সড়ক-মহাসড়ক, সেতুসহ অন্য যোগাযোগ অবকাঠামোয় টোল আহরণ একটি বৈশ্বিক রীতি। বিশ্বের সব দেশেই এ ধরনের অবকাঠামো ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট হারে টোল দিতে হয় চলাচলকারী যানবাহনকে। বাংলাদেশেও বিশেষত সেতু ও ফেরি পারাপারের ক্ষেত্রে টোল আহরণের প্রচলন আছে। সরকারি রাজস্ব আয় ও সড়ক-সেতু রক্ষণাবেক্ষণ-মেরামত ব্যয়ের অন্যতম উৎসও এটি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের বিদ্যমান টোল আদায় পদ্ধতির সর্বোচ্চ কার্যকারিতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। টোল আদায়ের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, মহাসড়কগুলোর প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়ন ব্যয় মেটানো এবং নতুন সড়ক নির্মাণে ফান্ড তৈরি করা। মানসম্পন্ন সেবা প্রদানের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতার প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়িয়ে তোলাও টোলের একটি উপযোগ। কিন্তু বিপুল পরিমাণ অর্থ টোলের মাধ্যমে সওজ ও বিআইডব্লিউটিএ আদায় করলেও মানসম্পন্ন সেবা দিতে পারছে না সংস্থাগুলো। টোল আদায়ের সেকেলে ব্যবস্থা, মানহীন সড়ক ও ভঙ্গুর যন্ত্রপাতি দিয়ে সেবা প্রদান করায় সময়ক্ষেপণের কারণে পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে উঠছে। বর্তমান পদ্ধতিতে ফেরির ক্ষেত্রে ম্যানুয়ালি আর সেতুর ক্ষেত্রে টোল প্লাজার মাধ্যমে আধা ম্যানুয়েল ও আধা ডিজিটাল উপায়ে টোল আদায়ের কারণে টোল প্লাজাগুলো সড়ক-মহাসড়কে যান প্রবাহের গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আলোচ্য ব্যবস্থায় ঘণ্টায় ৩০০টির বেশি যানবাহন সেবা নিতে পারে না। এটি অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ কারণে অধিক যানবাহন টোল প্লাজায় এলে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। তাছাড়া বিদ্যমান ব্যবস্থায় কিছু ক্ষেত্রে টেম্পারিং ও অস্বচ্ছতার সুযোগ আছে। এ কারণে সুনির্দিষ্ট যানবাহন ও যাত্রী টোল দিলেও অনেক ক্ষেত্রে তা সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না এবং সরকার উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রাজস্ব্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বণিক বার্তার সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে বাস-ট্রাকের বছরে টোল ব্যয় গড়ে ২ লাখ টাকা। এত ব্যয় পরিবহনসংশ্লিষ্টদের বড় দুশ্চিন্তার কারণ। টোলের বোঝার কারণে ব্যবসায়ের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও কমছে বলে খবর মিলছে। বিশ্বের যেসব দেশে টোল রোড বা সেতু রয়েছে সেখানে এটি ব্যবহারের মাধ্যমে যে সেবা ব্যবহারকারী পান, তা অর্থ ব্যয়ের চেয়ে বেশি। সেখানে টোল ছাড়া গন্তব্যে পৌঁছানোরও ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে টোল প্রদান করা ছাড়া গন্তব্যে পৌঁছানোর কোনো উপায় নেই। অর্থাৎ এখানে সেবাগ্রহীতাকে নিম্নমানের সেবা গ্রহণ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এমন ঘটনাও আছে, সেতুর টোল আদায়ের সময়সীমা পার হওয়ার পরও সেখান থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এতে পণ্য পরিবহন ব্যয় বাড়ছে।
আজকাল অনেক দেশেই টোল আহরণের ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক টোল কালেকশন (ইটিসি) পদ্ধতি ব্যবহার হচ্ছে। এটি এমন এক ডিজিটাল প্রযুক্তি, যা টোল প্রদানের জন্য কোনো ধরনের বিরতি দেয়া ছাড়াই যানবাহনগুলোকে টোল প্লাজা অতিক্রমের সুযোগ দেয়। এ প্রযুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সুবিধা হলো, এটি টোল প্লাজার কাছাকাছি যানজট হ্রাস করে। এছাড়া টোল আহরণে সময় সাশ্রয়, জ্বালানি সাশ্রয়, সড়কের সক্ষমতা বৃদ্ধি, টোল বুথে অপেক্ষার সময় হ্রাস এবং সর্বোপরি গাড়ির কার্বন নিঃসরণ কমানোর মাধ্যমে পরিবেশগত বিপর্যয় কমায়। বাংলাদেশে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে বড় প্রতিবন্ধকতা হলো বিপুল সময়ক্ষেপণ। এতে উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বিনষ্ট হচ্ছে। টোলসংক্রান্ত জটিলতার কারণে পণ্য নষ্ট হওয়া থেকে শুরু করে মূল্য বেড়ে যায় বলে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। এক্ষেত্রে সড়ক-মহাসড়কেও শৃঙ্খলা ফেরাতে টোল ব্যবস্থা আধুনিকায়ন প্রয়োজন। একই সঙ্গে মানসম্পন্ন সেবা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সেবাগ্রহীতারা একে বাড়তি হিসেবে না দেখে। সড়ক-মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ট্রিপপ্রতি বিপুল অংকের চাঁদা আদায়ের খবর মিলছে, যার সঙ্গে প্রভাবশালীরা যুক্ত। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, টোলের চেয়ে চাঁদাবাজির অংক আরো বেশি। ফলে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে অভাবিত মাত্রায়, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপর। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ়তায় অন্যায্য মাশুল আদায়ের এ সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে হবে। একই সঙ্গে রাস্তার গুণগত মান বজায় রাখা প্রয়োজন। আমাদের দেশে রাস্তা নির্মাণের কয়েক দিন পরই তা নষ্ট হয়ে যায়। টোলপ্লাজায় দীর্ঘ যানজট হয়। ছোট ছোট গাড়ি অবাধে চলে, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে। এসব অনিয়ম বহাল থাকলে টোল আরোপের বিষয়টি প্রশ্নের মুখে পড়তে বাধ্য।
টোল থেকে আদায়কৃত অর্থ সড়ক-সেতু রক্ষণাবেক্ষণ ও মানসম্পন্ন অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করা প্রয়োজন। বিপুল পরিমাণ অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে তার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা টোলের অর্থ সড়ক-সেতু রক্ষণাবেক্ষণ ফান্ডে জমা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। পরে এ অর্থ সংশ্লিষ্ট সেতু রক্ষণাবেক্ষণ ও মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে তা নির্মাণে ব্যয়ের কথা বলেছিলেন। এর পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। টোলের হার ও সেবা এমন হওয়া চাই সেখানে সেবাগ্রহীতা সেবা গ্রহণ করে সর্বোচ্চ উপযোগ লাভ করবে এবং এতে উৎপাদন ব্যয় প্রভাবিত হবে না। কিন্তু আমরা দেখছি, টোল ও চাঁদাবাজির কারণে পণ্য মূল্য বেড়ে যাচ্ছে, যা ভোক্তার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। শুধু তাই নয় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রেও এটি নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে।










