আজ মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে বিশ্বমানচিত্রে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও লাখো প্রাণের বিনিময়ে এ অর্জন। মুক্তির লড়াইয়ে রণাঙ্গনে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছিলেন, নির্দ্বিধায় জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, বিনম্রচিত্তে আজ আমরা তাদের স্মরণ করছি। শ্রদ্ধা জানাচ্ছি বাঙালি নারী ও বীরাঙ্গনাদের, যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দ্বারা নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বিভিন্নভাবে সহযোগিতা-সমর্থনের হাত বাড়িয়ে দেয়া বিদেশী রাষ্ট্র ও ব্যক্তিদের প্রতি রইল অগণন কৃতজ্ঞতা। আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যার আহ্বান দেশের মানুষকে স্বাধীনতার জন্য উজ্জীবিত করেছিল; বিশ্বমানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি ভূখণ্ডের স্বপ্ন দেখিয়েছিল। বিনম্র শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এএইচএম কামরুজ্জামান ও ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীকে।

বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূলে ছিল আপেক্ষিক অর্থনৈতিক বঞ্চনার অনুভূতি। পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনীতির অধিকতর দ্রুত উন্নতি ও বহুমুখীকরণ অনিবার্যভাবেই সে সময় পূর্ব পাকিস্তানিদের জীবনমানে প্রতিফলিত হয়। কয়েকটি পরিবারের হাতে কুক্ষিগত ছিল অধিকাংশ সম্পদ। মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে সৃষ্ট বৈষম্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বহাল ছিল সেবা-সুযোগ-সুবিধা ভোগের বৈষম্যও। পূর্ব পাকিস্তানের বেসরকারি খাতে অবাঙালিদের প্রাধান্য, অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে পক্ষপাতিত্ব আর ক্রমশ কোণঠাসা অবস্থা ভেঙে বের হতে প্রয়োজন ছিল স্বাধিকারের লড়াই। তাই তো বাঙালির ঐক্য ও সংহতির পেছনে ছিল স্বাধীন সার্বভৌম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন। আমরা এমন এক স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যার শাসন ব্যবস্থার মূলনীতি হবে গণতান্ত্রিক; যে রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হবে সবার সমান অধিকার। অবসান ঘটবে অন্যায়, অবিচার, শোষণ, নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িক বিভেদ, বৈষম্যের। আমরা এমন এক ন্যায্য সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে সবার অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটবে, অশিক্ষা দূর হবে।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে বাংলাদেশের অগ্রগতি গর্ব করার মতোই। আর্থসামাজিক বেশির ভাগ সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। জিডিপির হিসাবে পাকিস্তানকে আমরা আগেই পেছনে ফেলেছি। আইএমএফের সাম্প্রতিক পূর্বাভাস বলছে, মাথাপিছু জিডিপিতে এবার ভারতকে পেছনে ফেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। পদ্মা সেতুর মতো বৃহৎ প্রকল্প হচ্ছে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে। বিষয়গুলো নানামুখী অর্জন ও অগ্রগতিকে দৃশ্যমান করে। মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের মেগা প্রকল্পসহ ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মতো কর্মসূচি চলছে। প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মাথাপিছু আয় বাড়ছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার পথে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, যাতায়াত ও পরিবহন খাতে উন্নয়নের পাশাপাশি  জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের অগ্রগতি হয়েছে। দেশের প্রায় সব জায়গা ইন্টারনেটের আওতায় এসেছে। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার মানুষের কাজকর্মে যোগ করেছে নতুন গতি। এ উন্নতির পেছনে কাজ করেছে সাধারণ মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা আর সরকারি-বেসরকারি খাতের সহায়তা।

ঠিক বিপরীতভাবেই আমরা দেখছি দেশের সব মানুষের মোট আয়ের ৩৮ শতাংশই আয় করে ওপরের দিকে থাকা ১০ শতাংশ ধনী। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান্তরালে বাড়ছে মানুষে মানুষে সম্পদ ও আয়বৈষম্য, যা উন্নয়ন সুফলের সুষম বণ্টনকে প্রশ্নের সম্মুখীন করছে। আজও মুষ্টিমেয় লোকের হাতে আজ পুঞ্জীভূত সম্পদ-আয়ের বিপুলাংশ। মনে রাখা জরুরি, প্রবৃদ্ধির সুফল সুষমভাবে বণ্টন না হলে এবং সম্পদের সিংহভাগ জনসংখ্যার একটি ছোট অংশের হাতে কুক্ষিগত হতে থাকলে আয়বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, প্রবৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না। সম্পদবৈষম্যের নেতিবাচক প্রভাব সমাজ ও অর্থনীতির ওপর পড়েই। তাই এটি নিয়ন্ত্রণ জরুরি হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মর্মকথা হলো গণতন্ত্র, যে গণতন্ত্রে আছে ন্যায়পরায়ণতা, নাগরিকদের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, অধিকারের সমতা, পরমতসহিষ্ণুতা; যা পাকিস্তান রাষ্ট্রে সম্ভব ছিল না।

কৃষি খাতে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বদরবারে আলোচিত হয়েছে। খাদ্যোৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়েছে। এ পর্যায়ে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। আজও চার কোটি মানুষ দারিদ্র্যের রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি পায়নি। প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাবে ভুগছে। কভিডের কারণে দারিদ্র্য ও পুষ্টিহীনতা আরো বেড়েছে। কর্মহীন অবস্থায় রয়েছেন অনেকে। তাদের কাজে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এখনো প্রত্যাশিতভাবে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারিনি। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকিং খাত নাজুক। এ বিষয়গুলোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কভিড-পরবর্তী পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় সরকারকে আরো বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। আমাদেরও প্রস্তুতি নিতে হবে। রফতানি বহুমুখীকরণ, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো, কারখানার কর্মপরিবেশের উন্নতি, প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

মহান বিজয় দিবস উদযাপনের প্রাক্কালে অর্থনৈতিক বঞ্চনা দূর করে সবার জন্য একটি সমতামূলক, ন্যায়নিষ্ঠ ও মর্যাদাভিক্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠাই হোক আমাদের মূল অঙ্গীকার। দুর্নীতি রোধসহ আর্থসামাজিক পরিমণ্ডলে শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আরো বেশি মনোযোগী হতে হবে। মনে রাখতে হবে, টেকসই উন্নয়ন ও উন্নতির সমবণ্টন করা গেলে বঙ্গবন্ধুসহ লাখো মুক্তিযোদ্ধা যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা বাস্তব হয়ে উঠবে।