কভিড-১৯ মহামারী থেকে পুনরুদ্ধারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় অর্থনীতিগুলো বড় মাত্রায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রস্তুতি নিচ্ছে। নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন উৎপাদন খাত ও উদ্ভাবনে ৭০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা এবং ক্লিন এনার্জি উন্নয়নে গ্রিন ডিলে ২ ট্রিলিয়ন প্রদানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। এরই মধ্যে জার্মানি ইউরোপীয় ইউনিয়ন রিকভারি ফান্ডে ৭৫০ বিলিয়ন ইউরোর (৮৮৭ বিলিয়ন ডলার) সমপরিমাণ অর্থ জুগিয়ে কয়েক বছরের কৃচ্ছ্র নীতি থেকে সরে এসেছে। ফ্রান্সও ২০২১ সালজুড়ে নিজস্ব ন্যাশনাল জব রিটেনশন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির কর্মসূচি বজায় রাখবে।
বিপরীতক্রমে, যুক্তরাজ্যের এক্সচেকারের চ্যান্সেলর রিশি সোনাক কার্ভের পেছনে পড়ে গেছে। অনেকেই প্রত্যাশা করেন যে আগামী মার্চের দিকে ব্রিটেন একটি ভি আকৃতি পুনরুদ্ধারের মুখোমুখি হবে। এ সম্ভাবনা বিবর্ণ হওয়ায় এটি ক্রমেই স্পষ্ট যে সুনাকের রেসকেউ অপারেশন একটি টেকসই রিকভারি প্ল্যানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে।
সর্বসম্মত মতামত হলো, যুক্তরাজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২১ সালে সংকুচিত হবে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) প্রাক্কলন করে যে কভিড-১৯ সংকটের আগের পূর্বাভাসের চেয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ সংকুচিত হবে। একইভাবে বেকারত্বের লিগ্যাসি মহামারীপূর্ব স্বাভাবিক অবস্থার অন্তত দ্বিগুণ হবে।
এ ধরনের নিষ্প্রভ পূর্বাভাসগুলো সক্রিয় আর্থিক নীতির পুনরায় বহালে আন্তর্জাতিক আহ্বানকে ত্বরান্বিত করেছে। বিশেষ করে ধনী দেশের সরকারগুলোকে বিপুল সরকারি বিনিয়োগ কর্মসূচিগুলো শুরুর আহ্বান জানিয়েছে আইএমএফ। সর্বসাম্প্রতিক ফিসক্যাল মনিটরে সংস্থাটি বলেছে, জিডিপিতে ১ শতাংশ সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি জিডিপি ২ দশমিক ৭ শতাংশ, ব্যক্তি বিনিয়োগ ১০ শতাংশ, বেকারত্ব ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়াতে পারে।
কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে আইএমএফের আহ্বান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রণোদনার সুস্পষ্ট প্রয়োজন সত্ত্বেও সংস্থাটি ২০০৮-০৯ সালে বৈশ্বিক আর্থিক সংকটকালে আর্থিক ব্যয়সংকোচনের পক্ষে ছিল। অধিকাংশ অন্য অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকের মতো সংস্থাটির তখনকার সামষ্টিক অর্থনৈতিক মডেল ভুল তত্ত্বের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল যে পূর্ণ কর্মসংস্থানে পৌঁছতে বাজার অর্থনীতিগুলোর একটি স্বাভাবিক প্রবণতা রয়েছে। এটি সত্যকে (যেটি সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন মেইনার্ড কেইনস) উপেক্ষা করে যে সরকারি প্রণোদনার অনুপস্থিতিতে অর্থনীতিগুলো স্বাভাবিকভাবে দীর্ঘকালীন মন্দায় আটকে থাকবে।
ব্যাংক অব ইংল্যান্ডও তার সুর পরিবর্তন করেছে। যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিতে ব্যাংকটি আরো ১৫০ বিলিয়ন ইউরো (১৯৮ বিলিয়ন ডলার) জোগাতে যাচ্ছে, ২০২০ সালে এরই মধ্যে ২০০ বিলিয়ন ইউরোর বেশি প্রবাহিত করেছে এবং এখন নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি উপলব্ধি করে যে পুনরুদ্ধারের জন্য এটিও যথেষ্ট নয়। মূলধন ব্যয় যতই কম হোক না কেন, বাজার না দেখলে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করবেন না। এ কারণে ব্যাংক অব ইংল্যান্ড এখন আর্থিক প্রণোদনার আহ্বান জানিয়ে ফেডারেল রিজার্ভ ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে যোগ দিয়েছে।
কভিড-১৯ মহামারীর আগে মুদ্রানীতিকে মনে হয়েছিল একমাত্র নীতি হাতিয়ার। এখন গণবেকারত্ব এবং অর্থনীতিতে চাহিদার অব্যাহত পতন যদি ঠেকাতে হয়, তাহলে লকডাউনের পর অবশ্যই কর্মসংস্থান সৃষ্টিই হবে বড় প্রাধিকার।
গত গ্রীষ্মে যুক্তরাজ্যের সরকার ৮ বিলিয়ন ডলার অবকাঠামোয় ব্যয় করেছে। তবে যা প্রয়োজন, তার তুলনায় তা বড়ই অপ্রতুল। সরকার এখন পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা আড়াই বছরে সংক্ষিপ্ত করে ৪০ বিলিয়ন ডলার সংস্থান করছে এবং বড় পরিবেশগত প্রকল্প ও সামাজিক গৃহায়ণে প্রাধিকার দিচ্ছে। তাত্ক্ষণিক বহুমুখী প্রভাব রাখার মাধ্যমে রেট্রোফিটিং হোমস ও স্থানীয় সুযোগ-সুবিধাগুলো অনেক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।
ভবিষ্যৎ শ্রমবাজার সামনে রেখে কাজ ও দক্ষতা পুনর্বণ্টনের দীর্ঘমেয়াদি কাজটির জন্য আঞ্চলিক, স্থানীয় চাকরি এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলো অত্যাবশ্যক। যুক্তরাজ্যের ১৯৯৮ সালের নিউ ডিল ফর ইয়াং পিপল এবং ২০০৯ সালের ফিউচার জব ফান্ড হলো এমন ধরনের কিছু কর্মসূচি, যেগুলোয় কেবল প্রশিক্ষণ ও কাজের অভিজ্ঞতা নয়, জব সার্চে সহযোগিতা এবং স্থানীয় ভিত্তিতে লোক নিযুক্তির ওপর নিয়োগকর্তাদের প্রণোদনা দেয়ার বিষয়টি অবশ্যই যুক্ত করতে হবে।
আমরা হিসাব করে দেখেছি যে ২৫ বছরের নিচে এক মিলিয়ন তরুণ ব্রিটেনবাসী কোনো কাজেও নেই, আবার প্রশিক্ষণ বা শিক্ষায়ও যুক্ত নন তারা। তবে সরকারের কিকস্টার্ট জব-ক্রিয়েশন স্কিমে (অনেকটা দেরিতে যা চলতি মাসে শুরু হয়েছিল) কেবল ছয় মাসের জন্য তরুণ জনগোষ্ঠীকে জব প্লেসমেন্ট অফার করা হয়েছে।
সরকার আশা করে যে কিকস্টার্ট তিন লাখ তরুণ জনগোষ্ঠীর প্লেসমেন্ট নিশ্চিত করবে, তবে ২০২০ সাল নাগাদ সম্ভবত আনুমানিক এক লাখ লোক এ স্কিমে নিবন্ধিত হবে। মন্ত্রীরা অনুমান করেন যে যুক্তরাজ্যের নিয়োগকর্তাদের মাত্র ৫ শতাংশই তরুণ জনগোষ্ঠীকে ধারণ করতে পারবে, তবে রিটেইল ও লজিস্টিকস সেক্টরের বাইরে কয়েক হাজার প্রতিষ্ঠান প্রায় নিশ্চিতভাবে সামনের মাসগুলোয় নিজেদের ব্যবসায় উন্নতির আশা না করে কর্মসংস্থানের অফার করবে না।
আমরা যদি অন্য ৯ লাখ বা ২৫-এর নিচের জনগোষ্ঠীকে সংকটে সাহায্য করতে চাই এবং আগামী এক বছরজুড়ে প্রয়োজন হওয়া আনুমানিক ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন তরুণ জনগোষ্ঠীর প্লেসমেন্ট সৃষ্টি করতে চাই, তাহলে নিয়োগকর্তা হিসেবে সরকারি খাতকেই প্রধান ভরসাস্থল হিসেবে আবির্ভূত হতে হবে। কাজেই বেড়ে চলা বেকারত্বে পরোক্ষভাবে মোকাবেলার চেয়ে কার্ল মার্ক্স কথিত ‘রিজার্ভ আর্মি অব আনেমপ্লয়েড’ প্রতিস্থাপনের উদ্দেশ্যে আর্থিক নীতিতে জোর দিতে হবে—ব্যবসা চক্র সম্প্রসারণ বা সংকোচনে যা রাষ্ট্র সমর্থিত বিপুল চাকরি ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করবে।
সর্বোপরি যুক্তরাজ্যের নীতিনির্ধারকদের দিক থেকে যা প্রয়োজন তা হলো, কেইনস ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাংকলিন ডি. রুজভেল্টের স্পিরিটের সঙ্গে সংগতি রেখে একটি হালনাগাদকৃত পূর্ণ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি। এজন্য আবশ্যিক শর্ত হলো মুদ্রা ও আর্থিক নীতির সমন্বয়। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের তার মূল্যস্ফীতিবিরোধী ম্যান্ডেট ধরে রাখা উচিত, তবে আবশ্যিক আর্থিক প্রণোদনা কাট অফের জন্য নীতিনির্ধারকদের এটিকে ব্যবহার করা উচিত নয়।
অর্থনীতি চাঙ্গা করতে বাড়তি যা প্রয়োজন তা করতে তারা প্রস্তুত রয়েছে—এ অবস্থান ব্যক্ত করে চলতি মাসের প্রথম দিকে বিওই সাবেক ইসিবি প্রেসিডেন্ট মারিও দ্রাঘির ২০১২ সালে ইউরো রক্ষার বিখ্যাত উক্তিরই প্রতিধ্বনি করেছে। এ ধরনের আগামদর্শী নির্দেশনার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্ব উভয়ই মোকাবেলায় সরকারের বিওইকে দ্বৈত ম্যান্ডেট দিতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় ব্যাংকটিকে বলতে হবে যে বেকারত্ব হার প্রাক-সংকট পর্যায়ের ৪ শতাংশে নেমে না আসা পর্যন্ত মুদ্রানীতি কঠোর করবে না।
ফাইজারের টিকার সফল বিলিবণ্টন নিশ্চিত (এবং সম্ভবত অন্যগুলোরও) আগামীর বসন্তে হয়তো স্বাভাবিক জীবন ফিরে আসবে। তবে স্বাস্থ্য সংকট দূর হলেও বেকারত্ব সংকট বজায় থাকবে। একটি প্রজন্মকে হারাতে না চাইলে, প্রবৃদ্ধি হারাতে না চাইলে যুক্তরাজ্যের নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই এখন থেকে একটি দশক হারানো অবশ্যই এড়াতে হবে বৈকি।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
গর্ডন ব্রাউন: যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, জাতিসংঘের বৈশ্বিক শিক্ষাবিষয়ক বিশেষ দূত; প্রধান, ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অন ফিন্যান্সিং গ্লোবাল এডুকেশন অপরচুনিটি
রবার্ট স্কিডেলস্কি: ব্রিটিশ হাউজ অব লর্ডসের সদস্য, ওয়ারউইক ইউনিভার্সিটির পলিটিক্যাল ইকোনমির প্রফেসর ইমেরিটাস
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির










