মার্কিন নির্বাচন কীভাবে শেষ হবে সেটা এখন আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তবে একটা বিষয় স্পষ্ট যে আমেরিকান ভোটাররা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করেননি। বিষয়টি কিছু আমেরিকানের জন্য হতাশাজনক। কারণ তারা মনে করেন ট্রাম্পের এই পদে থাকাটা খুব বেশি বিপজ্জনক ও অমার্জনীয়। এই নির্বাচনটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে দেশটি কতটা গভীরভাবে বিভক্ত... এক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট পদে ট্রাম্প বা জো বাইডেন যেই থাকুন না কেন (যেহেতু ফলাফল এখনো নিশ্চিত নয়)।
এরই মধ্যে আমরা জানি যে, পুনর্নির্বাচিত হলে ট্রাম্প কীভাবে দেশ পরিচালনা করবেন। আর যদি বাইডেন জয়ী হন, তবে তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিনি প্রত্যেক আমেরিকানের প্রতিনিধিত্ব করবেন। তিনি আমেরিকানদের সঙ্গে নিয়ে মহামারী ও ভেঙে পড়া অর্থনীতিসহ অন্যান্য সমস্যার মোকাবেলা করবেন।
গতকাল বুধবার ডেলাওয়ারে দেয়া ভাষণে বাইডেন বলেন, আমরা ডেমোক্র্যাট হিসেবে প্রচারণা চালাচ্ছি। কিন্তু আমি একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেশ পরিচালনা করবো। প্রেসিডেন্ট পদ নিজেই কোনো দলীয় প্রতিষ্ঠান হতে পারে না। পুরো জাতির মধ্যে এটাই একমাত্র অফিস, যেটা প্রত্যেকের প্রতিনিধিত্ব করে। এটা সমস্ত আমেরিকানকে দেখভালের দায়িত্ব নেয় এবং আমি সেটিই সঠিকভাবে করবো।
একটি সুস্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থায় দেশকে এই সমস্যাগুলোর সমাধানে ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। তবে এটা পরিষ্কার নয় যে এই সঙ্কটময় মুহূর্তে এবং বিভক্ত জাতি নিয়ে এই ধরনের ঐক্য সম্ভব কিনা। আমেরিকানদের ঐক্যবদ্ধ করতে এবং জনগণের প্রয়োজনের প্রতি সাড়া দেয়ার জন্য বাইডেনকে এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, যেখানে শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকট ও সবচেয়ে খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থার মহামন্দার মাঝেও প্রায় অর্ধেক ভোটার ট্রাম্পকে সমর্থন করেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো এতকিছুর পরও কেন ভোটের বিচারে ট্রাম্প এতো জনপ্রিয়? একটি কারণ হতে পারে বাইডেনের দলের দুর্বল কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কিছু কারণ হতে পারে নির্লজ্জভাবে মিথ্যা বলায় ট্রাম্পের ক্লান্তিহীন কসরত, তার অগণিত মিথ্যাচারের প্রতি অনেকের সমর্থন, সর্বদা জটিল রিপাবলিকান কৌশল ও তাদের ডানপন্থী গণমাধ্যমগুলোর অন্ধ সমর্থন। যদিও এগুলো পুরো গল্পটি তুলে ধরে না।
বাইডেন তার প্রচারে মহামারীতে অনেক বেশি মনোযোগ দিয়ে ভুল করেছেন বলে মনে হয়। এটির পাশাপাশি করোনাভাইরাস আঘাত হানার আগ পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে সেরা অর্থনীতি গড়ে তোলা নিয়ে ট্রাম্পের মিথ্যা দাবির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বাইডেনের কঠোর পরিশ্রম করা উচিত ছিল। বুথ ফেরত জরিপগুলো যদি আমরা বিশ্বাস করি, তাহলে দেখবেন ভোটারদের সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ ছিল অর্থনীতি নিয়ে। সেখানে মহামারীটি উদ্বেগের তৃতীয় স্থানে ছিল।
ভাইরাসটিকে কম গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের নিরবচ্ছিন্ন প্রচারণা ও আত্মবিশ্বাসের প্রদর্শন দৃশ্যত বহু ভোটারকে প্ররোচিত করেছিল। প্রকৃতপক্ষে, সংক্রমণের ক্লাস্টার হয়ে ওঠা ট্রাম্পের প্রচার সমাবেশগুলোর বিপরীতে ভোটারদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া সীমিত করে নিরাপদে প্রচারের নৈতিক পথ অবলম্বনের বিষয়টি বাইডেনকে সহযোগিতা করেছে। সে জন্য তিনি প্রশংসার দাবিদার।
বাইডেনকে সমাজতান্ত্রিক তকমা দেয়া থেকেও উপকৃত হয়েছেন ট্রাম্প। ফ্লোরিডার বহু ভোটারের সমর্থন পাওয়ার পেছনে এটি ব্যাপকভাবে কাজ করেছে। কারণ সেখানকার অনেক মানুষের শেকড় সমাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় বিধ্বস্ত দেশগুলোতে রয়েছে। ফ্লোরিডায় কিউবান অভিবাসীদের প্রায়ই সবাই ট্রাম্পকেই বেছে নিয়েছেন। বর্ণবাদ ও জেনোফোবিয়াকেও (বিদেশীদের নিয়ে ভীতি) কাজে লাগিয়েছেন ট্রাম্প। এটা তার প্রচারের অন্যতম কুৎসিত দিক। তবে ট্রাম্পকে ভোট দেয়া কোটি কোটি মানুষ দোষী বা বর্ণবাদী এমনটা ভাবা ঠিক নয়। কিন্তু হ্যাঁ, ট্রাম্প নিঃসন্দেহে বর্ণবাদী, সমকামী ও জেনোফোবিক ভোট পেয়েছেন।
আপনাকে স্বীকার করতেই হবে যে ট্রাম্পের ক্যারিশমা আছে। তিনি নিজেকে আমেরিকা এবং বিশেষত শ্রমিক শ্রেণী ও গ্রামীণ আমেরিকানদের একজন শক্ত শুভাকাঙ্ক্ষি হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তিনি যে বিষয়গুলো নিয়ে জনগণের পক্ষে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন- তা লক্ষ্যণীয়। বর্ণবাদী মনোভাবের দিকটি বাদে তিনি আর যা যা বাস্তবে করেছেন- তা এক মুহূর্তের জন্য উপেক্ষা করে তিনি যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তার দিকে নজর দিন। নির্বাচনের এখন পর্যন্ত জানা ফলাফলে স্পষ্ট যে শহুরে ও গ্রামীণ আমেরিকার মধ্যে বিভাজন তীব্র হয়েছে। রক্ষণশীল গ্রামীণ ভোটাররা দেশের কিছু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নিয়ে গভীর অস্বস্তিতে রয়েছেন, যেটি সব দেশের জন্যই স্বাভাবিক।
ডেমোক্র্যাটরা এখন এই বিষয়গুলো গভীরভাবে অনুসন্ধান এবং ট্রাম্প ভোটারদের উদ্বেগ থেকে কিছু শেখার চেষ্টা করবে। মহামারীটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থেকে বিচ্যুতির আশঙ্কা ও ভয়াবহতার পূর্বাভাস দিয়েছিল। সুতরাং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে এটাও দেখতে হবে। কারণ এটি অস্থায়ী সংকট নয়।
একটি সাধারণ উদ্দেশ্যের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন ঐক্যবদ্ধ হওয়া দরকার। এর জন্য একে অপরের মতামতকে সম্মান করা, বোঝার চেষ্টা করা, ব্যাখ্যা করা, ব্যবধান ঘুচিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা এবং আপনি যাদের সঙ্গে একমত নন, তাদের যৌক্তিক উদ্বেগকে আমলে নিয়ে সমাধান করার উপায় খুঁজে বের করতে হবে। তবে কিছু নির্দিষ্ট বিষয় অবশ্যই বিবেচ্য নয়। যেমন: বর্ণবাদ ও কুসংস্কার বরদাশত করা যায় না। তবে আমি মনে করি না যে এগুলো ট্রাম্পকে সমর্থন দেয়ার পেছনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
অনেক আমেরিকানই একজন আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান প্রেসিডেন্ট চান; যিনি দেশ-বিদেশে তাদের পক্ষ হয়ে লড়াই করবেন। ট্রাম্প সেটি করেছেন বা করেননি- এই সময়ে এসে তা আর আলোচ্য বিষয় নয়। দেশ ভয়াবহ সংকটে রয়েছে। আমেরিকানরা যদি একসঙ্গে হয়ে কাজ করতে পারে, তবে তারা সমাধানগুলো আরো দ্রুত খুঁজে পাবে। একে-অপরের সঙ্গে বিরোধ বা বিদ্বেষ এই লড়াইকে দীর্ঘায়িতই করবে শুধু।
সিএনএনে প্রকাশিত নিবন্ধ
লেখক: ফ্রিদা ঘিটিস
সিএনএন ও ওয়াশিংটন পোস্টের কন্ট্রিবিউটর কলামিস্ট










