বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতের বিষয়টি নির্ভর করে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষকের উপস্থিতির ওপর। ২০ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষকের উপস্থিতিকে বৈশ্বিকভাবে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাতের ন্যূনতম মানদণ্ড ধরা হলেও তা অনুসরণ করতে পারছে না দেশের বেশকিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এসব প্রতিষ্ঠানে একজন শিক্ষকের অধীনে শিক্ষার্থী রয়েছেন ৪০ থেকে ৪৪ জন। এ অনুপাত যৌক্তিক পর্যায়ে না থাকায় নিশ্চিত হচ্ছে না শিক্ষার্থীদের মানসম্মত উচ্চশিক্ষা। কেননা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগ্রহণ পদ্ধতি বিশেষায়িত ও গবেষণাধর্মী হওয়ার কারণে সেখানে শিক্ষকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান ও পর্যবেক্ষণ জরুরি। সম্প্রতি এ-সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। সেখানে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক ন্যূনতম মানদণ্ড থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছে দেশের বেশ কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে রয়েছে পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, যা শিক্ষার্থীদের মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিতে প্রতিবন্ধক।
গত এক দশকে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় দেড় গুণ হারে বাড়লেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে আরো কয়েক গুণ বেশি। উচ্চশিক্ষা যেন শুধু বিভাগীয় শহর বা রাজধানীকেন্দ্রিক না হয়, এ লক্ষ্যে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জেলা পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। এভাবে নিশ্চিতের চেষ্টা করা হয়েছে জেলা পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাও যেন তাদের সুবিধাজনক গণ্ডির মধ্যেই উচ্চ ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ পান। তবে প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থী ভর্তি করতে যতটা উদ্যোগী, প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগে ততটাই অনিচ্ছুক। ফলে শিক্ষার্থীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভিজ্ঞ ও প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ করা হয়নি। এভাবে উপেক্ষিত থেকে গেছে মানসম্মত পাঠদানের বিষয়টি।
বিশ্ববিদ্যালয় শুধু কাঠামোগত পরিসর নয়। পরিকল্পিতভাবে বিভাগ খোলা, শিক্ষক নিয়োগ দেয়া, শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন নতুন উদ্ভাবন ও গবেষণার পরিবেশ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক পূর্ণতা প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই শিক্ষক সংকট সমাধানে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনকে বিশেষভাবে উদ্যোগী হতে হবে। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট কেন তীব্র তা খতিয়ে দেখে যত দ্রুত সম্ভব শিক্ষক নিয়োগ করা জরুরি। প্রয়োজনে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিকে সঙ্গে নিয়ে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগী হতে হবে। পাশাপাশি ক্লাসরুম পাঠদান, উন্নত শিক্ষা কার্যক্রম, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক ও শিক্ষা খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। বৃদ্ধি করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণা কার্যক্রম। শিক্ষক শূন্যতা পূরণের পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বিষয়েও মনোযোগী হতে হবে।
অনুমোদিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগের জন্য ইউজিসির পক্ষ থেকে পদ সৃষ্টি করে দেয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানভেদে ইচ্ছাকৃত অভ্যন্তরীণ সমস্যার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। তবে জ্যেষ্ঠ মর্যাদার পদের জন্য উপযুক্ত ও পর্যাপ্ত শিক্ষক না পাওয়ায় বিষয়টিও অস্বীকারের উপায় নেই। তাছাড়া প্রধান প্রধান নগরীর বাইরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় অধ্যাপকরা যোগ দিতেও আগ্রহী থাকেন না। ফলে নতুন কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের পদ পূরণে বিজ্ঞপ্তি দিয়েও কাঙ্ক্ষিত সাড়া না পাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় প্রয়োজনীয় সংখ্যক অধ্যাপক নিয়োগ দিতে হলে নীতিনির্ধারকদের উদ্যোগী ও উদ্ভাবনী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। রাজধানীসহ যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট শিক্ষকের মধ্যে অধ্যাপকের অনুপাত বেশি, সেখান থেকে কিছু অধ্যাপককে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি করা যেতে পারে। একই সঙ্গে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিন্ন শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা খাতের দুর্নীতি-অনিয়ম চিহ্নিত করে তা দূরীকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
দেশে উচ্চ শিক্ষার মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হয়। অথচ নবতর প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলোতেও শিক্ষক সংকট বিদ্যমান। শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত না করে এসব প্রতিষ্ঠানে একের পর এক নতুন বিভাগ খোলা ও অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তির কারণেই সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। তাছাড়া মানসম্মত শিক্ষার অভাবে এসব বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হওয়া শিক্ষার্থীরাও পরবর্তী সময়ে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন।
উচ্চশিক্ষার বৈশ্বিক প্রবণতার উল্টো পথে হাঁটছে বাংলাদেশ। ভারত ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানে নেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এমনকি নাইজেরিয়ার মতো দেশও অন্তত দুটো বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বের শীর্ষ ২০০টির মধ্যে অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশের এমন কোনো পরিকল্পনার কথা শোনা যায় না। আমাদের শিক্ষক সংকট সমাধানের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে। শিক্ষক সংকট কাটিয়ে উঠতে অবসরে যাওয়া শিক্ষকদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে নতুন শিক্ষক নিয়োগের জন্য জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। তবে শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রথাগত চক্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিশেষভাবে জোর দিতে হবে। কেননা যোগ্য প্রার্থীরা শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ না পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাই মানহীন হয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়। তাছাড়া বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা হচ্ছে না। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণা খাতে বাজেট বরাদ্দ হারের চিত্রও হতাশাজনক। তাই অপর্যাপ্ত গবেষণামূলক শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণা খাতে অপর্যাপ্ত বাজেট সমস্যার সমাধান জরুরি।










