দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপখাত গরু পালন। জিডিপিতে এর অবদান এখনো অনুল্লেখ্য হলেও চাষাবাদ, খাদ্যনিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন, পুষ্টি এবং কর্মসংস্থানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে এ খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দৃশ্যমান। বৈশ্বিক খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সর্বসাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে গরু পালনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন দ্বাদশ। নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় অর্জন। এটিকে ধরে রাখতে হবে, আরো টেকসই করতে হবে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অবস্থান আরো কীভাবে উন্নীত করা যায়, সেই চেষ্টা করতে হবে। অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় খাত বিবেচনায় বর্তমানে শিক্ষিত বেকার তরুণদের একটি অংশ গরুর বাণিজ্যিক খামারে যুক্ত হচ্ছেন। সাধারণ খামারিরাও গরু লালন-পালনের ক্ষেত্রে এখন আগের চেয়ে সক্রিয় ও মনোযোগী। তাদের এ উদ্যমকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে গরু পালনে আমাদের অবস্থান আরো সংহত হবে বৈকি। তবে সত্য হলো, এ খাতে এখনো কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। এর মধ্যে কিছু অর্থায়ন-সম্পর্কিত, কিছু বাজার ব্যবস্থাপনাগত এবং কিছু সংশ্লিষ্ট খাতের অন্তর্নিহিত প্রতিবন্ধকতা। এগুলো নিরসন করতে হবে।
দেশে গরু বা পশু পালনের জন্য ঋণপ্রাপ্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হলেও খামারিদের অনেকেই ব্যাংকঋণ পান না। বড় ও প্রাতিষ্ঠানিক খামারিদের একটি ক্ষুদ্র অংশ ঋণ পেলেও ক্ষুদ্র খামারিরা ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে কোনো রকম আর্থিক সহায়তা পান না। ফলে নিজেদের খামারের অধিকতর উন্নয়নে তারা বিনিয়োগ করতে পারছেন না। কাজেই অর্থায়নের ক্ষেত্রে বিরাজিত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। ঋণ ব্যবস্থা তাদের জন্য সহজ করার পাশাপাশি স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ বিতরণের পরামর্শ খাতসংশ্লিষ্টদের। এটি আমলে নিয়ে বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা জরুরি। বণিক বার্তার সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, পশুখাদ্যের অত্যধিক উচ্চমূল্য, বিদ্যুৎ-পানির বিল কৃষির আওতায় না আনার কারণে খামারিদের খরচ বাড়ছে। উপযোগ ও পশু পালনে প্রয়োজনীয় উপকরণের ক্ষেত্রে খরচ কমিয়ে তাদের মুনাফা বাড়াতে কীভাবে পৃষ্ঠপোষকতা জোগানো যায়, তার জন্য সরকারি হস্তক্ষেপ দরকার।
গরু পালন বাণিজ্যিকভাবে প্রসারের ক্ষেত্রে একটি বড় ইস্যু বাজার ব্যবস্থাপনাগত। বিশেষত ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য এখনো ভালো বাজার সংযোগ গড়ে ওঠেনি। বাজার ব্যবস্থাপনায় তাদের সর্বোচ্চ সুযোগ দিয়ে সংযোগটি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রক্রিয়াকৃত মাংস থেকে শুরু করে দুগ্ধজাত পণ্যগুলো ভ্যালু চেইনে কার্যকরভাবে একীভূত হতে পারে। সন্দেহ নেই, পুরো ব্যবস্থাপনাটিই বর্তমানে বাজারশক্তি দ্বারাই চালিত। কিন্তু তার মধ্যেও বাজারে খামারিদের অধিকতর অভিগম্যতা নিশ্চিতে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সহযোগিতায় বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া যায় কিনা, সেটি ভাবা যেতে পারে।
অর্থায়ন ও বাজার ব্যবস্থাপনা কিছুটা বহিঃস্থ চ্যালেঞ্জ হলেও গরু পালনের ক্ষেত্রে কিছু অন্তর্নিহিত বাধা আছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে উন্নত জাতের উন্নয়নে ঘাটতি, পশু স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, পশু লালনপালনে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অভাব, কৃেকৗশলগত অনগ্রসরতা প্রভৃতি। দেশে উন্নত জাতের উৎপাদনশীল গরুর সংখ্যা এখনো সীমিত। আবার যা আছে তার মধ্যেও একটি অংশ তাত্ক্ষণিক লাভ বিবেচনায় জবাই হচ্ছে। ফলে উন্নত জাতের গরু উৎপাদন বাড়ছে না। এটি বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে ভালো মানের ব্রিড ও সিমেন আমদানির পাশাপাশি দেশী জাত উন্নয়নের গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে উৎপাদন বাড়ানো যায়। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে যেমন সম্পৃক্ত করতে হবে, তেমনি রাষ্ট্রীয় সক্রিয়তাও বাড়াতে হবে। প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরেকটি বাধা রোগবালাই। এক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, কেবল অসুস্থতার কারণেই গবাদিপশুর অর্ধেক মারা যায়। অথচ বাস্তবতা হলো, পশু স্বাস্থ্যসম্পর্কিত সেবার কাভারেজ এখনো সীমিত। গরুর মৃত্যু কমাতে হলে রোগ নির্ণয় সামর্থ্যের উন্নয়ন ঘটাতে হবে, ভেটেরিনারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের সংখ্যা বাড়াতে হবে; বিশেষ করে ক্ষুদ্র খামারিদের কাছে এসব সেবা সুনিশ্চিত করা চাই। প্রযুক্তিগত মেলবন্ধনের মাধ্যমে বিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে গরু পালনের ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটলেও আমাদের খামারিদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও কৃেকৗশলগত ঘাটতি আছে। এ ঘাটতি দূরে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটাতে হবে এবং বৈজ্ঞানিক উপায়ে গরু পালন বিষয়ে প্রশিক্ষিত করতে খামারিদের প্রশিক্ষণ জোরদার করতে হবে। গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ আরো বাড়াতে হবে এবং উপখাতটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোও প্রয়োজন।
লক্ষণীয় বিষয় হলো, মাংস উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও কোনো ধরনের উন্নত পরীক্ষা ছাড়াই আমদানীকৃত মাংস প্রবেশ করছে। খামারিদের জন্য এটা বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাজেই খাতটির অগ্রগতির স্বার্থে মাংস আমদানিতে শুল্কারোপের পাশাপাশি অশুল্ক বাধাগুলো বেশি প্রয়োগের সুপারিশ তাদের। এটা বিবেচনায় নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যকর পদক্ষেপ কাম্য। গরু উৎপাদন যেহেতু বাড়ছে, সেহেতু যথাযথ মান নিশ্চয়তাপূর্বক কীভাবে মাংস রফতানি করা যায়, সেটি ভাবতে হবে। এর সম্ভাব্য বাজার অন্বেষণে এখন থেকেই তত্পরতা জরুরি। ব্রাজিল, চীন, ভারত, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশ গরু উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে। খাতটির উন্নয়নে দেশগুলো কী ধরনের নীতি নিয়েছে, নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন এনেছে, তা পর্যালোচনাপূর্বক সেগুলো আমলে নেয়া যেতে পারে। সর্বতো রাষ্ট্রীয় নীতি সমর্থনে দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন বেগবান হবে বলে প্রত্যাশা।










