২০০৩
সালে চালু হওয়ার পর থেকে বিশ্বব্যাংকের ‘ডুয়িং বিজনেস’ সূচক ধারণাগত ও পরিচালনগতভাবে সন্দেহের মুখে পড়েছে, কিন্তু মূলধারার অর্থনীতিবিদরা কেবল সম্প্রতিই এর সমালোচনা শুরু করেছেন। এর কিছু সমস্যা খোদ সংস্থাটিই স্বীকার করেছে। এটি সন্দেহাতীতভাবে ইতিবাচক ও সাধুবাদপ্রাপ্য হলেও আলোচ্য সূচক এরই মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিপুল ক্ষতি করেছে। কাজেই এটি জরুরি ভিত্তিতে বর্জন করা উচিত।
বিশ্বব্যাংক এরই মধ্যে অবশ্য ডুয়িং বিজনেস সূচকের প্রকাশনা স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে এর তথ্যগত অনিয়মের কারণে। জনপরিসরে ওঠা সর্বসাম্প্রতিক হইচইও সংখ্যা প্রতারণা-সম্পর্কিত। আপাতত চারটি দেশের আজারবাইজান, চীন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—অন্তত ২০১৭ ও ২০১৮ সালের তথ্যগুলো সংস্থাটি অযথাযথভাবে সংশোধন করেছিল এবং এভাবে ২০১৮ ও ২০২০ সালের ডুয়িং বিজনেস রিপোর্ট ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। অন্য ধরনের অনিয়মগুলোও ঘটে থাকতে পারে। অথচ সেগুলো ততটা সামনে আসেনি। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক গত পাঁচ বছরের তথ্যের একটি ‘পদ্ধতিগত পর্যালোচনা’ শুরু করেছে এবং সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তথ্য সংশোধনের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে সংস্থাটি।
তবে সূচক-সম্পর্কিত অন্য উদ্বেগগুলোর তুলনায় এটি খুবই ক্ষুদ্র ইস্যু। সংস্থাটির তত্কালীন মুখ্য অর্থনীতিবিদ পল রোমার এর কিছু তুলে ধরেছিলেন। তার মতে, চার বছরের বেশি সময় ধরে দেশভিত্তিক অবস্থানক্রমের অধিকাংশ বদলই পৌনঃপুনিক পদ্ধতিগত পরিবর্তনের ফলে হয়েছে, যেখানে সরকারগুলোর রাজনৈতিক ওরিয়েন্টেশনকেই অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
সুনির্দিষ্টভাবে রোমার বলেছিলেন যে বামপন্থী সরকারের অধীনে ব্যবসায়িক পরিবেশের অবনমন ঘটেছিল, তা দেখানোর জন্য চিলির তথ্য মনে হয় কারসাজি করা হয়েছিল। ২০০৬ ও ২০১৭ সময় পর্বে চিলির অবস্থান ২৫তম ও ৫৭তম অবস্থানে ওঠানামা করেছিল, যখন উল্লিখিত সময়ে দেশটির শাসনভার সমাজতন্ত্রী মিশেল ব্যাচেলেট এবং রক্ষণশীল সেবাস্তান পিনারার সঙ্গে অদল-বদল হয়েছে।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, ব্যাচেলেটের শাসনামলে চিলির অবস্থানের অব্যাহতভাবে অবনমন ঘটেছে। এজন্য রোমার ‘চিলি এবং ভুল ধারণা দেয়া অন্য যেকোনো দেশের প্রতি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষমা প্রার্থনার’ প্রস্তাব দিয়েছিল। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে বিশ্বব্যাংক রাজনৈতিক কারণে ওই দেশের (চিলি) অবস্থান ম্যানিপুলেট করেছিল। কিন্তু ওই অভিযোগ থেকে পরবর্তী সময়ে তিনি সরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং দুই সপ্তাহ পরে নিজের পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। বিভিন্ন দেশের একটি স্থায়ী নমুনা এবং সংগতিপূর্ণ পদ্ধতির ভিত্তিতে সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের জাস্টিন সান্ডেফোর এবং দিব্যানসি ওয়াদাহ তাদের নিজস্ব সৃষ্ট ২০০৬ ও ২০১৮ সময় পর্বের অবস্থানকে আনুষ্ঠানিক ডুয়িং বিজনেস অবস্থানক্রমের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তারা খুঁজে পেয়েছেন যে ব্যাচেলেটের সময়ে চিলির অবস্থানের ধারাবাহিক পতন এবং পিনারার সময়ে এর অব্যাহত উন্নতি পুরোপুরিভাবে পদ্ধতিগত ঘষামাজার কারণে হয়েছে। সেক্ষেত্রে চিলির আইন ও নীতিগুলো খুব একটা পরিবর্তনই করা হয়নি।
আন্তঃদেশগুলোর তুলনার ক্ষেত্রে ডুয়িং বিজনেসের অনুসারীরা সূচকের মূল্যের চেয়ে দেশের অবস্থানে বেশি দৃষ্টি দেয় এবং প্রতি বছরই অবস্থানক্রমগুলো বিপুল মিডিয়া কাভারেজ সৃষ্টি করে। এমনকি বিদ্যায়তনিক গবেষকরাও (ভুলভাবে) ব্যক্তি বিনিয়োগের জন্য সরকারি সমর্থনের সূচক হিসেবে অবস্থানক্রমকে ব্যবহার করে। ফলে সরকারগুলো অধিক বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানোর আশায় নিজ নিজ দেশের অবস্থান উন্নয়নে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামে।
এদিকে নীতিনির্ধারকরা মাঝেমধ্যে পুরো ব্যবস্থা কারসাজি করার জন্য বেপরোয়া (এবং কার্যকর) পদক্ষেপ নিয়েছে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ হলো ভারত। দেশটির সূচক স্কোরে উন্নতির উদ্দেশ্যে ভারত সরকার বিধিমালা বদলে দিয়েছে। এতে ২০১৫ সালের ১৪২তম থেকে নাটকীয়ভাবে উন্নতি ঘটে ২০২০ সালে দেশটির অবস্থানক্রম দাঁড়ায় ৬৩-এ।
তবে আবারো ভারতের উন্নতি প্রধানত হয়েছে পদ্ধতিগত সংস্কার এবং সমরূপ দেশগুলোর স্কোরে সামান্য পার্থক্য দ্বারা সৃষ্ট পরিবর্তন দ্বারা। দুর্ভাগ্যক্রমে, এমনকি বিনিয়োগ হার কমলেও ভারতের অবস্থানে উন্নতি ঘটেছে। পরিসংখ্যান মতে, জিডিপির অংশ হিসেবে ২০১০ সালের ৪০ শতাংশ থেকে ২০১৯ সালে দেশটির বিনিয়োগ হার প্রায় ৩০ শতাংশ অবনমন ঘটেছে।
তাহলে কীভাবে ওই দুটি ক্ষেত্রে ডুয়িং বিজনেস উন্নতির স্মারক হতে পারে, সেটি একটি বড় প্রশ্ন? সত্য যে, যখন আলোচ্য সংস্থাটি এ সূচক হিসাব করে, তখন শক্তিশালী স্বার্থের সংঘাত সম্ভাবনাময়ভাবে সৃষ্টি হতে পারে—হয় সংস্থাটির কর্মকর্তাদের আদর্শিক প্রভাবে নতুবা বড় ও আর্থিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোকে শান্ত রাখার প্রয়োজনে। কিন্তু আলোচ্য সূচকের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এর নকশা মৌলিকভাবে ভ্রমাত্মক।
ডুয়িং বিজনেস সূচকে কোনো দেশের সার্বিক ব্যবসায়িক পরিবেশ মূল্যায়ন করা হয় বটে, তবে এতে কেবল সামান্যসংখ্যক সরকারি নিয়ন্ত্রণ বিধি (যেমন কর সূচক বাদে, যার মধ্যে মোট মুনাফার অংশ হিসেবে কর অন্তর্ভুক্ত) বিবেচনায় নেয়া হয়। বড় কথা, এটিতে আর্থিক, পরিবেশগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ আইনের মতো ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এমন কিছু বিধিবিধান বিবেচনার বাইরে রাখা হয়। আরো তাত্পর্যপূর্ণ বিষয় হলো, সামষ্টিক-অর্থনৈতিক অবস্থা, অপরাধ, দুর্নীতি, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, ভোগ, অসমতা, দারিদ্র্যসহ কোম্পানিগুলো-বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক পরিবেশের সব দিক আলোচ্য সূচক মূল্যায়ন করে না।
অধিকন্তু, আলোচ্য সূচক পুরোপুরিভাবে ব্যবসায় সহজীকরণ এবং নিয়ন্ত্রণ বিধির জন্য কোম্পানিগুলোর ক্ষতির ওপর দৃষ্টি দেয়। এই সূচকে ওইসব বিধিবিধানের সুফল একদমই বিবেচনায় নেয়া হয় না, যতই সেগুলো একটি ভালো সার্বিক ব্যবসায়িক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখুক না কেন। একইভাবে ডুয়িং বিজনেস সূচক করকে কেবল ব্যয় হিসেবে গণ্য করে এবং এটিকে কোনোভাবে আধুনিক অবকাঠামো এবং শিক্ষিত কর্মী বাহিনীর মতো অর্থনৈতিক সুফলে ব্যবহূত রাজস্বের উৎস হিসেবে বিবেচনা করে না।
এভাবে ডুয়িং বিজনেসের সার্বিক গুরুত্বারোপ নিয়ন্ত্রণ বা বিধিবিধান-পরিপন্থী। যে দেশের নিয়ন্ত্রণ বিধি যত কম, উল্লিখিত সূচকে তার অবস্থান-নৈপুণ্য তত ভালো। বিদ্যমান সূচকগুলোয় করহার প্রবর্তনের বিষয়টি এত সাংঘাতিক যে বিশ্বব্যাংকের গঠিত দুটি স্বতন্ত্র মূল্যায়ন কমিটিই তা অন্তর্ভুক্ত না করার পরামর্শ দিয়েছে। ইসাবেল অরটিজ এবং লিও বাউনাচ উল্লেখ করেছেন, এ সূচক কার্যকরভাবে সামাজিক অগ্রগতি অবমূল্যায়ন করে এবং অসমতাকে প্রমোট করে। কেননা এটি কর্মসংস্থান সুরক্ষা হ্রাস, সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী কমানো এবং করপোরেটের ওপর তুলনামূলক কম করারোপসহ ‘বি-নিয়ন্ত্রণ অভিজ্ঞতায়’ অংশ নেয়ার কথা বলে। কাজেই তারা দুজন সঠিকভাবেই তর্ক তুলেছেন যে ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদন প্রকাশ বন্ধ করার এখনই সময় এবং এতদিন এই বিভ্রান্তিকর ও সমস্যাজনক সূচক যতটা উন্নয়নশীল বিশ্বের ক্ষতি করেছে, তার জন্য বিশ্বব্যাংকের অনুশোচনার ঋণ পরিশোধ করা উচিত।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
জয়তী ঘোষ: ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক; ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকস অ্যাসোসিয়েটসের এক্সিকিউটিভ সেক্রেটারি এবং ইনডিপেনডেন্ট কমিশন ফর দ্য রিফর্ম অব ইন্টারন্যাশনাল করপোরেট ট্যাক্সেশনের সদস্য
ভাষান্তর:
হুমায়ুন
কবির










