চার দশকের বেশি সময় ধরে যশোহরের ভবদহ অঞ্চলের মানুষ জলাবদ্ধতার শিকার। একাধিক ভুল সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপের কারণে কোটি কোটি টাকা খরচ করার পরও জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান মেলেনি। কৃষি ও মত্স্য চাষের ওপর নির্ভরশীল এ এলাকার মানুষের জীবিকার পথও বন্ধ হওয়ার পথে। রোববার এক অনলাইন বৈঠকে ভুক্তভোগী ও বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় ভবদহের জলাবদ্ধতায় জনদুর্ভোগ, সংকট ও সমাধানের পথরেখা উঠে এসেছে। আলোচনায় অংশ নেয়া ব্যক্তিরা বলেন, ভবদহ অঞ্চলের মানুষের যে অভিজ্ঞতা, জ্ঞান, সেগুলোকে কখনই বিশ্লেষণ করা হয়নি। জলাবদ্ধতা এ অঞ্চলের মানুষের চাষের জমি, স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট এমনকি জীবনমান নিম্নমুখী করে দিয়েছে।
সবুজায়নের নামে পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৯৬১ সালে ভবদহে পোল্ডার (স্লুইস গেট) স্থাপন করে। প্রথম অবস্থায় ফসলের উৎপাদন বাড়লেও নদীর পানির স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত করার প্রভাব ধীরে ধীরে পড়তে থাকে। এর পর থেকে আশপাশের নদ-নদীর নাব্য কমতে থাকে। ১৯৮১ সালের পর শুরু হয় জলাবদ্ধতা। জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে এলাকার মানুষ নদীর বেড়িবাঁধ কেটে জোয়ারের পানি পাশের বিলে ঢুকিয়ে দেয়। এরপর সরকার থেকে গ্রহণ করা হয় টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) প্রকল্প। এতে সুফলও মিলেছিল। কিন্তু বেশি দিন স্থায়ী হয়নি এটি। গত কয়েক বছরে আবারো জলাবদ্ধতার শিকার হচ্ছে ভবদহের মানুষ। বড় বিষয় হলো, জলাবদ্ধতার জন্য তারা কোনোভাবেই দায়ী নয়। কবে নাগাদ জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান আসবে, তা নিশ্চিত নয় কেউ। পরীক্ষিত এবং ১০০ শতাংশ সফল কোনো উদাহরণও নেই বিশ্বে। ভবদহের সমস্যাটি একটি জটিল বদ্বীপগত, যার সমাধান অন্য কোনো স্থানের সঙ্গে মেলানো যাবে না। একসময় পোল্ডার, বাঁধ ও স্লুইস গেট স্থাপনের মাধ্যমে এর সমাধান খোঁজা হলেও তাতে সুফল পাওয়া যায়নি। গত কয়েক বছরে জোয়ারাধার ও টিআরএম কিছুটা সুফল দিলেও এর টেকসইত্ব ও ভবিষ্যৎ ফলাফল নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। এটি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। বছরের পর বছর এবং বংশপরম্পরায় এ সমস্যার কারণে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারছে না। এসডিজি অর্জন করতে হলে পিছিয়ে পড়া এ অঞ্চলের মানুষের দারিদ্র্য ঘোচাতে হবে। সেক্ষেত্রে জলের ভেতরে বন্দি থাকা জনসাধারণকে অপেক্ষাকৃত ভালো স্থানে স্থানান্তর এবং তাদের সহায়তা প্রদান সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের পাশাপাশি বিলের ওপর নির্ভরশীল জনগণকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ভাতা বা ত্রাণের ব্যবস্থা করতে হবে। বর্তমান সমাধান হিসেবে ভবদহে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে সামাজিক নিরাপত্তাজালের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়ন ও অর্থ বা খাদ্যসহায়তা প্রদান কার্যক্রমের স্বচ্ছতা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। ৪০ বছর ধরে এখানে অনেকে স্থায়ীভাবে উদ্বাস্তু হয়েছে। তাদের পুনর্বাসনও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি জলাবদ্ধ এলাকা এ অঞ্চলের মানুষের চাষের জমি, স্কুল-কলেজ, রাস্তাঘাট এমনকি পারিবারিক জীবনমান নিম্নমুখী করে দিয়েছে। তাদের জীবনমান স্বাভাবিক করতেও পদক্ষেপ নিতে হবে।
ভবদহ জলাবদ্ধতার সমাধানের জন্য স্লুইস গেটগুলোর পলি দ্রুত অপসারণ করা জরুরি। পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থা নিলে টিআরএম নদী সচল করতে পারে। এক্ষেত্রে স্থানীয়দের দাবি আমলে নেয়া যায় কিনা, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। পাখিমারা বিলে (সাতক্ষীরার তালায়) টিআরএম প্রকল্পের ফলে কপোতাক্ষ নদ কিছুটা হলেও সচল করা গেছে। তবে টিআরএম বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ব্যাপক সম্পৃক্ততা ও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন। ভবদহের জলাবদ্ধতা যেমন নিরসন করতে হবে, তেমনি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য টিকিয়ে রাখতে হলে নদ-নদীগুলোকেও নাব্য সংকট থেকে রক্ষা করতে হবে।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সমস্যাটা প্রকৃতিসৃষ্ট নয়, এটি মনুষ্যসৃষ্ট। ভবদহের কারণে এ অঞ্চলের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ভালো থাকায় আগে নদীর গতিপ্রকৃতি ঠিক ছিল, যে কারণে সেখানে বসবাসরত মানুষের বিলের স্বাভাবিক জলাবদ্ধতায় বসবাসে সমস্যা হয়নি। ভবদহের প্রাকৃতিক যে বৈশিষ্ট্য, সেটি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। ভবদহকে স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট নদ-নদীগুলোকে পললমুক্ত করতে হবে। তবে তা নদীকে শাসন করে নয়, নদীকে মুক্ত করে। অবাধে জোয়ার-ভাটার সুযোগ দিলে ভবদহ সমস্যা দূর হবে বলে অনেকে মনে করছেন। যথাযথ নদী ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। এক্ষেত্রে ভবদহ সমস্যা সমাধানে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান আমলে নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বিষয়টি পর্যালোচনার্পূবক দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।










