মহামারী দুর্যোগের মধ্যে এক ভিন্নধর্মী পরিবেশে আজ শনিবার ৪৯তম জাতীয় সমবায় দিবস-২০২০ পালিত হচ্ছে। দিবসের এ বছরের প্রতিপাদ্য- বঙ্গবন্ধুর দর্শন সমবায়ে উন্নয়ন। এমনিতেই দেশের সমবায় খাত রুগ্ন, তারমধ্যে আবার দীর্ঘ মেয়াদী লকডাউন ও মহামারী। দুর্যোগের মধ্যে দেশের সমবায় খাতের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যাক।

বাংলাদেশে সমবায়ের বিকাশে সমস্যা যেমন আছে তেমনি সম্ভাবনা খুবই উজ্বল। সমবায় বান্ধব পরিবেশ আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকা সত্বেও বিশ্বের অপরাপর দেশই নয় ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের তুলনায়ও সমবায় ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। সমবায় বান্ধব আইন ও পরিবেশ না থাকা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সমবায় সমিতি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ও অডিট কার্যক্রমে কর্মকর্তাদের কর্তৃক ঘুষ গ্রহণ, জনগনের মধ্যে সমবায় সম্পর্কে সচেতনতা না থাকা; সমবায়ে স্বার্থান্বেষিদের প্রবেশ ও রাজনীতিকিকরণ, সরকারি অর্থসহায়তা না থাকা, সমবায়ের আদলে এনজিও কার্যক্রম পরিচালনা ও সমবায়ের শীর্ষ সংস্থা জাতীয় সমবায় ইউনিয়নের যথাযথ কার্যক্রম না থাকা সমবায় খাতের বিকাশে প্রধান অন্তরায়।

সমবায় অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে মোট নিবন্ধিত সমবায় সমিতির সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার ৮৩৪টি। এর মধ্যে প্রাথমিক সমবায় সমিতির সংখ্যা ১ লাখ ৭৭ হাজার ৬১৬টি। কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির সংখ্যা ১ হাজার ১৯৬টি এবং জাতীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সমবায় সমিতির সংখ্যা ২২টি। সমবায় সমিতিগুলোর ব্যক্তি সদস্য সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৯৬ হাজার ২৫১ জন। সমবায় অধিদপ্তরের উপরোক্ত পরিসংখ্যান অনেকটা ‘সৈন্য মারে লাখে লাখে কাতারে কাতার, শুমার করিয়া দেখে ২৪ হাজার’ প্রবাদ বাক্যের মতো। কেননা, বিআইডিএস এর এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে নিবন্ধিত সমবায় সমিতিগুলোর ৫৩ শতাংশেরই অস্তিত্ব নেই। আবার বিদ্যমান সমবায় সমিতির মধ্যে কিছু সাইনবোর্ড সর্বস্ব টিকে আছে। কোনটা আবার খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে। কিছু সমিতি অবশ্য স্বমহিমায় টিকে আছে। নানা প্রতিবন্ধকতার মাঝেও সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বাংলাদেশে অবশ্য দুই ধারার সমবায় ব্যবস্থা বিদ্যমান। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা মুলধারার সমবায় এবং ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা বিকল্প ধারার। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা সমবায় এক সময় দেশে দারিদ্র বিমোচন, কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতা অর্জনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। দেশের কৃষি সমবায় ছিল বিশ্ব সমবায় অঙ্গনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করার মত। ‘সেইদিন আর নাইরে নাতি গৃহে এখন আর জ্বলেনা বাতি’ সমবায়ের অবস্থা এখন এমনই। বিআরডিবি আওতাধীন কৃষক সমবায় সমিতির অধিকাংশেরই এখন অস্তিত্ব নেই। ইউসিসিএ গুলোর নিজস্ব সম্পদ থাকায় এবং সরকারি অর্থ সহায়তা থাকায়-এখনো অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। অনুরূপ সরকারি স্যালারি সাপোর্ট ও অনুদান থাকায় জাতীয় পল্লী উন্নয়ন সমবায় ফেডারেশনের অফিসে এখনো আলো জ্বলে। অন্যদিকে জাতীয় শিল্প সমবায় সমিতি, জাতীয় মৎস্য সমবায় সমিতি, জাতীয় মার্কেটিং সমবায় সমিতি, জাতীয় শিল্প সংস্থাসহ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা সমবায় সমিতিগুলোর প্রচুর স্থাবর অস্থাবর সম্পদ নিয়ে কোন কার্যক্রম ছাড়া সাইবোর্ড সর্বস্ব টিকে আছে। 

সমিতিগুলোর সম্পদ বেহাত বেদখল হয়ে যাচ্ছে। সমিতির যেহেতু আয় আছে সেহেতু কর্মচারী ও ‘ব্যবস্থাপনা কমিটি!’-ও আছে। কিন্তু তাদের মৌলিক কোন কার্যক্রম নেই। আবার এই সমিতিগুলো সমবায়ীদের আয়ত্তে নেই। ক্ষমতা যার সমবায় তার-এই নীতিতে চলছে। আবার বাংলাদেশ সমবায় ব্যাংক, সকল কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের প্রচুর স্থাবর অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। ব্যাংক যে উদ্দেশে গঠিত হয়েছিল সে লক্ষ্যে চলছে না। তাদের  মূল কার্যক্রম এখন নেই বললেই চলে। কো-অপারেটিভ ইন্স্যুরেন্স ও দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন বা মিল্কভিটা সচল থাকলেও কার্যক্রম প্রত্যাশিত মাত্রায় চলছে না। বড় কথা মুলধারার এই সমবায় এখন আর সমবায়ীদের কোন উপকারে আসছে না। ‘খায় দায় হাশেম, মোটা হয় কাশেম’- এরকম অবস্থা। এইধারার সমবায়ের উপকারভোগী এখন রাজনৈতিক দলের নেতা, সরকারী আমলা ও স্বার্থান্বেষী মহল।

এই নেতিবাচক চিত্রের পাশাপাশি সমবায়ে ইতিবাচক চিত্রও বিদ্যমান রয়েছে। ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠা  সমবায় অন্ধকারে আলোর মশাল নিয়ে এগিয়ে চলছে। সারা দেশে বিভিন্ন খাতে গড়ে উঠেছে সমবায় সমিতি। এই সমিতিগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্রবিমোচনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। কিছু বহুমুখী সমবায়  সমিতি, পেশাজীবী সমবায় সমিতি ও বিশেষায়িত সমবায় কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আইনি বিড়ম্বনা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সহ নানা প্রতিবন্ধকতার মাঝেও ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠা সমবায় সমিতি স্বমহিমায় টিকে আছে।

দারিদ্র বিমোচন ও স্বনির্ভরতা অর্জনের পরীক্ষিত পদ্ধতি সমবায়ের বিকাশে সমবায় বান্ধব আইন, প্রশাসন ও পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সমবায় অধিদপ্তরের ‘ঘুষ কালচার’ বন্ধ করতে হবে। সমবায়ের উন্নয়নে জাতীয় বাজেটে নিয়মিত বরাদ্দ রাখা প্রয়োজন। সমবায় খাতে অর্থায়নের জন্যে কো-অপারেটিভ ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন গঠন করা যেতে পারে। জনগণের মধ্যে সমবায় সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ‘সমবায় স্বাক্ষরতা’ কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। সমবায় গবেষণা ও লেখালেখি উৎসাহিত করার জন্য জাতীয় সমবায় পুরস্কারের ক্যাটাগরিতে গবেষণা ও সমবায় সাংবাদিকতা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। সমবায় বিকাশে সমবায় উন্নয়ন তহবিলের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সমবায়ের শীর্ষ সংগঠন জাতীয় সমবায় ইউনিয়নকে একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। সর্বোপরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা নিস্তেজ নিস্ক্রিয় সমবায় সমিতিগুলোকে সক্রিয় করার জন্যে ‘সমবায় কমিশন’ গঠন করা খুবই জরুরি।

প্রতিটি গ্রামে গড়ে উঠবে সমবায় সমিতি। সকল পরিবার আসবে সমবায়ের আওতায়। দেশের সকল নাগরিক হবে সমবায়ী। সমবায়ের মাধ্যমে নির্মিত হবে সম্প্রীতির সমাজ এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: চেয়ারম্যান-সেন্টার ফর কো-অপারেটিভ স্টাডিজ
arahmanccs@gmail.com