বদ্বীপ ও নদীমাতৃক হওয়ার প্রকৃতিপ্রদত্ত আপেক্ষিক সুবিধায় বাংলাদেশে ঐতিহাসিকভাবে গড়ে উঠেছিল বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নৌপথ। এর একটি হলো যমুনাকেন্দ্রিক নৌপথ। একসময় আলোচ্য নৌপথটি আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনে বড় ভূমিকা রাখলেও সময়ান্তরে এর উপযোগিতা অনেকখানিই সংকুচিত। বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় বিভিন্ন ধরনের কৃষি উপকরণ, জ্বালানি তেল, পণ্য ও দানাদার খাদ্যশস্য পরিবহনে যমুনাকেন্দ্রিক এ নৌপথ কিছুটা অবদান রাখলেও পূর্ণ সম্ভাবনায় এটিকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না । মূলত নাব্যতা সংকটে এমনটি হচ্ছে। পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় এ নৌপথের অন্যতম ব্যস্ত বাঘাবাড়ী নৌবন্দরে জাহাজ ভিড়তেও প্রায়ই অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে, বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পণ্য পরিবহন। ফলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিময়তা হ্রাস পেয়েছে।

শুধু পণ্য বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব নয়, পাড়সংলগ্ন মানুষের অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতাও বাড়াচ্ছে যমুনা নদীর নাব্যতা সংকট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতি বছর নদীটিতে বিপুল পরিমাণ পলি ও বালি পড়লে পানির স্রোতে স্বাভাবিক নিয়মে বঙ্গোপসাগরে চলে যেতে পারছে না। ফলে তৈরি হচ্ছে চর। বলা চলে, নাব্যতা সংকটে দুই দিক থেকে ওই জনপদের মানুষের বিপদ । একদিকে বর্ষাকালে নদীর দুই কূল উপচে বন্যা ও প্রবল ভাঙন। এতে অনেকে বসতভিটা ও আবাদি জমি হারাচ্ছে। অন্যদিকে শীত মৌসুমে জেগে উঠে ধু ধু বালুচর, যেখানে হয় না কোনো ফসল। ফলে অর্থনৈতিক সুযোগগুলো সেখানে ব্যাপকভাবে সংকুচিত, যার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে। সারা দেশে গড় দারিদ্র্যের হার যেখানে ২৫ শতাংশের নিচে, যমুনাপারের জনপদে তা এখনো প্রায় ৩৭ শতাংশে রয়ে গেছে। কাজেই দুই পারের মানুষের নাজুকতা হ্রাসের পাশাপাশি উল্লিখিত জনপদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে নাব্যতা সংকট রোধ ও দক্ষতার সঙ্গে যমুনা নদী ব্যবস্থাপনার সময় এসেছে।

দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, দেশে একে তো অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় নতুন নৌপথ করা তৈরি যাচ্ছে না, তদুপরি পরীক্ষিত নৌপথগুলোকে সুরক্ষায় ব্যর্থতার পরিচয় দৃশ্যমান। যমুনাকেন্দ্রিক নৌপথের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রয়োজ্য। অবহেলায় সুপ্রাচীন এ নদীপথটি আজকে প্রায়ই নিঃশেষিত। বৈজ্ঞানিক ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে যমুনা নদীর পানিপ্রবাহ কমছে, হ্রাস পাচ্ছে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। নাব্যতা সংকট নিরসনে অনেকটা অস্থায়ী ভিত্তিতে ড্রেজিং করা হচ্ছে বটে, কিন্তু সামগ্রিক দিক বিবেচনায় কাজটি করা হচ্ছে না। ফলে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সুফল। বদ্বীপ পরিকল্পনায় যমুনাকে ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টির কথা থাকলেও এর বাস্তবায়ন খুব একটা সহজ নয়। কেননা নদীভাঙন চলতে থাকলে দুই পাড়ে শিল্প-কারখানা স্থাপন এবং বড় ধরনের অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ গ্রহণ করা সম্ভব নয়। এর জন্য বড় ধরনের বিনিয়োগ যেমন প্রয়োজন হবে, সুস্পষ্ট লক্ষ্যাভিমুখী পথনকশাও তৈরি করতে হবে। বর্তমানে যমুনাকে ঘিরে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে পাইলট আকারে প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে। এ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। টেকসই ভিত্তিতে নদীশাসনের উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি সার্বিক দিক বিবেচনায় সংলগ্ন জনপদের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি ও সুসমন্বিত পরিকল্পনা নিতে হবে। না হলে বাঞ্ছনীয় মাত্রায় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব নয়।  

বিশেষ করে বাঘাবাড়ী নৌবন্দরটি ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিলে নৌপথটি ভারত ও নেপালের সঙ্গে বাণিজ্যের অন্যতম মাধ্যম হতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এতে পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি পণ্য পরিবহন খরচ যেমন কমে আসবে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বেগবান হবে। আশার কথা হলো, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অর্থনীতির জন্য যমুনা অর্থনৈতিক করিডরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করিডর বিবেচনা করা হচ্ছে। নদীটির ভাঙনপ্রবণতাই অবশ্য এক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ। যথাযথ পরিকল্পনা ও অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে এটি মোকাবেলা করা এবং অঞ্চলটিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা অসম্ভব নয়। জানা গেছে, যমুনা অর্থনৈতিক করিডর বাস্তবে রূপ দিতে অর্থায়নের সংস্থান করতে এরই মধ্যে বৈশ্বিক ঋণদানকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা বড় ধরনের অর্থায়নে রাজি হওয়ার খবর মিলছে। প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান নিশ্চিত এবং জুতসই পরিকল্পনার মাধ্যমে ঐতিহাসিক নৌপথটির পুনরুজ্জীবন এবং সংলগ্ন জনপদের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার অভ্যুদয় ঘটুক, এটিই প্রত্যাশা।