জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেশগুলোর অগ্রগতি যাচাইয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বিশ্বের ১৬৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম। আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। ভারত, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে। এসডিজির ১৭টি সূচকের মধ্যে ১২টির বাস্তবায়নই দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে চারটি সূচকের মূল্যায়নের জন্য কোনো উপাত্ত পাওয়া না যাওয়ায় অগ্রগতি মূল্যায়ন তালিকা থেকে সেগুলো বাদ দেয়া হয়েছে। দুর্বল ১২টি সূচকের মধ্যে পাঁচটি পরিমিত মাত্রায় দুর্বল কিন্তু অগ্রসরমাণ। ছয়টির লক্ষ্যমাত্রা দুর্বল ও স্থবির এবং একটির বাস্তবায়ন অবস্থা খুবই দুর্বল ও স্থবির। সূচকভিত্তিক বাংলাদেশের অগ্রগতি মূল্যায়নে প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে দারিদ্র্য নিরসনে বাংলাদেশ সঠিক পথেই রয়েছে। তবে অতিদারিদ্র্য নিরসনে সফল হলেও দারিদ্র্য নিরসনে সফলতার হার কম। ক্ষুধামুক্তির সূচকগুলোয় দেখা যায়, তিনটি সূচকে বাংলাদেশ ভালো করলেও দুটিতে স্থিতাবস্থায় ও দুটিতে চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণের সূচকগুলোর মধ্যে দুটি সূচকে ভালো করেছে কিন্তু ১১টি সূচকেই চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান রয়েছে। গুণগত শিক্ষায় স্থিতাবস্থা রয়েছে। লৈঙ্গিক সমতা অর্জনে এখনো চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এসডিজির লক্ষ্য এক ও দুই অনুযায়ী সর্বত্র সব ধরনের দারিদ্র্য নির্মূল করা এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, উন্নত পুষ্টি অর্জন ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা চালু করার কথা বলা হয়েছে। সারা বিশ্বের জন্যই এসডিজি বাস্তবায়নে তা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ; বিশেষ করে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনা। যদিও অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বিশ্বে এখন অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা কম। তবে অতিদরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমার যে গতি, তা এখনো মন্থর। সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এ চ্যালেঞ্জ একা মোকাবেলা করা অসম্ভব। ফলে এই কঠিন চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন এক্ষেত্রে অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য দূর করতে হলে সারা বিশ্বের সব দেশকেই এ খাতে আরো বিনিয়োগ করতে হবে এবং একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
এসডিজির ৮ নম্বর অভীষ্ট হলো স্থিতিশীল, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন এবং সবার জন্য পূর্ণাঙ্গ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান ও শোভন কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা। এই অভীষ্টের আওতায় অন্যতম লক্ষ্যমাত্রা হলো উচ্চ মূল্যসংযোজনী ও শ্রমঘন খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পণ্যে বৈচিত্র্যকরণ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার উচ্চতর মান অর্জন। বেসরকারি খাতের সামনে এই অভীষ্ট অর্জনের দিকে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। টেকসই উৎপাদন ও ভোগ, শ্রম অধিকার সংরক্ষণ, সুরক্ষিত কর্মপরিবেশ, আর্থিক সেবার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাসহ আরো কিছু লক্ষ্যমাত্রা এই অভীষ্টের মধ্যে রয়েছে, যেগুলোর মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে। এগুলোর জন্য বিশেষত দরকার ব্যবসার খরচ কমানো এবং মানবসম্পদের দক্ষতা উন্নয়ন; যা সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে অংশীদারিত্ব ছাড়া সম্ভব নয়। এসডিজি অর্জনে বেসরকারি খাতকে লজিস্টিক সহায়তা দিতে হবে।
বাংলাদেশের যেকোনো ভালো প্রস্তাব, ভালো কথা কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দুর্বলতা রয়েছে। প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি সুশাসনও দরকার। এসডিজির পরিকল্পনাগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সেটা একটা বড় ইস্যু। এজন্য বিশ্ব অংশীদারিত্ব প্রয়োজন। সামর্থ্য ও সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দারিদ্র্য বিমোচন, লিঙ্গসমতা চেতনা, অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা, বেসরকারি খাতের উদ্যোগ ও নতুনত্ব, মানব উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিনিয়োগ, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং প্রাকৃতিক ও রাজনৈতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। সত্যি মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেতে অনেক বেশি বিনিয়োগ, শক্ত-সমর্থ উন্নয়ন সহায়তা, পুঙ্খানুপুঙ্খ ও কার্যকর সংস্কারের উদ্যোগ প্রয়োজন এবং উন্নত ব্যবসার পরিবেশ, আর্থিক শৃঙ্খলা স্থাপন ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ সমুন্নত রাখতে হবে। বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য একটি সক্রিয় ও ক্রমাগত স্থিতিশীল পরিবেশ, সরকারি খাতের সুশাসন এবং সরকার ও বিচার বিভাগের দক্ষতা ও সততা শক্তিশালীকরণ, একটি দ্রুত বর্ধনশীল ও ক্রমবর্ধমান শহুরে শ্রমশক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার ও বিশ্বের দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে ঝুঁকি মোকাবেলার কার্যকরী ব্যবস্থাপনা। সর্বোপরি এসডিজি অর্জনে সফল হতে হলে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে জবাবদিহি এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
এমডিজি অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্ববাসীর প্রশংসা অর্জন করেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে এসডিজি অর্জন নিয়ে মানুষের আশা বেড়েছে। লক্ষ্য অর্জনের পথে কিছু ক্ষেত্রে ভালো করলেও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। এসডিজি অর্জনে মানের প্রশ্নে অপেক্ষাকৃত বেশি জোর দেয়া হয়েছে। কভিডের কারণে লক্ষ্য অর্জন আরো কঠিন হয়ে পড়বে, বিশেষত দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূরীকরণ। আশার কথা হলো, বাংলাদেশ সরকার বর্তমান পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে এসডিজি বাস্তবায়নকে মাথায় রেখে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এসডিজি বাস্তবায়ন তদারকির জন্য আলাদা বিভাগ খোলা হয়েছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন সংস্থা ইউএনডিপি এসডিজি বাস্তবায়নে সরকার ও বেসরকারি খাতকে সহায়তা করছে। সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ অংশগ্রহণ রয়েছে এমন কয়েকটি প্রকল্পে ইউএনডিপি সম্পৃক্ত। গবেষণা সংস্থা সিপিডির উদ্যোগে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্লাটফর্ম গড়ে উঠেছে। এ ধরনের উদ্যোগে বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। সরকার এসডিজির সুষম বাস্তবায়নে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে ও নিচ্ছে। এখন প্রয়োজন হলো বিভিন্ন বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ যথাযথভাবে বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিচ্ছে কিনা, তা ভালোভাবে মনিটরিং করা। যেখানে ঘাটতি দেখা যায়, সেখানে কী কারণে ঘাটতি হচ্ছে, খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেয়া।










