চলতি বছরের মার্চ থেকে সব ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অচলাবস্থা তৈরি করেছিল করোনা মহামারী। তবে জুন থেকে ধীরে ধীরে সচল হতে থাকে উৎপাদনের চাকা, ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে অর্থনীতি। কিন্তু এরই মধ্যে ফের আঘাত হেনেছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। এতে আবারো অর্থনীতি থমকে যাওয়ার শঙ্কা করছেন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট মহল।
বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা সংক্রমণের প্রথম পর্যায়ে দেশের অর্থনীতিতে যে ক্ষতি হয়েছে, দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাতে তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, শীত চলে যাওয়ার পর বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল করোনার প্রথম পর্যায়ের আক্রমণ। এ কারণে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। তবে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাত মোকাবিলা করাটা কিছুটা কঠিন হবে বলে মনে করেছেন অর্থনীতিবিদরা।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের আঘাতে অর্থনীতি লণ্ডভণ্ড হতে পারে। কারণ, প্রথম পর্যায়ের চেয়ে দ্বিতীয় ঢেউ লম্বা ও দীর্ঘ সময় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ যে প্রাক্কলন করেছে, বাস্তবে তার চেয়েও কম হবে। বিশষজ্ঞরা বলছেন, আগামী বছরের জুনের আগে ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক নাও হতে পারে।
প্রথম পর্যায়ের করোনার ক্ষতি মোকাবেলা তথা অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য সরকার ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫৩ কোটি টাকার ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে। প্রণোদনার প্যাকেজ ছিল মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। পরবর্তীতে আবার কিছু বাড়ানো হয়। প্রথমে ৫০ বিলিয়ন ডলারের প্রণোদনা দেয়া হয় রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানার জন্য। উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বেতনভাতা দেওয়ার জন্য। এছাড়াও কয়েক বিলিয়ন টাকার পোশাক কারখানার রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়ে যায়। এসব কথা চিন্তা করে সরকার এ তড়িৎ সিদ্ধান্ত নেয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই বড় অংকের টাকা বিতরণ করা হয়।
এই ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য বরাদ্দ ২০০ বিলিয়ন টাকা। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্পের উদ্যোক্তরা এ প্যাকেজ থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হয়। পর্যাপ্ত জামানত না থাকা এবং বিতরণকৃত ঋণ ফেরত পাওয়ায় শংকা থাকায় ক্ষুদ্র ও মাঝারী উদ্যোক্তরা ঋণ দিতে ব্যাংকগুলো ভয় পায়।এ খাতে ২০ শতাংশের কাছাকাছি ঋণ বিতরণ করা হয় যা অত্যন্ত হতাশাব্যঞ্জক। বড় শিল্পের জন্য শতভাগের কাছাকাছি ঋণ বিতরণ করা হয়। শুধু বঞ্চিত হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্পের উদ্যোক্তরা। সম্প্রতি সিপিডি ও অক্সফাম আয়োজিত সংলাপ থেকে জানা যায়, প্রণোদনা প্যাকেজের বাস্তবায়নের বর্তমান স্থিতি অনুযায়ী প্রণোদনা প্যাকেজ পৌঁছেছে মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ৮ শতাংশের হাতে। তবে প্যাকেজের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে তা পৌঁছাত মাত্র ১২ শতাংশের হাতে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয় যে, বড় প্রতিষ্ঠানের জন্য যে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল দেওয়া হয়েছে তার ৭০ শতাংশের মতো ব্যবহার হয়েছে। ৮০ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য। ছোটদের প্রণোদনা প্যাকেজের ২৮ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে যা পেয়েছে ৩২ হাজার প্রতিষ্ঠান। এছাড়া কৃষির জন্য ঘোষিত ঋণের প্রণোদনা প্যাকেজের ৪৫ শতাংশ , ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ও পেশাদার কৃষকদের ঋণের মাত্র ২১ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের অঙ্গসংগঠন ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি) এর গবেষণা অনুযায়ী মাত্র ০ দশমিক ৪ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তরা প্যাকেজের আওতায় ঋণ পেয়েছে। তারা আরও বলেছে ৭৪ শতাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তরা প্রণোদনা প্যাকেজ সম্পর্কে অবগত নয়। আইএফসির গবেষণা মোতাবেক এ শিল্পে নিয়োজিত মোট ৩৭ শতাংশ মানুষ চাকরি হারায়। এছাড়াও এ শিল্পে গত বছরের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বিক্রি কমে যায়। এ খাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৬৬ শতাংশ রাজস্ব কমে যায়। অর্থাৎ করোনার প্রভাবে এ খাতে ক্ষতি হয় ৯২ হাজার কোটি টাকার।
বাংলাদেশ একটি উদীয়মান অর্থনীতির দেশ। এ দেশে শিল্পখাতে নিয়োজিত মোট শ্রমিক ৬ কোটির কাছাকাছি। তার মধ্যে ৮০ ভাগ নিয়োজিত ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্পে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মোট জিডিপির ২৫ ভাগ অবদান রাখে ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্প। অথচ করোনাকালীন সময়ে এ শিল্প হুমকির মুখে পড়ে যায়। ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্পের চাকা না ঘোরাতে পারলে আমাদের উদীয়মান অর্থনীতি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেনা। মনে রাখা দরকার যে ২৫ মিলিয়ন শ্রমিক এ শিল্পে নিয়োজিত রয়েছে। এ শিল্পের দিকে না তাকালে বেকারত্ব অতি দ্রুত বেড়ে যাবে। সেটার প্রভাব পড়বে সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনার উপর। আইএলও-এর প্রাক্কলন অনুযায়ী চলতি বছরে করোনার কারনে ১১ থেকে ১৭ লাখ মানুষ চাকরী হারানোর সম্ভাবনা রয়েছে। আইএলও এবং এডিবির গবেষনা অনুযায়ী নন-ফরমাল সেক্টরে ২৮ লক্ষ যুবক কাজ হারিয়েছে। ২০১৯ সালে কাজ হারায় ১১ দশমিক ৯ ভাগ মানুষ এবং ২০২০ সালে হারায় ২৪ দশমিক ৮ ভাগ মানুষ।
দেশের রপ্তানি খাতে আবারও করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ফলে সদ্যোবিদায়ি মাস নভেম্বরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় দেশের রপ্তানি আয় কমেছে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী কয়েক মাস খারাপ যেতে পারে। চলতি অর্থবছরের নভেম্বর মাসে লক্ষ্যমাত্রা ৩৩৫ কোটি ৪০ লাখ ডলারের বিপরীতে আয় হয়েছে ৩০৭ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, গত বছরের নভেম্বরের চেয়ে রপ্তানি আয় সামান্য (০ দশমিক ৭৬ শতাংশ) বেড়েছে। গত বছরের নভেম্বরে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৩০৫ কোটি ৫৯ লাখ ডলারের। অর্থাৎ আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার।
এ ছাড়া ইপিবির হিসাব অনুযায়ী চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাস জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১ শতাংশ (০ দশমিক ৯৩ শতাংশ )।গত পাঁচ মাসে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে মোট রপ্তানি করেছে এক হাজার ৫৯২ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের পণ্য। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল এক হাজার ৫৭৭ কোটি ৭১ লাখ ডলারের পণ্য।
বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের কারণে আগামী তিন মাস ভয়াবহ অবস্থা যাবে। তবে পরে সামনের দিনগুলোতে ধীরে ধীরে আবারও ঘুরে দাঁড়াবে। এই বছর টিকে থাকার ব্যবসা করার বছর নয়।ইপিবির পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত পাঁচ মাসে সার্বিকভাবে তৈরি পোশাক রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৪৮ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে এক হাজার ২৮৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এই খাতের রপ্তানির পরিমাণ ছিল এক হাজার ৩০৮ কোটি ৮৭ লাখ ডলারের।
তৈরি পোশাক ছাড়াও গত পাঁচ মাসে রপ্তানি কমার তালিকায় রয়েছে হিমায়িত খাদ্য ১ দশমিক ১২ শতাংশ, প্লাস্টিক পণ্য ১০ শতাংশ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ, বিশেষায়িত টেক্সটাইল ২ দশমিক ১৬ শতাংশ, সমুদ্রগামী জাহাজ ৭১ শতাংশ।
অন্যদিকে আলোচ্য সময়ে রপ্তানি বাড়ার তালিকায় রয়েছে কৃষিজাত পণ্য ০ দশমিক ২৫ শতাংশ, কেমিক্যাল পণ্য ১৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ, হস্তশিল্প পণ্য ৪৭ শতাংশ, পাট ও পাটজাত পণ্য ৩৭ শতাংশ, হোম টেক্সটাইল ৫১ শতাংশ এবং অন্যান্য খাতের পণ্য ১ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
আগামী মৌসুমকে কেন্দ্র করে হাতে রপ্তানি আদেশ অনেক কম। তাদের মতে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের প্রভাবে রপ্তানি নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। পশ্চিমের অনেক দেশে আংশিক লকডাউন শুরু হয়েছে। অনেক জায়গায় বিক্রয়কেন্দ্র বা শোরুম বন্ধ। অনলাইনে কিছু কিছু বেচা-বিক্রি চলছে। এসব কারণে বৈশ্বিক চাহিদা কমেছে ৬০ শতাংশ।
বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, আরো একটি ধাক্কা নিয়ে করোনার দ্বিতীয় ওয়েব এগিয়ে আসছে। এ নিয়ে শঙ্কিত তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তারা। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রফতানি ৮ শতাংশ, জার্মানিতে ১০ শতাংশ, জাপানে ২৮ শতাংশ, ইতালিতে ৩০ শতাংশ, কানাডায় ৩০ শতাংশ ও স্পেনে ৬ শতাংশ কমেছে। এর আগে পোশাকের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক অর্ডার বাতিল ও স্থগিত হয়েছে। এ পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ বছরের জন্য স্বল্প সুদে প্যাকেজের আওতায় ঋণ দরকার।
আবারও সরকারের নীতি ও অর্থ সহায়তা চাইলেন দেশের প্রধান রপ্তানি খাতের উদ্যোক্তারা। করোনার দ্বিতীয় ধাক্কায় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বর্তমানে ক্রয়াদেশ ৩০ ভাগ কম আসছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। বিজিএমইএ সভপতি আরো বলেন, বিশ্ববাজারে পোশাকের চাহিদা কমেছে ৬০ শতাংশ। রাতারাতি এই চাহিদা পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। শিগগিরই রপ্তানিতে গতি ফেরার সম্ভাবনা কম। সাধারণত রপ্তানি পরিস্থিতির আগাম চিত্র পাওয়া যায় ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনের (ইউডি) তথ্যে বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে ইউডি গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। ইউডির পরিসংখ্যানেই আগামী মাসগুলোর রপ্তানি চিত্রের আগাম ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।
এসময়, তিনি দেশের তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরেন। বলেন, করোনাভাইরাসের প্রথম ধাক্কা মোটামুটি সামাল দেওয়া গেলেও ২য় ধাক্কা লেগেছে দেশের প্রধান এই রপ্তানি খাতে। ১ম ধাপের সেই ধাক্কা কাটিয়ে গেল আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি নিয়ে বেশ শক্ত অবস্থানের জানান দিচ্ছিল দেশের প্রধান এই রপ্তানিখাত।
তবে, করোনার ২য় ঢেউয়ের শুরুতেই আবারও ভেসে উঠেছে এ খাতের দৈন্যদশার। নেতিবাচক প্রবৃদ্ধিতে আটকে পড়ে অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমেছে ৭ দশমিক সাত আট ও ২ দশমিক ছয় ছয় শতাংশ। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ক্রয়াদেশও আসছে ৩০ ভাগ কম।
এ অবস্থায় শর্তসাপেক্ষে প্রথম দফায় সরকারের দেওয়া প্রণোদনা প্যাকেজের (ঋণ) অর্থ পরিশোধে সময়সীমা ২ বছর থেকে বাড়িয়ে ৫ বছর করার দাবি জানান তিনি। সেই সঙ্গে শ্রমিকদের পাশে থাকতে আবারও কয়েক মাসের জন্য আগেরবারের মতোই একটা প্রণোদনা প্যাকেজ চান তিনি।
ইতোমধ্যে হানা দিয়েছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। এর প্রভাবে অনেক দেশে সীমিত আকারে লকডাউন (অবরুদ্ধ অবস্থা) চলছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দেশের শিল্প খাতে আগামী দিনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, যার প্রভাব দীর্ঘ হবে-এমন আশঙ্কা অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, করোনা অর্থনীতির সব খাতেই আঘাত করেছে। এর ক্ষত না শুকাতেই আবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসছে। এতে ক্ষতি আরও বাড়বে। এ ক্ষতি পোষাতে সচল শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। বন্ধ বা রুগ্ণ শিল্পগুলো চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। নতুন বিনিয়োগে গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলে মানুষের আয় বাড়ানো সম্ভব হবে। তখনই কেবল শিল্প খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
করোনার প্রথম অভিঘাত মোকাবেলায় সরকার যথাসময়ে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সফল হয়েছে। তবে দ্বিতীয় অভিঘাত মোকাবেলায় সরকারকে আরো সচেষ্ট হতে হবে। দেশের সব উপজেলা পর্যায়ে ওএমএস চালু করতে হবে। নতুন করে যারা দরিদ্র হয়েছে এবং যারা চাকরি হারিয়েছে তাদের জন্যও সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, আমরা সিপিডি’র পক্ষ থেকে দেখেছি এখন শতকরা ৩৩ ভাগ গরিব মানুষ কোনো ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নেই। করোনার কারণে এক কোটি ৭০ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। তাদের কী করা হচ্ছে সে বিষয়ে আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে।
করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাব থেকে ব্যবসায়ীদের কিছুটা রেহাই দেয়ার জন্য এক বছরের জন্য ঋণ শ্রেণীকরণ থেকে অব্যাহতি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রথমে জুন মাস পর্যন্ত, এরপর আরো দুই ধাপে তা বাড়িয়ে ডিসেম্বর পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। এ সময়ের মধ্যে কোনো গ্রাহক ঋণ পরিশোধ না করলে তাকে ঋণখেলাপি বলা যাবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনা কার্যকরের সময় আগামী ৩১ ডিসেম্বরেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। নতুন কোনো নির্দেশনা না দিলে খেলাপি ঋণের আগের নীতিমালাই কার্যকর হবে।
দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের আগে থেকেই খেলাপি ঋণ নিয়ে ব্যাংকিং খাতে ছিল টালমাটাল পরিস্থিতি। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরেই ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছাড়ায় ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। ২০১৯ সালে রেকর্ড ৫০ হাজার ১৮৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে বছর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে আনে ব্যাংকগুলো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছাড়ের কারণে চলতি বছরে ব্যাংকের কোনো ঋণ খেলাপি হওয়ার সুযোগ নেই। তার পরও সেপ্টেম্বর শেষে ৯৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ছিল খেলাপি ঋণ। এর বাইরে ২০১৯ সাল শেষে দেশের ব্যাংকগুলোর খেলাপি, পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনকৃত দুর্দশাগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৩৭ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। এ ঋণের সঙ্গে অবলোপনকৃত প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা ও উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকা ঋণ যুক্ত হলে ব্যাংকিং খাতের বিপদগ্রস্ত ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ কোটি টাকার বেশি। ঋণ পরিশোধে বাধ্যবাধকতা ফিরে এলে খেলাপি ঋণের পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ব্যাংকাররা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে জানা যায,ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে আরো সাড়ে ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থ খেলাপি ঋণের ঘরে পৌঁছানোর আগের ধাপে অবস্থান করছে। আগামী জানুয়ারি থেকে ছয় মাস পার হলেই সংশ্লিষ্ট অর্থ খেলাপি ঋণের নিম্ন স্তর অর্থাৎ নিম্নমানের (এসএস) খেলাপি ঋণের ঘরে চলে যাবে।
ব্যাংকাররা মনে করেন, আগামী জানুয়ারির পর থেকে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র ব্যাংকের সামনে বের হয়ে আসবে। খেলাপি ঋণ জাম্প করতে থাকলে ব্যাংকগুলোর বর্ধিত হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করা কষ্টকর হয়ে পড়বে।
ঋণ শ্রেণীকরণের সময়সীমা আগামী বছরের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যাংকাররা জানান, গত জানুয়ারি থেকে ঋণ আদায়ের ওপর শিথিলতা আরোপ করায় ঋণ আদায় কার্যক্রম থেমে গেছে। যারা নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতেন তাদের অনেকেই ঋণ পরিশোধ বন্ধ করে দেন। এখন করোনাভাইরাস সৃষ্ট আর্থিক দুর্যোগ এ ঋণ খেলাপি সংস্কৃতিকে স্থায়ী রূপ দেয়ার দিকেই এগিয়ে নিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া ছাড়কে বড় ঋণগ্রহীতারা মহাসুযোগ হিসেবে নিয়েছেন। ছোট ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে কৌশলে কিস্তি আদায় করা সম্ভব হলেও বড়রা টাকা দিচ্ছে না। উল্টো কিস্তি না দিয়ে তারা ব্যাংক থেকে প্রণোদনার অর্থ বের করে নিচ্ছেন।
বর্তমানে নীতিমালার কারণে ঋণ পরিশোধ না করলেও ঋণখেলাপি করা যাচ্ছে না, এতে ঋণ আদায় না হলেও খেলাপি ঋণ না বাড়ায় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে না। এতে ব্যাংকগুলো কৃত্রিম আয় বাড়িয়ে দেখানোর সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আর এ কৃত্রিম আয়ের ওপর ভিত্তি করেই ৪০ শতাংশ পর্যন্ত সরকারের করপোরেট ট্যাক্স পরিশোধ করতে হবে। সরকারের কর পরিশোধ করার পর যে অংশ বাকি থাকবে তা থেকে শেয়ারহোল্ডারদের মাঝে মুনাফা বণ্টন করতে হবে। এতে ব্যাংকের ভিত্তি আরো দুর্বল হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রজ্ঞাপন জারি করে ব্যাংকগুলোর মুনাফায় লাগাম টেনে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রজ্ঞাপনে বলেছে, বিশেষ হিসাবে থাকা বা স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্টের (এসএমএ) ঋণ ও সব ধরনের ভালো ঋণের ওপর অতিরিক্ত ১ শতাংশ হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি (প্রভিশনিং) রাখতে হবে। সেই সঙ্গে ব্যাংকগুলো তাদের কোন ঋণের সুদকে আয় খাতে নিতে পারবে, তা–ও নির্দিষ্ট করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এভাবেই চলতি বছরের আর্থিক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করতে হবে ব্যাংকগুলোকে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য আগামী কয়েকটি মাস অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময়। প্রবাসী আয়সহ বৈদেশিক রপ্তানি আয় সামনের কয়েক মাস হতাশাজনক বার্তা দিতে পারে, ঋণের কিস্তি জুন পর্যন্ত স্থগিত করার কারণে ব্যাংকের তারল্য কমে যাবে। উপরন্তু, সরকার প্রণোদনা ব্যয় নির্বাহের জন্য ব্যাংক থেকে টাকা চাইবে, ডিপোজিট সংগ্রহ কমে যাবে, ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রচণ্ড তারল্য সংকটে ভুগবে। তাই এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাজ হবে তারল্য সংকট সৃষ্টি হতে না দেওয়া এবং প্রান্তিক পর্যায়ে বিনিয়োগ পৌঁছে অর্থনীতিকে সচল রাখা।
করোনার প্রথম ঢেউ এবং ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশে নামিয়ে আনার ফলে অধিকাংশ ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ক্ষতি হ্রাস করতে অনেক ব্যাংক কর্মীদের বেতন ভাতা হ্রাস করে আবার অনেক ব্যাংক কর্মী ছাঁটাইও করে। প্রথম পর্যায়ে ক্ষতির ধাক্কা কাটিয়ে উঠার চেষ্ঠা করছে ব্যাংকগুলো। ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলো পরিচালন মুনাফায় ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসার চেষ্ঠা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সঞ্চিতি সংরক্ষণের ফলে ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর মুনাফা আরো কমে যাবে। এমনকি বছর শেষে অনেক ব্যাংকই লোকসানে চলে যেতে পারে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ অর্থনীতিতে কী পরিমাণ ক্ষতির মধে ফেলে, কীভাবে এর প্রভাব মোকাবেল করা যায় তা নিয়েই শঙ্কিত ব্যাংক খাত।
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে আশার কথা জানিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সম্প্রতি সংস্থাটি এক প্রতিবেদনে কোভিড-১৯-এর মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি শক্তিশালী হচ্ছে বলে জানিয়েছে। করোনাকালে বিগত কয়েক মাসে রফতানি ও রেমিটেন্সের ইতিবাচক ধারার ওপর ভর করে অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক দ্রুত ঘুরে দাঁড়াচ্ছে দেশটি। তবে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি গন্তব্যগুলোতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ব্যাপকভাবে শুরু হওয়ার ফলে দেশটির পুনরুদ্ধার এখনও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
ই-মেইল: ma_masum@yahoo.com










