শব্দদূষণ এখন রাজধানী ছাড়িয়ে জেলা শহর, এমনকি গ্রামেও বিস্তৃত হয়েছে। শব্দের সহনীয় মাত্রা ৫০ ডেসিবেল হলেও ঢাকার বেশির ভাগ এলাকায় ৯০ ডেসিবেলের বেশি মাত্রায় শব্দ হয়। কোথাও কোথাও তা ১২০ ডেসিবেলও ছাড়িয়ে যায়। ঢাকার এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এখন শব্দদূষণে আক্রান্ত। এভাবে শব্দদূষণ অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে ঢাকা শহরের মোট জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ কানে কম শুনবে। এদের একটি অংশ পুরোপুরি বধির হয়ে যাবে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাজুক অবস্থায় রয়েছে ট্রাফিক পুলিশ, শিশু ও নারী। গতকাল বণিক বার্তায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শব্দদূষণে শ্রবণ সমস্যায় ভুগছে ৬৪ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ। দিনের অধিকাংশ সময়ে তাদেরকে মারাত্মক শব্দদূষণের মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা যেহেতু সবসময় তীব্র শব্দের মধ্যে কাজ করেন, তাই তাদের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যঝুঁকিটা বেশি বলেই জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্বে থাকা সদস্যদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনা করে এখনই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
রাস্তায় যেসব মানুষ লাগাতার হর্নের বাজনা শুনতে বাধ্য হন, যেমন পুলিশ, ট্যাক্সিচালক বা দোকানদার, তারা নিশ্চিত বধিরত্বের দিকে এগিয়ে চলেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, হর্ন বাজানোর বাতিকের পেছনে সাধারণভাবে নানা কারণ কাজ করে চালকের রাগ, আশঙ্কা, ক্ষমতা দেখানোর তাগিদ, এক ধরনের মাস্তানি ইত্যাদির পাশাপাশি একটি বিশ্বাস যে হর্ন না বাজালে গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে দেরি হবে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে চালকের অধৈর্যের কথাও বলতে হবে, নয়তো ট্রাফিক সিগনাল সবুজ হওয়ামাত্র পেছনের গাড়িগুলোর হর্ন বাজানোর কোনো কারণ থাকতে পারে না। চালকরা যেন ভুলেই যান যে সামনের দিকের গাড়িগুলোও কোথাও না কোথাও দ্রুত পৌঁছতে চাইছে। আবার আচমকা যদি কেউ সামনে এসে পড়ে, সেই আশঙ্কা থেকেও চালকরা হর্ন বাজাতে বাজাতে যেতে পছন্দ করেন। এটাও মানতে হবে খারাপ রাস্তা, ফুটপাতের অভাবের কারণে পথচারীদের রাস্তা দিয়ে চলার অভ্যাস ও নানা গতির বিচিত্র যানের উপস্থিতি হর্ন বাজাতে অনেক সময় চালকদের বাধ্য করে। আর একটি গুরুতর কারণের কথাও বলতে হয়। তা হলো, হর্ন বাজানোর বিপত্তি সম্পর্কে সাধারণের আশ্চর্য অজ্ঞানতা বা নিস্পৃহতা। আমাদের দেশের রাস্তার হাল তাড়াতাড়ি বদলে যাবে এমন ভরসা করার কারণ নেই। অন্যদিকে গাড়িচালকরা শ্রেণী হিসেবে হর্ন বাজাতে ভালোবাসেন বললে কিছুই করার থাকে না। বাকি থাকে দুটি উপায়। প্রথমত, নিয়মবিধির কিছু পরিবর্তন আনা সম্ভব। জোরে হর্ন বাজানোর শাস্তি হিসেবে ক্রমবর্ধমান হারে জরিমানা আদায়ের কথা ভাবা যেতে পারে। একেক এলাকায় একেক রকমের শব্দবিধির জায়গায় সর্বত্র ডেসিবেলের একটিই মাত্রা ধার্য করে দেয়া দরকার। ট্রাফিক পুলিশদের এ বিষয়ে কড়া হাতে আইন প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু সম্ভবত আরো কার্যকর উপায় হবে গাড়ি নির্মাতা ও বিক্রয়কারীদের ওপর নজরদারি বাড়ানো, যাতে হর্নের ডেসিবেল নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং এয়ারহর্ন ও ডবল আওয়াজের বৈদ্যুতিক হর্নগুলোকে নিষিদ্ধ করা উচিত। তখন ট্রাফিক পুলিশের খেয়ালখুশির ওপর নির্ভর করতে হবে না, সরকারি পরিদর্শকরা সহজে এমন বিধিনিষেধ প্রয়োগ করতে পারবেন। দ্বিতীয় উপায়টি হলো, গাড়ি চালানোর স্কুলে সঠিক পদ্ধতির অংশ হিসেবে হর্ন সমস্যার কথা সম্পর্কে ভবিষ্যৎ চালকদের সচেতন ও সতর্ক করা।
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ অনুযায়ী হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্য কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০ মিটার ব্যাসার্ধ পর্যন্ত নীরব এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু সেটার গুরুত্ব কি আমরা দিচ্ছি? বুঝে আর না বুঝে এসব স্পর্শকাতর এলাকায় শব্দ না করার বিষয়টিকে আমরা আমলে আনছি না। যে কারণে শব্দদূষণ দিন দিন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা নিয়ন্ত্রণ করার কোনো উপায় নেই। শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬-এ বলা হয়েছে, শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব ও ক্ষতিকরের হাত থেকে সুরক্ষা দেয়ার কথা বলা আছে। এ আইনে বলা আছে, প্রতি ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন বা নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ কী কী করবে। এসব কর্তৃপক্ষের কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন এলাকা শনাক্ত করতে হবে। যেমন নীরব এলাকা, বাণিজ্যিক এলাকা, মিশ্র এলাকা, শিল্প এলাকা, আবাসিক এলাকা প্রভৃতি। নীরব এলাকায় হাসপাতাল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্কুল প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত হবে। ব্যাপক প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড, লিফলেট ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণকে সজাগ করার কথা বলা আছে। এসব থাকলে জনগণ কোথায় কী করতে হবে জানবে। কিন্তু এ আইন সম্পর্কে তেমন কোনো প্রচার নেই। এ আইন বাস্তবায়ন করলে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। আইনের প্রচার ও বাস্তবায়ন, সচেতনতা সৃষ্টি, হর্ন বাজানো থেকে বিরত, জেনারেটর ও যন্ত্রপাতির শব্দ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা করতে হবে বা রাখতে হবে। হাইড্রোলিক হর্ন বাজানোর ব্যাপারে আদালতের নির্দেশনা আছে, যা কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে।
আমদের অভিমত, সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শব্দদূষণের কারণ ও ক্ষতি সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টি করা। এ লক্ষ্যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণীর পাঠ্যসূচিতে আরো বেশি করে শব্দদূষণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা যায়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচার করে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে সরকার, উন্নয়ন সংস্থা ও কমিউনিটির সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শব্দদূষণ তাত্পর্যপূর্ণ মাত্রায় কমিয়ে আনার জন্য সরকারের সদিচ্ছা ও কিছু উদ্যোগ যথেষ্ট। বিশেষ করে গাড়ির হর্ন ও মাইকের যথেচ্ছ ব্যবহার প্রশাসন চাইলেই নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। যেহেতু এর সঙ্গে অর্থনীতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্পর্ক নেই বললেই চলে, সেহেতু এটি করতে গেলে প্রশাসনকে বড় ধরনের কোনো চাপের মুখেও পড়তে হবে না। যারা শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করবে, তারাই আজ স্বাস্থ্য হুমকির মুখে। তাই আমরা চাইব, গাড়ির শব্দদূষণ বন্ধে ট্রাফিক পুলিশ বিভাগ আরো সক্রিয় হবে।










