বিশ্বব্যাংকের রিভিলড কম্পারেটিভ অ্যাডভানটেজ (আরসিএ) মানদণ্ডে দেশে অপ্রতিদ্বন্দ্ব্বী এখন পাট। বাংলাদেশে পাটের আরসিএ মান ৪৮৮। দেশে গত বছর প্রায় ৮৬ লাখ বেল পাট উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া পাট ও পাটজাতীয় পণ্যের মাধ্যমে রফতানি আয় হয়েছে ৮৮ কোটি ২৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ফলে আরসিএ মান বেশি থাকায় দেশে আরো বেশি পাট উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে অধিক সুবিধা নেয়ার সুযোগ রয়েছে। বিশ্বব্যাপী পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধির ফলে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর শিল্প-রাসায়নিক দ্রব্যসামগ্রীর পরিবর্তে অর্গানিক বা পচনশীল ও নবায়নযোগ্য দ্রব্যসামগ্রীর চাহিদা বাড়ছে। এদিক থেকে পাটের সামনে বড় সম্ভাবনার দুয়ার খুলে গেছে। বিশ্ববাজারের দিকে তাকালেও পাট ও পাটজাতীয় পণ্যের উজ্জ্বল সম্ভাবনা লক্ষ করা যায়। জার্মানি, ফ্রান্স, পর্তুগাল প্রভৃতি পরিবেশসচেতন ইউরোপীয় দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র, আফ্রিকা ও এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো প্রাকৃতিক তন্তুর ব্যবহার বাড়িয়েছে এবং বাড়াচ্ছে। শুধু পাটের আঁশ নয়, পাটকাঠি বা পাটের সোলাও আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন পণ্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পাটকাঠি থেকে জ্বালানি হিসেবে চারকোল ও এর গুঁড়া থেকে ফটোকপিয়ার মেশিনের কালি তৈরি হচ্ছে। এছাড়া পাট থেকে মণ্ড ও কাগজ তৈরির ক্ষেত্রেও ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্ববাজারে বহুমুখী পাটপণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা আমাদের পাট শিল্পের সামনে যে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, তা সদ্ব্যবহার করতে হবে এবং সেজন্য এ খাতের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। পাট খাতকে জাতীয় প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালকে পরিণত করা সম্ভব—বিশেষজ্ঞদের এই প্রত্যয় বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। এজন্য পাট শিল্পের সহায়ক নীতি প্রণয়ন করতে হবে এবং সেগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাটপণ্যের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ও রফতানি বাড়ানোর লক্ষ্যে বহুমুখী পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। প্রযুক্তি ঘাটতি, আকর্ষণীয় পণ্য তৈরিতে পিছিয়ে থাকা, বিপণনে অনভিজ্ঞতা, বড় বিনিয়োগের অভাব—এ রকম অনেক দুর্বলতা নিয়ে চলছে পাট শিল্প। এ খাতে সরকারি যতটুকু বিনিয়োগ, সেটা আসলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোয় ভর্তুকি দিতেই ব্যয় হয়ে যায়। পণ্য উৎপাদন কিংবা মানসম্পন্ন পণ্যের পেছনে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

পাটপণ্য রফতানির ক্ষেত্রে আমরা কিছু বাজার হারিয়ে ফেলেছি। নতুন বাজারও তৈরি হচ্ছে না। কয়েক বছর আগেও পাটপণ্য রফতানির ৩০-৩৫ শতাংশ যেত ভারতে। সেই বাজারে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ হওয়ায় রফতানি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের পাটপণ্যের আরেক বড় বাজার ইরানে রফতানি করা যাচ্ছে না নিষেধাজ্ঞার কারণে। দেশটির উদ্যোক্তাদের সঙ্গে উদ্যোক্তারা ডলারে লেনদেন করতে পারেন না। সুদান আরেকটি বড় বাজার হলেও সেখানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা চলছে। ফলে রফতানি বন্ধ। একই অবস্থা সিরিয়ায়। অন্যদিকে ঘানার বাজার ভারতের অধিকারে। আফ্রিকার দেশগুলোয় পাটপণ্যের চাহিদা থাকলেও সেখানে আমরা যেতে পারছি না। কারণ সেসব দেশে আমাদের কূটনৈতিক যোগাযোগ শক্তিশালী নয়। রফতানির পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ বাজারের অবস্থাও করুণ। সরকার দেশে পাটের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০১০’ প্রণয়ন করে। সেই আইন অনুযায়ী ২০১৩ সালে ধান, চাল, গম, ভুট্টা, সার ও চিনি—এই ছয় পণ্য সংরক্ষণ, সরবরাহ ও মোড়কীকরণে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। উদ্যোক্তাদের আশা ছিল, পাটের বস্তা ব্যবহারে বড় ধরনের সাড়া পাওয়া যাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা লক্ষ করছি, শুধু ধান, চাল ও গমে পাটের মোড়ক ব্যবহার হচ্ছে, তবু সেটি স্বল্প আকারে। ছয়টি পণ্যে পাটের বস্তা বাধ্যতামূলক করা গেলে দেশে পাটকলের সংখ্যা দ্বিগুণ হতো। অন্ততপক্ষে ১৯ পণ্যে বাধ্যতামূলক পাটের বস্তা ব্যবহারের নির্দেশনাটি যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই পাটপণ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়বে। পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ানো গেলে পাটকলগুলোর রুগ্?ণ দশা কিছুটা হলেও কাটবে। বছরের মধ্যে ইউরোপের অনেক বাজারে প্লাস্টিকের ব্যাগ নিষিদ্ধ হয়ে যাবে। সেই বাজার কিন্তু বিশাল। প্লাস্টিকের ব্যাগের বিকল্প হতে পারে পাটের ব্যাগ। সম্ভাবনাটি কাজে লাগাতে হলে উৎপাদন খরচ কমাতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে তোলার বিকল্প নেই।

পাটে মূল্য সংযোজন (ভ্যালু অ্যাড) বিলিয়ন ডলারের বিশ্ববাণিজ্যের দুয়ার খুলে দিয়েছে। উৎপাদন সহায়ক মাটি এবং আবহাওয়ার সুবাদে বিশ্বের সেরা পাট জন্মে এখানে। এ পাট থেকে তৈরি বহুমুখী পণ্য এখন নজর কাড়ছে বিদেশেও। কেননা পরিবর্তিত বিশ্ববাণিজ্যের পরিস্থিতিতে প্রচলিত পাটপণ্যে খুব বেশি এগোনোর সুযোগ কম। তাই বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নতুন বহুমুখী পাটপণ্যে নজর দিতে হবে। এর মাধ্যমেই পাট শিল্পের বিশাল বাজারে এ দেশের অংশ বাড়ানো যেতে পারে। পাট শিল্পের উন্নয়নে পাটপণ্যের বহুমুখীকরণের বিকল্প নেই। বর্তমানে ভারত, চীনসহ কয়েকটি দেশ পাটের আঁশের সঙ্গে অন্যান্য ন্যাচারাল ফাইবার ও পলি প্রোপাইলিন যুক্ত করে নানা জিনিস তৈরি করছে। ভারতীয় রেলওয়ে এরই মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে কাঠ ও প্লাইউড ব্যবহার কমিয়ে পাট থেকে জুট বোর্ড উৎপাদন ও ব্যবহার করছে। জুট ফাইবারের সঙ্গে কটন ব্লেন্ডিং করে তারা হোম ফার্নিশিং ও হোম টেক্সটাইল পণ্য তৈরি করছে। আমাদের এ পথে এগোতে হবে। এরই মধ্যে পাটের জিনোম সিকোয়েন্সিং হয়েছে। পলিথিনের ব্যাগের মতো পাটের পলিথিন ব্যাগ আবিষ্কার করেছেন বাংলাদেশী বিজ্ঞানীরা। এসব আবিষ্কার তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে দিতে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার বিকল্প নেই।