মাত্র এক-দুই দশক আগেও দেশে চালের বাজার ছিল পূর্ণ প্রতিযোগিতামূলক, সেখানে ছিল অসংখ্য ক্ষুদ্র মিলার ও অসংখ্য ছোট ক্রেতা। কিন্তু এখন ছোট ছোট মিলারের স্থান গুটিকয়েক মিল মালিক দখল করে চলেছেন। গতকাল আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণার বরাত দিয়ে বণিক বার্তায় প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের বোরো মৌসুমে চালকল মালিকরা কৃষকের কাছ থেকে প্রতি কেজি ধান ১৪ টাকা ৯৭ পয়সা দামে কিনেছেন, যা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রায় ১১ টাকা কম। আবার সেই ধান প্রক্রিয়াজাত করে ন্যূনতম ৩৬ টাকায় বিক্রি করেছেন তারা। শুধু মিলার নয়, ট্রেডার্স বিশেষ করে ফড়িয়া, বেপারি, আড়তদাররাও ধান সংগ্রহকালে কৃষকদের দামে ঠকিয়েছেন।

মূলত মধ্যস্বত্বভোগীদের উত্থানের কারণেই ধানের দামে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। সেজন্য বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের পাশাপাশি মৌসুমের শুরুতে ধানের দাম নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়া সরকারের ধান সংগ্রহ বৃদ্ধি করতে হলে মজুদ সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি মৌসুমের শুরুতেই কৃষকরা যাতে ধান মজুদ বা সংরক্ষণ করতে পারেন, সে ব্যবস্থাও করতে হবে। সেই সঙ্গে বাজার তদারকির দায়িত্বে থাকা বিপণন অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করার ওপরও জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বাজার নিয়মিত নজরদারি করতে হবে এবং অস্বাভাবিক কিছু নজরে এলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেয়ার চর্চা প্রতিষ্ঠা জরুরি। অথচ বাস্তবে আমরা দেখি, যখন কোনো কিছুর দাম বাড়ে, এর কয়েক দিন পর তা সংবাদমাধ্যমে আসে, তারও কয়েক দিন পর সরকারের টনক নড়ে। যখন পদক্ষেপ নেয়া হয় তখন নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। উন্নত দেশগুলোর সরকার প্রতিটি সিদ্ধান্তই কৃষকের অনুকূলে নেয় এবং তারা সেটা গুরুত্ব সহকারে মনিটর করে। তারা সবসময় চাষীদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে। কিন্তু আমাদের দেশে সেটা হয় না। কৃষকরা যে বিনিয়োগ করেন, কায়িক পরিশ্রম করে পণ্য উৎপাদন করেন, সেই পণ্য বিক্রি করে তারা যেন লাভবান হতে পারেন, সেটা আমাদের সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে কৃষকরা যাতে কোনোভাবে হতাশ না হয়ে পড়েন, সেদিকে সরকারের লক্ষ্য রাখার পাশাপাশি কৃষক যেন দ্বিগুণ উৎসাহে কৃষিকাজের মাধ্যমে পণ্য উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন, সেজন্য সরকারকে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে তাদের পণ্য যৌক্তিক দামে কিনে মজুদ রাখতে হবে।

বর্তমানে প্রযুক্তির কল্যাণে কাজটি বেশ সহজ, কেননা মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন পৌঁছে যাচ্ছে দ্রুত, ইন্টারনেট সংযোগও বলতে গেলে বাংলাদেশের সর্বত্র সহজলভ্য। কোন অঞ্চলে কোন কৃষিপণ্যের ফলন বেশি আর কোথায় তার চাহিদা বেশি, সেই তথ্য কৃষকের কাছে স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে পৌঁছানো গেলে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে কাজটা অনেকটা সহজ হয়ে যেত তার কাছে। সেক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীদের বিপুল মুনাফা অর্জনের পথও কিছুটা কমত। বাংলাদেশের কৃষকদের পণ্য বিক্রি, বাজারজাতের জন্য সুবিধাজনক অ্যাপের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। অনেক দেশেই এমন অ্যাপ রয়েছে। এটি কৃষককে কৃষিপণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রির জন্য উপযুক্ত বাজারের সন্ধান দেয়। পাশাপাশি আবহাওয়াসহ কৃষিবিষয়ক বিভিন্ন হালনাগাদ তথ্যও পাওয়া যায় অ্যাপটি থেকে।

কৃষকরা যেন কৃষিকাজে আরো উৎসাহিত হন, সেজন্য সরকারকে বিভিন্ন পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে হবে। কৃষক থেকে শুরু করে এ খাতসংশ্লিষ্ট সবার জন্যই একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। এটা কীভাবে তৈরি হবে তা নিয়ে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। সরকার চাইলে অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে মার্কেট ম্যাকানিজম নিয়ে কাজ করতে পারে। এছাড়া ভ্যালু অ্যাডেড প্রডাক্ট নিয়ে কাজ করতে হবে। চালকলের ব্যবসায়ীদের জন্য একটি টেকসই নীতিমালা গ্রহণ করতে পারে। মিল মালিক ও আড়তদাররা কী দামে কিনবে কিংবা কী পরিমাণ ধান কিনতে পারবে তা সরকারকে ঠিক করে দিতে হবে। প্রতি বছর সরকারকে কস্ট ডিমান্ডের ওপর একটা স্ট্যান্ডার্ড দাম নির্ধারণ করে দিতে হবে, যাতে চালকলের মালিকরা নিজেদের ইচ্ছেমতো দাম বাড়াতে না পারেন। এতে মিল মালিকরা নিজেদের একটা ন্যায্য মুনাফা রেখে তা বাজারে বিক্রি করবেন। ফলস্বরূপ, কৃষক থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যন্ত সবাই এর সুবিধা ভোগ করতে পারবে। ধান হারভেস্টের সময় প্রচুর ধান আসে, যা গোলায় রাখার মতো জায়গা থাকে না। ফলে তাড়াতাড়ি বিক্রি করতে গিয়ে কৃষক উৎসাহজনক দাম পান না। এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এর সমাধান আসতে পারে বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করার মাধ্যমে। এক্ষেত্রে বিপণন ব্যবস্থা আধুনিকায়নের বিকল্প নেই। বাজারের সঙ্গে কৃষকের সংযোগ ঘটাতে বিশ্বের প্রতিটি দেশেই সরকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমাদের এখানেও এমন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।