জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতে বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় সংঘটনের পৌনঃপুনিকতা আগের চেয়ে বেড়েছে। প্রায় প্রতি বছরই দুর্বল প্রকৃতির এক বা ততোধিক ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির পাশাপাশি কয়েক বছরের ব্যবধানে এ অঞ্চলে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে। নিকট অতীতে আঘাত হানা প্রবল ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে ছিল ২০০৭ সালের সিডর এবং ২০০৯ সালের আইলা। এ দুটি ঘূর্ণিঝড়ে গভীরতর দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতিতে পড়েছিল এ অঞ্চলের মানুষ, বাঁধের মতো বড় ভৌত অবকাঠামো, কৃষিজমিসহ সার্বিক প্রতিবেশ ব্যবস্থা। সরকারি প্রশাসন ও বেসরকারি সংগঠনগুলোর প্রচেষ্টা-পৃষ্ঠপোষকতায় উল্লিখিত ঘূর্ণিঝড়-পরবর্তী সামগ্রিক বিরূপ প্রভাব মোটামুটি প্রশমন করতে সমর্থ হলেও চলতি বছরের মে মাসে আঘাত হানা সুপার সাইক্লোন আম্পানে পুরো অঞ্চলের জনজীবন ও ভৌগোলিক পরিবেশের আবারো ব্যাপক বিপর্যয় ঘটে। বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আম্পানের আঘাতে বিশেষ করে খুলনা ও সাতক্ষীরার কয়েকটি উপজেলার ৩০ শতাংশ পরিবার দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে তাদের রাষ্ট্রীয় তরফে সর্বতো পৃষ্ঠপোষকতা জোগাতে হবে।

আম্পানের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবগুলো পর্যালোচনা করলে মোটাদাগে যা উঠে আসে তা হলো, জলমগ্নতায় বিপুলসংখ্যক মানুষের বাস্ত্যুচুতি, জীবিকা সংকট, সুপেয় পানি প্রাপ্যতার অভাব, কৃষিজমির উর্বরা শক্তি হ্রাস, স্থানীয়ভাবে আবদ্ধ পুকুরে মাছ চাষের সুযোগ ব্যাহত হওয়া, যথাযথ পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব, শিশুদের পুষ্টিহীনতা, সর্বোপরি স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের বিপর্যয়। এগুলো সমাধানের জন্য জুতসই পরিকল্পনা নিতে হবে। স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত কৌশলের পাশাপাশি বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাগুলো আমলে নেয়া চাই। শুধু উত্তর ভারতীয় বেসিনভুক্ত বঙ্গোপসাগর নয়, দক্ষিণ-পশ্চিম ভারতীয় বেসিন, আটলান্টিক, উত্তরপূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয়, উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় বেসিনেও ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ বাড়ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত,  কিউবা, চীন, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, মাদাগাস্কার, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, জিম্বাবুয়ে, আফ্রিকা, সোমালিয়া প্রভৃতি দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিয়মিত বিরতিতে পর্যুদস্ত হচ্ছে। কাজেই ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি কেবল আমাদের দেশের একক বাস্তবতা নয়, অনেক দেশেই আসলে ঘূর্ণিঝড়-সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু তফাত হলো, দুর্যোগের প্রভাব মোকাবেলায় ওইসব দেশ দীর্ঘমেয়াদি অ্যাপ্রোচ গ্রহণ করলেও আমাদের দেশে অনেকটা অস্থায়ী ভিত্তিতে ঘটনা-পরবর্তী তাত্ক্ষণিক কিছু ব্যবস্থা নেয়ার প্রতি বেশি মনোযোগী থাকেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে সৃষ্ট সংকটগুলো থেকে দীর্ঘমেয়াদি উত্তরণ অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। সুতরাং নিজস্ব প্রাসঙ্গিকতা মাথায় রেখে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরূপতা মোকাবেলায় স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত উত্তম চর্চাগুলোর যেমন সন্নিবেশ ঘটাতে হবে, তেমনি বহু দেশে নিরীক্ষিত ‘স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ম্যানেজড রিট্রিট’ অ্যাপ্রোচের মতো দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগও নিতে হবে।

উপদ্রুত এলাকায় আম্পানের আঘাতে কমপক্ষে ২০টি পয়েন্টে উপকূলীয় বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে পড়ায় অনেক জায়গায় স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে বিপুল মানুষ বাস্ত্যুচ্যুত হয়েছে। এদের মধ্যে একটি অংশ বসতভিটায় ফেরার চেষ্টা করলেও অনেকেই উপায়হীন হয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে এখনো রয়ে গেছে। সরকারি-বেসরকারিভাবে তাদের ত্রাণ সহযোগিতা দেয়া অব্যাহত রয়েছে বটে, এভাবে দীর্ঘদিন চলতে পারে না। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো চিহ্নিত করে তাদের পুনর্বাসনে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ওই অঞ্চলে আগে থেকে লবণাক্ততার সমস্যা ছিল। আম্পানে এবারের জলোচ্ছ্বাসে এটি আরো প্রকট হয়েছে। লবণাক্ততার কারণে আগামী কয়েক বছর সেখানকার কৃষিজমিতে ফসল আবাদে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। এসব জমির আবাদযোগ্যতা ফেরাতে হলে সর্বাগ্রে লবণাক্ততার প্রকোপ কমাতে হবে। এরও একটা দীর্ঘমেয়াদি বিহিত জরুরি। আপাতত লবণসহিষ্ণু ফসলের জাতগুলো প্রবর্তন করে সীমিত পরিসরে চাষাবাদ অব্যাহত রাখা যায় কিনা, সেটি ভাবতে হবে। ফসলভিত্তিক কৃষি থেকে শুরু করে মাছ চাষের মতো জীবিকার জায়গাগুলো সংকটাপন্ন হওয়ায় মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও আয়ের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। উপদ্রুত এলাকায় কীভাবে বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা করা যায়, তার উপায়ও সন্ধান করতে হবে। প্রয়োজনে সরকারিভাবে নাজুক পরিবারগুলোকে নগদ অর্থের জোগান বাড়ানো যেতে পারে। সেখানে সুপেয় পানিরও বড় সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক দূর থেকে মানুষ খাবার পানি সংগ্রহ করছে। জীবন ধারণের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হওয়ায় সুপেয় পানি সহজলভ্য করতে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া আম্পানের উপদ্রুত এলাকায় পানিবাহিত রোগবালাই ও শিশুর অপুষ্টির প্রকোপও বাড়ছে। মানসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থা জোরদার করার পাশাপাশি সেখানে কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টি কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। এক্ষেত্রে এনজিওগুলোকেও সম্পৃক্ততা করা যেতে পারে। সর্বোপরি, প্রাতিবেশিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে। পরিবেশগত স্থায়িত্বশীলতা নিশ্চিতে সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে এ অঞ্চলের নদীগুলোকে টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্টের (টিআরএম) আওতার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ আশা করি।

আরেকটি বিষয়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়গুলোর প্রমত্ততা কমাতে বরাবরই সুন্দরবন বড় সুরক্ষা ব্যুহ হিসেবে কাজ করেছে। সিডর, আইলার ক্ষেত্রেও এটি সত্য। সুন্দরবনের কারণে এবারো আম্পানে তাত্ক্ষণিক ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়েছে। কাজেই উপদ্রুত এলাকার প্রতিবেশগত ভারসাম্য ফেরানোর পাশাপাশি সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে। দুঃখজনকভাবে আমরা পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এ প্যারাবন ঘিরে কিছু অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ড দেখছি। ফলে বনটি অনেকটা সংকটাপন্ন। এর প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এগুলো বন্ধ করতে হবে। সেখানে বনায়ন বাড়াতে হবে। বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে ঘূর্ণিঝড় আরো বাড়ার আশঙ্কা করছেন। সেক্ষত্রে ভবিষ্যৎ প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো বিবেচনায় রেখে উপকূলীয় বাঁধের উচ্চতা ও স্থায়িত্ব বাড়াতে হবে। প্রাক-সতর্কতা ব্যবস্থারও আরো উন্নয়ন জরুরি।