আইন প্রণয়নের শুরু থেকেই আইন পরিবর্তন ও পরিমার্জন একটি স্বাভাবিক ও সুপ্রচলিত নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। ব্রিটিশরা এই উপমহাদেশ শাসনকালে তাদের নিজ স্বার্থে ও শাসনকার্য পরিচালনার সুবিধার্থে বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করে এবং ব্রিটিশ শাসন অপসারণের পর বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্য দেশগুলো সময়ে সময়ে সমাজের মান ও যুগানুসারে পুরনো আইন সংশোধন ও পরিমার্জন করে। বহুকাল থেকে ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর সংশোধনের জন্য তুমুল সমালোচনা ও দাবি তোলা হলেও সম্প্রতি ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনীতে কিছু কার্যকর পরিবর্তনের প্রস্তাবনা দেখা গেছে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এ সাম্প্রতিক প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো ‘স্বেচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা’র বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। এই নতুন সংশোধনীগুলোর কারণে ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা বিদেশ ভ্রমণ, শেয়ার ক্রয়, তার পরিচালক পদটি ব্যবহারসহ সব ধরনের প্রত্যাশিত সুবিধা ভোগে কিছুটা বাধানিষেধের সম্মুখীন হবেন।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কিছু সংজ্ঞাকে বিস্তৃত অর্থ দেয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পরিবারের সংজ্ঞায় স্বামী-স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা, ভাইবোনের পাশাপাশি শ্বশুর-শাশুড়ি, নাতি-নাতনী, পুত্রবধূ, কন্যার জামাতা এবং অন্য নির্ভরশীলদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অধিকন্তু, ‘ব্যক্তি’ অর্থ উভয় ‘প্রাকৃতিক ব্যক্তি’ এবং ‘কৃত্রিম আইনি’ সত্তাকে বোঝানো হয়েছে। নতুন প্রস্তাবনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘স্বেচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা’ সম্পর্কিত আইনের অন্তর্ভুক্তি। এর আগে শুধু আইনের অভাবে স্বেচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা ব্যক্তিকে দায়বদ্ধ করা সম্ভব হতো না। ব্যাংক আইনের নতুন সংশোধনী কার্যকর হলে স্বেচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ সম্ভব হবে।
অধিকন্তু, আন্তর্জাতিক মানের চর্চা ও নীতি অনুশীলন বজায় রাখার লক্ষ্যে ঋণ, অর্থ পাচার বা মানি লন্ডারিং, ট্রাস্টির দায়িত্ব, সন্ত্রাসী অর্থায়ন এবং আর্থিক অপরাধের সংজ্ঞার কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে। যেহেতু অধিগ্রহণের তারিখ মিউটেশনের অন্তর্ভুক্ত সম্পত্তি বিক্রয় করার অধিকারের পূর্বশর্ত, নতুন ব্যাংক কোম্পানি আইনে অধিগ্রহণের তারিখের ব্যাখ্যা এবং দখল ও মিউটেশন সম্পর্কিত কিছু নতুন বিধান সংযুক্ত করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
নতুন সংশোধনীতে ব্যাংক কোম্পানির পরিচালনা এবং পরিচালনা কর্মচারী সম্পর্কিত কিছু পরিবর্তন প্রস্তাবিত হয়েছে। কোনো চেয়ারম্যান, পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বা দুই স্তর অধঃস্তন কর্মকর্তা অর্থ, দুর্নীতি বা জালিয়াতি সম্পর্কিত দোষে সাব্যস্ত হলে সেই ব্যক্তি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যাংক কোম্পানির পরিচালনা ও প্রশাসনের কোনো কার্যকলাপে অংশ নিতে পারবেন না। তদ্ব্যতীত সেই ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যাংক কোম্পানিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হওয়ার যোগ্যতাও হারাবেন। কোনো পরিচালকের বিরুদ্ধে ঋণখেলাপিকে সহায়তা অথবা এ-সম্পর্কিত কোনো অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের নোটিস দেয়া হলে নোটিসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত পরিচালকদের পদ ছাড়তে অথবা পদত্যাগ করতেও বাধা দেয়া হয়েছে। এরূপ বিধান অত্যন্ত কঠোর প্রতীয়মান এবং আসামিকে অবশ্যই তার ন্যায্য বিচারের অধিকার দেয়া উচিত। তাদের ওপর এরূপ কঠোর শাস্তি আরোপের আগে অবশ্যই শুনানির সুযোগ দেয়া উচিত।
যেকোনো খাতের উন্নয়নের জন্য সুশাসন প্রতিষ্ঠাই হলো পূর্বশর্ত। তাই ব্যাংকিং খাতের সুপ্রতিষ্ঠিত উন্নয়নের লক্ষ্যে ব্যাংক কোম্পানি আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীর ১৪ক ধারার আওতায় কয়েকটি কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। আগে ব্যাংকের শেয়ার ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি বা একই পরিবারের সদস্যদের দ্বারা যৌথভাবে বা স্বতন্ত্রভাবে ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ক্রয় নিষিদ্ধ ছিল এবং এখন নতুন সংশোধনী অনুসারে কোনো প্রতিষ্ঠান বা একই সংঘবদ্ধ প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি পৃথক সত্তা থাকা সত্ত্বেও মোট ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার সংরক্ষণ করতে বাধা দেয়া হয়েছে। এই জাতীয় অন্তর্ভুক্তির ফলে কোনো একক সত্তার ব্যাংকিং পরিষেবা অর্জনের ক্ষেত্রে কোনো শ্রেষ্ঠত্ব থাকবে না। এগুলো ব্যাংক কোম্পানির মালিকানাধীন কোনো একক সংস্থা বা পরিবার বা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আধিপত্য রোধ করতে সক্ষম হবে এবং ব্যাংক খাতে সুশাসনের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করবে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর প্রস্তাবিত ধারা ১৪খ অনুসারে, একজন ব্যক্তি, সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে পর্যাপ্ত শেয়ারহোল্ডার হওয়ার যোগ্যতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। সংশোধনীতে মূলত দুটি শর্তের অন্তর্ভুক্তি রয়েছে। প্রথমত, কোনো ব্যাংক সংস্থা অন্য ব্যাংক সংস্থার সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারধারক হতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, কোনো আইনি সত্তা কোনো ব্যাংক সংস্থার সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারধারক থাকা অবস্থায় অন্য কোনো ব্যাংক কোম্পানির সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারধারক হতে পারবে না। এরূপ শর্তাবলি ব্যাংক কোম্পানির শেয়ার মালিকানা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ঋণ ও শেয়ার সম্পর্কিত ঝুঁকি বিপুল পরিমাণ হ্রাস করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারবে। এছাড়া এ বিধান আর্থিক খাতে সুশাসন ও স্থিতিশীলতা বজায় রেখে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করবে বলে আশা করা যায়।
পূর্ববর্তী আইনে পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ, পদায়ন, বরখাস্ত বা অপসারণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল। প্রস্তাবিত সংশোধনীতে উল্লিখিত কর্মকর্তা এবং তাদের দুই স্তর অধঃস্তন কর্মকর্তাদের পুনর্নিয়োগের জন্যও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অনুমতির বিধান রয়েছে। আগে কোনো ব্যাংক কোম্পানি পরিচালকের তার পরিচালকত্ব চলাকালীন অন্য কোনো ব্যাংক কোম্পানির পরিচালক হওয়ায় নিষেধাজ্ঞা ছিল। ব্যাংক কাম্পানিতে একক শিল্পগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ রোধ করতে নতুন প্রস্তাবনায় এজেন্ট বা প্রতিনিধিদের জন্যও একই বিধি প্রয়োগ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এই বিধিগুলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক কর্মকর্তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। এটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈষম্য এবং বৈষম্যমূলক আচরণের বহিঃপ্রকাশস্বরূপ। সুতরাং অভিন্নতা ও ন্যায্যতার স্বার্থে নতুন আইনের এই ধারার পুনর্বিবেচনা অতিজরুরি।
নতুন সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত আরো কয়েকটি বিধি কঠোর প্রকৃতির ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ বা তদন্তের পরে জালিয়াতি, আর্থিক অপরাধ, অবৈধ কার্যক্রম বা একই জাতীয় দাবি প্রমাণিত হয়েছে, তাদের ওই সিদ্ধান্তকে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার কোনো বিধান রাখা হয়নি। তদুপরি, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৬ ধারায় বাংলাদেশ ব্যাংকের এই জাতীয় অভিযোগের জন্য যেকোনো ব্যাংক সংস্থার চেয়ারম্যান, পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বা দুই স্তর নিম্নস্থ কর্মকর্তাদের অপসারণেরও ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। যদিও এ ধরনের বিধান যেকোনো ক্ষতিকারক অবৈধ কার্যকলাপ এবং আন্তর্জাতিক নিয়মাবলির মান বজায় রাখতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে, তবে এ-জাতীয় বিধানগুলো ন্যায়বিচার পাওয়ার মানবাধিকারের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। আইনের আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ, তবে আইন প্রণয়নের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিভিন্ন মৌলিক অধিকার যেমন সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার অধিকার, আত্মরক্ষার অধিকার এবং স্ব-মত ব্যাখ্যার অধিকার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া যেকোনো শাস্তি প্রদানের আগে অবশ্যই সব অভিযোগ যুক্তিসংগত এবং সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে। অন্যথায় এ ধরনের স্বেচ্ছাচারী বিধান অপ্রাসঙ্গিক হবে এবং ফলস্বরূপ মাননীয় সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিটের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জযোগ্য হবে।
ব্যাংক কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ আরো কার্যকর করার লক্ষ্যে কিছু নতুন বিধান সংশোধন ও সংযোজন করার প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। আগে কোনো প্রতিষ্ঠানে মাত্র তিনজন স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার বিধান থাকলেও নতুন প্রস্তাবনা অনুযায়ী পরিচালক সংখ্যা স্বতন্ত্র পরিচালকসহ ন্যূনতম ১১ জন এবং সর্বাধিক ২০ জন হবে। তবে স্বতন্ত্র পরিচালকের অনুপাত অবশ্যই মোট পরিচালকের অন্যূন এক-পঞ্চমাংশ হতে হবে। তদুপরি আন্তর্জাতিক অনুশীলন ও নীতি অনুসরণ করে পরিচালকদের একাডেমিক, পেশাদার ও বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকার নীতি বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং বছরে একবার বিকল্প পরিচালক নিয়োগ দেয়া যাবে। তবে পরিচালকের কার্যালয়ের মেয়াদ অবশ্যই ছয় মাসের অধিক হবে না। তদুপরি, প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুসারে প্রতিটি ব্যাংক কোম্পানিকে তাদের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সমন্বয়ে ‘নমিনেশন ও রেমুনারেসন কমিটি’ এবং ‘এথিকস ও কমপ্লায়েন্স কমিটি’ গঠন করতে হবে সংশ্লিষ্ট বিষয়াবলি মোকাবেলা করার জন্য।
ব্যাংক সংস্থা আইনের নতুন সংশোধনী অনুযায়ী ঋণ বা অগ্রিমের অনুদান পাওয়ার আগে ব্যক্তিগত গ্যারান্টি ও সিকিউরিটি প্রদান করার প্রয়োজন হবে। এ বিধান পরিচালকের সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো ঘনিষ্ঠ সংস্থা বা ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। এমনকি কোনো ব্যাংক কোম্পানি বা তার পরিচালক বা পরিবারের সদস্য বা ২০ শতাংশ ভোটাধিকারপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রেও বিধানটি সমানভাবে প্রযোজ্য হবে। শরিয়া ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে কোনো পরিচালকের পরিবারের সদস্য কোনো সিকিউরিটি প্রদান ব্যতীত মুদারবা ও মুশারাকার সুবিধা গ্রহণ করার অনুমতি পাবে না। প্রকৃতপক্ষে, এ বিধানগুলো ব্যাংকের ওপর অবৈধ প্রভাব হ্রাস করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত হয়েছে। এছাড়া এটি কোনো ব্যাংকিং আর্থিক খাতে যথাযথ শৃঙ্খলা ও শাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে। কোনো ব্যাংক সংস্থার পক্ষে খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে ঋণের সুবিধা প্রদান অবৈধ করা হয়েছে। এই বিধান লঙ্ঘনের জন্য দায়িত্বে থাকা সব পরিচালক ও কর্মকর্তা দায়বদ্ধ থাকবেন এবং লঙ্ঘনে সর্বনিম্ন ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা তিন বছরের কারাদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
তদ্ব্যতীত ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনীতে ধারা ২৭কক দ্বারা পরিচালকদের কাছ থেকে বৃহত্তর জবাবদিহিতার বিধি প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া দোষী সাব্যস্ত হলে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করারও বিধান রয়েছে। ধারা ২৭ কককর মাধমে কোনো ব্যাংক সংস্থায় দুর্দান্ত পরিচালনা ও প্রশাসনের জন্য স্বেচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের শনাক্তকরণ এবং তালিকা তৈরি করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ধারা ২৭ ককককর অধীনে স্বেচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের পুনরায় ঋণ সুবিধা প্রদানে নিষেধাজ্ঞা প্রদান এবং শিগশিগই তাদের বন্ধকি সম্পত্তি দখল করিয়া বিক্রয়/নিলামের জন্য উপস্থিত করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিজনেস ক্লাসে বিদেশ ভ্রমণ, গাড়ি বা বাড়ি রেজিস্ট্রেশন, ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু, আরজেএসসির আওতায় নিবন্ধীকরণ নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত করা হয়েছে। ঋণখেলাপিদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বয়কট করারও প্রবিধানের প্রস্তাবনা দেয়া হয়েছে। এরূপ ধারার আওতায় বর্ণিত বিধিনিষেধগুলো স্বেচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা ও পরিচালকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হবে। এছাড়া এই জাতীয় পদক্ষেপগুলো ঋণ সুবিধার সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকিপূর্ণ কারণগুলো সমাধান করবে এবং যথাযথ শৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার করবে। এগুলো স্বেচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের যথাযথ জবাবদিহিতা ও সামাজিক লজ্জা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আইনসভার অনেক প্রতীক্ষিত ও সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর পঞ্চম অনুচ্ছেদের ৫৮ থেকে ৭৬ ধারাগুলোর মধ্যে অবিচ্ছিন্ন পরিবর্তনের প্রস্তাবনা করা হয়েছে, যা দুর্বল ব্যাংক সংস্থাগুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনার সংশোধনমূলক পদক্ষেপের কিছু অতিগুরুত্বপূর্ণ বিধানের সমন্বয় করেছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে শাস্তি বা জরিমানাসংক্রান্ত বিধানগুলো আরো কঠোরতর করা হয়েছে। লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে বা লাইসেন্সবিহীন ব্যবসা করার জন্য ৫ লাখ টাকা থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, এমনকি সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডও হতে পারে। একইভাবে কেউ যদি বিভ্রান্তিমূলক, মিথ্যা বা মনগড়া দলিল বা তথ্য সরবরাহ করে, তবে সেই ব্যক্তিকে তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করারও বিধান আছে। এই জাতীয় কঠোর শাস্তি আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে সহায়তা করবে। তবে বিভিন্ন মানবাধিকার যেমন সুষ্ঠু বিচার পাওয়ার অধিকার, স্ব-প্রতিরক্ষা ও স্ব-মত ব্যাখ্যার অধিকার যাতে লঙ্ঘন না হয়, এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এবং যেকোনো আনীত অভিযোগের শাস্তি প্রদানের আগে অভিযোগটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হবে। অন্যথায় বিধানগুলো মাননীয় সুপ্রিম কোর্টে রিটের মাধ্যমে চ্যালেঞ্জযোগ্য হবে।
নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংকে আর্থিক তথ্য জমা দেয়ার পরে এখন ব্যাংক সংস্থাগুলোকে সংবাদপত্রগুলোয় একই তথ্য প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই; বরং তথ্যাবলি শুধু ওয়েবসাইটে যেখানে তথ্য পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান এমন স্থানে প্রকাশ করতে হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে নতুন বিধানটি অতি যুগোপযোগী উদ্যোগ। এর ফলে ব্যাংকগুলোর ব্যয় হ্রাস পাবে এবং যেকোনো জায়গা থেকে যেকোনো সময়ে অনলাইনে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজেই পাওয়া সম্ভব হবে।
ব্যাংক কোম্পানি আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী অবশ্যই আন্তর্জাতিক মান এবং নীতি বজায় রেখে পূর্ববর্তী আইনের বেশির ভাগ সমস্যাকে সমাধানের চেষ্টা করেছে। যেহেতু পরিচালক, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার জরিমানা ও অযোগ্যতার বিষয়ে কয়েকটি কঠোর বিধান মানবাধিকারের নীতিগুলোর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক, সুতরাং আইন প্রণয়ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এই আইনগুলো পুনর্বিবেচনা করাই শ্রেয়। সামগ্রিকভাবে ব্যাংক কোম্পানি আইনের নতুন সংশোধনী স্বেচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণগ্রহীতা এবং এ-সংক্রান্ত কিছু বৃহৎ সমস্যা, একক শিল্পগোষ্ঠী বা পরিবারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ববর্তী ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর কিছু দুর্বলতার কারণে ব্যাংকিং খাতের সাধারণ মানুষের আস্থা হ্রাস পুনরুদ্ধারে সাফল্যের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে এবং দেশের ব্যাংক কোম্পানির সুশাসন ও দক্ষ পরিচালনা নিশ্চিত করে একটি সুষমভাবে দীর্ঘ পথ অতিবাহিত করতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যায়।
শাফায়াত উল্লাহ: ব্যারিস্টার, লিঙ্কন’স ইন, যুক্তরাজ্য
অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ










