জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকীর বছরে হালকা প্রকৌশল শিল্পকে বর্ষপণ্য ঘোষণার মাধ্যমে সরকার এর গুরুত্বকেই তুলে ধরেছে। এর আলোকে দেশীয় হালকা প্রকৌশল শিল্পের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, যশোর, বগুড়া ও নরসিংদীতে ডেডিকেটেড লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। শিল্প পার্কগুলোয় স্থাপিত কারখানার জন্য দক্ষ জনবলের জোগান নিশ্চিত করতে একই সঙ্গে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হবে। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে উদ্যোক্তাদের উদীপ্ত করবে। দেশের যেসব স্থানে চাহিদা আছে, সেখানে সমন্বিত সুযোগ-সুবিধাসংবলিত পরিকল্পিত ও আধুনিক শিল্প পার্ক স্থাপনের দাবি দীর্ঘদিনের। এসব শিল্প পার্কে নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা, কমন ফ্যাসিলিটিজ সেন্টার, পরিবেশ সুরক্ষার জন্য ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজনীয় বর্জ্য ট্রিটমেন্ট প্লান্ট, গ্রিন পার্ক, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ইত্যাদি নিশ্চিত থাকতে হবে। স্থায়ী ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার দাবি: লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (বিএলইটিআই) মাধ্যমে এ খাতে কর্মরত কারিগরদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও চাহিদা পূরণে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বাইওয়া। নতুন কারিগর তৈরি করতে রয়েছে ট্রেড কোর্স। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা শহরেও চলছে প্রশিক্ষণ। তবে এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য নিজস্ব কোনো অবকাঠামো নেই। ফলে প্রকল্পের সিংহভাগ অর্থই ভাড়ায় চলে যাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা পার্ক স্থাপন ইতিবাচক। তবে এর সাফল্য নির্ভর করছে সুবিধাগুলো নিশ্চিত করার মাধ্যমে। লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প খাতে চলমান উন্নয়ন কার্যক্রম বেগবান করতে ডেডিকেটেড শিল্প পার্ক স্থাপন, এ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য অল্প খরচে পুঁজি সরবরাহ ও আর্থিক প্রণোদনা, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ কর্মী ও ব্যবস্থাপক তৈরি, উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত, সাবকন্ট্রাক্টিং শিল্পের বিকাশ ও আইন প্রণয়ন এবং হালকা প্রকৌশল শিল্পনীতি প্রণয়নও করতে হবে।

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ খাতের সম্ভাবনা সদ্ব্যবহারে হালকা প্রকৌশল শিল্পের সমস্যাগুলো দূরীকরণে উদ্যোগী হতে হবে। তাই এ খাতের উন্নয়নে স্বল্প সুদে ঋণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ দেশের পোশাক শিল্প খাতের উন্নয়নে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। পোশাক শিল্পের মতো হালকা প্রকৌশল খাতের উন্নয়নে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সৃজনশীল বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত বলে মনে করেন এ খাতসংশ্লিষ্টরা। সেই সঙ্গে বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনার দাবি বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির। বর্তমানে ফিনিশড পণ্য বা মূলধনি যন্ত্র আমদানি করলে শুধু ১ শতাংশ শুল্ক কর, পক্ষান্তরে এই মূলধনি যন্ত্র দেশে তৈরি করলে কাঁচামালের কর দিতে হয় ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত। দেশীয় হালকা প্রকৌশল খাতের স্বার্থে শুল্ক কাঠামোকে পুনর্বিন্যাস করা হলে এটি দেশের সামগ্রিক শিল্প খাতের উন্নয়নে আরো শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

উচ্চ সুদের ঋণ এবং সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ নিয়ে ব্যবসা এগিয়ে নেয়া দুরূহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সমমূলধন সহায়তা তহবিল (ইইএফ) থাকলেও এ সুবিধা পায় না হালকা প্রকৌশল। উদ্যোক্তাদের সুবিধার্থে নির্ধারিত লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্কসহ বিসিকের ৭৬টি শিল্পনগরীতে পূর্ণাঙ্গ ওয়ানস্টপ সেবা চালুর বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। স্বল্প পরিসরে প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশে মানসম্মত পণ্য তৈরি হচ্ছে। সিঙ্গাপুর ও সৌদি আরবে কিছু পণ্যের নমুনা পাঠিয়ে দারুণ সাড়া মিলেছে। তারা অনুমোদনের পর সরবরাহ আদেশ দিলেও এত পণ্য তৈরির মতো সামর্থ্য নেই কারো। চার বছর ধরে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। তবে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ হচ্ছে সীমিত পরিসরে। এর অন্যতম কারণ প্রশিক্ষক নেই। প্রয়োজনে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষক এনে দক্ষ জনবল তৈরি করার উদ্যোগ নিতে হবে। উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র বগুড়ায় কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও ঘটে গেছে নীরব বিপ্লব। বিসিক শিল্পনগরীসহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির কয়েকশ কলকারখানা। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত এসব কলকারখানায় প্রতি বছর প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার যন্ত্রপাতি উৎপাদন হলেও কয়েক হাজার কোটি টাকার আমদানি সাশ্রয় হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকদের চাহিদা মেটানো এসব কৃষি যন্ত্রপাতি রফতানিও হচ্ছে।

এশিয়ার শিল্পোন্নত দেশগুলো যেমন গণচীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, মালয়েশিয়া, ভারত, পাকিস্তানসহ উন্নয়নশীল দেশগুলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের মাধ্যমে অর্জিত সাফল্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের ভূমিকা অপরিসীম। ব্যাপক সম্ভাবনাময় এ খাতের উন্নয়নে প্রধান বাধা হচ্ছে মূলধন, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার অভাব। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর মতো প্রতিবেশী মিয়ানমারেও বাংলাদেশের হালকা প্রকৌশল পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এখন শুধু প্রয়োজন মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সুবিধাজনক শুল্ক কাঠামোর আওতায় আনুষ্ঠানিক পথে এই পণ্য রফতানির সুযোগ সৃষ্টি করা। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হলে প্রচলিত রফতানি পণ্যের পাশাপাশি হালকা প্রকৌশল পণ্য রফতানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা খুব কঠিন কোনো বিষয় নয়। সরকার উদ্যোগ নিলে বান্ডেল পদ্ধতির মাধ্যমে বিশ্ববাজারে বিশেষ করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে খুচরা যন্ত্রাংশ তথা অটোপার্টসের বড় বাজার সৃষ্টি করা সম্ভব। বিশ্বখ্যাত অটোমোবাইল কোম্পানিগুলো নিজেরা গাড়ির বেশির ভাগ যন্ত্রাংশ তৈরি না করে সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের মাধ্যমে ছোট ছোট উৎপাদক দিয়ে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করে নেয়। এরপর এসব যন্ত্রাংশ সংযোজন করে তৈরি হয় পুরো একটি গাড়ি। এই বান্ডেল পদ্ধতিতে একটি বড় উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত থাকে বহু ছোট উৎপাদক। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা হালকা প্রকৌশল শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন যেকোনো বিদেশী উন্নত মানের যন্ত্রাংশের সঙ্গে পাল্লা দেয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

এখন যা প্রয়োজন তা হলো, বিদেশী বড় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি করে দেয়ার উদ্যোগ সরকারের নেয়া। এ সম্পর্ক স্থাপন করে দিতে পারলেই হালকা প্রকৌশল শিল্প বিশ্ববাজারে শক্তিশালী রফতানি খাত হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবে। এক্ষেত্রে শুধু নগদ সহায়তা নয়, প্রয়োজন বিশ্বের বড় বড় কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া। এটাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং সময়ের দাবি। বাংলাদেশের রফতানিযোগ্য পণ্যের তালিকা অত্যন্ত সীমিত। এ মুহূর্তে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের হালকা প্রকৌশল পণ্য খাত। একটি দেশের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বড় ও সহজ ক্ষেত্রই হচ্ছে এ খাত। সবচেয়ে দ্রুত বিকাশমান এ খাতের উন্নয়নের মাধ্যমেই বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।