নভেল করোনাভাইরাস, আম্পান ও বন্যায় আমরা পর্যুদস্ত। ২০২০ সালের জানুয়ারির প্রথম দিন বছরটিকে স্বাগত জানাতে গিয়ে কারো কি কখনো মনে হয়েছে, আমরা বছরটি কীভাবে অতিবাহিত করতে যাচ্ছি, অবশ্যই না। করোনা চলার সময়ের মধ্যেই গত ২০ মে দেশের উপকূলীয় জেলাগুলোয় তাণ্ডব চালিয়েছিল সুপার সাইক্লোন অম্পান, ফলে উপকূল অঞ্চলসহ দেশের অনেক জেলার ঘরবাড়ি, ফসলের ক্ষেত, ফলের বাগান, মাছের ঘের, গবাদিপশুর খামারসহ কৃষির বিভিন্ন খাতের ক্ষতি হয়েছিল ব্যাপক। ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল প্রায় ২ লাখ ৬৫ হাজার ৬৭ হেক্টর জমির ফসল। বহন করতে হয়েছিল প্রায় ৬৭১ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি।

বাংলাদেশের নদ-নদীর পানির ৯৩ শতাংশই আসে উজানের দেশ ভারত, নেপাল, চীন ও ভুটান থেকে। গত বছর বন্যা ১২ জুলাই শুরু হলেও এবারের আগাম বন্যা শুরু হয়েছে ২৬ জুনের দিকে। করোনার কারণে যখনই গোটা দেশ দিশেহারা, তার মধ্যে আম্পানের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পানির প্রভাবে এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বন্যার কবলে পড়ছে বাংলাদেশ। ২০২০ সালে একসঙ্গে একাধিক দুর্যোগ আমাদের জন্য বিশাল ধাক্কা। প্রকৃতি যেন মানবসৃষ্ট কারণেই অতিষ্ঠ হয়ে রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছে, যার বিষবাষ্পে আমরা আজ অসহায়।

গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা বিধৌত একটি বৃহত্তম বদ্বীপ অঞ্চলে বাংলাদেশের অবস্থান। ভৌগোলিক এ অবস্থান এবং ভূতাত্ত্বিক গঠনের কারণে বাংলাদেশকে সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ দেশগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ কর্তৃক ২০১০ সালে প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্সে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ১০টি দেশের মধ্যে উঠে এসেছিল বাংলাদেশের নাম। প্রতি বছরই বাংলাদেশকে বন্যাসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হতে হয়। ছোট-বড় বন্যায় প্রতি বছর বাংলাদেশের প্রায় ২৬ হাজার বর্গকিলোমিটার অঞ্চল প্লাবিত হয়, যা কিনা দেশের মোট ভূখণ্ডের ১৮ শতাংশ, যদিও অত্যধিক মাত্রার বন্যা সারা দেশের প্রায় ৫৫ শতাংশেরও বেশি ভূখণ্ড কবলিত করে ফেলে। প্রতি বছরই বাংলাদেশকে বন্যাসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হতে হয়। বন্যার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকাটা যেন আমাদের নিয়তি।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যমতে, এবারের বন্যার প্রথম এক মাসে দেশের অন্তত ৩১ শতাংশ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। গত বছরেও দেশে কয়েক দফা বন্যা হয়েছিল, কিন্তু তা খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বন্যা হয়েছিল ১৯৯৮ সালে, যার স্থায়িত্বকাল ছিল ৩৩ দিন। এবারের বন্যা সেই রেকর্ড ভেঙে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির করেছে অপূরণীয় ক্ষতি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান সাম্প্রতিক বন্যায় বাংলাদেশের মানবিক সংকটে পড়ার কথা প্রকাশ করেছে। করোনা, আম্পান আর বন্যায় বাংলাদেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা চরম দুর্দশায় পতিত হয়।

বন্যাসহ যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি খাত। এবার বন্যায় দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের ৩১টি জেলায় নষ্ট হয়েছে আমনের বীজতলা, পাকতে শুরু করা আউশ ধান, পাট, তলিয়ে গেছে গ্রীষ্মকালীন সবজি, চীনাবাদাম, তিল, ভুট্টা, মরিচ, আখ, কলাবাগানসহ হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মতে, এরই মধ্যে ক্ষতি হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার টন ফসলের, যার বাজারমূল্য ৩৫০ কোটি টাকা। বানের জলে ভেসে গেছে গবাদিপশু, মাছের খামার। করোনাকালীন আম্পান আর বন্যার উপর্যুপরি এমন আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকগোষ্ঠী। চিকিৎসা সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, দারিদ্র্য সব মিলিয়ে বন্যার্ত জনজীবন কঠিন পরীক্ষায়, স্বল্পতম সময়ের ব্যবধানে এমন সম্মিলিত দুর্যোগের মুখে পড়তে হবে, এমনটি কি কেউ ভুলেও ভেবেছিল! এ যেন ভারসাম্যহীনতায় প্রকৃতির অসন্তুষ্টি প্রকাশের রূপ।

বন্যা বাংলাদেশের জন্য নতুন কোনো দুর্যোগ নয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণকালের বড় আকারের বন্যাগুলো হয়েছিল ১৯৭৪, ১৯৭৭, ১৯৮০, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০৪ ও ২০০৭ সালে। এর মধ্যে ১৯৮৮ ও ১৯৯৮ সালের বন্যায় দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ ভূমি প্লাবিত হয়ে মানুষের আবাস, গবাদিপশুর প্রাণহানিসহ পুরো কৃষি খাত বিধ্বস্ত হয়েছিল। কেবল বন্যা নয়, ১৯৬০ সাল থেকে হিসাব করলে এখন পর্যন্ত ৩৬টি ঘূর্ণিঝড় বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে। গোর্কি, সিডর, আইলা, মহাসেন, মোরা, ফনী, বুলবুলের মতো ঘূর্ণিঝড় ক্রমান্বয়ে বিপন্ন করেছে বাংলাদেশকে। এসব ঘূর্ণিঝড়ের সময় প্রাণহানি, জানমালের ক্ষতি, নদীভাঙনসহ প্রতিবারই আমাদের কৃষি খাতকে বহন করতে হয়েছিল অপূরণীয় ক্ষতি। অনেকটা যেন নিয়তির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর বন্যার সঙ্গে আমাদের বসবাস।

এই যে দুর্যোগ, তার জন্য কি প্রকৃতিই কেবল দায়ী? প্রকৃতির এই খামখেয়ালিপনার পেছনে রয়েছে মানবসৃষ্ট কিছু কারণ। অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন অবকাঠামো যেমন সড়ক, ব্রিজ, কালভার্ট, আশ্রয়কেন্দ্র, বেড়িবাঁধ ইত্যাদির নেতিবাচক প্রভাব, বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে নদ-নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া, ইচ্ছেমতো খালবিল খননের ফলে নদ-নদীর গতিপথ পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া, পানি ধরে রাখা এবং অপসারণের জায়গাগুলো ভরাট ও বন্ধ হয়ে যাওয়া, নদ-নদীর নাব্যতা হারিয়ে ফেলাসহ বহু কারণে বাংলাদেশ বন্যার দুর্ভোগে পড়ে। সমতল প্রকৃতির না হওয়ায় বাংলাদেশের অনেক এলাকার বৃষ্টির পানি সহজে নদ-নদীতে গিয়ে পড়তে পারে না, আবার মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে উজানের পানিও নদ-নদীর মাধ্যমে সহজে সাগরে যেতে পারে না। তাছাড়া দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ বন্ধ করার উদ্দেশ্যে নির্মিত বাঁধের জন্য স্বাভাবিক পানিপ্রবাহের ব্যাঘাত ঘটছে। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বৃষ্টিপাতের বাড়তি পানি বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। সৃষ্টি হচ্ছে ছোট-বড় বন্যার। পাশাপাশি রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা ও বন উজাড়করণের মতো ইস্যু।

প্রতি বন্যার সময়ে সরকার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ নিয়ে রয়েছে দুর্বলতা। বন্যা প্রায় নিয়মিত ঘটনা, তাই আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের মাধ্যমে আগাম প্রস্তুতি নেয়া প্রয়োজন। এবারের বন্যার স্থায়িত্বের কথা ভেবে সরকার এরই মধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। আমনের বিকল্প বীজতলা তৈরি, বিকল্প ফসল চাষের ব্যবস্থাসহ জরুরি ভিত্তিতে কৃষি পুনর্বাসনের প্রস্তুতি চলছে। এরই মধ্যে ত্রাণ হিসেবে বন্যাকবলিত এলাকায় চাল ও নগদ অর্থ দেয়া হয়েছে। করোনাকালীন সরকার ৪ শতাংশ হার সুদে প্রণোদনামূলক কৃষিঋণ চালু করেছে। বাংলাদেশে বন্যার ঝুঁকি মোকাবেলায় সেন্ট্রাল ইমারজেন্সি রেসপন্স ফান্ড ৫২ লাখ মার্কিন ডলারের বিশেষ তহবিল হস্তান্তর করেছে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার কাছে। করোনাকালীন এ বন্যায় ক্ষতি কমিয়ে আনতে সরকারের নেয়া প্রয়াসগুলো প্রশংসাযোগ্য। তবে প্রশ্নটা থেকেই যাচ্ছে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ যেখানে যেকোনো দেশের জন্যই দুরূহ, সেখানে বন্যা অভিযোজন ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় জোর দেয়া উচিত নয় কি?

বাংলাদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন প্রচেষ্টা অনেক আগে থেকেই চলে আসছে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীনই বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কমিশন গঠন করেছিল। গঙ্গার পানি বণ্টন, তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি, টিপাইমুখ বাঁধ ইত্যাদি নিয়ে আছে নানা জটিলতা। বাংলাদেশের ৫৪ নদীর উত্পত্তিস্থল ভারত। তাছাড়া তিনটি নদীর জলধারাও মিয়ানমার থেকে এসেছে। তাই দেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নে অববাহিকা অঞ্চলের দেশগুলোর সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। কূটনৈতিক তত্পরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভারত, নেপাল ও চীনের সঙ্গে তথ্য-উপাত্ত বিনিময়ের সুযোগ বাড়াতে হবে। এতে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বয় বৃদ্ধি খুবই প্রয়োজন। বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নদ-নদী খনন করে এর নাব্যতা রক্ষা করতে হবে। নদীর তলদেশের গড় ঢালের পরিবর্তন পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে যে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে কিনা। প্রয়োজন বন্যা-পূর্ববর্তী, বন্যাকালীন এবং বন্যা-পরবর্তী সময় বিবেচনা করে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া।

বাংলাদেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২ সালে প্রণীত হলেও একই সময়ে বহুমুখী দুর্যোগ মোকাবেলার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন। এর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। তবে আশার কথা হচ্ছে, আমাদের শতবর্ষী ডেল্টা প্ল্যানে বন্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি জায়গা পেয়েছে।

দেশে পর্যাপ্তসংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র পরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করতে হবে। করতে হবে বনায়ন, গড়ে তুলতে হবে বন্যা মোকাবেলা তহবিল। বন্যায় কৃষকরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদেরকে সঠিক সময়ে সঠিক দামে কৃষি উপকরণ দেয়ার ব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে হবে। গৃহপালিত পশুপাখির জন্য নিশ্চিত করতে হবে চিকিৎসা ও ওষুধ। বন্যা ও লবণাক্তসহিষ্ণু এবং স্বল্পমেয়াদি ফসল ফলানোর তাগিদ দেয়ার পাশাপাশি বীজের সঠিক সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। বন্যাকবলিত এলাকায় কৃষকদের ভাসমান বীজতলা ও ফসল উৎপাদনে উৎসাহ দিতে হবে। পর্যাপ্ত খাদ্যদ্রব্য, নিরাপদ পানি, অ্যান্টি-ভেনম ও ওষুধপত্রের ব্যবস্থা রাখতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বন্যার্তদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে বিভিন্ন এনজিও, ব্যবসায়িক গোষ্ঠী, সামাজিক সংগঠন ও বিত্তবানদের।

বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। ফসলি জমির প্রায় ১৯০ কিলোমিটার অংশ প্রতি বছরই পদ্মা, মেঘনা, যমুনায় তলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাঙালিরা বীরের জাতি। বিশাল ক্ষয়ক্ষতির মাঝেও সবসময় বাঙালিরা ঘুরে দাঁড়িয়েছে অদম্য সাহস নিয়ে। টিকে রয়েছে জীবনসংগ্রামের কঠিন যুদ্ধে। সবার সহযোগিতায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত কাটিয়ে উঠে দাঁড়াবে সোনার বাংলাদেশ—এ প্রত্যাশা আমাদের।

 

ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম: কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

দেবাশিস শর্মা: প্রকল্প ইন্টার্ন, কৃষি ব্যবসা ও বিপণন বিভাগ

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ