এক শতকের মধ্যে কভিড-১৯ মহামারী সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য সংকট এবং আধুনিক যুগে এটি গভীরতর অর্থনৈতিক মন্দা সৃষ্টি করেছে। চলমান মহামারী বিশ্বজুড়ে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী ব্যবস্থায় নাজুকতা উন্মোচন করেছে, বিপুল অসমতার বিষয়টি সামনে এনেছে এবং আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থায় বড় ধরনের ডিজিটাল ব্যাহতকরণ কীভাবে বিস্তৃত হতে পারে, সেটিও দেখিয়েছে। আমরা যেমন মনে করেছিলাম, স্পষ্টতই আমাদের সমাজ ও অর্থনীতিগুলো আসলে তেমন স্থায়িত্বশীল নয়।
কভিড-১৯ মহামারী মোকাবেলায় সাড়া দেয়া এতটা কঠিন হওয়ার একটা কারণ আমরা খুঁজে পেয়েছি। আর তা হলো, আমাদের ব্যবস্থা থেকে ব্যাপকভাবে আমরা শিথিলতার পরিসরগুলো অপসারণ করেছি। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকারিতা ও সময়মতো উৎপাদনসংক্রান্ত বেদবাক্যের শিষ্যে পরিণত হয়েছে, আর্থিকভাবে সংকটে থাকা সরকারগুলো এমনকি মৌলিক সেবা প্রদানে হিমশিম খেয়েছে এবং আমরা প্রাকৃতিক ব্যবস্থাগুলোকে তাদের অন্তিম সীমানায় ঠেলে দিয়েছি। এখন যখন বড় সংকট সামনে এল তখন আমরা দেখতে পাচ্ছি যেটিকে অত্যধিক শিথিলতা মনে করা হয়েছিল, সেটি ছিল আবশ্যকীয় অতিরেক মাত্র।
জলবায়ু পরিবর্তনের পুরোপুরি প্রভাব এবং মানুষের জন্য অপরিহার্য প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ব্যাহত হওয়াসহ কভিড-১৯-এর বহুমুখী প্রভাব থেকে আরো কিছু সংকট আমাদের সামনে প্রতীক্ষা করছে। কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়া কিছু সংকট অবশ্যম্ভাবীভাবে ‘অপ্রত্যাশিত ও আকস্মিক ঘটনা’ (কালো রাজহাঁস) হিসেবে আবির্ভূত হবে। এছাড়া আরো অনেক সংকটও সামনে আসবে, যেগুলোকে মিশেল ওয়াকার ‘ধূসর গন্ডার (গ্রে রাইনো)’ ঘটনা বলে অভিহিত করেছেন। এসব ঘটনা ব্যাপকভাবে অনুমানযোগ্য এবং এতে উচ্চ প্রভাবসম্পন্ন হুমকিও বিরাজমান; যদিও সেগুলোকে আমরা প্রায় ক্ষেত্রে উপেক্ষা করে থাকি।
সব শীর্ষ নির্বাহীর নিজেদের কার্যমেয়াদে অন্তত একটি প্রধান অভিঘাত অনুমান করা উচিত এবং তার ভিত্তিতে প্রস্তুতি গ্রহণ ও নেতৃত্ব দেয়া উচিত। ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর কভিড-১৯ মহামারীর প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ থাকলেও সেগুলোয় তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ-সাড়ার ওপর এখনো বেশি জোর দেয়া হচ্ছে। কাজেই সাম্প্রতিক এক গবেষণায় আমাদের নিজেদের সংস্থা দুটি কীভাবে কোম্পানিগুলো তাদের দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা ও পরিকল্পনার উন্নয়ন ঘটাতে পারে এবং একই ধরনের ভবিষ্যৎ ঘটনাগুলো মোকাবেলায় ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারে, সেটি অনুসন্ধান করেছে।
আমাদের গবেষণা কাজটি মূলত ওয়ার্ল্ড বিজনেস কাউন্সিল ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের সদস্যদের সঙ্গে আলাপ-সংলাপ এবং এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকাস অঞ্চলে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে করা হয়েছে। এতে সাসটেইনেবিলিটি লিডারস সার্ভে থেকে মহামারীর প্রভাব সম্পর্কিত অন্তর্দৃষ্টিগুলো সংযোজন করা হয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বশীলতা ও কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পদক্ষেপ-সাড়াগুলো বৃহত্তর মাত্রায় পর্যালোচনা করা হয়েছে।
ওই গবেষণায় ব্যবসার জন্য প্রধান তিনটি শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। প্রথমত, আমরা ধূসর গন্ডার বা কালো রাজহাঁসের মতো ঘটনাগুলো লুকাতে পারি না। অংশত আমাদের ব্যবস্থাগুলোয় শিথিলতার পরিসর ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে কোম্পানিগুলোকে জ্ঞাত ও অজ্ঞাত উভয় ধরনের হুমকিগুলো সম্পর্কে অবশ্যই ভালোভাবে প্রস্তুত হতে হবে। ভবিষ্যৎ অভিঘাতগুলো প্রতিরোধ করতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বশীলতা সম্পর্কে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোভাব পরিবর্তন করতে হবে। আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তাদের অবশ্যই মেনে নিতে হবে যে একটি কোম্পানির স্থায়িত্বশীলতা কেবল প্রতিষ্ঠানটির চার দেয়ালের অভ্যন্তরে সম্পাদিত কর্মকাণ্ড দ্বারা নয়, বরং ইকোসিস্টেম, জনগোষ্ঠী, অর্থনৈতিক অবস্থা, আইনের শাসন, কার্যকর সুশাসন এবং আরো অনেক কিছু দ্বারা নির্ধারিত হয়।
দ্বিতীয়ত, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় স্থায়িত্বশীলতার বিষয়টি দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করতে হবে। একবার নিজেদের চর্চায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে অবক্ষয়িত হওয়া থেকে তা (পড়ুন স্থায়িত্বশীলতা) প্রতিহত করতে হবে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। যেসব প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যৎ দৃশ্যপটগুলো সম্পর্কে অনুমান ও ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে সমর্থ হবে, তারা যেকোনো অভিঘাতের প্রভাব প্রশমন করতে পারবে এবং খুব দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। আমরা পেয়েছি যে গভীরভাবে প্রোথিত ও সব পর্যায়ে ব্যাপকভাবে বোধগম্য মূল্যবোধ এবং উদ্দেশ্যসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো সংকটকালে অধিক কর্মতত্পর, ক্ষিপ্র ও দৃঢ়সংকল্প হতে পারে। উদ্দেশ্য ও রূপকল্প বিষয়ে সংগঠনের মধ্যে সাংস্কৃতিক মৈত্রী আস্থা ও উন্মুক্ততা বিনির্মাণে সহায়তা করে, যা কার্যকর অভ্যন্তরীণ ও বহিঃস্থ যোগাযোগের পাশাপাশি পারস্পরিক সহযোগিতার জন্য আবশ্যক।
তৃতীয়ত, করপোরেট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, মানব ও সামাজিক পুঁজি এবং পরিবেশগত, সামাজিক ও পরিচালনগত (ইসিজি) তথ্যে উন্নত অ্যাপ্রোচের মাধ্যমে কোম্পানিগুলো দীর্ঘমেয়াদি বৃহত্তর স্থায়িত্বশীলতা তৈরি করতে পারে।
ভালো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উল্লেখযোগ্যভাবে গতানুগতিক আইন-বিধিভিত্তিক অ্যাপ্রোচ থেকে অধিক নমনীয়, নিয়মিত এবং প্রক্রিয়ামুখী পদ্ধতিতে স্থানান্তরের কথা বলে, যা চলমান শিক্ষা ও অনুসন্ধানের কাজটি সমর্থ করে তোলে। একই সঙ্গে গতানুগতিকতার বাইরের চিন্তা আরো বিকাশ ঘটাতে পারে এবং ভবিষ্যতের হুমকিগুলো অনুমান করতে পারে—এমন টুলস ও অ্যাপ্রোচ সন্নিবিষ্ট করাও প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রয়োজন।
মানব ও সামাজিক পুঁজির উন্নয়নে প্রতিষ্ঠানের ভেতর-বাইরের লোকজনের কথা এবং তদানুযায়ী সাড়া প্রদান করা গুরুত্বপূর্ণ। অধিকন্তু, কর্মীদের সুরক্ষা বাড়ানোর বিষয়টিকে অবশ্যই কোম্পানিগুলোর বিবেচনায় রাখতে হবে। এছাড়া যেহেতু একটা সম্প্রসারিত সময় পর্যন্ত মহামারীর স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক অভিঘাতে ভারসাম্য ধরে রাখায় আমরা আগ্রহী, সেহেতু আমাদের অবশ্যই অব্যাহতভাবে কর্মীদের জন্য ওইসব সুরক্ষা ব্যবস্থা অভিযোজন ও সম্প্রসারণ করতে হবে, যারা একে অন্যের সঙ্গে এবং জনসাধারণের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করছে।
চূড়ান্তভাবে, বিশেষত সাধারণ মানদণ্ড ও পরিমাপক গ্রহণ ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই ইসিজি ডিসক্লোজার উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হবে এবং মহামারীকালে (কর্মীদের মঙ্গল, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তি এবং নিরাপত্তা) ব্যবসায়িক স্থায়িত্বশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর ওপর অধিক তথ্য জোগাতে হবে। অংশীজনদের দৃষ্টিকোণে ব্যাপকতর বৈচিত্র্য, দীর্ঘ সময়ের ফ্রেম এবং বৃহত্তর দৃশ্যপট পরিকল্পনাসহ কোম্পানিগুলোর নিজস্ব স্থায়িত্বশীলতা মূল্যায়নের উন্নয়ন এবং ডিসক্লোজার ও কৌশলের সামাজিক ইস্যুগুলোর বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া জরুরি।
স্থায়িত্বশীলতা যতটা একটি স্থিত অবস্থা বজায় রাখা সম্পর্কিত, তার চেয়ে বেশি চাপের মুখে ক্ষিপ্র, গতিশীল, রূপান্তরমূলক আচরণ ও পদক্ষেপ গ্রহণ-সম্পর্কিত। এটি নিশ্চিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বের উদ্দেশ্য ও মূল্যবোধ, অংশীজনদের সম্পৃক্তি উন্নয়ন এবং সরবরাহ নিগড় পুনর্বিন্যাসে জোর দেয়া জরুরি। সর্বোপরি, প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা, নতুন ও টেকসই ব্যবসায়িক মডেল এবং আচরণকে স্বাগত জানাতে হবে।
প্রকৃত স্থায়িত্বশীলতা কঠিন পরিস্থিতি প্রতিরোধ করা সম্পর্কিত নয়, বরং সাংগঠনিক ও ব্যবস্থাগত পর্যায়ে ওই পরিস্থিতি যে ধরনের অভিঘাত সৃষ্টি করে, সেগুলোকে আলিঙ্গনপূর্বক প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া সম্পর্কিত। কাঁচামাল ও পরিচালনগত কার্যকারিতায় নির্ভরযোগ্য প্রবেশাধিকার থেকে কেবল স্থায়িত্বশীলতা আসে না, বরং দক্ষ ও স্বাস্থ্যবান জনশক্তি এবং প্রাণবন্ত জনগোষ্ঠী পেতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের স্বীকৃতি ও সুরক্ষা থেকেও এটি আসে। এজন্য প্রয়োজন প্রধান প্রধান ইকোসিস্টেমের সুরক্ষা ও সম্প্রসারণ এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক আইনের শাসন, পর্যাপ্ত জাতীয় ও স্থানীয় বাজেট নিশ্চিত করা। আর এর মানে হলো, চ্যালেঞ্জ ও ব্যাহতকরণের মুখে মূল্য সৃষ্টিতে উদ্ভাবনের কেন্দ্রীয় ভূমিকার স্বীকৃতি।
কভিড-১৯ স্থায়িত্বশীলতা সম্পর্কে পুনঃচিন্তনে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্য করছে। পরিবর্তন ঠেকাতে নিজেদের সামর্থ্য জোরদারের চেষ্টার পরিবর্তে কীভাবে অভিযোজন ও সমন্বয় করতে হয়, সেটি অবশ্যই শিখতে হবে, যদি তারা নিয়োগর্কতা হিসেবে, মূল্য সংযোজনকারী হিসেবে এবং বিশ্বজুড়ে জনগোষ্ঠীগুলোর বিশ্বস্ত সদস্য (এবং সেবক) হিসেবে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে চায়।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]
ক্যারিন জেমস: এনভায়রনমেন্টাল রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্টের প্রধান নির্বাহী
পিটার ব্যাকার: সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী, ওয়ার্ল্ড বিজনেস কাউন্সিল ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির










