দেশের ৭০ শতাংশ দরিদ্র মানুষ এখনো গ্রামে বাস করে এবং বেঁচে থাকার জন্য তারা প্রত্যক্ষভাবে জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল। যে পরিমাণ জীববৈচিত্র্য বর্তমানে আছে, তার তুলনায় ২০ শতাংশ বেশি চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে জীববৈচিত্র্যের ব্যবহার টেকসইভাবে হচ্ছে না। অত্যধিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে জীববৈচিত্র্যের ওপর। বিল-হাওড়-জলাভূমির জীববৈচিত্র্য ক্রমে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। পাখি নিধন থেকে শুরু করে শামুক-ঝিনুক সবকিছুই আজ হুমকির মুখে। জীববৈচিত্র্যের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এরই মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। সবারই জানা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের চ্যালেঞ্জগুলো হলো, জাতীয় অর্থনীতিতে জীববৈচিত্র্যের মূল্য সম্পর্কে নীতিনির্ধারকদের সীমিত সচেতনতা, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোয় পরিবেশগত সুরক্ষার অবাধ্যতা বা ন্যূনতম সম্মতি, রাজস্ব দ্বারা পরিচালিত ভূমি ব্যবহার অনুশীলন, সুষ্ঠু পরিবেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে সীমিত সাফল্য, সীমিত আন্তঃসেক্টরাল পলিসিগুলোয় খাত সমন্বয় ও সমন্বয়করণ, বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংস ও অবক্ষয়ের জন্য বাজারভিত্তিক সরঞ্জামের অনুপস্থিতি, স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা হ্রাসকরণ, বেসরকারি খাতের সীমাবদ্ধতা, মালিকানার ক্ষেত্রে বৈষম্য এবং উপকার ভাগাভাগি জৈবিক সংস্থানগুলোর ব্যবহার, নিম্নস্তরের জ্ঞান, সক্ষমতা, সচেতনতা, অপর্যাপ্ত অর্থায়ন ইত্যাদি। প্রাকৃতিক সম্পদের ক্রমবর্ধমান চাহিদাসহ বিশাল জনসংখ্যার চাপ ওপরের বর্ণিত হুমকির বেশির ভাগ মূল চালিকাশক্তি।
৪৭টি নদী ও অন্যান্য জলপথ বাংলাদেশের বৃহত্তম যে বিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, তাই হচ্ছে চলনবিল। চলনবিল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি বৃহৎ বিল। এটি নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলার বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে বিস্তৃত। নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা এই তিন জেলার নয়টি থানা মিলে বাংলাদেশের বৃহত্তম এই জলাভূমির অবস্থান। মাছের পাশাপাশি এ বিল থেকে ধানের জোগানও আসে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে নির্বিচারে পাখি নিধন ও শামুক-ঝিনুক আহরণের ফলে সেখানকার জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। পাখি নিধন বন্ধ ও প্রাণী রক্ষায় দেশে আইন থাকলেও চলনবিলে তার প্রয়োগ লক্ষ করা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ এরই মধ্যে জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশন (সিবিডি)-সহ সব বৃহৎ জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশসংক্রান্ত বহু চুক্তি স্বাক্ষর বা অনুমোদন করেছে। সিবিডির বাধ্যবাধকতা পূরণে বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ প্রচেষ্টা পরিচালনার জন্য ২০০৬ সালে প্রথম জাতীয় জীববৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (এনবিএসএপি) এবং ২০১৫ সালে দ্বিতীয় এনবিএসএপি (২০১৬-২১) প্রণয়ন করেছে। দ্বিতীয় প্রজন্মের এনবিএসএপি বৈশ্বিক আইনি জীববৈচিত্র্য লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে মিল রেখে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের ২০টি লক্ষ্যমাত্রার অধীনে ৫০টি কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করেছে, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কিত নীতি ও আইনি কাঠামোও প্রণয়ন করেছে। ফলে বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর সংকটাপন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদকুলকে রক্ষা করতে দেশের বিভিন্ন স্থান বাস্তু সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তার পরও নিয়মিত হারে বৃক্ষ নিধন হচ্ছে এবং প্রাণিকুল বাসস্থান হারাচ্ছে। ফলে মাঝে মাঝে শিকারি প্রাণী লোকালয়ে চলে আসছে এবং প্রায় সময় মানুষ এদের হত্যা করে। সেই সঙ্গে খাদ্য সংকটে পড়ছে প্রাণিকুল। এভাবে চলতে থাকলে প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যাবে এবং এর কুফল ভোগ করতে হবে।
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে শুধু কয়েকটি আলোচিত প্রজাতি রক্ষা করলেই জীববৈচিত্র্য রক্ষা হয় না। জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন সব প্রকার জীব প্রজাতিকে সমান গুরুত্ব দেয়া। পরিবেশবিজ্ঞানের অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জীববৈচিত্র্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মানবসমাজের উপকারে আসে। একটি স্থিতিশীল পরিবেশের সঙ্গে মানুষের ভালো থাকার সম্পর্ক রয়েছে। আর এসব লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে উঠে নীতিগতভাবেই জীবজগতের অন্য প্রাণীদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। সমগ্র প্রাণী ও উদ্ভিদজগতের বেঁচে থাকার জন্য প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা একান্ত অপরিহার্য। মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকা এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের স্বার্থে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা আবশ্যক। বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বেঁচে থাকার জন্য জীববৈচিত্র্যের প্রয়োজন। তাই এর ভারসাম্য বজায় রাখতে সঠিক সংখ্যায় সব প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। সাধারণ মানুষকে বোঝাতে হবে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের গুরুত্ব এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় না থাকলে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব ভয়াবহ হতে পারে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জটিল সমস্যাগুলো পরিচালনা করার জন্য ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সরকারকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের বিকল্প নেই।










