কৃষিজীবী-জলজীবী, বনজীবী মানুষের কাছে ভূমিই একমাত্র অবলম্বন। অথচ আমাদের নানা আইন আর নীতি ভূমির ওপর তাদের স্বাভাবিক এবং ন্যায্য দাবিটি নিশ্চিত করতে পারেনি। ধারা, অনুচ্ছেদে রয়েছে সমস্যা; তার চেয়েও বড় সমস্যা আইনের প্রয়োগের ক্ষেত্রে—যেখানে রয়েছে হাজারো অসংগতি। সমাজের শ্রেণী-কাঠামোর গড়নটিই এমন যে প্রান্তিক মানুষ সর্বত্রই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত, নিপীড়িত; ভূমি অধিকারের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। ভূমিতে নারীর অধিকার সীমিত, উপেক্ষিত; প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ ভূমি অধিকার থেকে বঞ্চিত। একটি যুগোপযোগী আইন প্রণয়ন এবং তা মানার বাধ্যবাধকতা নিয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই। সত্য বটে, বাংলাদেশ বর্তমানে উন্নয়নের মহাসড়কে অবস্থান করছে এবং শহর-বন্দর ও নানা স্থানে শিল্প-কারখানাসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মিত হচ্ছে। তবে এসবের অধিকাংশই অপরিকল্পিত, ভূমির ব্যবহার যথেচ্ছ এবং কোথাওবা অবৈধ। সরকারি খাসজমি এমনকি জলাশয়, নদ-নদী দখল করেও চলছে নির্মাণ পর্বের দক্ষযজ্ঞ। তবে ভূমির পরিমাণ যেহেতু সীমাবদ্ধ ও সীমিত, সেহেতু তা অবশ্যই পরিকল্পিত উপায়ে ব্যবহারের দাবি রাখে। সেটাও হতে হবে সুষ্ঠু, সমন্বিত, সর্বোপরি পরিবেশবান্ধব।
প্রান্তিক, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জমি দখলে নেয়ার প্রবণতা এখনো জারি রয়েছে। ভূমিতে নারীদের জমির অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বাংলাদেশের কৃষিতে গত ২৫ বছরে বড় রদবদল ঘটেছে। ক্ষেতমজুরি যাদের পুরো সময়ের পেশা, তাদের মধ্যে নারীদের অনুপাত বাড়ছে। কিন্তু জমির মালিকদের ৫ শতাংশও নারী নেই। এ যেন এক নতুন জমিদারি যে শ্রমিক, জমি তার নিয়ন্ত্রণে নেই। বাংলাদেশের কৃষিনীতিতে নারীদের এখনো ‘চাষী’ বলে স্বীকৃতি নেই। কৃষিতে ভাগ চাষ (টেন্যান্সি) বা জমি ইজারা (লিজ) অনেক বাধা-নিষেধে নিয়ন্ত্রিত। অথচ উৎপাদনের একটি বড় অংশ অধিকার করে রয়েছে। দেশে অনেক পরিবারের বাস্তু জমিটুকুও নেই। তাদের জন্য কোনো উদ্যোগ নেই ভূমি আইনে। ভূমি সংস্কারের ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গের ব্যতিক্রমী ভূমিকার কথা বলতেই হয়।
ভূমি ব্যবস্থাপনাকে এর আগে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়নি। আমাদের দেশের উত্তরাধিকার আইন ও ভূমিসংক্রান্ত অন্যান্য আইন কার্যত ব্রিটিশ আমলের। ভূমির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সরকারের অনেক বিভাগ ও শাখা-প্রশাখা। ভূমিসংক্রান্ত একেক কাজ একেক বিভাগ করে। এদের অবস্থা অনেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। কারো সঙ্গে কারো তেমন সংযোগ নেই। ফলে ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের বিপন্নতা আরো বেড়ে চলে। বর্তমান সরকার ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল করার উদ্যোগ নিয়েছে। গত পাঁচ বছরে ভূমি খাতে সরকারের একাধিক ইতিবাচক পদক্ষেপ রয়েছে। যেমন ম্যানুয়াল ভূমি জরিপের পরিবর্তে ডিজিটাল ভূমি জরিপের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ ডাটাবেজে সংরক্ষণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে অনলাইনে উপস্থাপন, অনলাইনে খতিয়ানের নকল উত্তোলনের আবেদন ও নামজারির আবেদন গ্রহণ এবং মোবাইলে এসএমএসের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাকে নামজারির অবস্থা অবগতকরণ ইত্যাদি। তবে এখনো বহু পথ পাড়ি দিতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশের একটি বড় লক্ষ্য হতে হবে ভূমি সংস্কার এবং এর ব্যবস্থাপনার আমূল মৌলিক সংস্কার।
আইন আছে বেদখল ঠেকাতে, কিন্তু আইনের আশ্রয় কীভাবে নিতে হবে, কীভাবে মিলবে প্রতিকার, তা বেশির ভাগ মানুষের অজানা। ভূমিসংশ্লিষ্ট আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের দুর্বলতা ধরা পড়ছে। নানা কারণে কৃষকরা জমি হারাচ্ছেন, আইন তাদের কোনো কাজে আসছে না। এ কারণে সংখ্যালঘু ধনীদের কাছে সংখ্যাগুরু কৃষকরা জমির মালিকানা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষকের জমি হাতছাড়া হচ্ছে আর ধনীরা এসব জমির মালিক হচ্ছেন। এসব জমির অধিকাংশই অকৃষি খাতে ব্যবহার হচ্ছে। এসব জমিতেই আবাসন শিল্পের দ্রুত বিকাশ ঘটেছে, বাড়ছে বর্গাচাষীর সংখ্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মালিকানার এ পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান হচ্ছে না। এর দুটো কারণ। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীরা এখনো কৃষির হাল ধরে রয়েছেন। আর দ্বিতীয়টি হলো, উন্নত ও অতিফলনশীল বীজ এ সমস্যাকে এখনো আড়াল করে রেখেছে। কিন্তু এটি টেকসই কৃষির উন্নয়ন নিশ্চিত করে না। তাই ভূমিবিন্যাসে সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন এবং তার সঠিক বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ভূমি ছাড়াও এ-সংশ্লিষ্ট অন্য সম্পদ, জলাশয় ও জলমহালগুলো ভূমিহীন প্রান্তিক ও দরিদ্র কৃষকদের বরাদ্দ দিতে হবে। সঠিকভাবে ভূমি সংস্কারের মাধ্যমে সমাজে বিরাজমান হানাহানি-মারামারি, মামলা-মোকদ্দমাও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।
সমস্যা রয়ে গেছে খাসজমি বন্দোবস্তে। এক্ষেত্রে ভূমিহীন কৃষক ও শ্রমিকরা অগ্রাধিকার পাচ্ছেন না। একক মালিকানায় সর্বোচ্চ ৬০ বিঘা জমি রাখার সীমাও মানা হচ্ছে না। ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশে বর্গাচাষীকে অগ্রাধিকার দেয়া হলেও সেটি মানছেন না সংশ্লিষ্টরা। ভূমিসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ক্রমে বেড়ে চলেছে। এগুলোর নিষ্পত্তির হারও সন্তোষজনক নয়। সুষ্ঠু ভূমি ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য সামনে রেখে প্রণীত এ অধ্যাদেশ পরিপালনের চেয়ে ভাঙার প্রবণতাই বেড়ে উঠছে। এক্ষেত্রে সহায়তা জুগিয়ে যাচ্ছেন সরকারি কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী। এসব জটিলতা কাটিয়ে সুষ্ঠু ভূমি ব্যবস্থার জন্য ডিজিটালাইজেশনসহ কিছু উদ্যোগ নেয়া হলেও তার সুফল দৃশ্যমান হচ্ছে না।
কাজেই সমন্বয়হীনতার ফলে একই জমির একাধিক মালিকের মধ্যে নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে, যা অহেতুক বিড়ম্বনা ও হয়রানির মতো সমস্যা সৃষ্টি করছে। প্রচলিত ভূমিসংক্রান্ত আইন দুর্বৃত্তদের স্বার্থ সংরক্ষণে উৎসাহিত করে বলে অভিযোগ রয়েছে। সেদিক বিবেচনায় এর পরিবর্তন হওয়া উচিত। সবার প্রত্যাশা প্রচলিত জটিল, দুর্বোধ্য আইনের অবসান এবং ভূমি প্রশাসনে সার্বিক সংস্কারের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত হবে। সুষ্ঠু ভূমি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দুই দশকে বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল ভূমির মালিকানাসংক্রান্ত বিষয়ে অনেক ধরনের অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। আমার প্রত্যাশা থাকবে নতুন আইন প্রণয়নের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, তাতে ভূমি সংস্কার ও বন্দোবস্তকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে ভূমিতে প্রান্তিক-ভূমিহীন-নারী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ পিছিয়ে পড়া মানুষের অধিকার নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে।










