ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শততম বর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে স্মৃতিচারণা (পর্ব দুই)

শামীম আজাদ: আজ চা নিয়ে কথা বললে কেমন হয়? সেলিম তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথায় কোথায় চা খেয়েছ?

সেলিম জাহান: আজকাল তো কফির বেশ প্রচলন হয়েছে, কিন্তু আমাদের সময় কফি বেশ মহার্ঘ বস্তু ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেখানে যেখানে আমরা চা খেয়েছি, তখন সেখানে কফির খুব প্রচলন ছিল না। তবে চায়ের মধ্যে দু-তিন প্রকার ছিল। একটা হচ্ছে দুধ চা, যাকে মালাই চা বলা হতো। এছাড়া পাতি চা ও লেবু চা। শামীম, আমার মনে হয় হলের খাবার নিয়ে আমাদের অনেক স্মৃতি রয়েছে। অবশ্য সুখস্মৃতির পাশাপাশি দুঃখের স্মৃতিও আছে। হলে কী ধরনের খাবার হতো, এটা নিয়ে বোধহয় সবারই উৎসাহ থাকবে।

শামীম আজাদ: আমি তো রোকেয়া হলে ছিলাম। আমাদের সকালটা শুরু হতো ঘণ্টা বাজার শব্দ দিয়ে। সকালের নাশতা আনার ঘণ্টা। নাশতা বলতে পাউরুটির মধ্যে হালকা করে মাখন লাগানো। দুপুর ও রাতে বিশাল বিশাল গামলার মধ্যে ডাল থাকত। এ ডাল আর ভাত সবাই যত খুশি তত খেতে পারত। এছাড়া কোনো দিন মাছ, সবজি, মাংস কিংবা ডিম থাকত; ডাইনিং হলের একটি কোনায় ছোট ছোট বাটিতে রাখা হতো। অনেক দিন এমন হয়েছে যে দুপুরের খাবারের সময় অনুযায়ী যেতে পারিনি। তখন যে নারীরা আমাদের জন্য রান্না করতেন, আমরা তাদের দাদি ডাকতাম। তারা রান্না করতেন মাটির চুলায়, তাদের কাছে গিয়ে বলতাম আমরা তো একটুর জন্য পেলাম না, তখন তারা আমাদের জন্য ছোট বাটিতে একটা ডিম ফেটে একটু তেল দিয়ে চুলার নিচে আগুনের মধ্যে দিয়ে দিত। কিছুক্ষণের মধ্যে ডিমটা ফুলে উঠত। ওই খাবারটাই যে কী মহার্ঘ ছিল! আমরা ওই ডিমটা ডাল দিয়ে খেতাম। সবচেয়ে মজার হচ্ছে, মাসে একটা ফিস্ট হতো। এক টুকরো মুরগির রোস্ট আর পোলাও। ঘিয়ের গন্ধ ভাসত তাতে। সেজেগুজে সে কী ঘোরাঘুরি আমাদের ডাইনিং রুমে! সেলিম, ছেলেদের হলে তোমাদের কেমন হতো?

সেলিম জাহান: ভীষণ আনুষ্ঠানিক ছিল। সলিমুল্লাহ হলের লম্বা টেবিলে সেদিন টেবিল ক্লথ বিছানো হতো। উপাচার্য আসতেন। আমাদের হলের তিনটা ব্যাপার বলব, শামীম তুমি যে ডালের কথা বললে, যেটা এখন হলের ছাত্ররা খাচ্ছেন, সেটা প্রথম রান্না করা হয়েছিল ১৯২১ সালে, প্রথম যেদিন হল খুলেছিল। প্রতিদিনই ডাল উদ্বৃত্ত থাকে, তা পরের দিনের ডালে মিশিয়ে দেয়া হয়। দ্বিতীয় হচ্ছে, হল ছাড়ার পর আমি বহুদিন দুটো জিনিস খেতে পারিনি। একটা হচ্ছে আলু। কারণ প্রতিদিন চারটে করে আলু খেতে হতো। পাঁচ-ছয় বছরে আমি হয়তো কয়েক মণ আলু খেয়েছি। তৃতীয়, করলা ও আলু দিয়ে এমন একটি রান্না করা হতো যে তার গন্ধে ভূত ভেগে যাওয়ার অবস্থা হতো। মোটামুটিভাবে আমার মনে হয়, হয়তো মেয়েদের হলের খাবার একটু ভালো ছিল। কিন্তু সলিমুল্লাহ হলের খাবার ভালো ছিল, আমি এটা বলব না।

শামীম আজাদ: রোকেয়া হলে সিঁড়ির কাছে বাঁ দিকে একটা ক্যান্টিন ছিল। যে বৃদ্ধ ভদ্রলোক ওখানে বসতেন, তাকে আমরা নানা ডাকতাম। আমরা তাকে নানা রকম কথা বলে মন ভেজানোর চেষ্টা করতাম, কিন্তু শিঙ্গাড়ার আকার ছোট থেকে কখনো বড় হয়নি। কড়া তেলে ভাজা যে খাবারগুলো আমাদের জন্য রাখা হতো, ওগুলো অনেক সময় খাওয়াটা আমাদের জন্য কষ্টকর হতো। ফিরে এসে খাবার না পেলে ওটাই আমাদের খেতে হতো। তবে মাঝে মাঝে কিন্তু আমরা শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে খেয়েছি। 

সেলিম জাহান: ছেলেদের একটা স্বাধীনতা ছিল। নিজেদের হলের খাবার খারাপ হলে আমরা কিন্তু অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের খাবারঘরে জড়ো হতাম।

শামীম আজাদ: আমরা কি করতাম জানো? আমরা গোপনে রান্না করতাম। 

সেলিম জাহান: প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন নতুন দুটো হল হয়েছে—একটি তিতুমীর হল, অন্যটি সোহরাওয়ার্দী হল। পলাশীর মোড়টা পেরিয়ে হলগুলো। কিন্তু কিছুদিন পরে আমরা ওখান থেকে বিতাড়িত হয়েছি বহিরাগত বলে। তার পরে আমরা মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে খেয়েছি। ওখানে খাবার ভালো ছিল। কিন্তু কিছুদিন পরে আমরা বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত হয়ে এখান থেকেও বিতাড়িত হয়েছি। দুটো জায়গায় কিন্তু ছেলেরা খুব খেতে যেত। এখানে মেয়েরা খেয়েছে কিনা, আমি  জানি না। একটি হচ্ছে আলিয়া মাদ্রাসার কাছাকাছি জায়গায় পপুলার রেস্টুরেন্ট ও হাসিনা রেস্টুরেন্ট। কারণ ওখানকার রান্না অনেকটা ঘরোয়া রান্নার মতো ছিল। শামীম তুমি হলে রান্নার কথা বলছিলে...

শামীম আজাদ: হলে ছোট একটা ইলেকট্রিক স্টোভ ছিল আমাদের। আমরা ওটা লুকিয়ে রাখতাম। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল যে খাবার না-হয় রান্না হলো, কিন্তু গন্ধ তো আর আটকে রাখা যায় না। এছাড়া হলের মধ্যে রেডিও বাজানো বা ক্যাসেট প্লেয়ারে গান বাজানো নিষেধ ছিল। আর এ দুটি আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসত। দরজা-জানলা বন্ধ করে আমরা গান শুনতাম। আর রান্না করলে তেমনিভাবে সব বন্ধ করে রাখতাম। শব্দ আর সুগন্ধ আটকাতে আমরা কখনো দরজার ফাঁকে বালিশও চাপা দিয়েছি। আমরা কিন্তু একা কখনো খেতে পারিনি। যেই না আমরা রান্না করতাম, আশেপাশে মোটামুটি খবর হয়ে যেত, দোতলা-তিনতলা থেকে অনেকেই এসে ভিড় করত।

সেলিম জাহান: ছেলেদের হলেও অনেকেই কিন্তু রান্না করে খেত। এটার খুব সুন্দর বর্ণনা আছে কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের লেখায়। ১৯৭১ সালে সেই খাবার রান্না করা অবস্থায় তাদেরকে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তুলে নিয়ে গেল, সেসব কথা কিন্তু সেখানে বলা আছে। যা-ই হোক, শামীম এবার বোধহয় আমাদের হলের বৃত্ত থেকে বের হতেই হয়। 

শামীম আজাদ: তার আগে আরেকটা জিনিস বলতেই হয়, আমাদের হলের নিচের তলায় ছিলেন হাউজ টিউটর মেহেরুনেচ্ছা আপা। আগে বলেছি, আপা অসাধারণ সুন্দরী ছিলেন। কিন্তু তার ছিল বিড়ালের মতো চলন। শ্রবণশক্তি ছিল অসাধারণ। তিনি সব শব্দ শুনতে পেতেন, ঘ্রাণও পেতেন। কাজেই কখন যে আপা মৃদু পায়ে উপরে উঠে আসতেন, আমরা বলতেই পারতাম না। সেলিম, এবার তুমি শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনের কথা বলো।

সেলিম জাহান: আমার মনে হয় শরীফ মিয়ার সব গল্প বলতে হলে দুই-তিন পর্ব পার হয়ে যাবে। সেটা এ কারণে যে তার ক্যান্টিন তো শুধু খাবারের জায়গা ছিল না, শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন ছিল একটা মহাতীর্থ। শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে যারা জড়িত, সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যারা তত্পর, তারা সবাই আসতেন। তারা যে সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তা নয়। যেমন শেখ লুত্ফর রহমান আসতেন এখানে। আমরা জাহিদুর রহিম, অজিত রায়কে দেখেছি সেখানে। তারা প্রত্যেকেই এখানে আসতেন। 

শামীম আজাদ: আবুল হাসান আসতেন, নির্মলেন্দু গুণও আসতেন। 

সেলিম জাহান: শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে দুপুরে একদম সাদা একটা পোলাও হতো। পুরো প্লেট নিলে ১ টাকা, হাফ প্লেট নিলে আট আনা। 

শামীম আজাদ: মাংসের কথা মনে আছে। এত ছোট টুকরো থাকত যে অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে দেখতে হতো। দুটো কি এক টুকরো মাংস পড়ত প্লেটে।

সেলিম জাহান: সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিল শরীফ মিয়ার চা। বিরাট একটা কেটলিতে চা জ্বাল হতো। শরীফ মিয়া ছিলেন একজন হাড় জিরজিরে মানুষ। তার ক্যান্টিনের ডান হাত ছিলেন রমজান। কোনো অবস্থাতেই তার মুখের হাসি ফুরাত না। 

শামীম আজাদ: এবার টিএসসির খাবার প্রসঙ্গে আসি। যুদ্ধের আগে সম্ভবত টিএসসির খাবার ১২ আনা করে খেতাম এবং যুদ্ধের পরে ১ টাকা ২৫ পয়সা করে। আমাদের কাছে টিএসসির খাবারটা ভালো লাগত। কারণ এখানে যেন একটা বিদেশ বিদেশ ভাব; ট্রেতে করে খাবার নিয়ে আসতে হতো, তার আগে কুপন নিতে হতো। প্লেটগুলো ছিল মোটা প্লাস্টিকের। একটা প্লেটে আলু ও মাংস, অন্য প্লেটে ভাত দেয়া হতো। সঙ্গে একটুখানি সালাদও দিত।

সেলিম জাহান: শামীম তোমার ট্রের রঙ মনে আছে? 

শামীম আজাদ: গাঢ় খয়েরি রঙের...

সেলিম জাহান: আরেকটা ছিল হালকা সবুজ রঙের। 

শামীম আজাদ: টিএসসিতে আমরা লাইন দিয়ে খাবার নিতাম। নারী-পুরুষ সবাই এক লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার নিতাম। কোনো ধরনের বিভেদ ছিল না। আমি কিন্তু টিএসসিতেই প্রক্ষালন কক্ষ শব্দটির সঙ্গে প্রথম পরিচিত হই।  

সেলিম জাহান: আমার যতদূর মনে পড়ে, প্রয়াত অধ্যাপক আনিসুজ্জামান শব্দটার ব্যবহার করেছিলেন। তোমার মনে আছে তখন টিএসসির পরিচালক ছিলেন আমানুজ্জামান খান। আমরা তাকে জামান স্যার বলতাম। টিএসসি কিন্তু ১৯৬১ সালে স্থাপিত হয়, ফোর্ট ফাউন্ডেশনের অর্থে। ফোর্ট ফাউন্ডেশনের অর্থ হলেও স্থপতি কিন্তু কোনো আমেরিকান ছিলেন না। গ্রিক স্থপতি টিএসসির নকশা করেন এবং তার নাম কনস্টান্টিনোস ডক্সিয়াডাস। 

শামীম আজাদ: হ্যাঁঁ, টিএসসিতে একটা সমাধি স্তম্ভ আপনারা দেখেছেন। চূড়াটা মন্দিরের মতো, কিন্তু তার সামনে একটা গেট রয়েছে। এটা আসলে ডিমেট্রিয়াস নামে এক গ্রিক ব্যবসায়ীর পরিবারের সাত সদস্যের সমাধিক্ষেত্র। সেখানে কিন্তু গ্রিক ভাষায় কিছু কথা লেখা আছে।

সেলিম জাহান: এই লেখাবিষয়ক একটা গল্প আছে। ১৯৯০ সালের কথা। আমি তখন বিশ্বব্যাংকের জন্য একটা কাজ করছি। বিশ্বব্যাংকের হেলেন আবািজ্জ ওয়াশিংটন থেকে এসেছেন। তিনি গ্রিক সিপ্রিয়ট আর্মেনিয়ান বংশোদ্ভূত। তিনি আমাকে বললেন, আমি শুনেছি তোমাদের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে নাকি একটি গ্রিক মন্দির রয়েছে। আমি তাকে বললাম, ঠিক মন্দির আছে বলে তো আমি জানি না, তবে সমাধিক্ষেত্রের মতো একটি স্মারক ভবন ধরনের স্থাপনা রয়েছে। তিনি এটা দেখতে এলেন এবং সামনে গ্রিক ভাষায় লেখা যে কথাগুলো রয়েছে তার অনুবাদ করে আমাকে শোনালেন। ভেতরের কথাগুলোও অনুবাদ করে বলেছিলেন। কিন্তু সব আমার মনে নেই। তবে সামনে যে কথাগুলো লেখা, তার অনুবাদ করে বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর যাকে পছন্দ করেছেন এবং ঈশ্বরের কাছে যারা চলে গেছেন তারা ভাগ্যবান।’

শামীম আজাদ: আমরা যখন গিয়েছি তখন সেখানের ইংরেজি লেখাগুলো মুছে মুছে গেছে কিন্তু গ্রিক অক্ষরগুলো এখনো আছে। ধারণা করা হয়, এ সমাধিগুলো ১৮০০ থেকে ১৮৪০-এর মাঝামাঝি সময়ে তৈরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেমন মুসলিম জাগরণের ফল, তেমনি ঢাকা যখন রাজধানী হলো, তখন ঢাকার এমন সুনাম বহির্বিশ্বে যে এখানে ফরাসি, ডাচ, আর্মেনিয়ান, সর্বশেষ ইউরোপীয় জাতির মধ্যে গ্রিকরা আমাদের এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে এসেছিল। কিন্তু তারা ফরাসি ও ইংরেজদের সঙ্গে পেরে ওঠেনি বলে ব্যবসা গুটিয়ে চলে গিয়েছিল। কিন্তু নায়ায়ণগঞ্জে তাদের টেক্সটাইলসংক্রান্ত ব্যবসাগুলো দীর্ঘদিন ছিল। সেখানে আর্মেনিয়ানরাও ছিল তখন।

সেলিম জাহান: বিপুলসংখ্যক আর্মেনিয়ান ছিল এখানে। ঢাকায় আর্মেনিটোলা নামে একটা জায়গাও রয়েছে। সেখানে কিছু গির্জাও রয়েছে।

শামীম আজাদ: এখন জানি না, টিএসসিতে আপনারা একটা সুইমিংপুল দেখেন কিনা। টিএসসির সুইমিংপুলের পাশে বসে আমরা কিন্তু অনেক আড্ডা দিয়েছি। আমি, বাবলি, মহসিন, বেলি, বাহার, হামিদ, নাজলি, শেলী। শেলী তো খুব সুন্দর গান করত যখন-তখন। মাঠটাও যা সুন্দর ছিল। টিএসসির শুধু খাবার নয়, এখানে আমরা যেতাম আড্ডা দেয়ার জন্য। মুনীর চৌধুরী স্যারের ‘চিঠি’ নাটকটা হয়েছিল এই টিএসসিতেই। মুক্তিযুদ্ধের আগে। তখন স্যার বেঁচে ছিলেন। চিঠি নাটকের দিন মনে আছে আমরা সবাই তখন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছি। দৌড়াদৌড়িটা আমরা অনেকটা অকারণেই করছি। সৈয়দ আকরাম হোসেন তখন তরুণ শিক্ষক। নীলিমা ইব্রাহিম আপাও আছেন। স্যারদের-আপাদের সঙ্গে আমরা বসছি—আমাদের কাছে ওটাই মজার। মুনীর স্যার বললেন, ‘পেছনে বসো। পেছনে বসে দর্শকদের অভিব্যক্তি দেখো, তাহলে বুঝতে পারবে যে নাটকটা কেমন হচ্ছে।’ তখন দেখেছি যে টিএসসির শিঙ্গাড়াগুলো আসত।

সেলিম জাহান: হ্যাঁ এবং ১১টা পর্যন্ত শিঙ্গাড়াগুলো থাকত, এর পরে আর পাওয়া যেত না। শামীম তোমার কি মনে আছে, টিএসসির মিলনায়তনটা পার হয়ে খাবার জায়গায় গেলে একটা ফোয়ারা দেখা যেত। ওটাও কিন্তু কনস্টান্টিনোসের তৈরি। তার পাশে টেবিল টেনিস খেলার ব্যবস্থা ছিল। 

শামীম আজাদ: টেবিল টেনিস কিন্তু বারান্দায়ও ছিল। আচ্ছা তোমার কি মনে আছে একটা জনতা ব্যাংক ছিল ওখানে?

সেলিম জাহান: হ্যাঁ, ঢুকতেই জনতা ব্যাংক এবং তার ম্যানেজার ছিলেন চিত্রনায়ক বুলবুল আহমেদ।

শামীম আজাদ: আলমগীর কবির পরিচালিত সূর্যকন্যা ছিল তার বিখ্যাত ছবি। আমরা কিন্তু সেখানে বুলবুল আহমেদকে দেখতেই যেতাম। স্টুডেন্টস অ্যাকাউন্টগুলো সব ওই জনতা ব্যাংকেই ছিল।

সেলিম জাহান: তোমার অ্যাকাউন্ট নাম্বার মনে আছে? আমারটা কিন্তু মনে আছে। আমার অ্যাকাউন্ট নম্বর ছিল ৫৬১৮। পরবর্তী সময়ে শিক্ষক হওয়ার পরও কিন্তু সেখানে আমার টাকা জমেছে।

 শামীম আজাদ: আমাদের স্কলারশিপের টাকাগুলো ওখানে যেত।

 সেলিম জাহান: টিএসসি নিয়ে অনেক গল্প আছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নানা রকম মহড়া, আড্ডা ইত্যাদি। তবে যারা অর্থনীতির ছাত্র, তাদের নিশ্চয়ই মনে থাকবে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর সেখানে অর্থনীতি সমিতির সভা হয়েছিল, সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রয়াত অধ্যাপক মাজহারুল হক। সেখানে তিনি তার বিখ্যাত বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি বয়োবৃদ্ধ আর বেশিদিন থাকবেন না। তিনি রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্ত যেথা ভয় শূন্য, উচ্চ যেথা শির’ কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলেন। 

শামীম আজাদ: আমার বন্ধু ফিরোজ সাঁইয়ের কথা মনে হচ্ছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু চাইলেন যে একুশে ফেব্রুয়ারি শুরু হবে মিনারের পাদদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের একঝাঁক ছেলেমেয়ের একই সঙ্গে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি গাওয়ার মাধ্যমে। একই সঙ্গে রেডিও ও টেলিভিশনে তা প্রচার করা হবে। এটার রিহার্সেল দিতে আমরা যেতাম টিএসসিতে। টিএসসির ওপরের তলায় ছোট ছোট দল গিয়ে আমরা মহড়া দিতাম, নাচ করতাম, আবৃত্তি করতাম। একদিন দেখি ফিরোজ সাঁই একা বসে আছে। আমরা সব মেয়ে গেছি, প্র্যাকটিস করব, তো তাকে চলে যেতে অনুরোধ করলাম। তিনি বললেন, না, আমি যাব না, আমি গান শোনাব। টিএসসিতে ওপরতলায় বসার জন্য ছোট ছোট কাঠের ব্লক ছিল। ওগুলোকে বাজালে তবলার মতো শব্দ করা যেত। তখনো কিন্তু তিনি বিখ্যাত হননি। তার ‘স্কুল খুলেছে মওলা’ গানটি জনপ্রিয় হওয়ার আগের কথা। ফিরোজ গাইলেন ‘ওগো নিরুপমা করিও ক্ষমা’ গানটি। আমরা মুগ্ধ হয়ে গেলাম তার গান শুনে। ফিরোজ আমাদের সতীর্থ। তখন আমরা তাকে আপনি করে বলতাম। তার গান শুনে বললাম, আপনি থাকেন, আপনি তো ভীষণ ভালো গান করেন।

সেলিম জাহান: টিএসসির সামনে যেখানে চা-বিস্কুট বিক্রি হয়, সেখানে দুটি বিশাল গাছ রয়েছে। গাছ দুটোর নাম হচ্ছে বুদ্ধ নারকেল। শামসুন্নাহার হলের পাশেও ছিল। টিএসসি নিয়ে আমাদের অনেক স্মৃতি, সেখানে শেখ কামালও অনেক যেত। 

শামীম আজাদ: শেখ কামাল আমাদের রিহার্সেলগুলো করাত।

সেলিম জাহান: টিএসসি বা টিএসসির ভেতরে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দলগত সাদা-কালো যে ছবিগুলো আমরা দেখি, এগুলো তুলেছেন আমাদের সতীর্থ রোকেয়া মিনাক্ষী হকের পিতা প্রয়াত আজমল হক। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ্য চিত্রগ্রাহক ছিলেন। টিএসসি থেকে লাইব্রেরি পার হয়ে যদি আসি তাহলে বলব ওখানে দুটো ক্যান্টিন খুব বিখ্যাত ছিল। একটা মধুদার ক্যান্টিন, অন্যটা শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন। দুটোর মধ্যে পার্থক্য ছিল, যারা রাজনীতি করতেন, তাদের আখড়া ছিল মধুদার ক্যান্টিনে। এখানেই মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম কিংবা নাহিদ ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। মধুদার ক্যান্টিনের খাবারের অনেক নাম ছিল। 

শামীম আজাদ: শক্ত টোস্টের ওপর মাখন ও চিনি দেয়া থাকত। ডাকসুর সাংস্কৃতিক পরিষদের মিটিংগুলো প্রায়ই ওখানে হতো।

সেলিম জাহান: ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগের মিটিংগুলো ওখানেই হতো। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যখন একটা মিছিল বের হবে, ওটাই ছিল তার উত্সস্থল। ওখান থেকে মিছিল শুরু হতো। 

শামীম আজাদ: আর কী চমত্কার সব পত্রিকা বের হতো। তখন কতগুলো প্রকাশনা ছিল। এজন্য আমরা ছোট ছোট মিটিংয়ে বসতাম। ডাকসুতেও আমরা মিটিংয়ে বসেছি। কলা ভবনের ভেতর দিয়ে একটি রাস্তা ছিল। ওখানে ডাকসুর অফিস ছিল। কত চমত্কার যে পরিবেশ ছিল। আমরা তার মধ্যেও মহড়া দিয়েছি। দেরি হলে ছেলেরা আমাদের পৌঁছে দিয়ে এসেছে হলে।

সেলিম জাহান: ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মাহাবুবুজ্জামান। সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন ম. হামিদ। তাদের দুজনের সঙ্গেই অনেক আলাপ হয়েছে। মধুদার ক্যান্টিনটা কিন্তু ঢাকার নবাবদের নাচঘর ছিল। এর ভাস্কর্য দেখলে বিষয়টি বোঝা  যায়।

শামীম আজাদ: যুদ্ধের পর আবদুল্লাহ খালেদ যখন অপরাজেয় বাংলা তৈরি করতে শুরু করলেন, ম. হামিদ ভাইকে দেখেছি কী পরিমাণে খাটছেন। ইঞ্চি ইঞ্চি করে স্থাপত্যটা নির্মাণ হচ্ছে, তার মধ্যে একটি স্ক্যাফোল্ডিং লাগানো। এসবের রেকর্ড রাখতেন একজন। সেলিম তুমি বোধহয় এটা জানো।

সেলিম জাহান: মিশুক মুনির তখন একটা ক্যামেরা পেয়েছিলেন তার বড় ভাই ভাষণের কাছ থেকে। অপরাজেয় বাংলা যখন নির্মাণ হচ্ছিল, তিনি তখন ওখানে যেতেন এবং নিজের ইচ্ছামতোই ছবি তুলতেন। পরে এটা নিয়ে ভীষণ সুন্দর একটা তথ্যচিত্র তৈরি করা হয়। তথ্যচিত্রটি কিন্তু আমার কাছে আছে।

শামীম আজাদ:  তখন যদি কেউ ম. হামিদ ভাইয়ের খোঁজ করত, আমরা বলতাম, দেখো, উনি অপরাজেয় বাংলার ওখানে টানানো আছেন। 

সেলিম জাহান: একটা স্মৃতি আছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তো বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহন হন। ১২ আগস্ট আন্তঃহল বিতর্ক প্রতিযোগিতা ছিল। সলিমুল্লাহ হল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তখন কামাল ও সবাই যাচ্ছে। আমি কিছুতেই যাব না, কারণ ১৫ তারিখ আমার পরীক্ষা। তখন আমরা কিন্তু একটা কথা খুব বলতাম যে চল হামিদ ভাইয়ের তাজমহল দেখে আসি। ওটাকে হামিদ ভাইয়ের তাজমহল বলা হতো। কথিত আছে ওখানে যে নারী মূর্তিটি আছে, এটা তার স্ত্রী ফাল্গুনি হামিদের।

শামীম আজাদ: আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে আবদুল্লাহ খালেদের অপরাজেয় বাংলার ভাস্কর্যের প্রতিমূর্তিতে আমরা নিজেদের খুঁজে পাই। আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ খুঁজে পাই। এর ঠিক পেছনেই বাংলা বিভাগ। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের শহীদ শিক্ষকদের কথা মনে পড়ে। মোফাজ্জেল হক চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী, আনোয়ার পাশা স্যার। আমাদের দুই বন্ধু মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম ও মোস্তফা কামাল শাহরিয়ার। মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্লাস না করার জন্য লিফলেট বিতরণ করতে যেতাম আমি আর বাবলী। একদিন শাহরিয়ারের সঙ্গে দেখা হলো। এক ঝলক ওকে দেখলাম, কিন্তু কেউ কোনো কথা বললাম না, সেই শাহরিয়ারের সঙ্গে আমার শেষ দেখা। 

সেলিম জাহান: মুক্তিযুদ্ধে  শিক্ষকদের পাশাপাশি আমরা বহু সতীর্থ বন্ধুকে হারিয়েছি। স্মৃতিচারণের একটি পর্বে আমরা একদিন শুধু তাদের নিয়েই কথা বলব। তবে এখন আবার শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে ফিরে আসি। কিছুদিনের জন্য শরীফ মিয়া ও মধুর ক্যান্টিনের মাঝামাঝি আরেকটি ক্যান্টিন গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ওটা বেশিদিন থাকেনি। 

শামীম আজাদ: তোমাদের কানুদার ক্যান্টিন নিয়ে বলো না। 

সেলিম জাহান: বলা চলে কলা ভবন, শহীদ মিনারের উল্টো দিকে ভূগোল বিভাগ বা বিজ্ঞান ভবনের সব তলায়ও ক্যান্টিন ছিল। কলা ভবনে বিখ্যাত ছিল কানুদার ক্যান্টিন। অর্থনীতি বিভাগের কানুদার ভালো নাম ছিল আবদুল করিম। কলা ভবনের তৃতীয় তলায় কানুদার এ ক্যান্টিনে খুব ভালো চা পাওয়া যেত। অন্য খাবারদাবার খুব একটা ছিল না। ওখানে কতগুলো ডেস্ক ফেলে রেখেছিলাম আমরা। ছেলেমেয়েরা সেখানে বসে আড্ডা দেয়ার জন্য আসত। ভূগোল বিভাগের নিচ তলায় ছিল সুরেশদার ক্যান্টিন। এ ক্যান্টিনগুলো কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের একটা বড় অংশ। এটা তো সবাই জানি যে কানুদা বা মধুদার ক্যান্টিনেই হোক খাবার বা চা খাওয়ার পর আমরা বলতাম, লিখে রাখেন মধুদা, লিখে রাখেন কানুদা। অনেক পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে চাকরি করার সময়ও অনেকে গিয়ে সে বিল পরিশোধ করেছি কিংবা অনেকে করেননি। 

শামীম আজাদ: এবার বলো তো হলের মধ্যে তোমার প্রিয় জায়গা কোনটা ছিল?

সেলিম জাহান: সলিমুল্লাহ হলের ভেতরের বাগানটা অনেক সুন্দর ছিল, অনেকটা দিল্লিতে মোগল আমলের বাগানের মতো। হলের দুটো ব্লকের মাঝখানে যে রাস্তাটা, সেখানে কিন্তু হলুদ গোলাপের ঝাড় ছিল। এখানের লনের মধ্যে বসেই ছেলেরা আড্ডা দিত। দুটো ব্লকের মধ্যে যে যাতায়াত পথ, ওখানেও পা ঝুলিয়ে বসে গল্প করতাম। আর হলে সামনে বসা তো হতোই। 

শামীম আজাদ: রোকেয়া হলে ছিল বিশাল একটি শিরিষ গাছ। গোলাপি রঙের ফুল ফুটত। তার নিচে বসতাম আমরা। আর ছিল পুকুরপাড়। পুকুরটা এখন আর নেই। সেখানে বসে এত এত গল্প, আড্ডা  হয়েছে। দেখা গেছে সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। পুকুরের রঙ ঘন হয়ে যাচ্ছে। আমি আর শ্রাবণী একটা জায়গায় বসলে আর উঠতাম না। আর হারমোনিয়াম পেলে তো শ্রাবণীকে টেনে তোলা যেত না। পারুল এসে বলত, তোরা কি উঠবি? এদিকে খাবারের সময় চলে যাচ্ছে। পারুল আজ আর নেই। অর্থনীতিতে পড়ত ও, ভীষণ মেধাবী ছিল। রোকেয়া হলের একটা জায়গায় কিন্তু টেলিফোন বুথ ছিল। 

সেলিম জাহান: সব হলেই ঢোকার মুখে টেলিফোন বুথ  ছিল। 

শামীম আজাদ: একদিন ফোন করেছি, রং নাম্বার হলো, কিন্তু গল্প করতে করতে সে মহিলাকে খালাম্মা বানিয়ে ফেলেছিলাম মনে আছে। টেলিফোনটা কখনো খালি থাকত না। সবসময় লাইন লেগেই থাকত। নমিদা আসতেন। মেইন বিল্ডিংয়ের নিচে বসে আমাদের ধুয়ে আনা শাড়িগুলো দিতেন। 

সেলিম জাহান: এ প্রসঙ্গে একটা স্মৃতি মনে পড়ছে। আমি থাকতাম ৩৩ নম্বর রুমে। গোসল বা অন্যান্য কাজ করতে এ রুমের সামনে দিয়ে সবাইকে যেতে হতো। কবি আবুল হাসান থাকতেন এ হলে। আমার রুমের সামনে দিয়ে যেতেন। তার দুটো অভ্যাস ছিল। এক. গোসলের সময় তোয়ালে নিতেন না। দুই. তোয়ালে নিতেন আমার রুম থেকে। তার জন্য আলাদা একটা তোয়ালে রেখে দিতাম। ধোপার ধোয়া ওই তোয়ালের মধ্যে নিউজপ্রিন্টের এক টুকরো কাগজ থাকত। আমি আজ খুব গর্বের সঙ্গে বলতে পারি আমার ওই ধোপায় ধোয়া জামাকাপড়ের কাগজের ওপর আবুল হাসানের বহু কবিতা রচিত হয়েছে। খুব সম্ভবত সলিমুল্লাহ হলে সবচেয়ে বড় যে কবি এসেছিলেন, তিনি হচ্ছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসেন তখন তিনি সলিমুল্লাহ হলে ভাষণ দিয়েছিলেন। মোট তিনটি হলে তার ভাষণ দেয়ার কথা ছিল, কিন্তু অসুস্থতার কারণে তিনি দিতে পারেননি। সলিমুল্লাহ হলের সেই মিলনায়তনে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁকে ডিলিট উপাধি দেয়া হয়েছিল। হলের স্মৃতিগুলো আমরা নানান জনের কাছ থেকে নানাভাবে শুনেছি।

শামীম আজাদ: যুদ্ধের পরে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি এসেছেন বাংলাদেশ দেখতে। আমার মনে আছে একবার রুমা গুহঠাকুরতাও এসেছিলেন।

সেলিম জাহান: ১৯৭২ সালেই কলকাতা থেকে শম্ভু মিত্র ও তৃপ্তি মিত্র বহুরূপী নাট্যদল নিয়ে এসেছিলেন। সম্ভবত একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে বাংলা একাডেমিতে তারা ‘চাক ভাঙ্গা মধু’ মঞ্চস্থ করেছিলেন। আরেকদিনের কথা মনে পড়ছে। আমরা সবাই দলবেঁধে গেলাম। সেদিন সুকান্ত ভট্টাচার্যের কনিষ্ঠ ভ্রাতা আশোক ভট্টাচার্য আসবেন এবং কথা বলবেন। তিনি পরিসংখ্যান ইনস্টিটিউটে কাজ করতেন। আমাদের কয়েক বন্ধু খুব উত্তেজিত। তিনি এলেন। ছোটখাটো একজন মানুষ। মাঝবয়সী। বিরল কেশ। চোখে মোটা পাওয়ারের চশমা। হঠাত্ পাশ থেকে আমাদের এক বন্ধু বলে উঠলেন, কিছুতেই তিনি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কনিষ্ঠ ভ্রাতা হতে পারেন না। কারণ সুকান্ত ভট্টাচার্য যে বয়সে চলে গেছেন, সে হিসাবে তার কনিষ্ঠ ভ্রাতার ছবি আমাদের মনে রয়েছে ১৭ কিংবা ১৮ বছরের কোনো তরুণের। কিন্তু সুকান্ত যে বয়সে আমাদের থেকে চলে গেছেন বা আমাদের বহু বন্ধুও যে বয়সে আমাদের কাছ থেকে চলে গেছেন, তারা তো সময়ের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন। তারা বৃদ্ধ হন না। তারা বিরল কেশ হন না। তারা আমাদের মতো আস্তে আস্তে জরা এবং ক্ষয়ের শিকার হন না। সুতরাং আমার ওই বন্ধুটির মনে হয়েছে যে সুকান্ত ভট্টাচার্যের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ১৫-১৬ বছরের হবেন, তিনি এই অশোক ভট্টাচার্য হতে পারেন না। এ ঘটনা মজার, কিন্তু এর মধ্যে ধূসর একটা বিষাদও মিশ্রিত রয়েছে।

শামীম আজাদ: সেজন্য আমার মনে হয় কি জানো, কারো প্রয়াণের খবরে পত্রিকায় তার সর্বশ্রেষ্ঠ ছবিটাই ছাপা উচিত। তার যৌবনের ছবি দেয়া উচিত, কারণ যৌবন দিয়েই মানুষ চিহ্নিত হয়।

সেলিম জাহান: যারা নতুন প্রজন্মের, তারা বুঝতে পারবে না কী অপূর্ব একটা জায়গা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আমি স্মৃতিকাতর হয়ে বলছি না, সত্যিকার অর্থেই বলছি। সেখানে আমরা যে জীবন উপভোগ করে এসেছি, সে জীবন কিন্তু আমাদের এত দূর টেনে নিয়ে এসেছে। 

শামীম আজাদ: সেলিম, তুমি তো একটা কথা প্রায়ই বলো যে শুধু শিক্ষক নন, শুধু পাঠ্য পুস্তক নয়, আমরা আজকে যা হয়েছি, সেখানে আমাদের বন্ধুদেরও অবদান রয়েছে। আমরা কিন্তু আমাদের বন্ধুদের চিহ্ন বহন করি।

সেলিম জাহান: শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনের কথা বলতে গেলে কত স্মৃতি এসে ভিড় করে। যে যুগের শ্রেষ্ঠ কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক। সেখানে কোনো ভেদাভেদ নেই। ধর্মের ভেদাভেদ, বয়সের ভেদাভেদ নেই।

শামীম আজাদ: পোশাকেও ষোলোয়ানা বাঙালিয়ানা। আমরা সুতির শাড়ি পরতাম। নমিদা নিয়ে আসত। পিকনিকগুলোয় আমরা পরতাম ছাপার শাড়ি। নিউমার্কেটে রূপায়ণ নামে একটা দোকান ছিল, ব্লক প্রিন্ট করত। বক্ল প্রিন্ট তখনই হয়েছিল। কিছুদিন আগে আমি ওই সময়কার একটি ছবি ফেসবুকে দিয়েছি। একজন মন্তব্যের ঘরে লিখেছে, ‘আপা, অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজলেও এমন একটি নারী এখন পাবেন না যে সুতি শাড়ি পরে পেছনে একটি বেণি দুলিয়ে দীপ্ত ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছে।’ পৃথিবীতে মুক্ত হয়ে নিঃশ্বাস নেয়ার চেয়ে বড় কিছু নেই।

সেলিম জাহান: এ কথাটা খুবই সত্যি। সমাজে বিত্তবান ও মধ্যবিত্তের মধ্যে এক ধরনের অসমতা তখনো ছিল, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনে বা চত্বরে তারা যখন প্রবেশ করেছে, তখন কিন্তু ওই অসমতার প্রভাব পড়েনি। বাড়িতে কী অবস্থায় ছিল, তা বাড়িতেই রেখে এসেছে। বিত্ত, সম্পদ ও ক্ষমতার এখন যে উলঙ্গ প্রকাশ আমরা নানান জায়গায় দেখতে পারছি, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্গনেও, এটা কিন্তু তখন ছিল না। আমাদের এক বন্ধুর বাবা প্রাদেশিক মন্ত্রী ছিলেন তখন, কিন্তু বন্ধুটি তা কখনো বলতে চায়নি। শেখ কামালের পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পিতা এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, কিন্তু কামাল যেভাবে আসত, আমাদের সবার সঙ্গে মিশত, চলাফেরা করত, তার আচরণে তা প্রকাশ পেত না। 

শামীম আজাদ: তাকে কিন্তু কখনো আলাদা পোশাক, দামি ঘড়ি বা বড় জায়গায় খাওয়াতে নিয়ে যাচ্ছে এটা দেখিনি। সে আমাদের সঙ্গে ওই চা-শিঙ্গাড়াই খেত। কামাল এত ক্রিকেটপাগল ছিল, যার জন্য আবাহনীর জন্ম দিল। শামীম আহমেদ। খুব ভালো সংবাদ পড়ত। একদিন আমরা ইংরেজি সাবসিডিয়ারি ক্লাস করছি, ও তখন ক্রিকেট খেলতে গিয়ে হয়তো ব্যথা পেয়েছে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসে ক্লাসে ঢুকল। মুনিম স্যারের ক্লাস ছিল ওটা। স্যার ছিলেন দার্শনিকের মতো। 

সেলিম জাহান: মুনিম স্যার অসম্ভব পণ্ডিত ও বিদগ্ধ একজন মানুষ। তিনি কিছুদিন বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। তখন আমি বাংলাদেশ অবজারভারে সম্পাদকীয় লিখি। আমার অনেক ইংরেজি শেখা মুনিম স্যারের কাছে। বানান, হাতে ধরে ধরে শিখিয়েছেন কোথায় কমা, কোথায় সেমিকোলন দিতে হবে। 

শামীম আজাদ: শেক্সপিয়ার নিয়ে আমাদের খুব ভালো করে জানা হয়েছে আসলে রাজিয়া খান আমিনের ক্লাসে। রাজিয়া খান আমিন, হোসনে আরা হক, পারভিন হক, নিয়াজ জামান, নাদেরা বেগম অসামান্য শিক্ষক ছিলেন তারা। রাজিয়া খান আমিন শুধু শেক্সপিয়ারের নাটকই পড়াতেন না, আমাদের নাটকের একেকটা চরিত্র নিয়ে পড়তে হতো। সেলিম, আমরা আমাদের বটগাছের কাহিনীটা বলি। তুমি শুরু করো।

সেলিম জাহান: বিশ্ববিদ্যালয়ে বট গাছটি আগে থেকেই ছিল। অন্যান্য গাছের মধ্য থেকে এটা বিখ্যাত ছিল। কারণ সেখানে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের রাজনৈতিক সভা হতো। আমরা এটিকে বটতলা নামে জানতাম। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনারা ওই বট গাছ কেটে ফেলে।

শামীম আজাদ: কী পরিমাণ গাড়ল চিন্তা করো। ওই বট গাছের গোড়ায় আমাদের সভা, মিটিং, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। বট গাছের কী দোষ।

সেলিম জাহান: বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি এলেন ঢাকায়। আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান জন এফ কেনেডির কনিষ্ঠ ভ্রাতা তিনি। মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নেয়া তার মতো অত বড় বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রে আর কেউই ছিলেন না বলা চলে। তার সঙ্গে তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরাও এসেছিলেন। আরেকজনের কথা আমার খুব মনে আছে, তিনি হচ্ছেন বিবিসির সিরাজুর রহমান। তিনি এসেছেন প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য। আমার এখনো মনে আছে সিরাজুর রহমান যখন মঞ্চে উঠলেন, তখন হয়তো সামনের সারিতে আমাদের কোনো শিক্ষক বসেছিলেন তার বন্ধু। সিরাজুর রহমান সবকিছু ভুলে মঞ্চ থেকে লাফিয়ে নেমে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরলেন। ওইদিন এডওয়ার্ড কেনেডি বটগাছ নতুন করে লাগান। সেদিন আমাদের চারজন ছাত্র নেতা উপস্থিত ছিলেন। ছাত্রলীগের নূরে আলম সিদ্দিকী ও শাহজাহান সিরাজ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদের সহসভাপতি আ স ম আবদুর রব ও সম্পাদক আবদুল কুদ্দুস মাখন। সত্যিকার অর্থে স্বাধীনতা আন্দোলনে বটতলার একটা বিরাট ভূমিকা ছিল। সেই বটতলার নিচে দাঁড়িয়েই কিন্তু আমরা দেখেছি যে ১৯৭১ সালের ২ মার্চ কলা ভবনের এদিকে যে গম্বুজের মতো ভবনটা ছিল, তার ওপর স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করা হয়েছে। সে পতাকার মাঝখানে লালের মধ্যে কিন্তু বাংলাদেশের মানচিত্র ছিল। সে ছবিটিও আমার কাছে আছে।

শামীম আজাদ: আমরা যদি একটু মন দিয়ে ভাবি তাহলে সে সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে, শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি কতটা ইতিবাচক ছিল তা বুঝতে পারি। ছাত্রসমাজই তো জাতির বিবেক। দেখা গেছে অনেক ধারণা ছাত্রসমাজের কাছ থেকেই রাজনৈতিক নেতারা গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে কয়েকটা শিক্ষা আইনের কথা যদি আমরা মনে করি, সেখানে ছাত্রসমাজের আন্দোলন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। 

সেলিম জাহান: ১৯৬২ সালে হামদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে যখন বিক্ষোভ, ১৯৬৬ সালে ছয় দফা আন্দোলন, আমাদের নিজস্ব ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলন। সত্যিকার অর্থে তো বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গেছে ছাত্রসমাজ। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে তাদের আন্দোলন, তাদের আত্মত্যাগের কথা আমরা জানি। পরবর্তী সময়ে নব্বইয়ের দশকেও আমরা দেখেছি যে এরশাদের উত্খাত ও গণতন্ত্রের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার জন্য ছাত্র আন্দোলন একটা বিরাট ভূমিকা রেখেছে। (চলবে)


লেখক পরিচিতি

শামীম আজাদ একজন কবি, লেখক ও গল্পকথক। তিনি বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখেন। সত্তরের দশকে সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রায়’ শামীম তরফদার নামে প্রবর্তন করেন বাংলাদেশে ফ্যাশন সাংবাদিকতার। যুক্তরাজ্যে বাংলা ভাষার অন্যতম কবির গ্রন্থ সংখ্যা প্রায় চল্লিশের কাছাকাছি।

ড: সেলিম জাহান একজন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। কর্মজীবনে বছর দুয়েক আগে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের পরিচালক ও মুখ্য লেখক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন দুই দশক ধরে। ইংরেজি ও বাংলায় তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা এক ডজন এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক।

শ্রুতিলিখন: রুহিনা ফেরদৌস