তিতাসের বকেয়া বিলের পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা ছুঁই ছুঁই। এক বছরেই সংস্থাটির বকেয়া বেড়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। শিল্প-কারখানাগুলোর কাছে বকেয়ার পরিমাণ বেশি। কিছু কারখানা আদালতে মামলা করে গ্যাসের বিলের বিপরীতে কম গ্যাস বিল পরিশোধ করছে। এছাড়া সিএনজি স্টেশন, ক্যাপটিভ, বাণিজ্যিক ও কলোনিগুলোয় বকেয়া রয়েছে তিতাসের। সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সার কারখানার কাছে বকেয়া আছে। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, করোনার সময়ে তিতাসের বকেয়া অধিক হারে বেড়েছে। বকেয়া বিল বাড়ার কারণ মূলত করোনা মহামারী। করোনাকালীন গ্যাস বিল পরিশোধে গ্রাহকদের যে সুযোগ দেয়া হয়েছিল, সেই সুযোগ নিয়ে অনেকে বিল পরিশোধ করেননি। অনেকে কয়েক মাসের বিল বকেয়া রেখেছেন। এখন একসঙ্গে এত বিল পরিশোধ করতেও ব্যর্থ হচ্ছেন গ্রাহকদের বড় একটি অংশ।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকরা কয়েক মাসের বিল ইচ্ছাকৃত বকেয়া পড়ার পর তিতাস কঠোর হতে গেলেই তারা আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেক্ষেত্রে আদালতের কাছে ব্যবসায়ীরা আর্জিতে বলছেন, তার প্রতিষ্ঠানে বহু শ্রমিক কাজ করেন। এখন গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে তার কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। এতে শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়বেন। আদালত ওই প্রতিষ্ঠানের বিল প্রদানের সীমা বেঁধে দিচ্ছেন। ফলে প্রতি মাসেই শিল্প মালিকদের কাছে বিপুল অংকের গ্যাস বিল বকেয়া থাকছে। তবে বিল আদায়ের উদ্যোগ হিসেবে তিতাসের পক্ষ থেকে রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হচ্ছে। এভাবে বকেয়া আদায়ের বিষয়টি দুষ্টচক্রের ফাঁদে পড়ছে। বর্তমানে তিতাসের এ ধরনের হাজারের ওপর মামলা রয়েছে। ফলে একদিকে বিল তো আদায়ই হচ্ছে না, অন্যদিকে মামলা পরিচালনার জন্য তিতাসের অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে। মাঝে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিইআরসির সহায়তা নেয়ার কথা বলা হলেও বিষয়টিতে তেমন অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। তিতাসের বকেয়া আদায়ে মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি জরুরি। এক্ষেত্রে বিইআরসি ব্যবসায়ী ও তিতাসের মধ্যে সমঝোতার ভূমিকা রাখতে পারে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ততার কারণে যারা সময়মতো তিতাসের বকেয়া পরিশোধ করতে পারেননি, তাদের সহায়তা জোগানো এবং বিল পরিশোধে যাদের অতীত রেকর্ড সুখকর নয়, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। অবশ্যই ভালো গ্রাহকরা যেন হয়রানির শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত না হন, তা নিশ্চিত করতে হবে। বকেয়া আদায়ে কিস্তি সুবিধা প্রদান, জরিমানা মওকুফসহ কিছু পদক্ষেপ নেয়ার সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের অতীত আচরণ অনুযায়ী কেস টু কেস অবস্থা পর্যালোচনার মাধ্যমে বকেয়া আদায়ের উদ্যোগ নিতে পারে তিতাস। ভালো গ্রাহক সময় প্রার্থনা করলে তাকে তা প্রদান এবং মন্দ গ্রাহকের লাইন বাতিলের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে।
গ্যাসের বকেয়া আদায়ে তিতাসকে আরো সক্রিয় হতে হবে। শুধু চিঠি প্রদানের মধ্যে তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে রাখলে চলবে না। মন্ত্রণালয়কে এক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধানের উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। বকেয়ার একটি অংশ অবৈধ সংযোগ প্রদানের মাধ্যমে অপচয় হয়েছে বলে যে অভিযোগ রয়েছে, তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে তিতাসের সার্বিক কার্যক্রম ও বিষয়ের অডিট হওয়া জরুরি। সর্বাগ্রে তিতাসের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন তিতাসের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে কিছু সুপারিশ করেছিল। যার মধ্যে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে নতুন সংযোগ বা পুনঃসংযোগের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া, গ্রাহক পর্যায়ে প্রিপেইড মিটার স্থাপন, বিচ্ছিন্নকৃত গ্যাস সংযোগ নিয়মের মধ্যে রেখে পুনঃসংযোগ, বকেয়া আদায় জোরদার, নিয়মিত জনবল বদলি, কোম্পানির নিজস্ব বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, হিসাবের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নিয়মিত পরিদর্শন কার্যক্রম জোরদার করা, গ্যাস বিপণন নীতিমালা অনুসরণ করা, ক্রয় প্রক্রিয়া বা দরপত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, অডিট নিষ্পত্তিতে কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রভৃতি ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর অনেক সময় অতিবাহিত হলেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি, যা হতাশাজনক। তিতাস শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হওয়ায় তাদের বকেয়ার বোঝা শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের ওপর পড়ছে। বিষয়টি আমলে নিয়ে দ্রুতই বকেয়া আদায়ের পদক্ষেপ নিতে হবে। বকেয়ার তালিকায় থাকা অনেক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী রয়েছে বলে খবর মিলছে। এক্ষেত্রে সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা প্রয়োজন। বকেয়া হওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ না করলেও পুঞ্জিভূত হতে থাকা এ অর্থ ক্রমে তিতাসের বোঝায় পরিণত হবে, যা গ্যাস খাত উন্নয়নের প্রতিবন্ধকও।
গ্যাস বিল বকেয়ার সমস্যার সহজ সমাধান হিসেবে বিশ্বের উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলোয় প্রিপেইড মিটার কার্যকর বলে প্রমাণিত। বাংলাদেশে গ্যাসের অপচয় রোধ, সিস্টেম লস কমাতে প্রিপেইড মিটার চালুর প্রস্তাব এসেছে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকেও। কয়েকটি প্রকল্প নেয়াও হয়েছিল। ঢাকার কয়েকটি অঞ্চলে আবাসিক গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের প্রিপেইড মিটার চালুর সুফল পেয়েছে তিতাস কর্তৃপক্ষ, গ্রাহকের বিল কমে এসেছে। গবেষণা বলছে, এ এলাকায় গ্যাসের অপচয়ও হ্রাস পেয়েছে। গ্যাসের অপচয় ও চুরি রোধসহ বকেয়া কমাতে শিল্পাঞ্চলেও প্রিপেইড মিটার চালু করা প্রয়োজন। কিন্তু গ্যাসের প্রিপেইড মিটার প্রকল্পের অগ্রগতি স্থবির হয়ে পড়েছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে গ্যাসের বকেয়া বিল সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে এর বিকল্প নেই। অবৈধ সংযোগ বন্ধে অভিযান আরো জোরদার করতে হবে।










