করোনাভাইরাসের প্রভাব শিল্প খাতে যে সংকটপূর্ণ অবস্থার সৃষ্টি করেছে, তার বেশির ভাগই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে। ছোট ব্যবসা, অল্প পুঁজি, লাভ- লোকসানের হিসাব খুব বেশি নয়; দেশে এমন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সংখ্যা ৭৭ লাখের বেশি। সরকারি হিসাবে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতে কমপক্ষে ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ কর্মে নিয়োজিত। সক্ষমতা কম তাই করোনার ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে এই খাতে। করোনা পরিস্থিতির কারণে তারা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়, শঙ্কায় এবং ঝুঁকির মধ্যে আছে। এই বিষয়টি বিশ্বব্যাংকের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশনের রিপোর্টে খুব পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশনের (আইএফসি) তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের দুই কোটির বেশি মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতের। এই খাতে ৩৭ ভাগ কর্মী করোনা মহামারির কারণে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প নিয়ে করা এক জরিপে বলা হয়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের শতকরা ৯৪ ভাগ প্রতিষ্ঠানে বিক্রি কমেছে। এরপর রয়েছে শ্রীলঙ্কা। সেখানে ৯২ ভাগ প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।আফগানিস্তানে ৮৮ ভাগ এবং ভারতে ৮৬ ভাগ এসএমই খাতের প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালে ৮৩ ভাগ এবং পাকিস্তানে সবচেয়ে কম ৬৮ ভাগ এসএমই খাতের প্রতিষ্ঠান করোনাভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জরিপে দেশের আট বিভাগের ১২ খাতের প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। খাতগুলো হলো, ফ্যাশন, জামাকাপড়, কৃষি, মৎস্য, খনিজ খাত, পাইকারি বাজার, পরিবহন, খাদ্য, চামড়া, প্লাস্টিক, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি। তথ্য প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শতকরা ৯১ ভাগ বলেছে করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে তারা স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি অর্থ সংকটে ভুগেছে। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় এই হার যথাক্রমে শতকরা ৬৬ ও ৬৯ ভাগ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী শিল্প খাতের মোট শ্রমশক্তির ৮০-৮৫ শতাংশ ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং মোট শ্রমবাজারের ২৫ শতাংশের কর্মসংস্থান হচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকারখানাগুলোতে। সুতরাং বলার অপেক্ষা রাখে না যে  এসএমই খাত  দেশের অর্থনীতিতে শিল্প খাতের চাকা সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।  বিগত এক দশক ধরে এই খাতে উদ্যোক্তাদের আগমন ও পুরাতনদের টিকে থাকার পেছনে সরকারের ইতিবাচক ভূমিকা প্রশংসনীয়, যার প্রমাণস্বরূপ এসএমই খাতে ২০১০ সালে অর্থায়নের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৩৫ বিলিয়ন (টাকা) এবং ২০১৭ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ১৬০০-১৭০০ বিলিয়নে। অর্থাৎ সাত বছরে প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পই দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির চালিকা শক্তি। অল্প বা মোটামুটি বিনিয়োগে অধিক কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে এই খাত। বাংলাদেশের মতো বিপুল শ্রমশক্তির দেশে বেকারত্ব হ্রাস ও দারিদ্র্য বিমোচনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। 

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তরুণদের পড়াশোনা শেষে চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হতে বলেছেন। তিনি 'বস' হতে বলেছেন। চাকরি না খুঁজে নিজের এবং অন্যের কর্মসংস্থান তৈরির জন্য প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বান তরুণ উদ্যোক্তাদের মানসিকতা গঠনে এক বিশাল পরিবর্তন এনেছে। এর ফলে উচ্চশিক্ষিত এমনকি বিদেশফেরত উচ্চশিক্ষিতদের অনেকেও নিজেদের দেশের শিল্পোন্নয়নে নিয়োজিত করেছেন। তাদের উদ্যোগ সাধারণত শুরু হয় ক্ষুদ্র অথবা মাঝারি শিল্প দিয়েই।

বিশ্বায়নের যুগে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিনিয়ত বহুমাত্রিক পরিবর্তন হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের সক্ষমতাকে সময়োপযোগী করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পবান্ধব একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব, অর্থের অপ্রতুল জোগান, কঠোর নীতি ও বৈষম্যমূলক আচরণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নকে কঠিন করে দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সরকারি দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রচণ্ড অনীহা ও অবহেলা চোখে পড়ে। যা মোটেও কাম্য নয়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবমতে, মাঝারি শিল্পে একজন লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে প্রয়োজন হয় ৯৫ হাজার টাকা। ক্ষুদ্র শিল্পের জন্য ৯৩ হাজার এবং কুটির শিল্পের জন্য প্রয়োজন ১০ হাজার টাকা। যদিও এ হিসাবটি অনেক আগের। টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত হচ্ছে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন।  ইতোমধ্যে বর্তমান সরকার ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি সমৃদ্ধ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার লক্ষ্যে রূপকল্প-২০২১ গ্রহণ করেছে।

কিন্তু মহামারি করোনাভাইরাসের করালগ্রাসে এবং মাসব্যাপী অর্থনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় এই (এসএমই) খাতের উপর যেন শনির ভর করেছে। এই খাতে যেহেতু অর্থের নগদ প্রবাহের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়, তাই অর্থনৈতিক কর্মকা- বন্ধ থাকায় এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) তথ্যানুযায়ী করোনায় এই (এসএমই) খাতে দুই মাসে ক্ষতি হয়েছে ৯২ হাজার কোটি টাকা। কারণ হিসেবে রয়েছে  বাংলাদেশের প্রধানতম উৎসব পবিত্র ঈদ এবং নববর্ষ উপলক্ষ্যে বাজারের যে চাহিদা থাকার কথা পোশাক ও হস্তশিল্পে উৎপাদিত পণ্যের সেটাও ছিল না।  ফলস্বরূপ  ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাময়িকভাবে সংকটময় পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার জন্য সরকারপ্রদত্ত আর্থিক প্রণোদনাও এই বিশাল শ্রমশক্তির তেমন একটা কাজে আসেনি যা এসএমই ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তারাও স্বীকার করে। বিআইডিএসের জরিপ অনুসারে  ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য প্রণোদনার টাকা পেতে যেসব শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা পূরণ করে টাকা পাওয়া অনেক কঠিন। কারণ, মাত্র ৩৮ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তার ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। বাকি ৬২ শতাংশ উদ্যোক্তা কখনো ব্যাংকে যাননি। ৪৯ শতাংশ উদ্যোক্তার এনজিও থেকে ঋণ নেওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। বাকি ৫১ শতাংশেরই এনজিও থেকে ঋণ নেওয়ার অভিজ্ঞতা নেই। আগষ্ট মাস পর্যন্ত  এসএমই খাতে ঋণ পেয়েছেন মাত্র ১১ হাজার ১৮৩ জন উদ্যোক্তা।ঋণ বিতরণ হয়েছে ৪  হাজার ১২০ কোটি টাকার, যা মোট প্যাকেজের ২০ দশমিক ৫ শতাংশ মাত্র। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে আর্থিক সহায়তা না পৌঁছানোর কারণ উদ্যোক্তাদের সহায়তা নেওয়ার পদ্ধতিগত জ্ঞানের অভাব এবং আনুষ্ঠানিকতা। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতে অর্থায়নের প্রায় ৮০ শতাংশ হয়ে থাকে অনানুষ্ঠানিক, যার কারণে আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের পলিসির সঙ্গে উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ততা কম। এতে করে সরকারি সহায়তার বিষয়ে তারা পর্যাপ্ত তথ্য পায়নি এবং যখন পেয়েছে তখন আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে সহায়তা গ্রহণও সম্ভব হয়নি।

অর্থনীতিতে অবদান রেখেও বঞ্চিত এসএমই খাত। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) জরিপ অনুযায়ী মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ২৫ শতাংশ আসে এসএমই খাত থেকে। শিল্প খাতের কর্মসংস্থানের ৮৬ শতাংশই এই খাতে, যা সংখ্যায় প্রায় এক কোটি। এই খাত মাসে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন করে, মজুরি দেয় প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। বর্তমানে দেশের প্রায় আড়াই কোটি মানুষের সরাসরি কর্মসংস্থান ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ‘দেশে ১৫ জনের কম কর্মচারী থাকা পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫৩ লাখ ৭২ হাজার, যা মোট প্রতিষ্ঠানের ৩৯ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানে ৯৭ লাখ ১৩ হাজার ৯২৯ জন কর্মী কাজ করেন।থ

অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে প্রায় ৬০ লাখ এসএমই উদ্যোক্তা রয়েছেন। পরিসংখ্যান মতে, দেশের মোট ৯০ শতাংশ শিল্প ইউনিট এসএমই খাতের অন্তর্ভুক্ত। সেই সঙ্গে শিল্প-কারখানায় নিয়োজিত মোট শ্রমিকের ৮৭ শতাংশ এবং মোট সংযোজিত পণ্যের ৩৩ শতাংশ এসএমই খাতের অন্তর্ভুক্ত। এসএমই খাতে তুলনামূলক স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগে বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায়। এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য মতে, দেশের জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান হচ্ছে ২৫ শতাংশ। আর সামগ্রিকভাবে শিল্প খাতে এসএমইর অবদান ৩২ শতাংশ। ।

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ২০১৯ সালে বাংলাদেশে এসএমই নীতি অনুমোদিত হয়েছে। ২০২৪ পর্যন্ত এই নীতি বাস্তবায়নের সময়কাল নির্ধারিত হয়েছে। অর্থনীতেতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা এই খাতে রয়েছে অবকাঠামোগত সমস্যা এবং সরকারি সঠিক  পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। ওইসিডির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং দ্রুত পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার ক্ষেত্রে দুর্বলতা করোনা মহামারিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে অনেক বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে।বেশকিছু উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিআরবি ক্যাবলস, আরএফএল, জামদানি শিল্পসহ অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান রয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প মোট দেশজ উৎপাদনে আরও অনেক বেশি অবদান রাখতে পারে। তাই অবকাঠামোগত সমস্যাসহ করোনা মহামারি কালীন সময়ে ক্ষতিপূরণ কাটিয়ে উঠতে সরকার প্রদত্ত প্রনোদনার  যে ব্যবস্থা ও তা সঠিকভাবে কাজে লাগানো এবং প্রণোদনা বন্টন সংক্রান্ত সমস্যা কাটিয়ে এই নীতির ফলপ্রসু বাস্তবায়ন দেখার অপেক্ষায় আমরা। 

লেখক: শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
ইডেন মহিলা কলেজ