নভেল করোনাভাইরাস মহামারী মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় (এমআইসি) বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলেছে। কেবল যুক্তরাষ্ট্র বাদে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংখ্যায় কভিড-১৯ সংক্রমিত ১০টি দেশই এমআইসিভুক্ত। একই কথা সত্য দৈনিক নতুন আক্রান্ত এবং প্রতি মিলিয়ন জনসংখ্যায় কভিড-১৯-এ মৃত্যুর ক্ষেত্রেও।
মধ্যম আয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রাক্কলনও সমানভাবে বিবর্ণ। ২০২০ সালজুড়ে উল্লিখিত দেশগুলোর পরিবারগুলোর আয় কমবে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, বৈশ্বিকভাবে আরো ১০০ মিলিয়ন লোক চলতি অধোগতির দৃশ্যপটে হতদারিদ্র্যে নিমজ্জিত হয়ে যাবে।
লাতিন আমেরিকার অভিজ্ঞতা আরো ভয়াবহ। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মধ্যে আলোচ্য অঞ্চলে কেবল ৮ দশমিক ৪ শতাংশ লোক বাস করে, কিন্তু এখন পর্যন্ত সেখানে কভিড-১৯-এ মৃত্যুর সংখ্যা মোট মৃত্যুর ৩০ শতাংশ। আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী চলতি বছর লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে জিডিপি ৯ দশমিক ৪ শতাংশে সংকুচিত হবে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক আশঙ্কা করছে যে ওই অঞ্চলে দারিদ্র্য ১০ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়তে পারে।
এসব বাধাবিপত্তি এমন এক সময়ে আবির্ভূত হয়েছে, যখন মধ্যম আয়ের দেশগুলোয় সামাজিক অস্থিরতার ঢেউ ছড়িয়ে পড়ছে। পেরু বা ঘানার মতো কিছু ব্যতিক্রম বাদে বিশেষত লাতিন আমেরিকার অধিকাংশ দেশে জনঅসন্তোষের প্রধান চালক হলো নিষ্প্রভ প্রবৃদ্ধি, ঊর্ধ্বমুখী গতিশীলতার অভাব এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণের দাবি। এমনকি চিলির মতো ভালো নৈপুণ্যের অর্থনীতিগুলোয়ও অনেক নাগরিকই মনে করেন যে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি এবং আয় বণ্টনের শীর্ষ থাকার অধিকাংশ সুফল (গেইন) কুক্ষিগত করেছে।
বিষয়গুলো অধিকতর অবনতি ঘটিয়ে কভিড-১৯ সংকটের আগে থেকেই এমআইসিগুলোর রফতানি চাঙ্গাকারী দীর্ঘ পণ্য সুপারসাইকেলের অবসান সেখানকার উন্নীত হওয়া জীবনমানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছিল। তরুণ জনগোষ্ঠী ভয় পেয়েছিল যে এক প্রজন্ম আগে তাদের পিতামাতারা যেখান থেকে জীবন শুরু করেছিল, সেখানেই তাদের পর্যবসিত হবে কিনা।
যখন মহামারী ছড়িয়ে পড়ল, এমআইসিগুলোর সরকার লকডাউন ও অর্থনৈতিক প্রণোদনার উদ্যোগ নিল। তবে উচ্চ নগর জনসংখ্যার ঘনত্ব, মানবস্পর্শ এড়ানো কঠিন এমন বড় অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ব্যাপকতর উপস্থিতি এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ওইসব পদক্ষেপের কার্যকারিতা খুব একটা মেলেনি।
উদাহরণস্বরূপ, কলম্বিয়ায় চলতি বছর জিডিপি আনুমানিক ৭ শতাংশ সংকুচিত হবে, যা হবে সবচেয়ে বড় রেকর্ড পতন। মহামারীসৃষ্ট চাকরি ও আয় হারানো এরই মধ্যে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা জনগোষ্ঠীর অংশ বৃদ্ধি করেছে। ২০১৯ সালের শেষে ২৭ শতাংশ থেকে যা মে মাসে আনুমানিক ৩৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, সরকারের জরুরি নগদ হস্তান্তর কর্মসূচি প্রবর্তন সত্ত্বেও। অধিকন্তু, অসমতা বেড়েছে। শীর্ষ এক-পঞ্চমাংশ জনগোষ্ঠীর ৩৩ শতাংশ আয় হ্রাসের বিপরীতে সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় হ্রাস পেয়েছে ৫০ শতাংশেরও অধিক।
লাতিন আমেরিকার অন্য দেশগুলোর গল্পও একই। সব মিলিয়ে এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে গত ডিসেম্বরে রাস্তায় নামা প্রতিবাদকারীদের অর্থনৈতিক নিম্নমুখিতার (ইকোনমিক রিভার্সাল) আশঙ্কা এরই মধ্যে ঘটছে। সামাজিক অস্থিরতা, যা বেশ আগে থেকেই জেঁকে বসেছে, সেটি অদূরভবিষ্যতে প্রতিহিংসার রূপ পরিগ্রহ করতে পারে।
এমআইসিভুক্ত দেশগুলোর সরকার ‘হোয়াটএভার ইন টেকস’ ব্যবস্থা গ্রহণ করে সামলাতে পারবে না। বরং তার পরিবর্তে তাদের যতটা সামর্থ্যে কুলোবে, সেটি করতে হবে এবং তারা তা করছেও। কিন্তু ‘যতটা পারে করবে’—এ নীতি তাদের জন্য যথেষ্ট হবে না এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও অন্তত তিন কারণে নিজেদের প্রতিশ্রুতি এড়াতে শর্ট সাইটেড হবে।
প্রথমত, বিশ্বের মোট জনসংখ্যায় এমআইসিগুলোর জনগোষ্ঠী ৭৫ শতাংশ, যার অর্থ হলো তাদের সম্পৃক্ততা এবং পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোনো কার্যকর বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনিরাপত্তা অবকাঠামোর উন্নয়ন সম্ভব হবে না। অতএব, এটি জরুরি যে যখনই লভ্য হবে, শিগগিরই এসব দেশে কার্যকর কভিড-১৯ টিকার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে হবে।
তবে যেমনটা বোঝা যাচ্ছে যে একটি টিকা বা টিকাগুলো প্রথমে উন্নত দেশগুলোয় যাবে, যারা সেগুলোর উন্নয়নে বিনিয়োগ করছে। অধিকন্তু, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যা কোয়ালিয়শন ফর এপিডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস ইনোভেশনস, গাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের সঙ্গে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন গ্লোবাল অ্যাকসেস (কোভ্যাক্স) ইনিশিয়েটিভের নেতৃত্ব দিচ্ছে—বোধগম্য কারণেই প্রধানত দরিদ্র দেশগুলোর ওপর দৃষ্টি দিচ্ছে। বর্তমানে কোনো নিশ্চয়তা নেই যে এমআইসিগুলোর প্রয়োজন অনুসারে কোভ্যাক্স টিকা জোগান দিতে বৈশ্বিক সংস্থাটি সমর্থ হবে।
‘মিসিং মিডল’ দেশগুলো ল্যাবরেটরি ও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগে অসমর্থ। তাদের পর্যাপ্ত রোগ ও মৃত্যুহার নির্ণয়ের সার্ভেইল্যান্সে ঘাটতি আছে এবং তারা খুব কমই বৈশ্বিক সহায়তা পায়। অন্য সংক্রামক রোগের বিপরীতে এমআইসিগুলোর টিকা হার—পাল প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনের চেয়ে এরই মধ্যে কম—সংকটকালে কমেছে, এটি যথাযথভাবে আমলে না নেয়া হলে আরো কিছু বৈশ্বিক প্রাদুর্ভাব ঘটাতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উদীয়মান বাজারগুলোর নৈপুণ্যের ওপর নির্ভর করে, যা বিশ্ব অর্থনীতির ৬০ শতাংশ। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকট থেকে পুনরুদ্ধার চালিত হয়েছিল চীন দ্বারা এবং পণ্যদামে ও বাণিজ্য পরিমাণের ওপর এমআইসিগুলোর প্রভাবের মাধ্যমে।
এ সময় এটি না-ও ঘটতে পারে, কাজেই এমআইসিগুলোর মহামারীচালিত মন্দা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে প্রবৃদ্ধির অন্য উৎসগুলোর ওপর নির্ভর করা প্রয়োজন হবে। দুর্ভাগ্যক্রমে, সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও ব্যক্তি বিনিয়োগ ঝুঁকিমুক্ত করতে এমআইসিভুক্ত দেশগুলোর সরকারের সম্পদের ঘাটতি বিদ্যমান, সুতরাং তাদের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন পাওয়াটা অপরিহার্য।
যতটা জানা যায় যে এমআইসিগুলোর বৈশ্বিক পুঁজিবাজারগুলোয় পর্যাপ্ত অভিগম্যতা রয়েছে, তবে কোনো নোটিস ছাড়াই তা বদলে যেতে পারে। অবনতিশীল আর্থিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এরই মধ্যে দেশগুলোর ঋণমানের অধোগতি ঘটিয়েছে, যা আরো খারাপ হতে পারে। যদি বাজারগুলো বন্ধ বা অত্যধিক ব্যয়বহুল হয়, তাহলে এমআইসিগুলোকে আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর মতো আনুষ্ঠানিক ঋণদাতাদের ধারস্থ হতে হবে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠানের উল্লিখিত দেশগুলোকে ঋণদানের সীমিত সক্ষমতা-সামর্থ্য রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে মূলধন পুনর্ভরণের (ক্যাপিটাল রেপ্লেনিশমেন্ট) প্রয়োজনও হবে।
অন্য অর্থায়ন প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে আইএমএফ স্পেশাল ড্রইং রাইটস (দ্য ফান্ডস রিজার্ভ অ্যাসেট) কিংবা উদীয়মান বাজারগুলোয় তারল্য প্রবাহিত করতে উন্নত দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক স্পেশাল-পারপাস ভেহিকল প্রবর্তন। টিকা ঘাটতি মেটাতে, বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনিরাপত্তার মতো জলকল্যাণ নিশ্চিত এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সুরক্ষাবেষ্টনী বাড়াতেও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ছাড়মূলক অর্থায়ন জরুরি।
শেষত, বিশ্ব সবুজ প্রবৃদ্ধির পথে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আগামী তিন দশকের বেশি সময় ধরে এমআইসিগুলোয় বিপুল অবকাঠামো বিনিয়োগ হবে এবং তারা যে পছন্দ তৈরি করবে সেগুলোয় আসলে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্ব আদৌ শূন্য নিট গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে কিনা, তা নির্ধারণ করবে।
এমআইসিগুলোয় একটি প্রলম্বিত সংকট, যেখানে উন্নত বিশ্বের চেয়ে দ্রুতগতিতে কার্বন নির্গমন বাড়ছে—বড়জোর এসব প্রচেষ্টা কিছুটা বিলম্বিত করবে এবং ভবিষ্যতের জন্য অধিক বিপর্যয়কর পরিণাম বয়ে আনবে। মহামারী এবং এর অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবেলায় দেশগুলোকে সাহায্য করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় প্রকারান্তরে নিজ স্বার্থ রক্ষায় আসলে কাজ করবে।
[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
মাসুদ আহমেদ: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্টের প্রেসিডেন্ট
মাওরিসিউ কার্দিনাস: কলম্বিয়ার সাবেক অর্থমন্ত্রী, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির










