এশিয়া ও বিশ্বের অন্য প্রান্তের উন্নত ও উন্নয়নশীল কিছু দেশের শিল্প কাঠামোয় এসএমই একটি প্রধান ভূমিকা রেখেছে। ফলে ওইসব দেশ বৈশ্বিক পরিসরে এসএমই-চালিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সফল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছে। এক্ষেত্রে চীন ও ভারতের কথা বিশেষভাবে বলা যায়। চীনের শিল্প খাতে এসএমইর অবদান ৬০ শতাংশ। দেশটিতে এ খাতে মোট শ্রমশক্তির ৪০ শতাংশের কর্মসংস্থান হচ্ছে। একইভাবে ভারতের শিল্প খাতে এসএমইর অবদান ৪০ শতাংশ এবং তাদের মোট শ্রমশক্তির মধ্যে ১০ কোটি ৬০ লাখ এ খাতে নিয়োজিত। আর বাংলাদেশের শিল্প খাতে এসএমই খাতের অবদান এখনো সাড়ে ২০ শতাংশের কাছাকাছি। বৃহৎ শিল্পের সঙ্গে চমত্কার পশ্চাৎ সংযোগ ঘটানোর মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতিতে এসএমইর আরো বড় মাত্রায় অবদান রাখার সুযোগ আছে। সম্প্রতি আয়োজিত সংশ্লিষ্ট এক কর্মশালায় বক্তাদের ভাষ্যেও এর অনুরণন ঘটেছে। সুতরাং যথার্থ কারণেই বড় শিল্প খাত ও সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে এসএমইর অধিকতর বিকাশের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা। বিষয়টি আমলে নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে কার্যকর উদ্যোগ কাম্য।

লক্ষণীয়, বিশ্বায়নের সুবাদে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিনিয়ত বহুমাত্রিক পরিবর্তন ঘটছে। এর সঙ্গে নিজেদের সক্ষমতাকে সময়োপযোগী করতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পবান্ধব একটি ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব, অর্থের অপ্রতুল জোগান, কঠোর নীতি ও বৈষম্যমূলক আচরণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বেগবান হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সরকারি দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নের অনীহাও বিরাজমান। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য যে ঋণ সুবিধা দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছিল, তা খুব কম ক্ষেত্রেই বাস্তবায়ন হয়েছে। কাজেই সবসময় আর্থিক ঝুঁকিতে থাকে খাতটি। একই কারণে করোনার অভিঘাতেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এটি। ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশনের (আইএফসি) গবেষণা জরিপ অনুযায়ী, মহামারীর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বাংলাদেশের এসএমই উদ্যোক্তারা। কিন্তু প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শৈথিল্য ও অনাগ্রহ দেখা গেছে তাদের বেলায়। ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে ঋণ প্যাকেজগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়ায় ব্যাংকগুলো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ দিতে আগ্রহী হলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবের অজুহাতে এসএমইগুলোকে ঋণ সুবিধা প্রদানে উদ্যোগী হচ্ছে না। ফলে তাদের জন্য ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন। চলতি মূলধন নিঃশেষ হওয়ার কারণে অনেক এসএমই উদ্যোগ বন্ধ হয়েছে। যারা এখনো টিকে আছে, তাদের বাণিজ্যিকভাবে স্থায়িত্বশীল এসএমইতে পরিণত করতে গেলে অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্টরা এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ আরো বাড়ানো এবং সহজ ও শিথিল শর্তে তা তাদের কাছে পৌঁছে দেয়ার কথা বলছেন। এটি বিবেচনায় নেয়া চাই। ভারতসহ উন্নয়নশীল দেশে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত এসএমইকে ঋণ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। সেসব দেশের কেউ কেউ সরাসরি নগদ সহায়তা, আবার কেউ কেউ ব্যাংকের ওপর নির্ভর করছে। সার্বিকভাবে দেশগুলো কীভাবে এসএমইকে পৃষ্ঠপোষকতা জোগাচ্ছে, সেটি অনুসরণ করা যেতে পারে।

সংশ্লিষ্ট খাতের বিরাজমান সংকট উত্তরণে এসএমই নীতিমালা ২০১৯ বাস্তবায়ন, এসএমই উদ্যোক্তাদের সেবা প্রদানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশেষ নজর দেয়া, ডিজিটাল আর্থিক সেবা শক্তিশালী করা, ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড তৈরি করে এসএমই উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ বিতরণ নজরদারি করা এবং তাদের পণ্য রফতানিতে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। এক্ষেত্রে এসএমই ফাউন্ডেশন ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের সক্রিয়তা আশা করব।

বলার অপেক্ষা রাখে না, মোট জিডিপিতে এসএমইর অবদান এখনো কম হলেও মোট কর্মসংস্থানে এর অংশ বেশ উল্লেখযোগ্য। দি ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন ফর স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজেস ইন এশিয়া পরিচালিত এক গবেষণার তথ্যমতে, বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানে এসএমইর অবদান ৩৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। তার মানে এ খাতের উদ্যোগগুলো শ্রমঘন। কাজেই বেকারত্বের চাপ সামলানো ও অধিক কর্মসংস্থানের জন্য এসএমইর আবশ্যকতা অনস্বীকার্য। বড় শিল্পের সঙ্গে এসএমইর সুসমন্বয় ও সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে অর্থনীতিতে গুণক প্রভাব সৃষ্টি সম্ভব, যার বড় উদাহরণ জাপান। জাপানের বড় কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের পুরোটা নিজেরা উৎপাদন না করে সাব-কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে দেশটির ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান থেকে উৎপাদন করিয়ে নেয়। এতে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বিপুল মানুষের সংযুক্তি যেমন সম্ভব হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক আয়ের ক্ষেত্রেও কিছুটা সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়েছে। জাপানের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনাপূর্বক বাংলাদেশেও বড় শিল্পের সঙ্গে এসএমইর সংযোগটি গড়ে তোলা জরুরি। এজন্য নীতি সহায়তা আরো বাড়ানোর পাশাপাশি অনুকূল নিয়ন্ত্রণ পরিবেশ কীভাবে বিনির্মাণ করা যায়, তার উপায় অন্বেষণ করতে হবে।