আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলবিষয়ক প্রকাশনা লয়েড’স লিস্টের সর্বসাম্প্রতিক মূল্যায়নে আরো ছয় ধাপ এগিয়ে বিশ্বের ব্যস্ততম বন্দরের তালিকায় ৫৮তম অবস্থানে উঠে এসেছে চট্টগ্রাম বন্দর। এর আগে অবস্থান ছিল ৬৪তম। টানা চার বছর ধরে এক্ষেত্রে অগ্রগতি বিরাজমান। এ সময়ের মধ্যে বিশ্বের অনেক দেশের বন্দরে কার্গো-কনটেইনার পরিবহনের সংখ্যা কমেছে কিন্তু আমাদের চট্টগ্রাম বন্দর ব্যতিক্রম। এর ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত আছে। এটা নিশ্চয়ই প্রীতিকর তথ্য। কেননা কোনো দেশের আন্তর্জাতিক সমুদ্রবন্দরে কার্গো-কনটেইনার পরিবহনের সংখ্যা অব্যাহতভাবে বেড়ে যাওয়ার অর্থ হলো দেশটির মোট জাতীয় উৎপাদন, শিল্প খাতের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষভাবে বাড়ছে বৈদেশিক বাণিজ্য। বাংলাদেশের রফতানি পণ্যের পুরোটাই বিদেশে যায় কনটেইনারের মাধ্যমে। শিল্প খাতের কাঁচামালসহ আমদানি খাতের বড় অংশও আসে কনটেইনারের মাধ্যমেই। বিশ্ববাজারে ধীরগতি সত্ত্বেও চট্টগ্রাম বন্দরের এ অগ্রগতি সংগত কারণেই আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে। তবে এ ধারাবাহিক অগ্রগতির ফলে আমাদের প্রধান বন্দরে কিছু সমস্যাও বাড়ছে। কনটেইনার পরিবহনের সংখ্যা অব্যাহতভাবে বাড়ার কারণে বন্দরটিতে পণ্য খালাসে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে বেশি। সেখানে জাহাজজট একটা স্থায়ী সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বের যেসব সমুদ্রবন্দরে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সবচেয়ে বেশি সময় লাগে, চট্টগ্রাম বন্দর সেগুলোর তালিকার শুরুর দিকে রয়েছে। মূলত জেটির অপ্রতুলতায় এমনটি হচ্ছে। বন্দরটির অপারেশনাল কার্যক্রমের ব্যাপ্তি বৃদ্ধির সুবাদে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১২ শতাংশ হারে কার্গো-কনটেইনার হ্যান্ডলিং বাড়ছে। অথচ সেই অনুপাতে জেটির সংখ্যা বাড়েনি কিংবা পুরনো জেটিগুলোর সংস্কার কার্যক্রম জোরদার হয়নি। জাহাজজটজনিত কারণে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতার মূল কারণ এখানেই নিহিত।
শুধু জেটির অপর্যাপ্ততা নয়, হ্যান্ডলিংয়ে আধুনিক যন্ত্রপাতির ঘাটতি, ইয়ার্ডের পরিসর সংকট, পুরনো শুল্ক ফির পরিবর্তন না হওয়া, অকশন কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রক্রিয়াগত জটিলতা, বার্থগুলোর অপর্যাপ্ত গভীরতা, জোয়ার-ভাটার ওপর জাহাজ অপারেশন নির্ভরশীল হওয়া, সংকুচিত পোর্ট অ্যাকসেস রোডসহ চট্টগ্রাম বন্দরের যথাযথ ব্যবহারে মোট ১৬ ধরনের সমস্যা চিহ্নিত করে এবং সেসবের সমাধানের উপায় জানিয়ে সম্প্রতি একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বিষয়গুলো আমলে নিয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সক্রিয়তা কাম্য।
চার-পাঁচ বছর ধরে বন্দরের অনেক উন্নয়ন হচ্ছে। তবে দুঃখজনক হলো এর কোনোটাই পরিকল্পনামাফিক হচ্ছে না। পরিকল্পনামাফিক না হওয়ায় বন্দরের কার্যক্রমও সুচারুভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। কর্ণফুলীর দুই পাড়ে বন্দরের কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষ সেই পরিকল্পনায় এগোচ্ছে না। ফলে কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। এদিকে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় ২০১৮ সালে চট্টগ্রাম বে টার্মিনাল প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও এখনো তা অনেকটাই কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ। কবে এর কাজ শুরু হবে তাও চূড়ান্ত হয়নি। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পাঁচ হাজার কনটেইনার বহন ক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ বার্থিং করানো সম্ভব হবে। জাহাজ ভেড়ানোর ক্ষেত্রে জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করতে হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সুতরাং আলোচ্য প্রকল্পের বাস্তবায়ন যত দ্রুত শেষ হবে, তার সুফল হবে সুদূরপ্রসারী।
সবকিছু ছাপিয়ে আসলে চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যাটি অবকাঠামোগত। জেটির সংখ্যা না বাড়ালে দ্রুত পণ্য খালাসের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার সমস্যা স্থায়ীভাবে দূর করা সম্ভব হবে না। কিন্তু সেটি সময়সাপেক্ষ কাজ; অন্তত আরো দেড় বছরের আগে জেটির সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু সেজন্য বন্দরের জাহাজজট ও পণ্য খালাসের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় গতিসঞ্চারের উদ্যোগ ফেলে রাখা যায় না। বন্দরের সংস্কার কার্যক্রম নিয়মিত চালাতে হবে, কনটেইনার রাখার জায়গা সম্প্রসারণ করতে হবে এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা জোরালো করতে হবে। একই সঙ্গে বন্দর কর্তৃপক্ষের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে বৈকি।
এদিকে বন্দর পরিচালনার ক্ষেত্রে এখনো কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রয়ে গেছে। বিশ্বে একটি আধুনিক বন্দর পরিচালনার জন্য আমাদের নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে যে নিয়মকানুনগুলো আছে সেগুলো আধুনিক বিশ্বে অচল। সুতরাং আমলাতান্ত্রিক এসব জটিলতাকে সহজ করে অত্যাধুনিক নিয়মকানুন প্রবর্তন করতে হবে এবং সেসবের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর যেভাবে পরিচালিত হচ্ছে, তাতে দ্রুত অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা সীমিত। এক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের প্রতিনিধি নিয়ে পুরো বন্দর কর্তৃপক্ষ ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি। সম্পৃক্ত অন্য সংস্থাগুলোর সঙ্গেও সুসমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। নইলে অযথা কালক্ষেপণ হবে। আরেকটি বিষয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনেক নিয়মকানুন বন্দরের নিয়মকানুনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আইন-বিধির সমরূপতা না থাকলে অযাচিত জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং ব্যবহারকারীরা হয়রানির শিকার হন। এটি অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে আইনগত সংস্কারের মাধ্যমে সরকার চট্টগ্রামের সক্ষমতা ও গতিশীলতা বৃদ্ধিতে কার্যকর উদ্যোগ নেবে, এটিই প্রত্যাশা।










