এক নিবন্ধে কর্ম মূল্যায়নের সুযোগ ২০১৫ সালে অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী আঙ্গাস ডেটন রাখেননি।
তার গবেষণার পরিধি বিশাল; গভীরতাও অনেক।
তবু সাহস করে সেগুলোর মধ্য থেকে তিনটি ইস্যু (দুটি মৃত্যু ও একটি সাহায্য-সংক্রান্ত) অতি সংক্ষেপে আজ আলোকপাত করব— ডেটনের ভাবনা-চিন্তার ক্ষুদ্রাংশ পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে।
এক. মানুষ কেন
আত্মহত্যা করে?
সাধারণ ধারণা হলো, মানুষ আত্মহত্যা করে আবেগতাড়িত পছন্দের কবলে পড়ে; যখন সে ভবিষ্যত্ চিন্তা না করে তাত্ক্ষণিক অনুভূতিকে গুরুত্ব দেয় বেশি।
ডেটন রচিত আত্মহত্যার অর্থনৈতিক তত্ত্বের অন্তর্নিহিত ভাব হলো, বেঁচে থাকার উপযোগের চেয়ে মরে যাওয়ার উপযোগ অগ্রাধিকার পেলে মানুষ নিজেই নিজেকে খুন করে! এ তত্ত্বের উপসংহারে তিনি এও বলেছেন, কয়েকটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছাড়া আত্মহত্যার সঙ্গে সন্তুষ্টি বা জীবনে সুখী হওয়ার সম্পর্ক ক্ষীণ।
তবে আত্মহত্যার ওপর ব্যথা বা যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতির প্রভাব অত্যন্ত জোরালো বলে ডেটনের মত।
সেজন্য যারা একাধিক রোগব্যাধির শিকার হয়ে জটিলতায় ভারাক্রান্ত কিংবা যারা দীর্ঘমেয়াদি অসহ্য ব্যথায় ভুগছেন, তাদের জন্য যৌক্তিক হতে পারে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত।
কার্যত তেমন পরিস্থিতিতে চিকিত্সকের সহায়তায় রোগীর আত্মহত্যার অধিকার এরই মধ্যে একাধিক দেশে আইনবলে স্বীকৃত।
আমার অবশ্য মনে হয়, ব্যথা বলতে কেবল শারীরিক বেদনাকে বোঝাননি ডেটন।
ব্যক্তিগত বিপর্যয় কিংবা সামাজিক উত্পীড়নও সম্ভবত ওই তালিকার আওতায় পড়বে।
দুই. মৃত্যুর হার
নির্ধারিত হয় কী
দ্বারা?
মানবেতিহাসের যতটা আমরা জানি, তার বেশির ভাগ সময়েই মানুষের গড় প্রত্যাশিত আয়ুষ্কাল ছিল সংক্ষিপ্ত।
গড়ে ২৫ বছর বা আরো কম বেঁচেছেন আমাদের শিকারি-সংগ্রাহক পূর্বপুরুষরা।
লিখিত ইতিহাসে মানুষের গড় আয়ু ৩৭ বছরে ঠেকেছে এই সেদিন— ১৭০০ সালের ইংল্যান্ডে।
তবে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে ব্রিটিশরা এক নাটকীয় পরিবর্তনের মুখোমুখি হন।
প্রত্যাশিত আয়ু ১৮২০ সালে ৪১ বছরে উন্নীত হয় সেজন্য।
বিশ শতকের শুরুতে গ্রেট ব্রিটেনবাসীর গড় আয়ু ছিল ৫০ বছর এবং বর্তমানে তা ৭৭ বছর।
লক্ষণীয়, উল্লিখিত সময়ে খাড়াভাবে নেমেছে শিশুমৃত্যুর হার।
এর
ব্যাখ্যা মেলে।
সাধারণত কম বয়সীরাই সংক্রমণের শিকার হয় বেশি।
অতীতে সিংহভাগ শিশুমৃত্যুর কারণ ছিল নানা ধরনের সংক্রামক রোগ।
চিকিত্সাবিজ্ঞান সেগুলো বশে আনার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে প্রত্যাশিত গড় আয়ুষ্কাল।
এমনকি সার্বজনীন তত্ত্ব আছে, যা দ্বারা বিভিন্ন আর্থসামাজিক শ্রেণীতে, নানা দেশে যুগে যুগে সংঘটিত মানবমৃত্যুর হারের পরিসংখ্যানকে ব্যাখ্যা করা যায়? ডেটনের ধারণা, মৃত্যুহারের সঙ্গে জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ; যদিও তার এ মন্তব্যে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, মৃত্যুহারের ওপর আলোচ্য তিন উপাদানের ভূমিকা জনপ্রতি আয়ের চেয়েও বেশি! ডেটনের অনুমান, আগামীতে চিকিত্সা সেবার উন্নয়ন ও এর উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধিজনিত গতিতে স্বল্পমেয়াদে দেখা দিতে পারে স্বাস্থ্যবৈষম্য।
তবু তিনি আশাবাদী, ধীরে ধীরে তা কমবে এবং শুধু আগে যারা আসবেন তারা নন, ক্রমে সবাই পাবেন সর্বাধুনিক স্বাস্থ্যসেবা।
তিন. কীভাবে বিনষ্ট
হয় বৈদেশিক সহায়তার
কার্যকারিতা?
প্রশ্নটি নৈতিক এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক, পিছিয়ে পড়াদের সহায়তা জোগানো যায় কীভাবে? এ প্রশ্নের জবাবে ডেটনের উত্তর— উন্নয়নের প্রশ্নে অন্যের
পোষকতা এক বড় প্রতিবন্ধকতা।
তাই তিনি চোখ বুজে টার্গেট করে দরিদ্র দেশে অর্থসাহায্য প্রেরণের ঘোরতর বিরোধী এজন্যও যে, মন্দ অর্থ ভালো অর্থকে তাড়িয়ে দেয়।
অনেকে এমন দার্শনিকতায় আস্থা রাখেন যে, কোনো দরিদ্র দেশকে ত্রাণসহায়তা না দেয়ার মানে হলো, একজন ডুবন্ত শিশু থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া।
ডেটনের মতে, এক্ষেত্রে বাণিজ্যের মতো কয়েকটি ইস্যুর প্রতি মনোযোগ বাড়ানো ভালো।
ত্রাণ যে অবিমিশ্র আশীর্বাদ নয়, তা নিশ্চয়ই জানেন ডেটন।
ফলে আমার বিশ্বাস, দুর্যোগকবলিত কিংবা যুদ্ধে বিধ্বস্ত কোনো অর্থনীতিকে ত্রাণসহায়তা দেয়ার বিরোধিতা করেননি তিনি।
শান্তিরক্ষা কিংবা যুদ্ধ-পরবর্তী সহায়তা অথবা প্রতিষেধক গবেষণায় পশ্চিমা অর্থ বিনিয়োগের প্রতিবাদও তার করার কথা নয়।
ডেটনের অগ্নিদৃষ্টি বরং বিভিন্ন দেশের স্থানীয় সরকারে পাঠানো সেসব ডলারের প্রতি, যেগুলো দারিদ্র্য হ্রাস, স্বাস্থ্যে উন্নতি ও প্রবৃদ্ধির বারুদে আগুন দেয়ার কথা বলে ব্যয় হয় দুর্নীতিগ্রস্ত একশ্রেণীর ব্যক্তির ভোগ-বাসনা পূরণে।
নিছক ত্রাণ নয়, ডেটনের ক্ষোভ ত্রাণের রাজনীতির ওপর।
ফলে তার দৃষ্টিতে ত্রাণ উন্নয়নের পথে বাধা এ যুক্তিতে যে, তা অর্থনৈতিক প্রণোদনা বিনষ্ট করে এবং দুর্নীতিগ্রস্ত করে তোলে রাজনীতিকদের।
তদুপরি এটি জনপ্রতিনিধিত্ব ও রাজস্ব আহরণের মতো মৌলিক রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটায়।
আমি জানি না, ত্রাণের পক্ষের লোকজন কী বলবেন।
তবে ত্রাণ কিন্তু সত্যই বহু রাজনীতিককে উচ্ছন্নে নিয়েছে দেশে দেশে।
তাছাড়া এ বাস্তবতাও অনস্বীকার্য, দরিদ্র অর্থনীতিতে প্রচুর অর্থের অন্ধ অনুপ্রবেশে হয় হিতে বিপরীত।
ত্রাণ বণ্টন প্রক্রিয়ার সমস্যা অনেক।
আমার মনে হয়, গোটা ব্যবস্থা বাতিল না করে দুর্বলতা দূর করাই উত্তম।
ডেটন তা-ই বলতে চেয়েছেন হয়তো।
তার মতে, কিছু সমস্যার সমাধান খোঁজা অনর্থক।
এর
মধ্য দিয়ে তিনি কি আমাদের এ কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, অর্থ ব্যয়ের চেয়েও দুরূহ কাজ থাকে আর্থিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নকারীদের সামনে?
লেখক:
অর্থনীতিবিদ










