সচেতন, সচেতনতা ও সচেতন। জীবন-যাপনে কোন কাজেই সচেতনতার বিকল্প নেই। জেনে বুঝে আমরা যদি অচেতন থাকি তাহলে আমাদের কোন কাজেই সফলতা আসবে না। সচেতনতা বা সর্তকতাই সকল নিরাপত্তা দিতে পারে বলে আমার মনে হয়। ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। প্রাকৃতিক পরিবেশের সবচেয়ে কর্কশ ঋতু গ্রীষ্মকাল। মূলত বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ এই দুই মাস নিয়ে গ্রীষ্মকাল হলেও গরমের আগমনটা ফাল্গুনের শেষের দিক থেকেই শুরু হয়। আর তা বহমান থাকে জ্যৈষ্ঠের পরেও। গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহে প্রকৃতি থাকে উত্তপ্ত। ফলে এই সময়টা দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। কোথাও স্বল্প পরিসরে আবারও কোথাও বা ভয়াবহ। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ পর্যন্ত বাংলাদেশে যত বড় বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে তার সবকয়টিই বলা যায় রাজধানীশহর ঢাকাতে।
ক্ষয়ক্ষতি যেমনই হোক না কেন আগুণ কিন্তু সবসময় মারাত্বক। কারণ ছোট ছোট আগুনে মানুষ না পুড়লে পুড়ছে মানুষের স্বপ্ন৷ ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের সব বিভাগ থেকে ঢাকায় দুর্ঘটনার সংখ্যা ও ক্ষয়-ক্ষতি বেশি। পরিসংখ্যানসূত্রে , ২০১৮ সালে সারাদেশে ৮ হাজার ৪৬১টি আবাসিক ভবনে আগুনের ঘটনা ঘটেছে, এর ২০৮৮টি ঢাকায়, চট্টগ্রামে ২৮৫ ও রাজশাহীতে ১১৬টি এসব ঘটনায় শুধুমাত্র ঢাকায় প্রাণ হারায় ১২১ জন। আর এসব দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার মতো।
আর ২০১৪ সালে ১৫২টি অগ্নিদুর্ঘটনায় ৮৫ কোটি, ২০১৫ সালে ২১৩টি দুর্ঘটনায় প্রায় ২৮ কোটি ও ২০১৬ সালে ১৯০টি অগ্নিদুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। ইলেকট্রনিক্স সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউএসএসএবি) ২০১৮ সালের ৩১ মার্চে দেওয়া তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে ৬ বছরে অগ্নিকাণ্ড হয়েছে ৮৮ হাজার। এ অগ্নিকাণ্ডে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১ হাজার ৪০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। যেহেতু পোশাক কারখানাতেই হাজার হাজার মানুষ একসাথে কাজ করে তাই সেখানে আগুনে প্রাণহানির আশঙ্কা সবচেযে বেশি।
অগ্নিকাণ্ড এখন যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে৷ কেন এত দুর্ঘটনার শিকার ঢাকা? কারণ খুঁজলে উত্তর হলো ঢাকাতে অল্প জায়গায় বেশি মানুষ বসবাস করে। অনেক অপরিকল্পিত ও অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ রয়েছে। নতুন নতুন ইলেকট্রিক গ্যাজেট, ল্যাপটপ, মোবাইল চার্জারসহ অন্যান্য দাহ্য পদার্থের প্রাপ্যতা বেশি। তাই ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডসহ অন্যান্য দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি। আগুণ শুধু ঢাকাকেই পছন্দ করে, না আমি মনে করি আগুনের পছন্দ অসচেতন জনগণ। সে ঢাকারও হতে পারে, হতে পারে বাংলাদেশ বা বহির্বিশ্বের। এই অসচেতন জনগণকে জানাতে হলে আগে আমাদের মনে রাখতে হবে বা জানতে হবে অগ্নিকাণ্ডের উপকরণ, কারণ ও এই ব্যাপারে কী কী সাবধানতা আমাদের নেওয়ার প্রয়োজন।
সবার আগে বুঝতে হবে অগ্নিকাণ্ডের জন্য কী কী উপাদান কাজ করে। পড়ালেখা করাতে যেমন বই, খাতা, কলমের প্রয়োজন, একটি সংবাদ লিখতে হলে যেমন অসংখ্য তথ্যের প্রয়োজন তেমনি অগ্নিকাণ্ডও এমনিতে ঘটে না। যদি সেটা জানতে পারি, তাহলে সাবধান হতে সুবিধা হয়। অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম উপকরণ হলো অত্যধিক তাপ, জ্বালানী ও অক্সিজেন। চলুন জেনে নেই এগুলো কিভাবে অগ্নিকাণ্ড ঘটাতে সাহায্য করে। আগুন অথবা অত্যধিক তাপ হতে পারে সেটা বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট অথবা অন্য কোনো মাধ্যম থেকে। আগুন যদি নাও থাকে, অত্যধিক তাপ থেকেও কিন্তু অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে।
পুরান ঢাকায় একবার বিয়ে বাড়ির রান্নার তাপে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। ঘরে রান্নাবান্নার ফলে অত্যধিক তাপ সৃষ্টি হয়েছিল। নিচে কেমিক্যাল ফ্যাক্টরি থাকায় সেটা আগুন ছড়িয়ে দেয়। আগুন জ্বলার পরে যদি আশপাশে জ্বালানি থাকে, তবে সেটা সেই আগুনকে শক্তিশালী করে তোলে এবং সেটা ছড়াতে শুরু করে। কেমিক্যাল মজুত করে রাখলে কোনো অবস্থায় সেখানে এক স্ফুলিঙ্গ আগুনও যদি পৌঁছে, তাহলেই দাউ দাউ করে আগুন ছড়াতে শুরু করবে। পুরান ঢাকাকে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়। অক্সিজেন। অক্সিজেন ছাড়া আগুন জ্বলতে পারে না। অনেকেই জানেন না।
আগুন ধরার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম কাজ হচ্ছে ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে ফেলা। বদ্ধ ঘরের হাওয়ায় অক্সিজেন যদি না থাকে, আগুন দুর্বল হয়ে যায়। আপনি নিজেই গ্লাস উল্টো করে কাগজে আগুন ধরিয়ে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তাই কেউ জানালার কাচ ভাঙার চেষ্টা করবেন না। তাহলেই পুড়ে মরবেন। একই সঙ্গে খেয়াল রাখতে হবে, সেই ঘরে যেন মানুষ না থাকে। তাহলে অক্সিজেনের অভাবে তিনিও মারা যাবেন। এই হচ্ছে অগ্নিকাণ্ডের তিনটি উপকরণ।
অগ্নিকাণ্ডের অনেক কারণ আছে । বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ধরন ও প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্য থেকে দেখা যায় যে, বেশিরভাগ অগ্নিকাণ্ডের কারণই বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট। বৈদ্যুতিক সংযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় তাড়াহুড়ো করেই হোক আর খরচ বাচাতে গিয়েই হোক নিম্নমানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে সহজেই তা থেকে শর্টসার্কিট হয়ে আগুন লাগছে। পোষাক শিল্পে আগুন লাগার ক্ষেত্রে বিশেষত যে কারণটি লক্ষ্য করা যেতে পারে তা হলো কর্মরত অধিকাংশ শ্রমিক কর্মচারি ধুমপান করে। যখন বিরতি দেয়া হয় তখন অনেকেই এখানে সেখানে দাড়িয়ে ধুমপান করে। এরপর যখন ঘণ্টা বা সাইরেন বাজে কাজে ফিরে যাওয়ার তখন অনেকেই হাতের সিগারেট বা বিড়ির অবশিষ্টাংশটুকু যত্রতত্র ফেলে দেয়। সেই রেখে যাওয়া সিগারেটের অল্প একটু আগুন ভেতরের তাপে আরো বেশি উত্তপ্ত হয় এবং একসময় ভয়াবহ আগুন হিসেবে সব জ্বালিয়ে দেয়। মশার কয়েল থেকেও অগ্নিকাণ্ডের সুত্রপাত হতে পারে।
আর ঘটমান এই অগ্নিকাণ্ডগুলো ভয়াবহ হবার কারণ বিশ্লেষণে উঠে আসে যে, শপিংমল কিংবা কারখানা গুলোতে অগ্নি নিবার্পক ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে সহজে আগুন নিয়ন্ত্রনে আসে না। কোন এক ফ্লোরে আগুন লাগলে সাথে সাথে যদি অটো অ্যালার্মিং সিস্টেম চালু থাকে তবে অন্য ফ্লোরে অবস্থানরতরা আগেই স্থান ত্যাগ করতে পারে। এ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে অন্তিম মুহূর্তে সবাই বুঝতে পারে আগুন লেগেছে। ফলে তারা দিশেহারা হয়ে পড়ে। হতাহতের সংখ্যাও বাড়ে। আর বিল্ডিং তৈরির আইনটি তৈরি হয়েছে ২০০৬ সালে। ফলে অনেক ভবন আগে তৈরি দুঘর্টনার সময় হতাহতের পরিমান বাড়ে। গলদ রয়েছে অগ্নিনির্বাপণে ব্যবহৃত সরঞ্জাম নিয়েও৷ এ মুহূর্তে বেশি প্রয়োজন ফায়ার সার্ভিস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন৷
যান্ত্রিক এই কারণগুলো ছাড়াও অন্যতম কারণ হলো সাধারণ জনতার নিরক্ষরতা ও আগুনের বিষয়ে শিক্ষার অভাব। আমেরিকায় সাধারণ জনতাকেও আগুনের ব্যাপারে শিক্ষিত করা হয়। স্কুল-কলেজে শেখানো তো হয়ই, কর্মক্ষেত্রেও নিয়মিত ট্রেনিং দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এমন ব্যবস্থা আছে বলে আমি জানি না। তাছাড়া পাঠ্যপুস্তকেও এই বিষয়ে বিশদ আলোচনা নাই। ফলে আগুন ভয়াবহ রূপ ধারণ করার সময় বা সুযোগ পাই। পূর্বেই বলেছিলাম আগুন শুধু আর্থিক ক্ষতি করে না একটি স্বপ্নকেও কেড়ে নেয়। তাই কোথাও কোন অবস্থাতেই আগুন লাগুক এটা কারো কাম্য হতে পারেনা। সচেতনতাই পারে এর থেকে আমাদের রক্ষা করতে। তবে এই সচেতনতার জন্য তাহলে আমাদের করণীয় কী তাও কিন্তু জানতে ও জানাতে হবে। উচিত আগুন যেন না লাগে, সেটা খেয়াল রাখা। অফিস আদালতে আগুন নিয়ে কাজ কারবার না করাই ভালো।
ঘরের ভেতরে ম্যাচের কাঠি, সিগারেট, লাইটার ইত্যাদি অ্যালাউ না করা। চুলা জ্বালানো কাজে ওসব লাগলে নির্দিষ্ট স্থানে রাখা। বাড়ির বাইরেও জ্বলন্ত সিগারেট, জ্বলন্ত ম্যাচের কাঠি যেখানে সেখানে ছুড়ে না ফেলা। বৈদ্যুতিক তার, সার্কিট ইত্যাদি নিয়মিত চেক করা। যদি কোথাও কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়, তাহলে দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে মেরামতের ব্যবস্থা নেওয়া। অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, বৈদ্যুতিক আগুনে পানি ঢালা চলবে না। এতে আগুন ভয়াবহ রূপ নেবে। সে ক্ষেত্রে আপনাকে মেইন সুইচ অফ করে দিতে হবে। তারপরে ফোম বা বালি ছিটাতে হবে। কিন্তু পানি না। দাহ্য পদার্থ বাড়িতে না রাখা। রাখলেও সর্বোচ্চ সাবধানতা অবলম্বন করা। বিশেষ করে যেখানে আগুন লাগার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা থাকে, সেখানে অবশ্যই এসব পদার্থ না রাখা। প্রতিটা কমার্শিয়াল দালানে ইমার্জেন্সি ফায়ার এক্সিট রাখা, যদি না থাকে, তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা করা। যদি তার পরও কেউ ব্যবস্থা করতে না চান, তাহলে আইনের আওতায় এনে শাস্তির বিধান করা। ফায়ার এক্সিট না থাকলে কোনো কমার্শিয়াল ভবন নির্মাণের অনুমতি না দেওয়া।
প্রতিটা দালানের প্রতি তলায় কিছু দূরত্বে অগ্নিনির্বাপকের ব্যবস্থা থাকা, যাতে হাতের নাগালে পাওয়া যায়। সেই দালানে নিয়মিত কাজ করা প্রায় প্রত্যেক কর্মচারীকেই অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা কীভাবে ব্যবহার করতে হয় সেটার ট্রেনিং দেওয়া। মাসে একবার হলেও নিয়মিত ফায়ার ড্রিলের ব্যবস্থা করা। ফায়ার অ্যালার্ম বাজিয়ে ভবন খালি হলে কোন দিক দিয়ে বেরোতে হবে, সেটা অনুশীলন করা, যাতে বাস্তবে আগুন লাগলে মানুষ দিশেহারা হয়ে না যান। কোনো ঘটনা থেকে কেবল শিক্ষা নিয়ে বসে থাকলেই পরবর্তী ঘটনা আটকানো যায় না৷ কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তার যথাযথ কারণ বের করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই যে কোনো সভ্য সমাজের রীতি৷ কিন্তু আমরা তা করি না৷ আমাদের দেশে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন আইন মেনে চলার অভ্যাস নেই, সাধারণ মানুষকে আইন মানানোর বাধ্যকতা সৃষ্টির জন্য যে সব কর্তৃপক্ষ আছেন, তারাও হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেন৷
অনেক ক্ষেত্রে টাকা খেয়ে সব অনিয়মকে জায়েজ করে দেন৷ ফলে একের পর এক ট্রাজিড দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকে৷আসলে আইন বা নিয়ম না-মানার কারণেই আমাদের দেশে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটছে৷ একের পর এক বহুতল ভবন গড়ে উঠেছে একটার সঙ্গে আরেকটার গা ঘেঁষে৷ কোনো নিয়মের তোয়াক্কা ছাড়াই গড়ে উঠেছে ভবন৷ এক্ষেত্রে অবহেলাজনিত কারণে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর দায়-দায়িত্বও তাঁদের ওপর বর্তায়৷ এমনকি যেসব কর্তৃপক্ষের এইসব আইন কার্যকর করার কথা, তারাও দায়িত্ব এড়াতে পারেন না৷
আমাদের দেশে দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি খুবই অপ্রতুল৷ বিশেষ করে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে৷ যে ক্ষেত্রে আগুন নেভানো, মানুষকে সরিয়ে নেওয়া এবং জরুরি উদ্ধার কাজ পরিচালনা করা দরকার, সেসব ক্ষেত্রে আমাদেরকে আরো প্রস্তুতি নিতে হবে৷এবার জানতে চাই সরকার জনগণের নিরাপত্তার জন্য ব্যাপক কর্মসূচী গ্রহণ করে সেখানে ফায়ার সার্ভিস বিভাগের আধুনিকায়ন প্রয়োজন মনে করেন কি না? যারা আইন অমান্য করে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছে তারা আইনের উর্ধ্বে কি না? আগ্নিকান্ড প্রতিরোধে উপরোক্ত ব্যবস্থা প্রয়োজন কি না? আর অসচেতন জনগনের নিকট জিজ্ঞাসা, সচেতনতা আপনাদের ক্ষতি করে কি না? যদি অগ্নিকাণ্ড সকলের জন্য বিপদজ্জনক হয় তবে আসুন সকলে আগুনের নিরাপদ ব্যবহার করি ও সচেতন থাকি। নিজেকে নিরাপদ রাখি।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
gopalodikari1213@gmail.com










