একথা অনস্বীকার্য, জাহাজ ভাঙা শিল্প নানাভাবে অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে এ শিল্পকে কেন্দ্র করে বেশকিছু উপশিল্পও গড়ে উঠেছে। এসব ইতিবাচক দিক থাকলেও নেতিবাচক দিকও কম নেই। সংলগ্ন এলাকাগুলোর ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের জন্য জাহাজ ভাঙা শিল্প অনেকাংশে দায়ী। এ শিল্পের পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতে শিপ ইয়ার্ডগুলোয় রাসায়নিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর রাখার সরকারি নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও অনেক ইয়ার্ড মালিক এ নির্দেশনা যথাযথভাবে মানছেন না। বিদেশ থেকে আনা পুরনো জাহাজের রাসায়নিক বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় সাগরে ফেলছে অধিকাংশ শিপ ইয়ার্ড। এতে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ছে সামুদ্রিক পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, ক্ষতিকর অয়েল ট্যাংকার ভাঙার হার বাড়ছে বাংলাদেশে। শিপ ইয়ার্ডগুলো এভাবে সরকারি নির্দেশনা অমান্য করার অবস্থা অব্যাহত থাকলে উপকূলীয় অঞ্চলের পরিবেশ-প্রতিবেশ যে পুরোপুরি ধ্বংস হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। চট্টগ্রামের এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থেই শিপ ইয়ার্ডগুলোয় দ্রুত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর করার পদক্ষেপ নিতে হবে। আর এটা করতে হলে ইয়ার্ড মালিকদের স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরেরও নজরদারি আরো বাড়াতে হবে। শিপ ইয়ার্ডে যেসব জাহাজ কাটা হয়, তার বেশির ভাগই অয়েল ট্যাংকার বা তেলবাহী জাহাজ। স্বভাবতই এসব জাহাজে থাকে কালো তেল ও বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক দ্রব্য। কাজেই উল্লিখিত বিষাক্ত পদার্থ যাতে সমুদ্রে মিশতে না পারে, তার জন্য রয়েছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বাধ্যবাধকতা। নিয়ম অনুযায়ী শিপ ইয়ার্ডগুলোয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে অয়েল ওয়াটার সেপারেশন প্লান্ট, ইনসিনারেটরসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার কথা। কিন্তু বাস্তবে এসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হচ্ছে না। সে ফ খরচ কমানোর জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও শিপ ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষ সেগুলো ব্যবহার করছে না বলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন। এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যতিক্রম দেশের পরিবেশগত নাজুকতা যে বাড়িয়ে তুলবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কাজেই এ ধরনের প্রবণতা শক্ত হাতে অবশ্যই প্রতিরোধ করতে হবে।
আশার বিষয়, পরিবেশ অধিদপ্তর এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি শিপ ইয়ার্ডে অভিযান চালিয়েছে। অভিযান চলাকালে অধিকাংশ শিপ ইয়ার্ডের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একেবারে বন্ধ রাখার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অকার্যকর রেখে পরিবেশ দূষণের অভিযোগে এরই মধ্যে কয়েকটি শিপ ইয়ার্ডকে জরিমানাও করা হয়েছে। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে শুধু আর্থিক জরিমানা করলে সেটা হবে গুরুপাপে লঘুদণ্ড। দরকার হলো নির্দেশনা অমান্যকারীদের আরো কঠোর শাস্তি। সেক্ষেত্রে আইন অমান্যকারী শিপ ইয়ার্ডের নিবন্ধন বাতিল করার কথা ভাবা যেতে পারে। এটা হলে শিপ ইয়ার্ড মালিকরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যকর করতে নিজেদের ভেতর থেকে চাপ অনুভব করবেন। প্রায়ই দেখা যায়, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আকস্মিকভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান চলে। কয়েক দিন চলার পর তা বন্ধ হয়ে যায়। অভিযান বন্ধ হলে স্বাভাবিকভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর অপকর্ম আবার শুরু হয়। কাজেই বিষয়টি মাথায় রেখে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান চালিয়ে যেতে হবে। পরিবেশ অধিদপ্তর এখন যে অভিযান পরিচালনা করছে, তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। সংস্থাটির নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান পরিচালনাই পারে পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে জাহাজ ভাঙা শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশ নিশ্চিত করতে। আমরা আশা করি, বিষয়টি বিবেচনায় রেখে পরিবেশ অধিদপ্তর আরো সক্রিয় হবে।
জাহাজ আমদানির ক্ষেত্রে বর্জ্যমুক্ত সনদ প্রদানকারী ক্যাশবায়ার/বর্জ্য প্রত্যয়নকারী সংস্থা/বর্জ্য পরিষ্কারকারী সংস্থাগুলোর তালিকা প্রস্তুতকরণ এবং তাদের কার্যক্রম কঠোর আইনি বিধানের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। জাহাজের পতাকা পরিবর্তন রোধে এবং বর্জ্য বিষয়ে সঠিক তথ্য নিশ্চিত করতে ‘ধূসর’ ও ‘কালো’ পতাকাবাহী (অর্থাৎ আন্তর্জাতিক আইন ভেঙে জাহাজ পরিচালনাকারী রাষ্ট্র, যেমন কমোরজ, পালাও, কম্বোডিয়া, তানজানিয়া, ভানুয়াতু, সেন্টকিটস অ্যান্ড নেভিস, বেলিস, কুক আইল্যান্ড, সিয়েরা লিওন, টোগো ইত্যাদি) দেশ থেকে জাহাজ আমদানি নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেয়া, জাহাজের বর্জ্য বিষয়ে পুরোপুরি এবং বিস্তারিত তথ্য ছাড়া পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক ভাঙার জন্য কোনো জাহাজ আমদানি ও সৈকতায়নের অনুমতি প্রদান না করা; এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর বর্জ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক আইন বাসেল কনভেনশন, দেশে প্রচলিত জাহাজ ভাঙা-বিষয়ক বিধিমালা প্রতিপালন নিশ্চিত করা আবশ্যক। পরিবেশ ছাড়পত্র অমান্যকারী জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডে জাহাজের আমদানি ও ভাঙা অনুমোদন দেয়া যাবে না।
একসময় জাহাজ ভাঙা শিল্পে তাইওয়ানের নেতৃত্ব ছিল। নব্বইয়ের দশকে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়াও শীর্ষস্থানে উঠে আসে। এর পরের দুই দশকে শীর্ষ অবস্থানে ছিল চীন ও ভারত। শ্রমিক ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হওয়ায় অনেক দেশ এ শিল্প থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়ে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের দিকে ঝুঁকেছে। তাইওয়ান, চীন, স্পেন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, ক্রোয়েশিয়া প্রভৃতি দেশ এর ক্ষতিকর দিক বিবেচনা করে এ শিল্প থেকে সরে গেছে। ২০০৮ সাল নাগাদ এসব দেশের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের মতো উপকূলবর্তী স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় উৎপাদন বেড়েছে। বাংলাদেশে এ শিল্পের প্রসার বাড়লেও নিশ্চিত হয়নি কাজের সঠিক পরিবেশ। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কোনো রকম সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা (ভারী বুট, হার্ড হ্যাট, গ্যাস মাস্ক ইত্যাদি) ছাড়া কাজ করার কারণে প্রায়ই শ্রমিক মারা যান দুর্ঘটনায়। জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতির কারণে প্রায়ই বিস্ফোরণ ঘটে। এ শিল্পের শ্রমিকদের কাজের ঝুঁকি অনেক বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে জাহাজ কেনার ক্ষেত্রে চলছে প্রতিযোগিতা। গত দুই বছরে তো ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। বেশির ভাগ দেশের জাহাজ ভাঙা থেকে দূরে আসার মূল কারণ ছিল পরিবেশ দূষণ। এসব দেশ ইস্পাত পণ্য তৈরির জন্য প্রাথমিক কাঁচামাল হিসেবে পুরনো লোহার টুকরো বা মৌলিক কাঁচামাল আকরিকের ওপর নির্ভরশীল। এক্ষেত্রে এমন পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে শিল্প ও পরিবেশ-শ্রমিক সবাই বাঁচে। কেবল আইনের প্রয়োগ নয়, দুর্ঘটনা বা মৃত্যুঝুঁকি কমাতে পরিত্যক্ত জাহাজ শিপইয়ার্ডে আনার আগেই বিষাক্ত গ্যাস ও বর্জ্যমুক্ত করা জরুরি। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, বাংলাদেশে আইনের ফাঁকফোকর ও তা প্রয়োগে দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর জাহাজ এনে ভাঙার প্রবণতা বাড়ছে। আমরা চাইব, সরকার জাহাজ ভাঙা শিল্পকে একটি গাইডলাইনের মধ্যে আনবে এবং ক্ষতিকর অয়েল ট্যাংকার আসা নিয়ন্ত্রণ করবে। এক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ও যথাযথ ভূমিকা পালন করবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।










