প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি, বিনিয়োগ এবং সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এশিয়ার দেশগুলোর সাথে নিজেদের সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ১১তম রাষ্ট্রদূত সম্মেলনে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেভলুত কাভুসোগলু ‘নতুন এশিয়া’ পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেন। তার মতে, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা শিল্প থেকে শুরু করে প্রযুক্তি ও সংস্কৃতি পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে এশিয়ার প্রতি একটি নতুন সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রণয়ন তুরস্কের পররাষ্ট্র নীতি কার্যকর করার ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও বলেন, এই নতুন উদ্যোগ তুরস্কের টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। কাভুসোগলু পরবর্তী এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জোর দিয়ে বলেছেন যে এই নতুন উদ্যোগ তুরস্কের পররাষ্ট্র নীতিতে কোন অক্ষ পরিবর্তন নির্দেশ করে না।এই নীতির অধীনে আঙ্কারা পাকিস্তান, বাংলাদেশ, এমনকি ভারতের মত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক মজবুত করার দিকে নজর রেখেছে। 

বস্তুত অ-পশ্চিমা দেশ সমূহের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমবর্ধমান আধিপত্য বিস্তারকে বিবেচনায় নিয়েই এই নীতি প্রণয়ন। 

এশিয়ার প্রধান দেশগুলোর সাথে তুরস্কের সম্পর্ক তার সফট পাওয়ার, দ্বন্দ্ব নিষ্পত্তি পদ্ধতি, অর্থনৈতিক নিয়ামক এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের সাথে জড়িত। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত তাদের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি এবং কৌশলগত গুরুত্বের কারণে অন্যতম প্রধান দেশ হিসেবে বিবেচিত। এ ক্ষেত্রে কাভুসোগলুর সাম্প্রতিক পাকিস্তান ও বাংলাদেশ সফরের ঘটনা তাৎপর্যপূর্ণ। তুরস্কের শীর্ষ কূটনীতিবিদ তিন দিনের পাকিস্তান সফর করেন, যেখানে তিনি পাকিস্তান ও আজারবাইযানের সাথে দ্বিতীয় ত্রিপাক্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, আঙ্কারা বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে ইসলামাবাদের সাথে তার সম্পর্ক বৃদ্ধি করেছে, প্রধানত রাজনৈতিক, প্রতিরক্ষা এবং অর্থনৈতিক বিষয়কে কেন্দ্র করে। সফট পাওয়ারের মাধ্যমে উৎসাহিত করা সাংস্কৃতিক বন্ধন তাদের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

পাকিস্তানের প্রতি তুর্কি নীতির অন্যতম মাত্রা কাশ্মীর ইস্যু। ইসলামাবাদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখার সময় তুরস্ক প্রকাশ্যে ভারতের নিন্দা করা থেকে বিরত থাকে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগানের ভাষণ নয়াদিল্লি ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। তিনি বলেন যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কাশ্মীর সংঘাতের প্রতি ‘যথেষ্ট মনোযোগ’ দেয়নি। তার অসন্তোষ প্রকাশ করার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার দুই দিনের আনুষ্ঠানিক তুরস্ক সফর বাতিল করেন যা পরের মাসে নির্ধারিত ছিল। 

ভারত যখন সিরিয়ায় তুরস্কের অভিযানের নিন্দা জানিয়েছে, তখন পাকিস্তান সাম্প্রতিক নাগোর্নো-কারাবাখ সংঘাতে আঙ্কারার জড়িত থাকার পিছনে তাদের সমর্থন জানায়। পাকিস্তান আজারবাইযানকে তুরস্কের মিত্র হিসেবে বিবেচনা করে এবং নাগোর্নো-কারাবাখের উপর বাকুর দাবিকেও স্বীকৃতি দেয়, ইসলামাবাদ আর্মেনিয়ার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন থেকেও বিরত থেকেছে। 

গত মাসে কাভুসোগলুর দুই দিনের ঢাকা সফরের সময় তিনি নবনির্মিত তুর্কি দূতাবাস প্রাঙ্গণ উদ্বোধন করেন এবং দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ নতুন এশিয়া উদ্যোগে তুরস্কের অন্যতম প্রধান অংশীদার, যার মধ্যে রয়েছে তার প্রাণবন্ত অর্থনীতি এবং তরুণ জনসংখ্যা।’ কাভুসোগলু তার সফরের অংশ হিসেবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎ করেন। তুরস্কের মন্ত্রী বাংলাদেশের সাথে শক্তিশালী সম্পর্ক স্থাপনে আঙ্কারার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং বলেন যে আঙ্কারা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য কে শক্তিশালী করার জন্য যা প্রয়োজন তা করতে প্রস্তুত। প্রতিরক্ষা এবং অর্থনীতি দুটি প্রধান ক্ষেত্র যা পারস্পরিক লাভজনক সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। 

ভারতের সাথে তুরস্কের শীতল সম্পর্কের কথা মাথায় রেখে, বাংলাদেশকে আঙ্কারার জন্য একটি কৌশলগত রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যেহেতু এটি ভারতের পূর্ব প্রতিবেশী এবং মিত্র, যা দক্ষিণ এশিয়ায় তুরস্কের নীতি সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখতে পারে। ২০১৯ সালে মোট ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাণিজ্য নিয়ে ভারতের পর এই অঞ্চলে বাংলাদেশ তুরস্কের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে বাংলাদেশ ভারতের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে যার একটি বড় জায়গা দখল করে আছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের অবদান।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, ঢাকা তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্পের উপর বিশেষ মনোযোগ প্রদান করেছে এবং ইতোমধ্যে তার সামরিক বাহিনীর জন্য তুরস্কের তৈরি ওটোকার কোবরা হালকা সশস্ত্র যানবাহন কিনেছে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা জায়ান্ট রোকেটসান বাংলাদেশে মাঝারি পাল্লার একাধিক লঞ্চ রকেট সিস্টেম সরবরাহের জন্য একটি চুক্তি করেছে, অন্যদিকে ৩,০০০ এর বেশী বাংলাদেশী সামরিক কর্মকর্তা তুরস্কে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আঙ্কারার লক্ষ্য হচ্ছে ২০২৩ সালের মধ্যে অস্ত্র বাণিজ্য ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা- যা তুরস্ক সরকার এবং তার ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির জন্য একটি কৌশলগত বছর। 

জাতিসংঘ এবং অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কো-অপারেশনসহ সকল আন্তর্জাতিক ফোরামে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রতি তুরস্কের সমর্থন দুই দেশের সম্পর্ককে উল্লেখযোগ্যভাবে গভীর করেছে। এটি শুধু কূটনৈতিক সহায়তা প্রদান করেনি, আঙ্কারা তার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশে শরণার্থীদের জন্য শিবির, হাসপাতাল, স্কুল এবং এতিমখানার মতো বিভিন্ন সুবিধা তৈরি করেছে।

কাভুসোগলুর বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সফর দক্ষিণ এশিয়ার প্রতি আঙ্কারার ক্রমবর্ধমান আগ্রহকে মনে নিয়ে এসেছে। যদিও তুরস্ক এই অঞ্চলে তার উপস্থিতি এবং প্রভাব আরো গভীর করতে আগ্রহী, এখানে রাশিয়া ও চীনের মত অ-পশ্চিমা শক্তির দৃঢ় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতি বিবেচনা করা উচিত।

বেইজিং তার আকর্ষণীয় বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এর মাধ্যমে তুরস্কের সাথে সম্পর্ক বাড়াতে সচেষ্ট। এই বিনিয়োগ চীনের তুরস্ক নীতির মূলে এবং আঙ্কারা বরাবরই বিআরআই থেকে উপকৃত হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। প্রায় সকল তুর্কি মন্ত্রণালয় চীনের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য কর্ম পরিকল্পনা তৈরি করেছে, এবং বিআরআই তুরস্কের আমলাতন্ত্রের নীতিতেও অন্তর্ভুক্ত। 

জিনজিয়াং-এর তুর্কি উইঘুর সম্প্রদায়ের সাথে আঙ্কারার গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক নিয়ে বেইজিং গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। পূর্বে পূর্ব তুর্কিস্তান নামে পরিচিত, জিনজিয়াং একটি নামমাত্র অংশ ছিল, এবং মাঝে মাঝে চীনের ঊনবিংশ শতাব্দীর চিং রাজবংশের একটি সামন্ত রাষ্ট্র ছিল। উইঘুর বিষয়ে তুরস্কের সম্পৃক্ততা সেই সময়ের কথা, যখন অটোমান সুলতানরা তাদের প্রভাব বিস্তারের জন্য ইসলাম ধর্মের মুখাপেক্ষী ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ১৮৭৩ সালে সুলতান আব্দুল আজিজ উইঘুরদের তার আধিপত্যের স্বীকৃতির বিনিময়ে চিং-এর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য অস্ত্র পাঠান। সে সময়, চিং আবার জিনজিয়াং-এর গভীরে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছিল, চীনা আধিপত্যের ভিত্তি স্থাপনের লক্ষে। 

আঙ্কারা এরদোগানের অধীনে উইঘুরদের প্রতি দৃঢ় সমর্থন বজায় রেখে আসছিল, যা ২০০৯ সালে জিনজিয়াং-এ চীনা নীতিকে ‘গণহত্যা’ বলে অভিহিত করে। ইতোমধ্যে বিষয়টি চীনা নেতা শি জিনপিং-এর জন্য অন্যতম গুরুতর রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার ফলে তিনি উইঘুরদের বিরুদ্ধে কঠোর ভাবে দমন-পীড়নের জবাব দিতে উৎসাহিত হয়েছেন। তাদেরকে ‘পুনর্শিক্ষা শিবিরে’ পাঠানোর পাশাপাশি তিনি ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা সিস্টেম এবং স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ায় উচ্চ প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের সম্প্রদায়ের উপর ব্যাপক নজরদারি শুরু করেছেন। 

তবে সম্প্রতি, এরদোগান তুর্কি প্রচার মাধ্যমে বিষয়টির উপস্থিতি কমানোর ব্যাপারে সচেষ্ট। এই কৌশল বেইজিং এর সাথে সম্পর্ক অনুকূল করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তা সত্ত্বেও, নেতৃস্থানীয় উইঘুর কর্মীরা এখনো তুরস্কের কর্মকর্তাদের সাথে নিয়মিত সাক্ষাৎ করে, এবং তুরস্কে তাদের সম্প্রদায় বিশ্বব্যাপী উইঘুর প্রবাসীদের কেন্দ্র। তাদের সংখ্যা সম্পর্কে কোন সরকারী তথ্য পাওয়া যায় না। এই গভীর সম্পর্ক সম্পর্কে সচেতন বেইজিং তুরস্কের অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বাঁচতে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সহায়তা সরবরাহ করা থেকে বিরত থেকেছে।

প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বার্ষিক জ্বালানি আমদানি নিয়ে তুরস্কের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে এবং এরদোগানের ভিত্তি কে সন্তুষ্ট রাখতে তুরস্কের এফডিআই বা বার্ষিক নগদ প্রবাহে দশ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। চীন থেকে এই ধরনের প্রবাহ আশা করতে হলে আঙ্কারাকে তার উইঘুর নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তন করতে হবে, যা তুরস্ককে বিশ্ব রাজনীতিতে উদীয়মান চীন-রাশিয়া অক্ষের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে। 

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগান আজারবাইযানের সামরিক প্যারেডে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। এটিকে রাশিয়ার প্রতি 

হুমকি হিসেবে না দেখে বরং দেখা উচিৎ সম্পর্ক উন্নয়ন প্রচেষ্টা হিসেবে, যখন এই ধরণের উপস্থিতি নতুন মার্কিন প্রশাসন ভালভাবে নাও নিতে পারে, যেখানে নতুন মার্কিন প্রশাসনের সাথে সম্পর্ক পুনরস্থাপন কাম্য যা রাশিয়ার সাথে এস- ৪০০ বিষয়ক চুক্তির জন্য বাধাগ্রস্থ হয়েছিল।

মধ্য এশিয়া ও মধ্য প্রাচ্যে কিছু বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও ক্রেমলিন প্রতিষ্ঠিত রাশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের প্রধান আন্দ্রে কোরতুনভ বলেন, ‘এই মুহূর্তে সম্পর্ক খুবই উত্তেজনাপূর্ণ, সেখানে প্রতিযোগিতা এবং এমনকি সংঘর্ষের একটি উপাদান রয়েছে।’ ‘তারপরেও তুরস্কের সাথে সহযোগিতা কৌশলগতভাবে এতগুরুত্বপূর্ণ যে রাশিয়া এ ব্যাপারে চোখ বন্ধ করতে প্রস্তুত।’

তুরস্ক এছাড়াও রাশিয়ার জন্য একটি প্রধান শক্তি গ্রাহক, কিন্তু এখানেও এটি সমস্যার সুত্রপাত হয়েছে। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে মস্কোর শীর্ষ গ্রাহক, তুরস্ক সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আজারবাইযানের মত প্রতিদ্বন্দ্বী সরবরাহকারীদের দিকে ফিরে রাশিয়া থেকে গ্যাস ক্রয় হ্রাস করেছে। 

তবে ন্যাটো মিত্রদের বিরোধিতা সত্ত্বেও রাশিয়ার সাথে শক্তি ও অস্ত্র চুক্তির জন্য পুতিন এরদোগানের প্রশংসা করেছেন। পুতিন বলেন যে, এই ধরনের সঙ্গীর সাথে কাজ করা শুধু ভালো নয়, এটা নির্ভরযোগ্য। তাদের মধ্যে পার্থক্যের ক্ষেত্রে রাশিয়াকে ‘ধৈর্য ধরতে হবে’ এবং ‘সমঝোতা খুঁজতে হবে’, তিনি আরও বলেন। এই মুহূর্তে, রাশিয়া এবং তুরস্ক ‘তাদের পারস্পরিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও’ সম্পর্ক বজায় রেখেছে, বলেছেন ইস্তাম্বুল ভিত্তিক থিংক ট্যাংক ইদাম-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান এবং ব্রাসেলসের কার্নেগী ইউরোপের একজন ভিজিটিং স্কলার।

বর্তমানে প্রাকৃতিক গ্যাস দুটি রুটের মাধ্যমে রাশিয়া থেকে তুরস্কে নিয়ে যাওয়া হয়: ট্রান্স-বলকান পাইপলাইনের পূর্ব শাখা, যা ইউক্রেন, রুমানিয়া এবং বুলগেরিয়া (সোভিয়েত ইউনিয়নের সময় ১৯৮৭ সালে সম্পন্ন) এবং ব্লু স্ট্রিম, যা রাশিয়ার ইসোবিলনোয়ে থেকে কৃষ্ণ সাগর বন্দর পর্যন্ত। ক্রমবর্ধমান গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে আঙ্কারার গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে তুরস্ক রাশিয়া এবং ইরানের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে যাতে তারা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি প্রাকৃতিক গ্যাস কিনতে পারে। এরদোগান ইতোমধ্যে গ্যাস সংরক্ষণের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ করেছেন যাতে এটি তৃতীয় পক্ষের দেশগুলোতে পুনরায় রপ্তানি করতে পারে। তেল, গ্যাস এবং পারমাণবিক শক্তি ক্ষেত্রে তাদের অংশীদারিত্ব উন্নত করার জন্য তুরস্ক এবং রাশিয়া ইতোমধ্যে তিনটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। আরো গ্যাসের বিনিময়ে তুরস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়াকে তুরস্কের বিশেষায়িত অঞ্চলের মাধ্যমে দক্ষিণ স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইন রুট করার অনুমতি দেবে, যা নাবুকো প্রকল্পের প্রতিদ্বন্দ্বী। 

এছাড়াও, তুরস্কের পারমাণবিক শক্তি সংস্থা এবং রাশিয়ার রুস্যাটম দুটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, একটি হচ্ছে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের জন্য এবং অন্যটি পারমাণবিক দুর্ঘটনার প্রাথমিক বিজ্ঞপ্তির জন্য। পারমাণবিক শক্তি নিয়ে চুক্তি দুই দেশের বর্তমান প্রবণতাকে তুলে ধরে, বিশেষ করে যখন মনে করা হয় যে তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক যুক্ত একটি ন্যাটো দেশ। এর বাইরেও আক্কুয়ু পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষর, যা ন্যাটো কর্তৃক অনুমোদিত নয়, থেকেও দুই দেশের সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান উন্নতির চিহ্ন লক্ষ্য করা যায়। 

তাই একথা বলাই বাহুল্য যে চীন-রাশিয়া ব্লকে নিজের সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে নিজেকে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে বদ্ধ পরিকর তুরস্ক। তবে এসবের বাইরেও তাকে মোকাবেলা করতে হবে এই অঞ্চলের বহু পুরনো সৌদি প্রভাবকেও যা কিনা শুধু রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকই নয় বরং তারচেয়ে বেশি ধর্মীও ও সামাজিক। 

তুরস্কে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত সঞ্জয় পান্ডা জি-২০ সদস্যবিশিষ্ট দুই দেশের ‘বৃহত্তর লক্ষ্যের’ জন্য দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ‘কোর্স সংশোধনের’ আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২০ সালের ১৬ ডিসেম্বর ইস্তাম্বুল ভিত্তিক থিংক ট্যাংক সাউথ এশিয়া স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ সেন্টারের (গাসাম) সেমাল ডেমির আয়োজিত এক ভার্চুয়াল সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভারতীয় দূত বলেন, যে কোন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে ‘সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে’। 

ভারতীয় দূত বলেন, নয়াদিল্লি তুরস্কের কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করে। এশিয়া এবং ইউরোপের চৌহদ্দিতে অবস্থিত, এটি ভূ-রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মক, এবং অর্থনৈতিকভাবে, তৃতীয় দেশে রপ্তানির জন্য একটি কেন্দ্র হিসেবে, বিশেষ করে ইইউ বাজারে একটি পদক্ষেপ হিসেবে,’ তিনি বলেন। তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ থেকে শুরু করে প্রতিরক্ষা এবং উচ্চ প্রযুক্তি পর্যন্ত একটি বিস্তৃত বর্ণালী জুড়ে বহুমুখী সহযোগিতার এই সম্ভাবনাকে অনুকূল করতে হবে। বহুপাক্ষিক ফোরামে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে পান্ডা বলেন যে বৈশ্বিক বিষয়ে মতামতে তাদের সমন্বয় রয়েছে এবং পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়ে সাধারণত একে অপরকে সমর্থন করে আসছে দুই পক্ষ। তুরস্কের সংসদের স্পিকার মুস্তাফা সেনটপের সাথে তার সাম্প্রতিক সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করে পান্ডা বলেন, ‘আমরা প্রতিটি বিষয়ে একমত থাকতে পারি না, কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা এগিয়ে যেতে পারবো না।’

তুরস্ক একটি ভারতীয় উদ্যোগে যোগ দিচ্ছে যা কোয়ালিশন ফর ডিজাস্টার রেসিলিয়েন্ট ইনফ্রাস্ট্রাকচার নামে পরিচিত। 

২০০৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর ঐতিহাসিক তুরস্ক সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নতুন ও সম্ভাবনাময় দিকে পরিচালিত করে। সাম্প্রতিক কাশ্মীর ইস্যু বাদ দিলে এই দুই উদীয়মান শক্তির সুসম্পর্ক নতুন ঘটনা নয়। ২০০৮ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রিসেপ তাইয়িপ এরদোগান তুরস্ক-ভারত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে (এফটিএ) সমর্থন করেন। পরের বছর, তুরস্কের প্রথম ন্যানো স্যাটেলাইট (আইটিইউপিস্যাট১) ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা কর্তৃক পিএসএলভি সি-১৪ রকেটে মহাকাশে পাঠানো হয়। ২০১০ সালে ভারত সফরে গিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবদুল্লাহ গুল মহাকাশ গবেষণা, জৈব প্রযুক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে নয়াদিল্লির সাথে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। তারপর থেকে, উদীয়মান অংশীদারিত্ব বাণিজ্য ক্ষেত্রে সবচেয়ে দ্রুত অগ্রসর হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২০০০ সালে ৫০৫ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০১৮ সালে ৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়েছে। বস্তুত, চীনের পর ভারত পূর্ব এশিয়ায় তুরস্কের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হয়েছে। উপরন্তু, ২০১৯ সালে ভারতের সাথে তুরস্কের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা তার এই অঞ্চলের অন্যতম মিত্র পাকিস্তানের সাথে পরিচালিত বাণিজ্যকে ( ৮০৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ছাড়িয়ে গেছে। 

দেখা যাচ্ছে যে এই অঞ্চলে তুর্কি প্রভাবকে সানন্দে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক মোটামুটি সবগুলো বড় শক্তি যদি না নিজের স্বার্থে আঘাত আসে; যা অত্যন্ত স্বাভাবিক। তবে দেখবার বিষয় মার্কিন বলয়কে হাতে রেখে কিভাবে চীন-রাশিয়া ব্লকের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে এই অঞ্চলে নিজের প্রভাব বাড়ায় আঙ্কারা যেখানে তাকে মোকাবেলা করতে হবে সৌদি বলয়কেও যার ভিত্তি বেশ দৃঢ় ও গভীর। বাম- ডান আদর্শগত দ্বন্দ্বের বাইরে আবার না নতুন কোন আদর্শগত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে এই অঞ্চল- এই সংশয়কে একেবারে উড়িয়ে না দেয়াই উচিৎ হবে বলে মনে হয়।

লেখক: গবেষক
raiyanamir@gmail.com