দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। চলমান করোনা মহামারীতে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় আর্থিক সংকটে পড়েছে এসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ অবস্থায় এরই মধ্যে একটি বিক্রি হওয়ার পাশাপাশি আরো কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এ প্রক্রিয়ায় রয়েছে বলে খবর মিলছে। কাজটি বিদ্যমান আইনের পরিপন্থি। এক্ষেত্রে অভিভাবক সংস্থা হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।

গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও উচ্চশিক্ষার চাহিদা মেটাতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে আসছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। জনসংখ্যা অনুপাতে দেশে সরকারি ব্যবস্থাপনায় উচ্চশিক্ষা অবকাঠামো এখনো অপ্রতুল। সময়ান্তরে নতুন নতুন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া হলেও উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী সব তরুণ জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটাতে তা পুরোপুরি সমর্থ নয়। ফলে বাস্তবিক প্রয়োজনের ওপর ভিত্তি করেই দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়ে উঠে এসেছে, যদিও এর পেছনে উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিই কাজ করেছে। এতদিন প্রতিষ্ঠানগুলো নির্বিঘ্নে চললেও করোনা মহামারী তাতে বড় ধরনের ছেদ ঘটায়। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো এতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও ভর্তি প্রক্রিয়া, পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণ সবই স্থগিত। মূলত শিক্ষার্থী ভর্তি ও টিউশন ফি প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ের উৎস হওয়ায় করোনাকালীন ছুটিতে তার পথ বন্ধ। মাঝে কিছু প্রতিষ্ঠান স্ব-উদ্যোগী হয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির প্রচেষ্টা নিলেও তাতে খুব একটা সাড়া মেলেনি। ফলে আর্থিক সংকটে পড়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। অনেক প্রতিষ্ঠানই শিক্ষক ও অন্যান্য জনবলের বেতন-ভাতা বহনে হিমশিম খাচ্ছে। এ প্রেক্ষাপটে কিছু প্রতিষ্ঠান অর্থের বিনিময়ে মালিকানা বদলের যে উদ্যোগ নিচ্ছে, তা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।

সংশ্লিষ্ট আইনে ট্রাস্টি পর্ষদ পুনর্গঠনের সুযোগ থাকলেও বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। এ অবস্থায় তত্ত্বাবধানকারী সংস্থার অগোচরে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যে বিক্রি করা হচ্ছে, সেটি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বৈকি। এটিকে প্রতিষ্ঠানগুলোর আগের অনিয়মের ধারারই আরেকটি প্রকাশ হিসেবে দেখতে হবে। অতীতেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন অনিয়মের কারণে আলোচনায় এসেছে। শিক্ষা পরিষদ, সিন্ডিকেট, পরিচালনা পর্ষদ ও অর্থ কমিটির নিয়মিত সভা না করা, উপাচার্যসহ শীর্ষ তিন পদে নিয়োগে অনাগ্রহ, নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে গড়িমসি, পূর্ণকালীন শিক্ষক নিয়োগে শিথিলতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণ না করা প্রভৃতি অনিয়ম সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমনকি কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষিত তহবিলের বিপরীতে ভুয়া কাগজপত্র ও স্বাক্ষর জাল করে ট্রাস্টি সদস্যদের ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সুশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ইউজিসি বিভিন্ন সময় নানা সুপারিশ দিয়েছে বটে, কিন্তু বলিষ্ঠ ও কঠোর পদক্ষেপের ঘাটতিতে এসব অনিয়ম রোধ করা যায়নি। শক্তভাবে এটি প্রতিহত করা প্রয়োজন। আইনি পরিকাঠামোর মধ্যে থেকে পরিবর্তিত বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতে সুচারুভাবে ট্রাস্টি পর্ষদ কীভাবে পুনর্গঠন করা যায়, তার উপায় সন্ধানই এখন সময়ের দাবি।    

বর্তমানে আমাদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সতিই আর্থিক সংকটে আছে। এটি নিশ্চয়ই উদ্বেগের। বাজার অর্থনীতির সূত্র অনুযায়ী ব্যবসা মন্দা গেলে বা চালাতে সমর্থ না হলে যেকোনো প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বদল হবে, বিক্রি হবে—এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু শিক্ষা আর দশটি পণ্যের মতো নয়। এটি মানুষের জীবন গঠনের জন্য একটি খুব তাত্পর্যপূর্ণ ও অপরিহার্য অনুষঙ্গ। এটি নিছকই ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে চালিত হওয়া উচিত নয়। স্বভাবতই বিষয়টি মাথায় রেখে বিদ্যমান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনেও বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। চলমান মালিকানা বদলের এ প্রবণতা আলোচ্য আইনের মূল সারাৎসারেরই বিপরীত। সেক্ষেত্রে একান্তভাবে সেটি করতে হলে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমতি ও অনুমোদনের ভিত্তিতে করা দরকার। এর ব্যত্যয় হলে প্রয়োজনে দায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা  যেমন নিতে হবে, একইসঙ্গে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দিক থেকেও সহাযোগিতামূলক একটা সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।  ছুটিকালীন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, পরিচালন ব্যয়গুলো কীভাবে মেটানো হচ্ছে, কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা, সে বিষয়েও খোঁজখবর রাখা চাই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরামর্শের ভিত্তিতে সরকারও সংকটে থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য প্রয়োজনে প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে পারে। এতে আর্থিক চাপ অনেকাংশে প্রশমিত হতে পারে বৈকি। 

অনলাইনে অনেকটা শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারলেও আর্থিক সংকট কিছুটা কাটানো যেত। বাস্তবতা হলো, অনেক দেশে পুরো শিক্ষা কার্যক্রম অনলাইনে চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা থাকলেও আমাদের যথেষ্ট অনলাইন পরিকাঠামো নেই। কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্ষেত্রে কিছুটা অবকাঠামোগত প্রস্তুতি থাকলেও অনেকেরই নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে উচ্চবিত্ত ছেলেমেয়ে যেমন পড়ে, তেমনি মধ্যবিত্ত ঘরের শিক্ষার্থীরাও পড়ে। তদুপরি দূরশিক্ষণের মাধ্যমে পাঠদান করার উদ্যোগ নেয়া হলেও ইন্টারনেট খরচ ও ডিভাইস ব্যয় বেশি হওয়ায় সেটি অনেকের জন্য কষ্টসাধ্য। সুতরাং পুরোপুরিভাবে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নের কাজটিও খুব একটা সহজ নয়। প্রতিটি দেশেই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমান্তরালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপস্থিতি রয়েছে। করোনায় সব দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই কম-বেশি অভিঘাতের শিকার। কিছু দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো বন্ধ, কিছু দেশ খোলার পরিকল্পনা করছে। ওইসব দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সংকট পার করছে, কী ধরনের পরিকল্পনা ও নীতি-কৌশল গ্রহণ করছে, সেগুলো পর্যালোচনা করা জরুরি। কার্যকর প্রমাণিত নীতি হাতিয়ারগুলো দেশের বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতের সঙ্গে মিল রেখে অভিনবমূলকভাবে প্রয়োজনে প্রয়োগ করা যেতে পারে।

বিশ্বের উচ্চমানের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে। জ্ঞান ও গবেষণায় দীপ্তি ছড়িয়ে সুনামের সঙ্গে বহু বছর ধরে টিকে আছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি, ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রভৃতি। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী ভারতেও ভিআইটি ইউনিভার্সিটি, বিরলা ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি অ্যান্ড সায়েন্স, অমৃত বিশ্ব বিদ্যাপীঠ, ইউনিভার্সিটি অব পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড এনার্জি স্টাডিজের মতো বিখ্যাত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। সেগুলো প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানসম্মত উচ্চশিক্ষা জুগিয়ে আসছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্থায়িত্বশীলতার ক্ষেত্রে শিক্ষার প্রতি কর্তৃপক্ষের একাগ্রতা, সুশৃঙ্খলা, নিয়ম পরিপালন নিশ্চিত, গবেষণা ও গুণগত মানে অধিক মনোনিবেশ করার বিষয়টি ভূমিকা রেখেছে। আমাদের দেশেও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়সহ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভালো করছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ছোট ছোট কিছু নীতিগত বিচ্যুতির খবর নানা সময়ে উঠে এসেছে। এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক স্থায়িত্বশীলতার পথে বাধা। কাজেই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে মানে ও শৃঙ্খলায় দীর্ঘমেয়াদি উত্তরণের এখনই সময়।