বাংলাদেশ ব্যাংক-এ কর্মরত আমার এক প্রাক্তন ছাত্র এই ছবিটি ( ১৯৯৯ সালে ব্যাংক সংস্কার কমিটির প্রতিবেদনের প্রচ্ছদ) তুলে আমাকে পাঠিয়ে বলেছে রিপোর্টটি ব্যাংকের লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত আছে এবং সে এটি পড়ে খুব উপকৃত হয়েছে। তার মতে ব্যাংক খাত সংস্কারের সব নির্দেশনাই এতে আছে। তবে আমার মতে, এই রিপোর্টের কিছু বিষয় যুগোপযোগী করা দরকার। যেমন -বাজার অর্থনীতিতে শেয়ার কিনে একটি ব্যাংকের মালিকানা দখল করার সুযোগ থাকে। কিন্তু এ সুযোগের অপব্যবহার করে এ খাতে একচেটিয়া দখলদারি তৈরি হওয়া যে বিপজ্জনক এবং তার প্রতিকারের কিছু নিয়মনীতি থাকা যে দরকার তা এই রিপোর্টে নাই। অলাভজনক খেলাপি প্রতিষ্ঠান বন্ধের জন্য দেউলিয়া আইনের সুযোগ দেয়ার ব্যাপারেও তেমনটা বলা হয় নাই। তার চেয়ে বড় কথা হলো এত আয়োজন ও পরিশ্রম  করে তৈরী সংস্কারের রিপোর্ট তো লাইব্রেরীতে সেলফবন্দি হয়ে থেকে লাভ নেই যদি বাস্তবায়ন না হয়। 

এই রিপোর্টের বেশ কিছু সুপারিশ এক সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা প্রবিধি হিসাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে ব্যাংকিং আইনে রূপান্তরিত করা হয়নি বলে সেগুলো আর কার্যকর থাকেনি। বরং ব্যাংকিং আইনে বিধিনিষেধগুলো আরো শিথিল করার ফলে অনিয়মের সুযোগ আরো বেড়ে গেছে।

মনে আছে নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে এই সংস্কার কমিটির কাজ শুরু করার সময় ব্যাংক মালিকদের সংঘটনের মিটিংয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনারা তো ব্যক্তিখাতে ব্যাংকিং ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করেছেন মুনাফা পেতে, ব্যাংক ভালো চললে তো আপনাদেরই লাভ। উত্তরে সংঘটনের সভাপতি যা বললেন তার সারাংশ দাঁড়ায়, ‘বোকার ভান করবেন না, মূলধন ছাড়াও অনেক বাড়তি খরচ করে ব্যাংক দিয়েছি; এখন নিজেদের জন্য সেই ব্যাংকের আমানতের অন্তত কিছু অংশ নিয়ে নেব না তা কি হয়?’ সে সময় বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের তিন ভাগের এক ভাগই ছিল উদ্যোক্তা-পরিচালকদের নেয়া ঋণ, যার অধিকাংশই ছিল খেলাপি। 

পরবর্তীতে ব্যাংক সংস্কারের জন্য গৃহীত পদক্ষেপ ও উচ্চ আদালতের সক্রিয়তার কারণে অন্তত ৫৪ জন উদ্যোক্তা-পরিচালককে অপসারণ করা হয় নিজেদের ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণ খেলাপি হওয়ার কারণে, এছাড়া আরও ৭৩ জন তাদের নেয়া ঋণ নিয়মিত করতে বাধ্য হন, আর ৮ জন তখন আদালতের স্থগিতাদেশ নিতে সক্ষম হন। এর পর থেকে উদ্যোক্তা-পরিচালকদের এ ধরনের ঋণ নেয়ার সংস্কৃতির অবসান হয়; দেখা গেল যে আইনত যে পরিমাণ ঋণ তারা নিতে পারেন, তাও নিচ্ছেন না।

ইদানীংকালে ব্যাংকিংখাতে নিয়ম নীতি শিথিল করার ফলে আরও মারাত্মক ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে। অবস্থা দেখে মনে হয় এক সময় কিছুদূর অগ্রসর হয়ে আমরা যেন আবার পেছনের দিকে হাঁটছি।

লেখক: অর্থনীতিবিদ