বার্ষিক বাজেট চূড়ান্তকরণের এ সময়ে আমরা বড় বড় অংকের হিসাব শুনতেই বেশি অভ্যস্ত। হাজার কোটি টাকার বাজেটের বিপরীতে লক্ষ কোটি টাকার জিডিপি কিংবা হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি, এডিপি ইত্যাদি। এসবের মাঝে অর্থনীতির ছোট ছোট অনেক অনুষঙ্গ গুরুত্বহীন মনে হলেও আসলে এ সবকিছুর সমন্বয়েই অর্থনীতির পুরো কাঠামো গড়ে ওঠে। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণে বিশ্বব্যাপী সম্ভাব্য মন্দা নিয়ে যে আলোচনা শুরু হয়েছে, তার বাইরে আরো কিছু বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দিতে চাই। আজকের এ লেখায় নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর সময়ে মানুষের জীবনসংক্রান্ত কিছু বিষয়ে আলোকপাত করে অর্থনীতির ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক উভয় বিষয় নিয়ে লিখতে আগ্রহ বোধ করছি।

ভোক্তার মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ দিয়ে শুরু করি। সাধারণভাবে দেখা যায়, একজনের ভোগ অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বলে মানুষ অন্যের ভোগ পছন্দ করে না। কিন্তু মাস্ক কিংবা স্যানিটাইজার ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম লক্ষণীয়। অন্যের ব্যবহার আমাকে আনন্দ দিচ্ছে। আমি নিজে ব্যবহার করছি এবং পাশের মানুষের সঙ্গে আমার অংশেরটা ভাগ করে নিচ্ছি। ফলে এসব ব্যক্তিগত পণ্য অনেকটা পাবলিক পণ্যের মতো আচরণ করছে। আপনার ব্যবহারের ফলে আমার ভাগ কমে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা আমাকে কষ্ট দিচ্ছে না। বিষয়টি ভিক্ষুকদের আচরণের সঙ্গে মিলে যায়! গাড়িতে করে যাচ্ছেন, একজন ভিক্ষুককে টাকা দিলেন। সে তার নিজেরটা গ্রহণ করে পাশের জনকে উদ্বুদ্ধ করবে। পাবলিক পণ্য ব্যবহারের মতো এখানে ভোগ বা স্বার্থের কোনো দ্বন্দ্ব্ব নেই।

খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আসতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। মুখরোচক খাবারের প্রতি আকর্ষণ কমে যেতে পারে। নেশাজাতীয় দ্রব্যের চাহিদা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যারা কোনো দিন ভেষজ দ্রব্যাদি খাননি, তারাও আদা, রসুন, কালিজিরা, লবঙ্গ, মধু ইত্যাদিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। যেসব তরুণ-তরুণী সিগারেটে আসক্ত ছিলেন, তারা বাসার বাইরে যেতে পারেননি বলে অভ্যাস পরিবর্তন হয়ে থাকতে পারে। অনেকেই মাস্ক ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ভাইরাসের প্রকোপ থেমে গেলেও মাস্কের ব্যবহার আগামী অনেক দিন পর্যন্ত চলবে। চোখ ধাঁধানো কোনো বৈশিষ্ট্য হাইলাইট করে ভিন্ন কৌশলে মার্কেটিংয়ের মাধ্যমে নতুন ধরনের মাস্ক উৎপাদনে বিনিয়োগ করা যেতে পারে।

আগামী দিনে ফার্ম লেভেলে উৎপাদনের জায়গায় উদ্যোক্তাদের চিন্তা ও বিনিয়োগে পরিবর্তন আসবে। দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় কিছু পণ্য ও সেবার প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে গেছে। যেমন অনেকে চুল কাটার কাজ নিজেই করছেন। সন্তানের চুল নিজেই কাটছেন এবং নিজের জন্য পার্লারের চাহিদা কমিয়ে ফেলেছেন। ফলে এসব পণ্য ও সেবার প্রতি আগ্রহ কমে গিয়ে বিকল্প ধারণা গড়ে উঠতে পারে। স্যানিটাইজার, অ্যান্টিসেপটিক, ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদি পণ্যের ব্যবহার এবং একই সঙ্গে অভ্যস্ততা বাড়ায় আরো কিছুদিন মানুষ এসব পণ্য ব্যবহার করবে। গোসল ও কাপড় ধোয়া বেড়ে যাওয়ার ফলে সাবান ও ডিটারজেন্টের ব্যবহার বেড়েছে। ফলে এসব পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়বে। ভবিষ্যতে এসব পণ্যের দামও বাড়তে পারে। কারণ কাঁচামালের চাহিদা বাড়বে এবং এসব পণ্যের চাহিদাও বেড়ে যাবে। তবে নিম্নমানের পণ্য বাজারে আসার আশঙ্কা অনেক এবং যদি তা-ই হয় তাহলে দাম কমেও যেতে পারে। এছাড়া যাদের মাথাপিছু আয় বেশি, তাদের চাহিদা বাড়ার কারণে মেডিকেল সার্ভিসসংক্রান্ত বিনিয়োগ বাড়বে। 

পাবলিক পরিবহন বন্ধ থাকার সুবাদে গণপরিবহনের পাশাপাশি নতুন করে গড়ে ওঠা উবার, পাঠাও, ও-ভাইসহ অন্যান্য রাইডের সঙ্গে যুক্ত পেশাজীবীদের কোনো আয় নেই। জুতা সেলাই, ঘড়ি মেরামত, স্বর্ণের কারিগর ইত্যাদি পেশার বা বাসায় কাজের লোকের চাহিদা কমে গেছে। অনেকে বাধ্য হয়ে নিজে কাজ করতে শিখে গিয়েছেন, যা আগামীতে মানুষের দৈনন্দিন কাজের ধরন পরিবর্তন করবে। বিনোদনের উপকরণ ব্যবহারে পরিবর্তন অনেক বেশি। পত্রিকার হকারদের প্রয়োজন কমেছে অনেকখানি। কারণ বিকল্প হিসেবে অনলাইন নতুন জায়গা করে নিয়েছে। নেটফ্লিক্স ও অন্যান্য অনলাইন প্লাটফর্মে মুভি দেখার অভ্যাস তৈরি হয়েছে। জুম ব্যবহার করে অনলাইনে কাজ করার প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে আগামী দিনে অহেতুক কাজের জন্য বাইরে বের না হয়ে ঘরে বসেই কাজ করার ক্ষেত্র তৈরি হবে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০২০-এর জানুয়ারি থেকে মে সময়ে জুম, নেটফ্লিক্স ও আমাজনের শেয়ারের মূল্য বেড়েছে যথাক্রমে ১৩১ দশমিক ৯, ২৮ দশমিক ৯ ও ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ। ঠিক এ মুহূর্তে নেটফ্লিক্সের শেয়ারের দাম সর্ববৃহৎ তেল ও গ্যাস প্রতিষ্ঠান এক্সনমবিলের চেয়ে বেশি। ফেসবুক, হোয়াটস-আপ, ভাইবার, ইমো, ইনস্টাগ্রাম, বটিমসহ সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের শেয়ারের গতি ঊর্ধ্বমুখী। গ্যারান্টি দিচ্ছি, এ শিল্পে নতুন বিনিয়োগ আসবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন অ্যাপস নিয়ে এসে ভালো মতো মার্কেটিং করতে পারলে মুনাফা নিশ্চিত।

সামষ্টিক অর্থনীতি বিবেচনায় ২০০৮ সালের মন্দা-পরবর্তী ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই বিশ্ব অর্থনীতি এক আবশ্যিক মন্দার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে। বৈশ্বিকভাবে সার্বিক চাহিদার ঘাটতির ফলে উৎপাদন এবং এর ফলে কর্মসংস্থান কমে গিয়ে এক মারাত্মক ঝুঁকির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। একটি অর্থনীতিতে মূলত দুই ধরনের কর্মসংস্থান দেখা যায়—প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক। পৃথিবীর অন্যান্য নিম্ন বা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের মতো আমাদের দেশেও কভিড-১৯-এর প্রকোপে সবচেয়ে ভয়ংকর ক্ষতি হবে অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের জায়গায়। হাজারো উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা যাবে। ঢাকা শহরে যারা বাদাম, ছোলা, বরিশালের আমড়া, ভাপা পিঠা, ফুচকাসহ বাহারি খাবারের দ্রব্যাদি বিক্রি করতেন, তারা কী করবেন? যারা গলির মুখে, রাস্তায়, ফুটপাতে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় ও গৃহস্থালি সামগ্রী বিক্রি করতেন, তারা কী করছেন? কিংবা ধরুন দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষুদ্র কাপড় বিক্রেতাদের দোকান বন্ধ থাকার ফলে তাদের কী অবস্থা হবে? যদি বড় ব্যবসায়ী হয়ে থাকেন, তবে তার হয়তো কিছু সঞ্চয় রয়েছে কিন্তু যিনি দর্জি, তার কী হবে? চোর, পকেটমার, ঘুষখোর, ছিনতাইকারী এমনকি দালাল শ্রেণীর লোকজনের কর্মসংস্থান এখন একদম সীমিত। যারা বইয়ের প্রকাশক, বিক্রেতা বা মার্কেটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত, তাদের কী হবে? যেসব প্রতিষ্ঠান ও তার কর্মচারীরা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে জড়িত, তাদের কী হবে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষা উপকরণ এবং খেলাধুলা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা বন্ধ থাকায় এসব উপকরণের চাহিদা শূন্যের কোটায়। অর্থনীতির আকার বড় হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের আয় ও সঞ্চয় বাড়লেও সবার তো বাড়েনি। যিনি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, তার হয়তো সঞ্চয় রয়েছে কিন্তু যে ছেলেটি প্রডাকশন বয় হিসেবে দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করত, তার কী হবে? দিনমজুর, রিকশাচালক, পরিবহন শ্রমিক, আইনজীবী, মুহুরি, দলিল লেখক, চা-পান বিক্রেতা ও ভ্রাম্যমাণ ডাক্তার, খণ্ডকালীন চাকরিসহ এ রকম হাজারো পেশাজীবী মানুষের বেঁচে থাকাটা কতখানি কষ্টকর হয়ে গেছে তা অনুভবও করতে পারছি না। তৃতীয় বিশ্বের স্বল্পোন্নত এমনকি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি হয়ে গেছে, কিসের মধ্যে সমন্বয় করবেন—না খেয়ে মরে যাওয়া, নাকি নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মরে যাওয়ার মধ্যে?

এখানে সমস্যার জায়গা দুটি। এক. অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের প্রকৃত হিসাব নেই। ঠিক কতজন মানুষ আজ নিজেদের আর্থিক অসহায়ত্বের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, তা সঠিকভাবে জানা যাচ্ছে না। দুই. এ অর্থনৈতিক ও মানবিক বিপর্যয়ে ভিক্ষুকদের মতো এদের কারো কাছে হাত পাতার যোগ্যতা নেই! ফলে নিজের ও পরিবারের কাছে হেরে যাওয়া ছাড়া আর কি-ইবা করার আছে? লক্ষ করলে দেখা যাবে নভেল করোনাভাইরাসের এ সময়ে আমাদের দেশে ভিক্ষুকদের খুব একটা সমস্যা হয়নি। শুরুর কিছুদিন বাদ দিলে তাদের ঈদের আগে-পরে রাস্তায় দেখা গেছে এবং এখন নিয়মিত চোখে পড়ছে।

প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও রয়েছে গভীর সমস্যা। বড় ব্যবসায়ীদের মুনাফা ও আয় কমে গেলেও বেঁচে থাকা নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। তবে প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হলে অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ এ সবকিছুর সঙ্গে অর্থনীতির একটি শক্তিশালী পশ্চাৎ সংযোগ ও অগ্রসংযোগ রয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান দুইভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। সরাসরি ও প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের বিরূপ প্রভাবে পরোক্ষভাবে। ধরা যাক, বড় একটি কাপড়ের দোকান বা কোনো রেস্টুরেন্টের মালিকের অনেক টাকা সঞ্চয় রয়েছে। কিন্তু দোকান-রেস্টুরেন্ট বন্ধ থাকলে এর শ্রমিক ও পণ্য বাজারজাতের সঙ্গে যারা সম্পৃক্ত তারা কী করবেন? কর্মচারীদের কি বেতন দেয়া হবে? কিংবা কোন ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকলে তার সামনের চায়ের দোকানের বিক্রি হবে কীভাবে?

এত কিছুর মাঝে নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের এ সময়ে আমাদের অর্থনীতির দুটি শক্তিশালী দিক চোখে পড়েছে। প্রথমত, আমাদের উৎপাদন ও বাজারজাত ব্যবস্থা অনেক শক্তিশালী বলে প্রতীয়মান। নভেল করোনাভাইরাসের সঙ্গে সম্পর্কিত হেন কোনো দ্রব্য ও সেবা নেই, যা ফুটপাতে পাওয়া যাচ্ছে না। পিপিই, মাস্ক, স্যানিটাইজার থেকে শুরু করে সবকিছুই একদম হাতের নাগালে। উত্তরা, গুলিস্তান, মিরপুর, ধানমন্ডি হোক আর গলির মুখে সাজানো ছোট টেবিলের ওপর হোক, সব জায়গায় এসব দ্রব্য পাওয়া যাচ্ছে। এন৯৫ মাস্ক থেকে শুরু করে সাধারণ কাপড়ের তৈরি মাস্ক সবই সহজলভ্য; যদিও মানের পার্থক্য থাকতে পারে। এসব পণ্য আমরা ঠিকমতো ব্যবহার করছি কিনা, সেটিও ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থার এ দিকটি হেসে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। এটি আমাদের অর্থনীতির সামর্থ্যের দিক প্রকাশ করে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে আমাদের নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থায় এসব পণ্য তৈরি করেছি অথবা বাইরে থেকে আমদানি করছি। পণ্যের মান নিয়ে অনেক সন্দেহ থাকতে পারে কিন্তু এটি নিঃসন্দেহে আমাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রকাশ করে।

দ্বিতীয়ত, মার্চের শেষ থেকে শুরু হওয়া সাধারণ ছুটি ও বিক্ষিপ্ত লকডাউনে প্রায় সবকিছুই বন্ধ ছিল। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট বন্ধ থাকার পরও পণ্য পরিবহনে কোনো সমস্যা পরিলক্ষিত হয়নি। ভোক্তার চাহিদা, সিন্ডিকেট বা পণ্য পরিবহনে অধিক খরচের কারণে দামের পার্থক্য হতেই পারে, তবু কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি। কৃষিজাত পণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি, ওষুধসহ প্রায় সবকিছুর সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল। এটিও অর্থনীতির শক্তির দিক প্রকাশ করে। যদিও বিত্তবান মানুষের বেঁচে থাকার অধিক আগ্রহের কারণে স্যানিটাইজার, অ্যান্টিসেপটিক, ব্লিচিং পাউডার ইত্যাদি দ্রব্য অতিরিক্ত মজুদ করার ফলে শুরুতে ঘাটতি দেখা গিয়েছিল।

একই বাস্তবতায় আমাদের ত্রাণসামগ্রীর পরিমাণ নিয়ে কোনো ঘাটতির কথা শোনা যায়নি। ত্রাণপ্রাপ্তি নিয়ে জাতি হিসেবে আমাদের আবেগ সীমাহীন। যার বাড়িতে অনেক খাবার রয়েছে, তিনি আরো ত্রাণ পেতে চান। তার প্রতিবেশী বা আশেপাশের কেউ পেল কিনা, তাতে কিছু যায় আসে না। বিষয়টি আমাদের সামাজিক দৈন্য প্রকাশ করে। কভিড-১৯-এর এই পরিবর্তিত সময়ে কর্মসংস্থান কমে গিয়ে যদিও বিষয়টি অন্য রকম, তবু বলছি, ত্রাণ পাওয়া নিয়ে আমাদের এক অজানা ভালো লাগা কাজ করে। বিভিন্ন দুর্যোগের সময় যখন কাজের অনেক সুযোগ ছিল, তখনো মানুষ ৬ ঘণ্টা ব্যয় করে (যাওয়া-আসা ও ত্রাণ পাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ানো) পাঁচ কেজি চাল সংগ্রহ করেছে। ভেবে দেখুন, আমাদের শক্তিশালী অর্থনীতি বিবেচনায় একজনের ৬ ঘণ্টা কাজের মূল্য অন্তত ৬০০ টাকা। আর ত্রাণ বিতরণের বাড়তি ফটোসেশনের কথা নাই-বা বললাম! মজার বিষয় হচ্ছে, বিয়েবাড়ি বা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে যত খাবারই রান্না করা হোক, ঘাটতি হবেই। ফলে দেখা যাচ্ছে সম্পদের পরিমাণের চেয়ে সমন্বয়ের গুরুত্ব অধিক। এই সামাজিক সমস্যা উত্তরণের দায়িত্ব সমাজকেই নিতে হবে। সামাজিক রীতিনীতিতে ভিন্ন রকম এক কষ্টের অনুভূতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। কী দরকার এ সমাজ ব্যবস্থার, যে সমাজ ব্যবস্থায় নিজের আত্মীয়স্বজন বাদ দিয়ে মৃতের সংস্কারে স্বেচ্ছাসেবকদের এগিয়ে আসতে হয়?

বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড, সিসা কমে গিয়ে আকাশ পরিষ্কার হওয়ার পাশাপাশি আমাদের নিজেদের মানবিক মূল্যবোধের পরিবর্তনও আবশ্যক। দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়ে গিয়ে অর্থনীতির সার্বিক যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে ইতিবাচক সামাজিক মূলধনের গুরুত্ব অপরিসীম। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দেশগুলোর কতদিন লাগবে আর আগামীতে এ ধরনের সমস্যা মোকাবেলায় সামাজিক মূলধনের ভূমিকা কী হবে, তা নিয়ে ব্যাপক গবেষণার অবকাশ রয়েছে। তবে মানুষ যেহেতু খুব দ্রুত অভিযোজন করতে পারে, তাই আমি নিশ্চিত নিকট ভবিষ্যতে সবাই সবকিছু ভুলে যাবে। কভিড-১৯ মোকাবেলায় ব্যক্তি পর্যায়ের ধারণা ও প্রচেষ্টা দিয়ে সবার সমস্যার সমাধান হবে না। সবার সমস্যার সমাধান করতে হলে সম্মিলিত প্রচেষ্টা লাগবে। ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় শুধু বিক্ষিপ্ত সমাধান হবে। সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কোনো বিকল্প খুঁজে লাভ নেই।

 

মোস্তফা মোরশেদ: উন্নয়ন অর্থনীতি গবেষক