খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে প্রথম। গত ১০ বছরে এর উৎপাদন বেড়েছে ৭৮ শতাংশ, যা সরকারের অন্যতম সাফল্য। তেলাপিয়া উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, প্রায় চার লাখ টন। অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে চতুর্থ এবং বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম। নিঃসন্দেহে এটা জাতির জন্য গর্ব এবং অহংকারের বিষয়। দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়গুলোয় ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম কারণ ইলিশ আহরণে নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলার প্রবণতা আগের তুলনায় বেড়েছে। প্রজনন ঋতুতে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা আগের তুলনায় বেশি কার্যকর হচ্ছে। এ ব্যাপারে জেলেদের সচেতনতা বেড়েছে, সরকারি প্রশাসনের নজরদারি ব্যবস্থাও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। এর পরে রয়েছে পুকুর ও ছোট জলাশয়ে মাছ চাষের ক্ষেত্রে অগ্রগতি। এক্ষেত্রে দেশের মৎস্যজীবী ও সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের ভূমিকা বিরাট। মৎস্য বিজ্ঞানীদের অবদানও রয়েছে। তারা বিভিন্ন প্রজাতির দেশী মাছের উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছেন, যেগুলো চাষীরা পুকুর ও ছোট জলাশয়ে পরিকল্পিতভাবে এবং বাণিজ্যিক লক্ষ্যে উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছেন। বিজ্ঞানীরা অনেক বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির দেশী মাছের আধুনিক চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন এবং চাষীরা সেগুলো উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছেন বলে ওই মাছগুলো বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে।

মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আমাদের যেমন আত্মতৃপ্তির সুযোগ আছে, ঠিক তেমনি সামনের বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখা। তা করতে হলে চাষীদের মানসম্মত পোনা ও খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। করোনার প্রভাবে মৎস্য সম্পদে যে ক্ষতিটুকু আমাদের হবে, তা পুষিয়ে উৎপাদন আরো বাড়াতে হলে অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত জলাশয় যেমন নদ-নদী, প্লাবন ভূমি, সুন্দরবন হাওড়-বাঁওড়, কাপ্তাই লেক ইত্যাদি জলাশয়কে বিজ্ঞানভিত্তিক চাষ ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার লক্ষ্যে নিরাপদ মৎস্য উৎপাদন এখন সময়ের দাবি। বাংলাদেশ বর্তমানে ৫৮টি দেশে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রফতানি করছে। মানসম্মত পণ্য রফতানির লক্ষ্যে পরীক্ষার জন্য মৎস্য পরিদপ্তরের আওতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় আন্তর্জাতিক মানের তিনটি মান নিয়ন্ত্রণাগার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে মৎস্য ও মৎস্যজাতীয় পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। একে আরো বেগবান করতে গবেষণা ও মান পরীক্ষার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হবে।

মাছের আবাসস্থল উন্নয়ন করা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে পুকুর-ডোবা, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড়, নদী-নালায় পলি জমে ভরাট হয়ে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন, অবাধ বিচরণের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব জলাশয় সংস্কার ও খননের মাধ্যমে দেশীয় মাছের আবাসস্থল পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রতিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে। সম্ভাবনাময় হাওড়াঞ্চলের মৎস্য সম্পদ আজ ক্রমহ্রাসমান, যার অধিকাংশ মানবসৃষ্টির কারণে। উৎপাদন হ্রাসের প্রধান কারণগুলো হলো বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের বাঁধ নির্মাণ, মাছের চলাচল পথে জালসহ নানা ধরনের ফাঁদ স্থাপন, নির্বিচারে ডিমওয়ালা ও পোনা মাছ নিধন, বিল-জলমহাল ইজারা গ্রহীতাদের সব মাছ আহরণের প্রবণতা, ফসল উৎপাদনের জন্য শুষ্ক মৌসুমে বিল থেকে পানি সেচ দিয়ে জলাশয় শুকিয়ে ফেলা, নৌপথে চলাচলকারী বিপুলসংখ্যক বালি ও পাথরবাহী নৌযানের বর্জ্য নিষ্কাশন, উজান থেকে নেমে আসা পানির সঙ্গে প্রচুর পরিমাণে পলি জমে নদী-বিল-হাওড় এলাকা ভরাট হয়ে যাওয়া, অধিকসংখ্যক মাছ আহরণকারী কর্তৃক অবৈধ জালের ব্যাপক ব্যবহার করে সব আকারের মাছ নিধন ইত্যাদি অন্যতম। হাওড় অঞ্চলে মৎস্য সম্পদের উন্নয়ন ও উৎপাদন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হলে টেকসই পরিবেশবান্ধব, জনগণের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ও বাস্তবমুখী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। হাওড়ে প্রায় পাঁচ মাস পানি থাকে। মৌসুমের শুরুতেই বিল, নার্সারি কার্যক্রম বাস্তবায়ন, পোনা মজুদ ও সমাজভিত্তিক সংরক্ষণের মাধ্যমে সহজেই মাছ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

বাংলাদেশের মানুষের মোট প্রাণিজ আমিষের চাহিদার অর্ধেকের বেশি অংশ এখন পাওয়া যাচ্ছে মাছ থেকে। আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর, বিশেষত নারী ও শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হার এখনো বেশি। তা কাটিয়ে উঠতে মাছের অবদান দিন দিন বাড়ছে। তবে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় এবং সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক প্রজাতির মাছের দাম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার বাইরে রয়েছে। এদিকে নজর দেয়া প্রয়োজন, যেন মাছের দাম সর্বসাধারণের নাগালের মধ্যে আনা যায়। তাছাড়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মাছের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করা। এজন্য তদারকি জোরদারের বিকল্প নেই। এ সাফল্য ধরে রাখা এবং ধারাবাহিক অগ্রগতি অর্জনের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অবশ্যই প্রয়োজন। সরকারিভাবে মাছ সংরক্ষণের জন্য বেশকিছু হিমাগার নির্মাণ করা দরকার। কৃষিঋণের উল্লেখযোগ্য অংশ মৎস্য খামারিদের দেয়া যুক্তিযুক্ত। মাছ চাষে প্রচলিত ও গতানুগতিক ব্যবস্থাপনার বিপরীতে উন্নত ও আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ব্যবস্থা করতে হবে। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে দেশীয় প্রজাতির মাছকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা যাবে এবং উৎপাদন বেড়ে যাবে। চাষীদের মানসম্মত পোনা ও খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। মৎস্য খাতে আর্থিক প্রণোদনা বৃদ্ধি করতে হবে। মৎস্য অভয়াশ্রম বাড়াতে হবে। পরিবেশ ও প্রতিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে। মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার লক্ষ্যে নিরাপদ মৎস্য উৎপাদন এখন সময়ের দাবি। সাফল্যের এ ধারা অব্যাহত রাখতে নিয়মিত দিকনির্দেশনা ও মনিটর করতে হবে। মাছ চাষের ক্ষেত্রে যথাযথ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণে তাদের বর্ধিত সহায়তা প্রদান, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনে যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেশীয় অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। এতে চাষীরা যেমন তাদের বিদ্যমান প্রচেষ্টা ধরে রাখতে এবং আরো বেগবান করতে সমর্থ হবেন, একই সঙ্গে বর্ধিতসংখ্যক জনগণ মৎস্য চাষে উৎসাহী হবে। হয়তো একটিও পুকুর কিংবা দীঘি মৎস্য চাষের বাইরে থাকবে না। হাজামজা অসংখ্য পুকুর, দীঘি ও জলাশয় রয়েছে, যা সংস্কার করে চাষের আওতায় আনা কঠিন কিছু নয়। একটি সঠিক মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা অবশ্যই সম্ভব। ব-দ্বীপ পরিকল্পনা যেন এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।