দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার ...

................................................!

বাজেট ২০২০-২১ অর্থ বছর বাংলাদেশের সরকারের সেই দুঃসাহসিক চ্যালেন্জ মোকাবিলায় গৃহীত এক অভিযান!

করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে ১ জুন থেকে সীমিত আকারে বাংলাদেশের লকডাউন খুলে দেয়ার প্রাক্কালে ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে তার শুভেচ্ছা ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই অমর কথা কিন্তু প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করেছিলেন। যা আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে বিরচিত সম্মানে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ধ্বনি-প্রতিধ্বনিত হতো আর মুক্তি সংগ্রামকে বেগবান করতো শক্তি ও সাহস নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সকল স্বাধীনতাকামী বাঙালির হৃদয়ে ১৯৭১ সালে।আজ অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামে মহান কবিকে স্যালুট জানাই তাঁর অপরিমেয় সৃষ্টির প্রতি জাতির অর্থনৈতিক অভিযানেও তাঁর সাড়া পাই।স্যালুট জানাই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। যিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেই এই অমর কবিকে বীরের মর্যাদায় স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে আনায়ন করেছিলেন ২৪ মে ১৯৭২ সাল।

এবারের বাজেট বড় চ্যালেঞ্জ দেশের সামষ্টিক ও ব্যষ্টিক অর্থনীতির পরিমিতি অর্জন করা শুধু কঠিনই নয় রীতিমত দুঃসাধ্য! সেই চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করতে আমাদের আছেন একজন দক্ষ অর্থমন্ত্রী, যার নেতৃত্বে একজন চৌকস অর্থ সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং তাদের সংগ্রামী সহকর্মীগণ ।আমরা যখন বাসায় বসে আছি তারা কিন্তু তখন দুস্তর পারাবারে নিজেদের রেখেছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাষ্ট্রীয় সেবায় পুলিশ/সৈনিকের মতো।

যেহেতু অর্থবিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বাজেট প্রণয়নে সরাসরি যুক্ত থাকে এবং পলিসি তৈরি, অভ্যন্তরীণ সম্পদ সমাবেশে মুখ্য ভূমিকা রাখে। সেই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ,অর্থ বরাদ্দ ও শুল্ক-কর নির্ধারণ পলিসি নিয়ে নীতি নির্ধারণী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তেমন সরাসরি আলোচনা চূড়ান্ত করা, গণমাধ্যমে  প্রকাশ, স্টেকহোল্ডার, বিআইডিএস, বাংলাদেশ পলিসি ডায়লগসহ সুশীল সমাজের  মতামত প্রকৃতির এই করোনার প্রাদুর্ভাবে গ্রহণ করার অবকাশ ছিল না বা প্রকৃতিগত কারণে হয়ে ওঠেনি। তাই বাজেটের ওপর অনেকেরই আশা আকাঙ্ক্ষা, অনুসন্ধিৎসার জিজ্ঞাসিত বিষয়ে পৃথক পৃথক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা স্বাভাবিক।

প্রসঙ্গক্রমে স্বল্প উদাহরণে বলা আবশ্যক যে মার্চ পর্যন্ত চলতি অর্থবছরে এডিপির বরাদ্দকৃত ২ লাখ ১০ হাজার ১৯৮ কোটি টাকার অব্যয়িত অর্থের পরিমান ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা। এবং আইএমইডির প্রতিবেদনানুসারে ৪৬ টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের এডিপি অগ্রগতি ৫০ শতাংশ ও নিচে। 

আবার ড. নাজনীন অর্থনীতিতে করোনার প্রভাব সংক্রান্ত তার গবেষণায় জানিয়েছিলেন যে মে মাস পুরাপুরি লকডাউন থাকলে ক্ষতির পরিমান হবে ২ লাখ কোটি টাকা যা ২৫ লাখ ৪ হাজার ৪৮২ কোটি টাকার ৯ শতাংশ। এই ক্ষতির বড় খাতগুলো কৃষি, শিল্প ও সেবা। মাথায় আছে দাতা সংস্থা বিশ্বব্যাংকের সতর্কবার্তা , প্রবৃদ্ধি ২- ৩ শতাংশে নেমে আসার অশনি সংকেত। যা বিগত বছরে ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ । আর বর্তমান বছরে প্রোজেকশন করা হয়েছিল ৮ দশমিক ২ শতাংশ। যদি ৩ শতাংশ কমে তবে জিডিপির এ পরিমান ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এরই মধ্যে ২২এপ্রিল  পর্যন্ত বিজিএমইএর মতে, ৩২০ কোটি ৬ লাখ ডলারের রফতানি আদেশ তথা ২৭ হাজার ২০০ কোটি টাকার আদেশ বাতিল হয়েছে। যা আশঙ্কা করা হয়েছে, ৪২-৪৫ হাজার কোটি টাকা। এ থেকে পরিমাপ করা যায় যে কী চালেঞ্জ মোকাবেলা করতে সরকারের হিমশিম খেতে হবে নতুন বাজেট প্রণয়নে।

আমি সাবেক চেয়ারম্যান জাতীয় রাজ্স্ব বোর্ড , ড. মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির গবেষক ও বিইএর সভাপতি অধ্যাপক ড.আবুল বারকাত এবং দুই মেয়াদে প্লানিং কমিশনের সদস্য এমিরিটাস প্রফেসর ড .আবদুস সাত্তার মন্ডলের প্রস্তাবিত মতামতগুলোর প্রতি অভিজ্ঞান নিয়ে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আমার কিছু উপস্থাপনা বাজেটের এই শেষ সময়ে অভিনিবেশ করতে চাই। হয়তো তাদের সুচিন্তিত মতামত অনেকাংশেই বাজেটে স্থান লাভ করেছে। তারপরও বলতে চাই-

যে বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আসতে পারে-

১. স্থূল জাতীয় উৎপান ( জিএনপি), স্থূল দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এর প্রতি নজর রেখে ব্যবসায় -বাণিজ্য সম্প্রসারণ ,মূল্যস্ফীতি নিম্নহারে রাখা, টাকা সরবরাহ যথাযথ রাখা, সরকারি ঋণের প্রকৃতি নির্ধারণে সরকারের গৃহীত স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদে ব্যাপক কর্মসংস্থানের  মাঠ তৈরি করা।

২. বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পরিবহন, সম্পদ সংগ্রহ, জ্বালানি, আসবাবপত্র ,আনুসঙ্গিক প্রভৃতি খাতে বরাদ্দ ব্যয় হ্রাস করে এ অর্থ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করে নিরাপত্তা বেষ্টনী আরো সম্প্রসারণ এবং অধিক জনগণকে সম্পৃক্ত করা।

৩. পাবলিক প্রকিউরমেনট আ্যাক্টে এবং ক্রয়ে পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা সর্বত্তোম গুনাগুন ( less price best quality), সবচেয়ে কম দামে ভালো জিনিস ক্রয় । এ ব্যবস্থাপনায় নির্ভরযোগ্য গুণগত মানের ঠিকাদার পাওয়া কখনই সম্ভব নয়। যেহেতু আমাদের দেশে রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতির প্রভাব, মামা ভাগ্নে, এমপি মহোদয়ের আত্মীয়, দলীয় বলয় কাজ করে। সুতরাং ভালো কাজের স্বীকৃতিসম্পন্ন ঠিকাদাররা প্রকল্পের কাজে ই-টেন্ডারের (e - tender) মাধ্যমে আসার সুযোগ তৈরি করতে প্রকিউরমেন্ট আ্যাক্ট পরিবর্তন একান্ত দরকার। কোন ঠিকাদার হ্রাস শতাংশ (%) মূল্য কাজ নিয়ে গুনগত মানের কাজ কখনো করতে পারবেন না। এখানে বহুমাত্রিক দুর্নীতি কাজ করে। তেমনি কম দামে ভালো জিনিস পাওয়ার অমূলক ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। দরকার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানের মতো ভয়ংকর সৎ লোকের; এমডি, মেট্রোরেলের মতো লোক।

ড. মোশাররফ স্যারের কথার জের হিসেবে:

১. জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ফিসক্যাল পলিসি বিষয়ে এসআরওগুলো বাজেট ঘোষণার দিনই জারির ফলে দ্রব্যমূল্যের ওপর ঘাত-প্রতিঘাত দূর করার জন্যে শুল্ক-কর সংক্রান্ত পরিবর্তন বছর বছর না করে অন্তত চার-পাঁচ বছর অপরিবর্তিত রাখা ।

আমার প্রস্তাব হলো প্রকল্প বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটি  (National Committee for Project Implementation) গঠন:

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার প্রকল্পে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের অনভিজ্ঞতা, অদক্ষতা ও অসততার কারণে একদিকে প্রকল্প বাস্তবায়নে যেমন বিলম্ব হয় অন্যদিকে প্রকল্প ব্যয়ও বৃদ্ধি করতে হয়। সুতরাং এখানে চৌকস এবং ভয়ংকর সৎ ব্যক্তির প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ হতে হবে। পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন থেকে অভিজ্ঞতায় প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণ, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ও বিধি পরিপালন করে টেন্ডার প্রক্রিয়াকরণ কাজ সম্পন্ন করা যেতে পারে।

যেহেতু জমি অধিগ্রহণ, প্রকিউরমেন্ট ও বিধি পরিপালন ও টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে দীর্ঘসময় ব্যয় হয়। এসব দূরীকরণে একনেক সভায় অনুমোদিত প্রকল্প বাস্তবায়ন সঠিক সময়ে মানসম্পন্ন করার জন্যে সশস্ত্র বাহিনী , সরকার এবং বেসরকারি থেকে বাছাই করে তিন সদস্যের উচ্চ কমিটি গঠন করা যেতে পারে । যাদের দক্ষতা,সততা, অভিজ্ঞতা অনেক ঊর্ধ্বে ,কর্মকাল হবে নিয়োগকাল থেকে প্রকল্পের পূর্ণকাল বা চলমান পিএসসির সদস্যদের বয়সের অনুরূপ। এই টিমের চেয়ারমান/সভাপতি থাকবেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, আর সদস্য সচিব থাকবেন সচিব। যেহেতু প্রকল্প বাস্তবায়নে মন্ত্রী ও সচিবদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে স্বচ্ছতা আনয়ন ও সময় সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখতে পারছে না, তাই এই বিকল্প প্রস্তাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন জাতীয় কমিটি ( National Committee for Project  Implementation, NCPI) হবেন প্রকল্প পরিচালক নির্বাচনে ,আইএমইডি কর্তৃক তথ্য উপাত্ত পর্যালাচনা ও দেখভাল ও সম্ভাব্য অসুবিধাগুলো দূর করার সমাধানের প্রস্তাব।

২. যা একনেকের সভার সভাপতির সম্মুখে পেশ করবেন এই কমিটির মনোনীত ব্যক্তি । এই কমিটি কেবল প্রধানমন্ত্রীর কাছে দায়বদ্ধ থাকবেন।

৩. টেন্ডার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলের কর্মী অথবা জনপ্রতিনিধির , টেন্ডারে অংশগ্রহণ বন্ধ করতে হবে।

৪. বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় বাস্তবায়নযোগ্য প্রকল্পের পাশাপাশি সব মন্ত্রণালয়ে প্রশাসনিক খরচের আওতায় বিপুল পরিমাণ বরাদ্দ খরচের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সচিবের সঙ্গে সঙ্গে তার অধস্তন কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও সততা, সর্বোপরি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সততা, জবাবদিহিতা ও দেশপ্রেম এসব ক্ষেত্রে খুবই প্রয়োজন। যেমন অফিসের যন্ত্রপাতি ও ব্যবহার্য সামগ্রী ক্রয় ও ব্যবহার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন খরচ, হাসপাতালের রোগীর ওষুধ ও খাওয়া খরচ, কৃষি উপকরণ ক্রয় ও সরবরাহ কিংবা সামাজিক সুরক্ষা খাতের ব্যয় বা ত্রাণ তৎপরতার ব্যয় উল্লেখযোগ্য।

এক্ষেত্রে সততার জিরো টলারেন্সের বিকল্প নেই।

৫. জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের শুল্ক-কর আহরণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কতিপয় অর্থনৈতিক সূচক স্বাভাবিক 

প্রবাহ প্রয়োজন, যেমন- আমদানি ও রফতানির প্রবৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্যের ভালো অবস্থা অর্থাৎ সচল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভোক্তা চাহিদা বৃদ্ধি ও সরবরাহ চেইনের ঊর্ধ্বমুখিতা, সঠিক আর্থিক নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো কাজ করা, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে শিল্পায়ন, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমের সুযোগ সৃষ্টি ও যথাযথ তদারকি, সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প সময়মতো বাস্তবায়ন ও শুল্ক-কর প্রদানে বাধ্যবাধকতা ইত্যাদি । এ বিষয়ে ড. মোশাররফ হোসেনে অভিমতের অনুকূলে এমিরিটাস অধ্যাপক এর নিম্ন বর্ণিত সুপারিশগুলো কর্মসূচিতে থাকা দরকার।

এমিরিটাস প্রফেসর ড. সাত্তার মন্ডল স্যারের সুনির্দিষ্ট অভিমতগুলো তার ‘এবারের কৃষি বাজেট হতে হবে ব্যতিক্রমী’ প্রবন্ধের অনুকূলে তুলে ধরেন-

৬. শিল্প, কলকারখানা, পরিবহন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সব বন্ধ থাকলেও বন্ধ হয়নি কৃষি ও কৃষকের উৎপাদন কর্মকাণ্ড। কাজেই ( ১) বন্যা-খরা মাথায় নিয়ে আউশ আমন ফসলের অনিশ্চয়তা প্রাধান্য দিতে হবে, পাটের ন্যায্য মূল্য কৃষকেরা পাবে কিনা সেটা ও মাথায় রাখতে হবে। ( ২)করোনার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়া প্রায় দুই কোটি মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে গেছেন। এর ফলে গ্রামের আবাসন, কর্মসংস্থান ও খাদ্য জোগানের ওপর বেশ একটা চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এরই মধ্যেই লাখ লাখ ছোট–বড় খামার তাদের উৎপাদিত পোলট্রি, দুধ ও মাছ সময়মতো বিক্রি করতে না পারায় পুঁজি হারিয়েছে। (৩) ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ধ্বংসলীলা। দক্ষিণবঙ্গের বহু বেড়িবাঁধ ভেঙে নোনাপানি ঢুকে পড়েছে, যা আগামী ফসল চাষ বিঘ্নিত করবে। (৪) খাদ্য-পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ অর্থনীতির এমন একটা নাজুক পরিস্থিতিতে আসছে জাতীয় বাজেট। (৫)এই বাজেটে গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও কৃষি উৎপাদনমুখী হতে হবে। (৬)বিপুলসংখ্যক ঘরে ফেরা মানুষকে এই সর্বংসহা গ্রাম ও কৃষি বিপদে যেকোনো সংকটে আশ্রয় দিয়েছে, খাদ্যের জোগান দিয়েছে, এবারও দিচ্ছে। যারা গ্রামে ফিরেছেন, তাদের অনেকে শিগগিরই শহরে ফিরে এসে আয়–রোজগারের ব্যবস্থা করতে পারবেন না। অতএব, বাজেটে এমন সব কাজের জন্য বরাদ্দ বাড়াতে হবে, যাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং সেগুলো প্রত্যক্ষভাবে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হয়। (৭) এর মধ্যে পড়ে কৃষি ও গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ ও সংস্কারকাজ। যেমন রাস্তাঘাট ও মাটির কাজ বাড়াতে হবে। হাজামজা পুকুর, খাল, নদী খনন। একমাত্র পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনেই প্রায় পাঁচ হাজার কিলোমিটার সেচনালা এবং প্রায় চার হাজার কিলোমিটার পানি নিষ্কাশনের খাল রয়েছে। বরেন্দ্র এলাকায় রয়েছে প্রায় ১৪ হাজার পুকুর। সারা দেশে লক্ষাধিক খাসপুকুর ও জলাভূমি রয়েছে। ফিশারিজ বিভাগের অধীনে আছে দেড়–দুই লাখ মরা খাল। এগুলোর খননকাজ শুরু করতে পারলে বিপুলসংখ্যক মানুষ কাজ পাবেন এবং গরিবের আয়–রোজগার হবে। সেই সঙ্গে বৃষ্টির পানি ধরে রেখে তা সেচ, মাছ চাষ ও অন্যান্য কাজে লাগানো যাবে। তবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে আপাতত খননকাজে ভেকো মেশিন ব্যবহার না করাই যুক্তিযুক্ত হবে। গ্রামীণ অবকাঠামো মেরামতকাজের ওপর বেশি জোর দেওয়া উচিত হবে। (৮) এলজিইডির আওতায় আছে প্রায় আড়াই লাখ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক ও বহু ক্ষুদ্র সেচখাল। সেই সঙ্গে এখন যুক্ত হলো ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধগুলো। প্রায় চার হাজার কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ আছে, যার অনেক জায়গায় এমনিতেই ভাঙা ছিল। এগুলোর আশু সংস্কারকাজের ওপর বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ ও জোর দেওয়া সংগত হবে। (৯) রাস্তাঘাট গ্রামীণ সড়ক মেরামতকাজে যেমন একদিকে নিম্ন আয়ের মানুষের, বিশেষ করে মহিলাদের কর্মসংস্থান হবে, অন্যদিকে পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও যোগাযোগব্যবস্থা গতি লাভ করায় গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙা হয়ে উঠবে।

৭. নতুন উদ্যোগে পদ্মা যমুনা মেঘনা নদীর তিন–চার লাখ হেক্টর আবাদযোগ্য চরাঞ্চলে অর্থকরী ফসলের আবাদ শুরু করে। আগামী বর্ষার পানি নেমে যাওয়ার পর এসব জমিতে পেঁয়াজ, রসুন, মিষ্টিকুমড়া, মিষ্টিআলু, সূর্যমুখী, ধনে—এসব ফসল লাগানোর উদ্যোগ নেয়ার বিপুল সুযোগ রয়েছে। প্রথমে প্র্যাকটিক্যাল অ্যাকশন, বর্তমানে পাম্পকিন প্লাস নামে একটি সংস্থা রংপুর অঞ্চলের বিশাল বালুচরগুলোতে কয়েক বছর যাবৎ নদীভাঙনে বাস্তুচ্যুত ভূমিহীন কৃষকদের দ্বারা মিষ্টিকুমড়া আবাদ করে সফলতা দেখিয়ে চলছে। এর জন্য বাজেটে বরাদ্দ পেলে ও দিকনির্দেশনা থাকলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এ কাজটিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে আশা করা যায়।

৮. গ্রামের বহু নারী এরই মধ্যে কেঁচো কম্পোস্ট সার তৈরি করছেন। বিক্রি করার বিষয়টি বাজেটে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাওয়া উচিত, সে জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রকল্প বাজেট প্রয়োজন।

৯. কৃষি যান্ত্রিকরণে দক্ষিণ অঞ্চলকে ভর্তুকি দেয়া। এরই মধ্যেই ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকার এডিপি অনুমোদিত হয়েছে। যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পাওয়ার পর যাতে এবারের এডিপিভুক্ত হয়ে বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, তার জন্য প্রয়োজনে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।

১০. প্রাণিসম্পদ ও মৎস্যখামারিদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও ক্ষতিপূরণের যে ঘোষণা এরই মধ্যে এসেছে, তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের স্বার্থে এবারের বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থসংস্থান থাকা দরকার। আরেকটি কাজও বাজেটে উল্লেখ থাকতে পারে— সুলভে খাদ্য বিতরণ। চলমান কর্মসূচির মধ্যে চাল, ডাল, আলুর সঙ্গে ডিম, গুঁড়া দুধ ও শুকনা মাছও অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

১১.বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া দরকার কৃষি বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও জোগান-শৃঙ্খলের পুনঃস্থাপন। এর জন্য গ্রামীণ হাটবাজারের ভৌত কাঠামো, কমিউনিটি গুদাম ও সংরক্ষণ, কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থা ইত্যাদি নতুন করে নির্মাণ ও উন্নয়নের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা প্রয়োজন। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও যাতে এদিকে এগিয়ে আসতে পারে, তার জন্য উৎসাহব্যঞ্জক ব্যবস্থা থাকা যুক্তিযুক্ত হবে। গ্রামের হাটবাজারে লাখ লাখ পাইকার, ফড়িয়া, ব্যাপারি ও আড়তদার, যারা কৃষকের অল্প অল্প পরিমাণ পণ্যসামগ্রী একত্র করে বিপণনকাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে, তাদের অনেকেই অতটা শিক্ষিত নয়। এ বাজেটে এই অবহেলিত অথচ অপরিহার্য মার্কেটিং এজেন্টদের জন্য পুঁজির সংস্থান ও ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা দেখতে চাই।

১২. প্রায় তিন কোটি গ্রামীণ পরিবারের মানুষকে নিত্যদিন খেত–খামারের কাজে এবং পণ্য কেনাবেচা করতে হাটবাজারে যেতে হচ্ছে করোনার ঝুঁকি মাথায় নিয়ে। তাদের জন্য স্বাস্থ্যসচেতনতা পরামর্শের পাশাপাশি এ বাজেটে ন্যূনতম কিছু স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী ও রোগ প্রতিরোধকারী ভিটামিন-সি এর ব্যবস্থা রাখা সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।

আমি প্রত্যক্ষ কর তথা আয়কর ও সম্পদ করের উপর কয়েকটি প্রস্তাবনায় বলতে চাই যে

ক. আয়কর রিটার্ন গ্রহণে সারা বছরের জন্য বিলম্ব ফি ছাড়া সার্বজনীন করনির্ধারণী ব্যবস্থা উন্মুক্ত রাখা।

খ. দুই বছরের আয়কর রিটার্ন এবং আয়কর একসঙ্গে দেয়া অথবা আগামী অর্থ বছরের পূর্ণ সময়ের যে কোনো সময়ে পৃথকভাবে কিংবা একসঙ্গে দাখিল করার ব্যবস্থা রাখা। এই ব্যবস্থায় ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ কর বছরের জন্য

অগ্রীম কর (প্রজোজ্য ক্ষেত্রে) ও এই একই আওতায় থাকবে

গ. ভাড়া প্রাপ্তির ব্যাংক মাধ্যমের ২৫০০০ টাকা বা তদুর্ধ্ব আবশ্যিক বিষয় তুলে দিতে হবে।

ঘ. ব্যক্তি পর্যায়ের করদাতাদের সরল সুদ ধার্য্য আপাতত ২০১৯-২০,২০২০-২১ কর বৎসর সমূহে আরোপ প্রত্যাহার করতে হবে।

ঙ. ব্যক্তি আয়কর নথিতে সকল প্রকার ফিল্ড অডিট বন্ধ করতে হবে, ডেস্ক অডিট হবে। কিন্তু বিষয়টি ১৭৩ ধারায় সংশোধন প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করতে হবে।

চ. যে সকল অডিট মামলা ঝুলে আছে আপাতত এই দুই বছরে ব্যক্তি নথিতে তা রিটার্নভিত্তিক প্রদর্শিত আয়ের অনুকূলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্পন্ন করার ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে বড় ধরনের করফাঁকি মামলাগুলো কোন প্রকার হয়রানি ছাডা়ই নিষ্পত্তির বিধান প্রবর্তন করতে হবে।

ছ. বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রদের দ্বারা পরিদর্শন কাজ নিষ্পন্ন করার ব্যবস্থা থাকবে সেখানে সংশ্লিষ্ট সার্কেল কর পরিদর্শক টিম সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করবেন এবং ডেপুটি কমিশনার টিম লিডার হবেন, যিনি ডেস্কে থাকবেন তবে সরেজমিনে তদন্ত/পরিদর্শন করে মাঝে মধ্যে প্রতিবেদন যাচাই করবেন। এ ব্যবস্থা করোনা উত্তর যেসকল স্থাপনা , ব্যক্তি করপ্রদানে যোগ্য থাকা সত্ত্বেও করের আওতায় রাজস্ব প্রদানে এগিয়ে আসে নাই সেসব ক্ষেত্রে  অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহে রাজস্ব বোর্ডের কর্মসূচিতে পরীক্ষামূলক হিসেবে আইনে প্রভিশন রাখা যেতে পারে।

জ. করদাতাদের প্রদত্ত চেক, পে-অর্ডার দীর্ঘদিন সার্কেলে ফেলে রাখা হয়। আবার সার্কেল থেকে সোনালী ব্যাংকসহ বাংলাদেশ ব্যাংকে চালান করে জমা দিলে কখনো কখনো মাস বা বছরও লাগে। এই সব ক্ষেত্রে সার্কেলে প্রপ্তির ৭ দিন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক বা সোনালী ব্যাংকে ৭ দিন, সর্বোচ্চ ১৪ দিনের মধ্যে করদাতার ব্যাংক থেকে ক্লিয়ারেন্সের বিধি প্রণয়ন করতে হবে এবং সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত করার মানসে করদাতাকে তাদের প্রাপ্তিস্বীকার রিসিটের কপি যথারীতি পৌঁছায়ে দিতে হবে।

ঝ. সকল সরকারি জাতীয় বিদ্যালয়ে জাতীয় কারিকুলামে অধ্যায়নরত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের বেতন মওকুফ করে দিতে হবে, বেতনের সম পরিমান অর্থ ভর্তুকি হিসেবে সরকারের বিবেচনায় নিতে হবে।

জ্ঞ. জুম শ্রেণী ক্লাস পদ্ধতি চালু নিশ্চিত করতে নিয়োগ, দক্ষতা, ছাত্রদের প্রশিক্ষণ করার জন্য তথ্য- প্রযুক্তির ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে

ট. শেষ অধ্যায়ের প্রতি প্রফেসর ড.আবুল বারকাত স্যারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার দিক নির্দেশনার সুস্পষ্ট মতামত গ্রহনের বিধান প্রবর্তনের সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনীর তত্ত্বাবধানে বিএসএমএমইউকে ( BSMMU) সম্পৃক্ত করে প্রথম ও দ্বিতীয়  পাঁচ বছরের দুটি পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যুগোপযোগী করতে হবে।

ঠ. এখন জনপ্রশাসন, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী সমীপে আমি বিনীতভাবে আবেদন রাখবো যে, যদিও লকডাউন সারা বিশ্বব্যাপী, বাংলাদেশ এখনো মুক্ত নয় কিন্তু আপনারা খেয়াল করে দেখুন বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং তথ্য প্রযুক্তির কারণে লকডাউন মানুষকে অসহিষ্ণু করতে পারে নাই। সেদিন যদি বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী হয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি পদ্মা সেতুর মতো সাহসী উদ্যোগের ভূমিকা না নিতেন আমাদের অবস্থা পৃথিবীর বৃহত্তম তেল ভান্ডার ভেনিজুয়েলার মতো ভয়াবহ হতে পারতো। সুতরাং তিনি শুধু প্রধানমন্ত্রী নন, তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা একজন আমাদের যেমন অভিভাবক তেমনি দার্শনিক। অভিবাদন তার প্রতি।

বলা আবশ্যক, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির অন্যতম অনুঘটক বিদ্যুৎ এবং তথ্য প্রযুক্তি। এই বিষয়টিতে খুব গুরুত্ব দিয়ে নতুন প্রজন্মের যথেষ্ট মেধাবীদের ধরে রাখার ন্যূনতম  হলেও এখনই বিসিএস (তথ্য প্রযুক্তি ) ক্যাডার গঠন করার ঘোষণা বাজেটে রাখার জন্যে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

পৃথিবীর দেশে দেশে  ছাত্রদের মধ্যে জুম, আ্যাপসের মাধ্যমে ভার্চুয়াল ক্লাস ও পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। যদি এই ক্যাডার থাকতো তাহলে জবাবদিহিতা থাকতো। আগামীতে এর বিকল্প নাই। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর সদয় বদান্যতায় এই বিসিএস (তথ্য প্রযুক্তি ) ক্যাডারসহ কিছু নান্দনিক ঘোষণা জাতির জনকের জন্মশত বার্ষিকী উপলক্ষ্যে এই দুর্গম বৎসরের বাজেটে এলে বাজেট সমৃদ্ধ হবে। 

লেখক: কর কমিশনার (অব.), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড