সরকার যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করে তখন বিদ্যুৎ সংকটে পুরো দেশ বিপর্যস্ত। শিল্প-কারখানার উৎপাদন থেকে শুরু করে বিনিয়োগ, এমনকি স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ব্যাহত হয়েছে বিদ্যুত্স্বল্পতার কারণে। দ্রুত বিদ্যুৎ পেতে সমাধান হিসেবে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করতে বেশকিছু সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এতে বিদ্যুৎ সংকট মিটলেও বাড়তি ব্যয়ের চাপ বাড়ে বিপিডিবির। ক্যাপাসিটি চার্জ প্রদান, ব্যয়বহুল জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অধিক দামে বিদ্যুৎ কেনার মতো কিছু সিদ্ধান্ত বিপিডিবির বোঝাকে ভারী করেছে। চাপ সামলাতে সরকারের কাছ থেকে সহায়তা নিতে হয় বিপিডিবিকে। প্রথম দিকে সহায়তা দেয়া হতো ঋণ হিসেবে। এর দায় বিপিডিবিকে টানতে হতো। কিন্তু গত কয়েক বছর সরকার ভর্তুকি হিসেবে অর্থ দিলে এ দায় থেকে মুক্তি মেলে সংস্থাটির। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, বিপিডিবির আয়-ব্যয়ের ব্যবধান কমেছে। আয়ের তুলনায় সংস্থাটির ব্যয় এখনও অনেক বেশি। বাড়তি অর্থ সরকার যোগাচ্ছে। ফলে বিপিডিবির লোকসান কমে এসেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা ছিল ৯ কোটি টাকা। যদিও এর পেছনে পরোক্ষ কিছু কারণ রয়েছে— আলোচ্য অর্থবছরে করোনার কারণে শিল্পোৎপাদন বেশ কয়েক মাস বন্ধ ছিল। এ নিয়ে গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকা ও সরকারের ভর্তুকির কারণে বিপিডিবির লোকসান কম হয়েছে।
বেসরকারি উদ্যোক্তাদের নানা সুবিধা দেয়া হলেও তাদের কাছ থেকে বেশি দামেই বিদ্যুৎ কিনছে বিপিডিবি। এমনকি প্রতি বছর যে হারে বাজেটারি সাপোর্ট বা ভর্তুকি দেয়া হয়, তাতেও বিপিডিবির বাড়তি সুবিধা নেই। তবে নীতি সহায়তা কাজে লাগিয়ে ব্যবসা বড় করেছে বেসরকারি কোম্পানিগুলো। পিডিবির যে সংকট, সেজন্য দায়ী মূলত তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়ে যাওয়া। নিয়মিত ভর্তুকি বাবদ যে অর্থ দেয়া হয়, তা বেসরকারি কোম্পানিগুলোর কাছেই যাচ্ছে। বিতরণ ও হুইলিং চার্জই বিপিডিবির আয়ের উৎস। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী কয়লাভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যথাসময়ে উৎপাদনে আসতে না পারায় ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে তেলভিত্তিক ছোট ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা এখনো রয়ে গেছে। তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ইউনিটপ্রতি বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। এছাড়া ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার পর্যায়ের ডিজেলচালিত বেশির ভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন খরচও বেশি। এসবের ফলে বিপিডিবির ব্যয় বাড়ছে।
স্বল্প সময়ে বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য বেসরকারি খাতকে সুবিধা প্রদানের নীতি যথার্থ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎপাদন-বিপণন ও তার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। লোকসানের বোঝা কমাতে ঘন ঘন দাম বৃদ্ধি ও সরকারি ভর্তুকি টেকসই সমাধান নয়। দরকার ব্যয়সাশ্রয়ী বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র। সরকারের মহাপরিকল্পনায়ও বিষয়টি ছিল, কিন্তু এর অধিকাংশই নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন হয়নি। এ অবস্থায় বিদ্যমান বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে চুক্তি পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে ব্যয় কমিয়ে আনার পথ অনুসন্ধান করা যেতে পারে। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থায়ী ব্যয় উঠে গেছে, চলতি মূলধন ব্যয়ও কমেছে। অনেকের সঙ্গে বিপিডিবির চুক্তির মেয়াদও পার হয়েছে। মহামারীতে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) ও জ্বালানি তেলের দর কমে গেছে। সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনায় সংস্কার আনা প্রয়োজন। বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎস ব্যবহারে নতুন পরিকল্পনা নেয়া উচিত। করোনা মহামারী বিবেচনায় উৎপাদন সক্ষমতা কতটুকু রাখা হবে, তা পুনর্বিবেচনার সময় হয়েছে। ভাড়ায় চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে দেয়া ক্যাপাসিটি চার্জ পুনর্বিন্যাস করা দরকার। কারণ এর জন্যই বিপিডিবিকে বিপুল অংকের অর্থ কোনো সেবা প্রাপ্তি ছাড়াই ব্যয় করতে হচ্ছে। আবার বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও শিল্পায়ন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না হওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে না। করোনা মহামারীতে চাহিদাও কমে গেছে। এক্ষেত্রে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে করা চুক্তির মেয়াদ অতিক্রান্ত হয়ে গেলে তা নবায়ন না করা এবং বিদ্যুৎ ক্রয়মূল্য পুনর্নির্ধারণে বিপিডিবির পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
দেশে এ মুহূর্তে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অনেক বেশি। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করেছে, সেটা বাস্তবে কাজে লাগছে না। সক্ষমতার একটি বিরাট অংশ অলস বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। শুধু বসে থাকছে না, চুক্তি অনুযায়ী প্রতি মাসে শতকোটি টাকা মাসুল গুনতে হচ্ছে সরকারকে। এখানেই শেষ নয়, অদূর ভবিষ্যতে আরো অর্ধশতাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়ে গ্রিডে যুক্ত হবে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন। এখন লোকসানের বোঝা কম দেখালেও ভবিষ্যতে আরো বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর চুক্তি নবায়নের সময় ক্যাপাসিটি চার্জ বাদ দেয়া প্রয়োজন। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম কমায় এসব কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় কমেছে। তাই বেসরকারি খাত থেকে বিদ্যুৎ কেনার দামও কমানো দরকার। ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি নবায়নের সময় সেগুলোর কাছ থেকে ইউনিটপ্রতি কম মূল্যে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করা এবং তুলনামূলক উৎপাদন খরচ কম এমন কেন্দ্রগুলোর ব্যবহার বাড়াতে হবে।










