বাংলাদেশের শিল্প খাত বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ প্যারিস চুক্তির আওতায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ লক্ষ্যে কার্বন ক্রেডিট বাণিজ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। কার্বন ক্রেডিট এমন একটি আর্থিক প্রক্রিয়া, যা শিল্প প্রতিষ্ঠানকে তাদের কার্বন নিঃসরণ ভারসাম্য করতে সাহায্য করে। সহজভাবে বলতে গেলে, কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠান যদি নির্দিষ্ট পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড নির্গত করে, তবে তা সমন্বয়ের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে নির্গমন কমাতে পারে। এভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো কার্বন ক্রেডিট অর্জন করতে পারে, যা বিক্রি বা লেনদেন করা সম্ভব।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার শুধু খরচ কমায় না, বরং কার্বন ক্রেডিট বিক্রির মাধ্যমে অতিরিক্ত আয়ও নিশ্চিত করতে পারে। যদিও বাংলাদেশে এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ কার্বন ট্রেডিং ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি, তবে সঠিক কাঠামো তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে এ ক্রেডিট বিক্রি করা সম্ভব হবে। এর ফলে পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের খরচও সহজে উঠে আসতে পারে। বিশেষত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর শিল্পগুলোর জন্য এটি শুধুমাত্র পরিবেশবান্ধব নয়, বরং একটি লাভজনক উদ্যোগও হতে পারে।

শুধু আর্থিক লাভই নয়, কার্বন ক্রেডিট গ্রহণের ফলে কোম্পানির পরিবেশ, সামাজিক ও প্রশাসনিক (ইএসজি) মান উন্নত হয়। বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীরা এখন টেকসই ও পরিবেশবান্ধব কোম্পানির প্রতি বেশি আগ্রহী। ফলে যেসব বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠান কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ নিচ্ছে, তারা আরো বেশি বিদেশী বিনিয়োগ ও অংশীদারত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করছে। এটি শুধু শিল্প খাতের নয়, বরং পুরো অর্থনীতির উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের ইস্পাত, সিমেন্ট ও টেক্সটাইল শিল্প দীর্ঘদিন ধরে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। তবে সৌরশক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করলে তারা দূষণ কমিয়ে অতিরিক্ত আয়ও করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, বাংলাদেশের অন্যতম ইস্পাত প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান জিপিএইচ ইস্পাত নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নির্গমন কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

ডিকার্বনাইজেশনের (কার্বন কমানোর) ক্ষেত্রে সৌরশক্তি গুরুত্বপূর্ণ হলেও, নতুন প্রযুক্তি যেমন কোয়ান্টাম ইলেকট্রিক আর্ক ফার্নেস (ইএওএফ) আরো কার্যকর হতে পারে। এ নতুন প্রজন্মের ফার্নেসগুলো কম জ্বালানি ব্যবহার করে এবং কম দূষণ করে। তবে এই প্রযুক্তির বাস্তবায়ন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কতটা সম্ভবপর তা নিয়ে যথাযথ বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

কার্বন ক্রেডিট বাণিজ্য পুরোপুরি কার্যকর করতে হলে বাংলাদেশে উপযুক্ত অবকাঠামো ও নীতিমালা গড়ে তুলতে হবে।

প্রথমত, একটি উপযুক্ত নীতিকাঠামো থাকা জরুরি, যা কার্বন ক্রেডিটের মানদণ্ড, যাচাই প্রক্রিয়া ও নিয়মনীতির সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেবে। দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ, প্রতিবেদন ও যাচাই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে যাতে স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত হয়। তৃতীয়ত, কার্বন ক্রেডিট লেনদেন পরিচালনার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি করতে হবে। চতুর্থত, ডিজিটাল ট্রেডিং প্লাটফর্ম চালু করা প্রয়োজন, যাতে স্ংশ্লিষ্ট লেনদেন সহজ হয়। পাশাপাশি আর্থিক প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা শিল্প খাতকে এতে সম্পৃক্ত করতে সহায়ক হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনকে ত্বরান্বিত করতে পারে, যা কার্বন ক্রেডিট বাজারকে কার্যকর ও টেকসই করবে।

সঠিক নীতিমালা ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে বাংলাদেশ টেকসই শিল্প উন্নয়নের পথিকৃৎ হয়ে উঠতে পারে, যা দেশকে আরো সবুজ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।

ড. এম আবু ইউসুফ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়াও তিনি সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র‌্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক।