দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আসছে। ধীরে ধীরে এই কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন উন্নত দেশের অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে। শিল্পায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ সময়ের কৃষিনির্ভরতা আর থাকছে না। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কমে যাচ্ছে কৃষির অবদান। একই সঙ্গে বাড়ছে শিল্প খাতের অবদান। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিডিপিতে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অবদান ধীরে হলেও ক্রমবর্ধমান। এক্ষেত্রে কৃষি খাতের অবদান কমেছে এবং স্থবির রয়েছে সেবা খাত। জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ধারাবাহিকভাবে যে কমছে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ বাংলাদেশ অনেক দিন ধরেই কৃষিনির্ভর দেশ থেকে একটি শিল্পনির্ভর দেশে রূপান্তর হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন দেশে কর্মসংস্থান হচ্ছে, অন্যদিকে দারিদ্র্য বিমোচনেও শিল্প খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

উন্নত দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পর্যায় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, উন্নয়নের প্রথম অবস্থায় জিডিপিতে কৃষির অবদান থাকে সর্বাধিক, তার পরও ধীরে ধীরে কৃষির অবদান হ্রাস পেয়ে শিল্পের অবদান বাড়ে। এরপর সেবা খাতের বিস্তৃতি ঘটে। কিন্তু বাংলাদেশের জিডিপিতে কৃষির অবদান কমে এলেও শিল্পের চেয়ে সেবা খাতের অবদান বেড়েছে অপেক্ষাকৃত দ্রুত। অর্থনীতিবিদরা এ পরিস্থিতিকে কিছুটা সমালোচনাও করছিলেন, বিশেষত যেখানে আমরা শ্রম উদ্বৃত্ত দেশ, সেখানে শ্রমনির্ভর শিল্পায়ন সবচেয়ে জরুরি। গত কয়েক বছরের তথ্য-উপাত্ত এক্ষেত্রে আশার আলো হয়ে সামনে এসেছে। সন্দেহ নেই, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয়ের সুষ্ঠু বণ্টন, টেকসই দারিদ্র্য বিমোচন প্রভৃতির জন্য শিল্পায়নের বিকল্প নেই। এক্ষেত্রে চীনের পন্থাটি বিশেষ আকর্ষণীয়। কারণ সেখানে যেসব শিল্পের ওপর জোর দেয়া হয়েছে সেগুলো শ্রমনিবিড়। সে দেশের নীতিনির্ধারকরা এমন সব শিল্প বেছে নিয়েছেন, যাতে একজন উদ্যোগী সীমিত শিক্ষা, অল্প পুঁজি ও আধা দক্ষ কর্মী নিয়ে এবং কোনো পেশাদার ম্যানেজার ছাড়াই বেশ ভালো রকমের উৎপাদনশীলতা অর্জন করতে পারেন। ভারতের পাঞ্জাবেও এ ধরনের শিল্পায়ন ঘটছে। বস্তুত, বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সাফল্যের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। এখন বৃহৎ শিল্পের সঙ্গে এর সংযোগ ঘটাতে হবে।

শিল্পের অগ্রযাত্রার শুরুর দিকটায় মূলত যোগাযোগ ব্যবস্থা, জ্বালানিসহ বিভিন্ন সুবিধার সহজ প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতেই রাজধানী ঢাকা ও তার আশপাশের অঞ্চল এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামকেই বিনিয়োগের কেন্দ্র বানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ঘনত্ব বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে সেখানেই কেন্দ্রীভূত হয়ে গেছে শিল্প। কিন্তু কভিড-১৯ এসে শ্রমঘন শিল্পের কেন্দ্রীভবন নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ এনে দিয়েছে। কর ব্যবস্থায় সংস্থার ছাড়া সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন হবে না। বিনিয়োগের পরিবেশটার উন্নতি করা লাগবে। প্রশাসনিক যন্ত্রকে যুগোপযোগী করতে হবে, মেধাভিত্তিক হতে হবে। যোগ্য লোকের যথেষ্ট ঘাটতি আছে। শিক্ষা খাতকে ঢেলে সাজাতে হবে। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পুরোপুরি পুনর্গঠন করতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। চীন থেকে যে বিনিয়োগ আসার কথা, সেটা অন্য দেশে যাচ্ছে। এসব বিষয়ে ভাবতে হবে। পরিবর্তিত বিশ্বে কোনো একক খাতের ওপর নির্ভর করে অর্থনীতি টিকে থাকতে পারবে না। টিকতে হলে অবশ্যই উৎপাদন ও রফতানিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে। এজন্য নীতি সহায়তার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনতে হবে। যেটি চীন, ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো করেছে। বাণিজ্য উন্মুক্ত হওয়ার পাশাপাশি রফতানি বৈচিত্র্যকরণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ অঞ্চলের অনেক দেশই বাণিজ্য ব্যবস্থা উদার করার পাশাপাশি সময় অনুযায়ী কার্যকর নীতি প্রণয়ন করতে পেরেছে, যা দক্ষতা উন্নয়ন ও বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করে রফতানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। সার্বিকভাবে সঠিক সময়ে সঠিক নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে দেশগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতা শক্তিশালী হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে গত এক দশকে রফতানি খাতের কেন্দ্রীভবনে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। রফতানি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের রফতানি খাতে অনেক পণ্যই সম্ভাবনাময়। কিন্তু যথাযথ নীতি ও অবকাঠামো সহায়তার ঘাটতিতে খাতগুলোর বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। সম্ভাবনাময় পণ্যগুলোর মধ্যে আছে কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য, বাইসাইকেল, প্লাস্টিক ও ফার্নিচার। দ্রুত শিল্পায়ন ও শিল্পের আধুনিকায়নের জন্য বিশেষ করে বেসরকারি খাতের উন্নয়ন, সম্প্রসারণ, পণ্যের বহুমুখীকরণ, পণ্যের মান উন্নয়ন, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজার সম্প্রসারণে নতুন উদ্যোগ নেয়া আবশ্যক।

বাংলাদেশের ব্যাপক ও বাস্তবোচিত শিল্পায়নের জন্য পরিকাঠামো, শিক্ষা এবং ক্ষুদ্র শিল্পকে সহযোগিতার নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। শিল্পকে উৎসাহ দেয়ার জন্য চাই বহুমুখী উদ্যোগ। প্রয়োজনীয় উপকরণের জোগান-পরিবেশ-পরিকাঠামো এক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ, প্রযুক্তি, বিপণন একযোগে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যাগুলোর মোকাবেলা করতে না পারলে অগ্রগতি ধরে রাখা কঠিন হবে। অতীতে শিল্পের বিকাশে উৎসাহ দেয়ার জন্য মূলত সংরক্ষণের নীতি অনুসৃত হয়েছে। এ নীতির গোড়ায় গলদ ছিল। কোনো একটি শিল্পের পক্ষে কোনটি সেবা প্রযুক্তি, কী পরিমাণে উৎপাদন করলে উৎপাদনশীলতা সর্বাধিক হয়, তা সরকারের পক্ষে জানা, বিশেষত আগে থেকে জানা অনেক কঠিন। বরং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে শিল্পায়ন ঘটালে তা অপেক্ষাকৃত টেকসই হয়। আমাদের বিনিয়োগ পরিবেশের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এক্ষেত্রে তিনটি বিষয়কে দায়ী করা যায়—অতিরিক্ত সরকারি নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল পরিকাঠামো ও দক্ষতার ঘাটতি। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হলে পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় দুটোই বেশি লাগে, যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশীয় শিল্পকে পেছনে ঠেলে দেয়। স্থানীয় পর্যায়েও পণ্য সরবরাহে এর প্রভাব পড়ে। উৎপাদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো জ্বালানি। দেশে এখনো বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি রয়েছে। নতুন শিল্পে সংযোগ পেতে বেশ বেগ পোহাতে হয়। জমির স্বল্পতা আরেকটি দুশ্চিন্তার বিষয়। এক্ষেত্রে আলোর পথ দেখাচ্ছে অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিকল্পনা। এর সুষ্ঠু বাস্তবায়ন জরুরি। যোগাযোগ ব্যবস্থারও উন্নতি ঘটাতে হবে। উৎপাদনশীলতার পক্ষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, শ্রমিক-কর্মচারীদের শিক্ষার মান ও দক্ষতা। প্রশিক্ষণ ও কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে শিল্পের শ্রমের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব। শিল্পায়নের গতি আরো বাড়াতে হলে অর্থনীতিতে ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। এটি বিধিবিধান থেকে শুরু করে শিক্ষা পর্যন্ত বিস্তৃত করতে হবে।