রাজধানী ও এর আশপাশে কোম্পানির অধীনে বাস চালাতে দৈনিক ওয়েবিল বা গেট পাস (জিপি) চাঁদা। প্রথমে মালিকানা ব্যবস্থা ভেঙে দিতে হবে। তাতে মালিক নেতাদের চাঁদাবাজি বন্ধ হয়ে যাবে। যানবাহন চালানোর বিষয়টি চাকরি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অর্থাৎ নিয়োগপ্রাপ্ত চালক হতে হবে। এটা হলে শ্রমিক নেতাদের ক্ষমতা কমে যাবে। বর্তমান পরিবহন ব্যবস্থায় নানা সুবিধাভোগী চক্র তৈরি হয়ে গেছে। মাঝে চাঁদাবাজি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। তাদের তিন সংগঠন সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি এবং বাস ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। কিন্তু সেই উদ্যোগ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।

যে অর্থ পরিবহন মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা হিসেবে নেয়া হয়, সেই অর্থ বাড়তি বেতন-ভাতা হিসেবে দিলে শ্রমিকরা লাভবান হতেন। বর্তমান ব্যবস্থায় সাধারণ শ্রমিকরা এর সুফল পাচ্ছেন না। লাভের গুড় কতিপয় শ্রমিক নেতা ও সংগঠনের পকেটে যায়। শ্রমিক সংগঠন বা নেতাদের দায়িত্ব পরিবহন মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় নয়, তারা যাতে শ্রমিকদের উপযুক্ত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেন, সেটি নিশ্চিত করা। পরিবহন খাতে অবৈধ চাঁদা বন্ধ করতে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা আদায়কে বৈধতা দেয়ার যে প্রচেষ্টা চলছে, সবাই তার বিরোধিতাই করবে। এ খাতে সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। মালিকরা যে অর্থ চাঁদা হিসেবে দিচ্ছেন, সেই অর্থ তারা শ্রমিকদের বেতন-ভাতা হিসেবে দিতে দোষটা কী? এ খাতের শ্রমিকদের বেতন-ভাতা তুলনামূলকভাবে কম এবং বেশির ভাগ শ্রমিককে জীবনধারণের জন্য অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়। এটিও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। দ্বিতীয়ত, কোন শ্রমিক সংগঠন বৈধ, কোনটি অবৈধ তা নিরূপণ করবে কে? এক সরকারের আমলে যে সংগঠনকে অবৈধ ঘোষণা করা হবে, পরের সরকার সানন্দে সেই সংগঠনকে বৈধতা দেবে। এ চক্র থেকেও পরিবহন শ্রমিকদের বেরিয়ে আসতে হবে। পরিবহন মালিকদেরও বুঝতে হবে সাধারণ শ্রমিকরাই খাতটিকে টিকিয়ে রেখেছেন। তাদের বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম বেতন ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা দেয়া হলে এ খাতে নৈরাজ্য ও চাঁদাবাজি যেমন কমবে, তেমনি যাত্রীসেবাও বাড়বে। পরিবহনসহ সব সেবা খাতের চাঁদাবাজি কঠোর হাতে বন্ধ করতে হবে। শ্রমিকদের কল্যাণে যদি পরিবহন-মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো সত্যি কিছু করতে চায়, তার উত্তম উপায় হলো শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো, চাঁদার নামে অবৈধ উপার্জনে প্রলুব্ধ করা নয়।