১৯২১ সালের ১ জুলাই রমনা এলাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ দেশে উচ্চশিক্ষার যাত্রা শুরু। দেশে উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। তাছাড়া ১৯৬১ সালে ভেটেরিনারি ও কৃষি অনুষদ নামে দুটি অনুষদ নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা, যার পরবর্তী নাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এদিকে দেশে প্রকৌশল ও কারিগরি শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে ১৯৬২ সালের ১ জুন পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়; যা ১৯৭১-এর পর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় নামকরণ করা হয়। পূর্বাঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে ১৯৬৬ সালের ১৮ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। এদিকে দেশে চিকিৎসাবিজ্ঞানবিষয়ক শিক্ষার জন্য ১৯৪৬ সালের ১০ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ এবং ১৯৬৫ সালে ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চ (আইপিজিএসআর) প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯৮ সালের ৩০ এপ্রিল সংসদীয় অধ্যাদেশের মাধ্যমে এটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। মোট কথা বর্তমানে ৪৬টি পাবলিক ও ১০৭টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, বেশকিছু বিশেষায়িত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কলেজ নিয়ে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
সম্পূর্ণ আবাসিক হিসেবে বিশিষ্ট রসায়নবিদ অধ্যাপক মফিজ উদ্দিনকে প্রথম উপাচার্য করে ১৯৭০ সালে জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। কার্যত ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি তত্কালীন গভর্নর আচার্য এসএম আহসান বিশ্ববিদ্যালয়টি উদ্বোধন করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে এর যাত্রা শুরু হয়। প্রথম ব্যাচে ১৫০ জন শিক্ষার্থী ও ২১ জন শিক্ষক নিয়ে পরিসংখ্যান, ভূগোল, অর্থনীতি ও গণিত বিভাগ পাঠদান কার্যক্রম শুরু করে। ওই সময়ে ১৪ জন কর্মকর্তা ও ১২৫ জন কর্মচারী কাজ করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়টি রাজধানীর জিরো পয়েন্ট থেকে ৩২ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পশ্চিমে ৬৯৭ দশমিক ৫৬ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়টির শ্যামল পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর। বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য জলাশয় একে পরিযায়ী পাখির অভয়ারণ্য হিসেবে পরিণত করেছে এবং এটি পাখি পর্যবেক্ষকদের একটি পছন্দের জায়গা। এখন পর্যন্ত এটিই বাংলাদেশের একমাত্র আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন সময় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন প্রখ্যাত কবি অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, ভাষাবিদ ও সাহিত্যিক অধ্যাপক মুহম্মদ এনামুল হক, লোকসাহিত্যবিদ অধ্যাপক মজহারুল ইসলাম, লেখক অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, ভূগোলবিদ অধ্যাপক আ ফ ম কামালউদ্দিন, অধ্যাপক মো. এ নোমান, পরিসংখ্যানবিদ অধ্যাপক কাজী সালেহ আহমেদ, অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন, অর্থনীতিবিদ আমিরুল ইসলাম চৌধুরী, রসায়নবিদ অধ্যাপক আলাউদ্দিন আহমেদ, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আব্দুল বায়েস, রসায়নবিদ অধ্যাপক জসীমউদ্দিন আহমেদ, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক খন্দকার মুস্তাহিদুর রহমান, পদার্থবিদ অধ্যাপক মো. মনিরুজ্জামান, রসায়নবিদ অধ্যাপক শরীফ এনামুল কবির, মাইক্রোবায়োলজিস্ট অধ্যাপক মো. আনোয়ার হোসেন, পরিসংখ্যানবিদ অধ্যাপক এমএ মতিন ও বর্তমান উপাচার্য নৃবিজ্ঞানী অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম।
মাননীয় উপাচার্যদের পাশাপাশি যেসব প্রথিতযশা শিক্ষক, গবেষক ও বিজ্ঞানী এ বিশ্ববিদ্যালয়কে আলোকিত করেছেন-করছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অধ্যাপক সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়, লেখক হায়াত মাহমুদ, লেখক হুমায়ুন আজাদ, নাট্যকার সেলিম আল দীন, কবি মোহাম্মদ রফিক, অধ্যাপক মুস্তাফা নূরুল ইসলাম, আবু রুশদ মতিনউদ্দিন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দিলারা চৌধুরী, অধ্যাপক নাসিম আখতার হোসাইন, ইতিহাসবিদ বজলুর রহমান খান, পরিসংখ্যানবিদ অধ্যাপক এম কবির, পদার্থবিদ অধ্যাপক সলিমুল্লাহ স্যার, রসায়নবিদ অধ্যাপক কেএম সফিউল্লাহ ও অধ্যাপক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ, ভূগোলবিদ অধ্যাপক খোন্দকার মউদুদ এলাহি, অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ ও প্লাজমা বিজ্ঞানী অধ্যাপক এএ মামুনসহ অনেকেই। অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থী দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সম্মাননা, পদক, ফেলোশিপ, অ্যাওয়ার্ড, সেরা গবেষক-বিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে আলোকিত ও সম্মানিত করেছেন।
শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্য, নাটক, সংগীত ও খেলাধুলায় এ বিশ্ববিদ্যালয়কে যারা সম্মান এনে দিয়েছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একেএম এনামুল হক শামীম—এমপি ও বর্তমান পানিসম্পদ উপমন্ত্রী, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন—এমপি ও হুইপ, জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা—এমপি, নাট্যজন হুমায়ুন ফরীদি, শহীদুজ্জামান সেলিম, ফারুক আহমেদ, শুভাশিস ভৌমিক ও সজল, নৃত্যশিল্পী শিবলী মুহাম্মদ, সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম, অভিনেত্রী সুমাইয়া শিমু, জাকিয়া বারী মম, মিম মানতাসা ও আফসানা আরা বিন্দু। এছাড়া দেশে-বিদেশে অগণিত সাবেক-বর্তমান শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা, শিল্প ও সাহিত্য, নাটক ও সংগীত, খেলাধুলা, রাজনীতি ও সাংবাদিকতা, সরকারি-বেসরকারি ও সামরিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যাংক বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম বৃদ্ধি করে চলেছেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, ইউজিসির সদস্য, পিএসসির সদস্য, ব্যাংকের চেয়ারম্যান, এমডি, সরকারের সচিব, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ডিজি, পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক হিসেবে কাজ করেছেন-করছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা অন্য থেকে আলাদা। এখানকার শিক্ষার্থীদের মাঝে যে বন্ধন, তা এককথায় অতুলনীয় এবং এই বন্ধন শিক্ষাজীবন শেষে কর্মক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হয়। এখানকার ছোট ছোট সম্পর্ক জীবনসংগীতে, একসঙ্গে ব্যবসায়িক পার্টনারে, কর্মক্ষেত্রে ও প্রয়োজনে পরস্পর সহযোগিতায়, পরবাসে একই জায়গায় বসবাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মূলত ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, আবাসিক ক্যাম্পাসনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা, প্রান্তিক, চৌরঙ্গী, ডেইরি গেট, মুক্তমঞ্চ, টিএসসি, ক্যাফেটেরিয়া, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, লাইব্রেরি, অডিটোরিয়াম এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহনকেন্দ্রিক ক্যাম্পাস-ঢাকা-ক্যাম্পাস যাতায়াত ব্যবস্থা এর অন্যতম কারণ বলে অনেকের ধারণা। এখানকার শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসজীবন বেশ প্রকৃতিনির্ভর। দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রজাতির পাখির কলকাকলি, প্রজাপতি, গুইসাপ, বিড়াল, কুকুর, শিয়াল, কাঠবিড়ালির উপস্থিতি ক্যাম্পাসকে একটি গ্রামীণ শহুরের মিশ্র অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে, যা সত্যিই অতুলনীয়। লাল সিরামিক ইটের তৈরি বিল্ডিং ও রাস্তা, প্রচুর গাছগাছালি ও লেক, উঁচু-নিচু রাস্তা ও লাল মাটি, সর্বোপরি এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ সহজেই সবার নজর কাড়ে।
সাংস্কৃতিক রাজধানী খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চ একটি অনন্য স্থাপনা, এটি পাহাড়ের পাদদেশে না হলেও ওই আদলেই তৈরি। লাল সিরামিক ইটের তৈরি মঞ্চটি ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে মুক্ত আকাশের নিচে গ্রিক এরিনা বা ওপেন এয়ার মঞ্চের আদলে নির্মাণ করা হয়েছে, যা এই উপমহাদেশে সর্বপ্রথম। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, স্টেজ থেকে সংলাপ বললে সামনের ও পেছনের সারিতে বসে সমানভাবে শোনা যায়। এ মঞ্চকে ক্যাম্পাসের সংস্কৃতিচর্চার এক উর্বর ভূমি বলা হয় এবং শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বাংলাদেশের খ্যাতনামা নাট্য সংগঠনের নাটক পরিবেশিত হয়ে থাকে। নতুন কলা ভবনের সামনে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক হিসেবে ৫২ ফুট ব্যাস ও ৭১ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট দেশের সবচেয়ে উঁচু শহীদ মিনারটি অবস্থিত। আটট সিঁড়ি ও তিনটি স্তম্ভবিশিষ্ট; দৃঢ়তার প্রতীক ত্রিভুজ আকৃতির ঋজু কাঠামোটিতে দেশের জন্য বীর শহীদদের আত্মত্যাগের মহিমা বিধৃত হয়েছে। আটটি সিঁড়ি বাংলাদেশ অভ্যুদয়ের আটটি তাত্পর্যপূর্ণ বছর ’৪৭, ’৫২, ’৫৪, ’৬২, ’৬৬, ’৬৯, ’৭০ ও ’৭১ এবং তিনটি স্তম্ভের একটি বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও অন্য দুটি মাটি ও মানুষ এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব-অর্থনৈতিক মুক্তি ও গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে। মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য সংশপ্তক রয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে এক পা ও এক হাত হারিয়েও এক সংশপ্তক মুক্তিযোদ্ধা বিজয়ের হাতিয়ার ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। কেন্দ্রীয় ক্যাফেটেরিয়ার সঙ্গেই রয়েছে ভাষা আন্দোলনের স্মরণে ভাস্কর্য অমর একুশ।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং তারই ধারাবাহিকতায় শিক্ষার্থীদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, জাতীয়তাবাদ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, ক্যাম্পাসের ভেতরে ও বাইরে সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ। তাছাড়া যৌন নিপীড়নবিরোধী আন্দোলন, বিভিন্ন সময় বেতন ও ডাইনিং চার্জ বৃদ্ধি বন্ধ, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন-সংগ্রাম ছিল উল্লেখ করার মতো। তাদের অতীত ঐতিহ্য ও স্মৃতি মনে রাখার জন্য আছে বেশকিছু সরণি। যেমন কবির সরণি, মুন্নী সরণি, স্বপ্না সরণি ও জুবায়ের সরণি উল্লেখযোগ্য। টিএসসির পাশেই রয়েছে সপ্তম ছায়ামঞ্চ, যা ক্যাম্পাসভিত্তিক সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করে। তাছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, স্বেচ্ছাসেবী, সাংস্কৃতিক, আবৃত্তি, চলচ্চিত্র, থিয়েটার, ক্লাবস, সোসাইটি, সমিতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সংগঠন সারা বছর ক্যাম্পাসকে উৎসবমুখর করে রাখে।
উচ্চশিক্ষায় অনেক কিছু প্রথমের সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটি জড়িত। বাংলাদেশের প্রথম নৃবিজ্ঞান, ব্যবসায় প্রশাসন, নাটক ও নাট্যতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, পাবলিক হেলথ ও ইনফরমেটিকস বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু তুলনামূলক সাহিত্য ও সংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের যাত্রা এখান থেকেই। শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রেও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম হওয়ার গৌরব রয়েছে, যেমন বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট ও নারী ফুটবল দলের কোচ, বাংলাদেশ জাতির দলের অধিনায়ক ও জাতীয় সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, প্রো-উপাচার্য, উপাচার্য, সংসদ সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই হয়েছেন। বাংলাদেশের প্রথম নারী উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই একজন। তাছাড়া, পাখি মেলা, প্রজাপতি মেলা, হিম উৎসব, সাপ খেলা, লাঠি খেলা, গাজীর গান, পালাগানের আসর, পুতুলনাচ, আদিবাসী নাচ, বাউল সন্ধ্যা, কাওয়ালি গান এখান থেকেই শুরু।
প্রথমে দুটি অনুষদে চারটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম বছরে এসে ছয়টি অনুষদ (৩৪টি বিভাগ), চারটি ইনস্টিটিউট, ছয়টি সেন্টার, ১৫টি অফিস, ১৬টি আবাসিক হল (আটটি ছেলেদের এবং আটটি মেয়েদের), প্রায় ৭৫০ জন শিক্ষক, ৩৭০ জন কর্মকর্তা, ১ হাজার ৫০০ জন কর্মচারী ও ১৫ হাজার ৩০০ শিক্ষার্থী নিয়ে চলছে বাংলাদেশের সমবয়সী এই উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি।
এদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একান্ত আগ্রহে, অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৪৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৩টি স্থাপনা তৈরি হবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছয় হাজার আসনের ১০ তলাবিশিষ্ট ছয়টি অত্যাধুনিক আবাসিক হল, ১০ তলাবিশিষ্ট প্রশাসনিক ভবন, হাউজ টিউটর, প্রভোস্ট, শিক্ষক, অফিসার, কর্মচারী ও পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য আবাসিক ভবন, গেস্ট হাউজ কাম গ্র্যাজুয়েট রিসার্চার হাউজ, বিভিন্ন অনুষদের অনুভূমিক সম্প্রসারণ, লেকচার থিয়েটার এবং পরীক্ষার হল নির্মাণ, নতুন লাইব্রেরি ভবন, স্পোর্টস কমপ্লেক্স, মুক্তমঞ্চের উন্নয়ন, ছাত্রীদের জন্য খেলার মাঠ, রাস্তা, গ্যাস, বৈদ্যুতিক ও পানির লাইন সংস্কার ও সম্প্রসারণ, অডিটোরিয়ামের সংশোধন, মেডিকেল সেন্টারের অ্যাম্বুলেন্স কেনা, মিনিবাস, আসবাবপত্র ও পিকআপ কেনা। ক্যাম্পাসে থাকবে একটি রোড নেটওয়ার্ক, যার মাধ্যমে ১৫ মিনিট অন্তর অন্তর গাড়ি চলবে। এই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পর ক্যাম্পাসে আবাসিক, একাডেমিক, গবেষণা, বিনোদন, ল্যাবরেটরির আধুনিকায়ন, ভৌত অবকাঠামোসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি ও বৃদ্ধি পাবে। শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্র আরো সম্প্রসারিত হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
একটি আবাসিক উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০ বছরে উপনীত হওয়া নিঃসন্দেহে অনেক গৌরবের। অল্প কিছু সুযোগ-সুবিধা, লোকবল ও শিক্ষার্থী নিয়ে যার যাত্রা হয়েছিল ১৯৭১ সালের ১২ জানুয়ারি, আজ অনেক দূর এগিয়েছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মপরিধি এবং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নানা ক্যাটাগরিতে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক তথা বিশেষজ্ঞ-বিশিষ্ট জনের ধারণা, অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের ফলে সরাসরি উপকৃত হবে বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্ট সবাই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহুমাত্রিক, এখানকার বর্তমান, সাবেক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী সবার মাঝে বন্ধন অনেক সুদৃঢ় এবং ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। আগামীতেও এ ধারা বজায় থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সবার বিশ্বাস।
ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবীর: অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ
পরিচালক, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়










