ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডের জমি মালিকানার বিদ্যমান ব্যবস্থায় কৃষিতে আর খুব বেশি উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব নয়। এ অবস্থায় তাত্ক্ষণিকভাবে সামনে আসা সমস্যা সমাধানে অস্থায়ী ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিলে হবে না। তার জন্য চাই দীর্ঘমেয়াদি সামগ্রিক ভূমি সংস্কার। এরশাদের আমলে ভূমি সংস্কারের একটি পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। কৃষির পরবর্তী ধাপে উল্লম্ফনের জন্য এ অসমাপ্ত কাজটি শেষ করতে হবে। একটা পর্যায়ে উৎপাদনশীলতা স্থবির হলে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া ভূমি সংস্কার করে বৃহৎ খামারভিত্তিক বাণিজ্যিক কৃষির রূপান্তর ঘটিয়েছে। আমাদেরও এটি জরুরি।
অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তরের সঙ্গে দেশে বড় বড় শহর ঘিরে ম্যানুফ্যাকচারিং ও নির্মাণ খাতের বিস্তার ঘটছে। এ খাতের শ্রম চাহিদা মেটাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। আবার একটা বড় অংশ বাইরেও যাচ্ছে। ফলে কৃষি খাতে দেখা দিচ্ছে শ্রমিক সংকট। সামনে এ সংকট আরো বাড়বে। সেই বিবেচনায় কৃষিতে মজুরি খরচ যে বাড়বে, তা সহজেই অনুমেয়। এর সমাধান হিসেবে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ব্যাপক প্রসারের কথা বলা হলেও ক্ষুদ্রাকৃতির খামার ধরনের কারণে সেটি সম্ভব হচ্ছে না। এটি পরিবর্তন করা জরুরি। লক্ষণীয় বিষয় হলো, অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনে একসময় কৃষিতে যুক্ত মানুষের সংখ্যা কমে আসে, এটিই স্বাভাবিক। জাপান, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্র, সুইডেন প্রভৃতি দেশে মোট জনসংখ্যার মাত্র ২-৩ শতাংশ মানুষ কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। উল্লিখিত সংখ্যক লোকই হাজার হাজার একর কৃষিজমিতে বিপুল পরিমাণ মৌলিক কৃষিজাত পণ্য উৎপাদন করছে এবং নিজেদের খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে তা থেকে একটা অংশ রফতানিও করছে। এটি সম্ভব হয়েছে মূলত বৃহৎ খামারের কারণে। বৃহৎ খামারভিত্তিক কৃষির সুবাদে সুদক্ষ ব্যবস্থাপনায় দেশগুলো সর্বতোভাবে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে সমর্থ হয়েছে। এতে উৎপাদনশীলতা, শস্য নিবিড়তা যেমন বেড়েছে, তেমনি উৎপাদন খরচও নিয়ন্ত্রণে থেকেছে। কাজেই কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বাস্তবিক প্রয়োজনেই বৃহদায়তন খামারভিত্তিক কৃষি গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বৃহৎ জমি নিয়ে যেকোনো কৃষিভিত্তিক খামার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রধান বাধা অবশ্য আইনি। অনেক দেশে সাধারণত বাজার ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদনশীলতা বিবেচনায় জমির মালিকানা পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশে জমি হস্তান্তর প্রক্রিয়া মূলত উত্তরাধিকারভিত্তিক। এতে ওয়ারিশ অনুযায়ী জনপ্রতি জমি ভাগ হতে হতে প্রজন্মান্তরে তা ক্ষুদ্র খণ্ডে পরিণত হয়, যা বড় খামার গড়ার পক্ষে প্রতিবন্ধক। আলোচ্য প্রতিবন্ধকতা দূরে প্রয়োজনীয় আইনি সংস্কার করা জরুরি। সরকার কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহারসংক্রান্ত আইন করলেও উত্তরাধিকার আইনে সংস্কারের অভাবে তার সুফল মিলছে না। কৃষিজমির মালিকানায় কীভাবে পরিবর্তন আনা যায় এবং সুন্দর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বড় খামারভিত্তিক কৃষি রূপান্তর ঘটানো যায়, তার জন্য উচ্চ আয়ের দেশগুলোর অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা যেতে পারে। সমবায় করে কিংবা কনট্র্যাক্ট ফার্মিংয়ের মাধ্যমে মালিকানা পরিবর্তন না করেও বড় খামারভিত্তিক আবাদ প্রক্রিয়ার উন্নয়ন সম্ভব বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এটি আমলে নেয়া যেতে পারে।
সর্বত্রই নতুন নতুন কৃষিপ্রযুক্তির বিকাশ ও যান্ত্রিকীকরণ ঘটছে। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। কিন্তু উচ্চ দামের কারণে বড় কৃষিযন্ত্র বিপুল দামে একক ব্যক্তির পক্ষে কেনা সম্ভব নয়। তাছাড়া কারো জমিতে ফসল আগে আসে, কারো জমিতে পরে আসে। এতে একজনের জমির ওপর দিয়ে যন্ত্র আনা-নেয়া করতে সমস্যা হয়। গুটিকয়েক ব্যক্তির ব্যবস্থাপনায় বৃহৎ খামারের জন্য একটি যন্ত্র কিনলে তাতে অনেকেই লাভবান হয়। উপযোগিতার দিক থেকেও বড় খামার সাশ্রয়ী। জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, কৃষিজমি যেভাবে কমছে, তাতে একসময় আমাদেরও বড় খামার এবং বাণিজ্যিক কৃষিতে যেতেই হবে। কৃষির সার্বিক উন্নতিতে এ রূপান্তর সুপরিকল্পিত উপায়ে কীভাবে করা যায়, সেটি এখন থেকে ভাবতে হবে।










